Table of Contents
![]() |
সুলতানি বাংলার ন্যায়ভিত্তিক শাসন, সাংস্কৃতিক বিকাশ, বাংলা ভাষার পৃষ্ঠপোষকতা এবং লোকজ ঐতিহ্যের প্রতীকী উপস্থাপন |
৩:৫
Previous Part.......
বাংলা ভূখণ্ডে স্বাধীন সুলতানি সালতানাতের সাড়ে পাঁচশো বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটি কেবল একটি শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তনের দলিল ছিল না; বরং তা ছিল এই বদ্বীপের আদিম ও লৌকিক ঐতিহ্যের চূড়ান্ত মুক্তির এক সোনালী মহাকাব্য। বহিরাগত আর্য ও কর্ণাটকীয় সেন রাজাদের আমলে যে সাধারণ মানুষ ও তাদের মুখের আদি-বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় ফতোয়া দিয়ে অস্পৃশ্য করে রাখা হয়েছিল, মুসলিম সুলতান ও সুফি-সাধকদের উদার স্পর্শে তা এক রাজকীয় গৌরব ও সামাজিক শ্রী লাভ করে। এই শাসনতান্ত্রিক মডেলের সবচেয়ে বড় সফলতা ছিল এর অনন্য সমন্বয়বাদী চরিত্র—যেখানে কোনো কৃত্রিম বা উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতিকে সাধারণ মানুষের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া হয়নি।
মুসলিম শাসকেরা এ দেশের জল-হাওয়া, ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে নিজেদের এমনভাবে বিলীন করে দিয়েছিলেন যে, তারা নিজেরা বহিরাগত উৎস থেকে এলেও এ দেশের মাটিকে নিজেদের একমাত্র স্বদেশ হিসেবে গ্রহণ করে প্রকৃত ‘ভূমিপুত্রে’ রূপান্তরিত হয়েছিলেন। তারা এ দেশের ধন-সম্পদ বাইরে কোনো সাম্রাজ্যে পাচার করেননি, বরং এই পলিমাটির অর্থনীতি ও লোকজ ঐতিহ্যকে হৃষ্টপুষ্ট করতে অকৃপণভাবে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। এই উদার ও বৈষম্যহীন রাজনৈতিক ছায়াতলের কারণেই বাংলার প্রাচীনতম পেশাজীবী কারিগর সমাজ এবং সাধারণ আমজনতা শতাব্দীর প্রাচীন সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক গোলামি থেকে চিরতরে মুক্তি লাভ করে এক অনন্য আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার পেয়েছিল।
ঐতিহাসিকদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত: জালিয়াতির বয়ান চূর্ণকরণ
বিংশ শতকের আধুনিক ইতিহাসতাত্ত্বিক ও সমাজবৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলোর তুলনামূলক খতিয়ান ইন্টারনেট এবং তাদের বইয়ে গেড়ে বসা হিন্দুত্ববাদী ও ঔপনিবেশিক ‘সাংস্কৃতিক জালিয়াতি’র বয়ানকে সমূলে চূর্ণ করে দেয়। প্রখ্যাত হিন্দু পণ্ডিত ড. দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর ঐতিহাসিক স্মারক গ্রন্থে যে ধ্রুব সিদ্ধান্ত দিয়ে গেছেন, তা আধুনিক কালের সমস্ত প্রোপাগান্ডাকে স্তব্ধ করার জন্য যথেষ্ট। তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে স্বীকার করেছেন যে, মুসলিম সুলতানদের রাজকীয় আশ্রয় ও সরাসরি অর্থসাহায্য না পেলে বাংলা ভাষা পণ্ডিতদের অবজ্ঞায় চিরতরে লোপ পেয়ে যেত। একইভাবে, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ এবং মার্কিন ঐতিহাসিক ড. রিচার্ড ইটন তাঁদের স্বতন্ত্র প্রামাণ্য গবেষণায় প্রমাণ করেছেন যে, বাংলায় ইসলামের প্রসার কোনো তরবারির জোরে হয়নি; বরং তা ছিল আর্যদের কঠোর জাতিভেদ প্রথায় পিষ্ট এই মাটির সন্তানদের স্বতঃস্ফূর্ত সামাজিক মুক্তি ও আইনি ইনসাফ অন্বেষণের এক মহিমান্বিত বিপ্লব।
তিব্বতি বৌদ্ধ ঐতিহাসিক লামা তারানাথের ডায়েরি ও দলিল যেভাবে নালন্দা ধ্বংসের আসল অপরাধী হিসেবে দুই ক্ষুব্ধ উচ্চবর্ণের হিন্দু তান্ত্রিক ব্রাহ্মণকে চিহ্নিত করেছে, তা প্রমাণ করে, মুসলিম শাসকদের ওপর জ্ঞানপীঠ ধ্বংসের যে অপবাদ চাপানো হয়েছিল, তা ছিল এক সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা। মধ্যযুগের মুসলিম শাসনে বাংলায় যে অভূতপূর্ব ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সর্বজনীন আইনি নিরাপত্তা কায়েম হয়েছিল, তার ফলেই এ দেশের সাধারণ মানুষের মুখে ভাষার শৃঙ্খল চিরতরে মুক্ত হয়েছিল। সুতরাং, ইতিহাসের নিরেট সত্য এটাই সাক্ষ্য দেয় যে—ভাষা, ভূমি এবং শাসনতান্ত্রিক ইনসাফ—কোনো বিচারেই উচ্চবর্ণের সনাতনপন্থীরা এই বাংলার আদিম বা স্বাভাবিক উত্তরাধিকারী ছিলেন না; বরং মুসলিম শাসনামলই ছিল এই মাটির ভাষা ও সংস্কৃতির আসল রক্ষাকবচ এবং মুক্তির প্রধান শুভক্ষণ।
তৃতীয় অধ্যায়ের সামগ্রিক ও তাত্ত্বিক উপসংহার
বইয়ের এই তৃতীয় অধ্যায়ের প্রতিটি দালিলিক, বিচারিক ও সাহিত্যিক খতিয়ান বিশ্লেষণ করলে নিম্নলিখিত চূড়ান্ত এবং অকাট্য ঐতিহাসিক সত্যসমূহ আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়:
১. মুক্তির দূত বখতিয়ার খলজী: বখতিয়ার খলজীর গৌড় বিজয় কোনো সাধারণ জবরদখলকারী আগ্রাসন ছিল না, বরং তা ছিল সেনদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ বাংলার প্রাক-আর্য ভূমিপুত্র ও বৌদ্ধদের স্বতঃস্ফূর্ত আহ্বানের এক অমোঘ পরিণতি, যার কারণে লক্ষণ সেন বিন্দুমাত্র প্রতিরোধ না করেই প্রাণভয়ে পালিয়ে গিয়েছিল।
২. নালন্দা ধ্বংসের অপবাদ রদ: সমসাময়িক ফারসি ও তিব্বতি ঐতিহাসিক দলিল অনুযায়ী, নালন্দা বা ওদন্তপুরী ধ্বংসের পেছনে মুসলিমদের কোনো ভূমিকা ছিল না; বরং তাত্ত্বিক বিতর্কে হেরে যাওয়ার গ্লানি থেকে দুই ক্ষুব্ধ হিন্দু তান্ত্রিক ব্রাহ্মণই নালন্দার লাইব্রেরি পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছিলেন।
৩. মদিনা সনদের আইনি ইনসাফ: সুলতানি আমলের ন্যায়ভিত্তিক বিচারকাঠামো মূলত মদিনা সনদের বহুত্ববাদী শাসনতান্ত্রিক দর্শনের ওপর দাঁড়িয়ে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের জানমালের একচেটিয়া রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি ও ধর্মীয় স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করেছিল।
৪. বাংলা ভাষার রাজকীয় পুনর্জন্ম: আর্য-ব্রাহ্মণদের ‘রৌরব নরকের’ ফতোয়া ও অবজ্ঞার খনি থেকে বাংলা ভাষাকে উদ্ধার করে রাজদরবারে সর্বোচ্চ সাহিত্যিক আভিজাত্য দিয়েছিলেন মুসলিম সুলতানরা, যার ফলেই রামায়ণ-মহাভারতের মতো মহাকাব্যগুলো প্রথমবারের মতো বাংলায় অনূদিত হওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ পেয়েছিল।
এই অধ্যায়ের অকাট্য ঐতিহাসিক প্রমাণসমূহ এ কথাই প্রমাণ করে যে, মধ্যযুগের মুসলিম যুগই ছিল বাংলা ভাষা ও এই ভূখণ্ডের প্রকৃত বিকাশের সুবর্ণ সময়। তবে ইতিহাসের চাকা এখানেই থেমে থাকেনি। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে মুসলিম শাসনের পতনের পর, এই বাংলার রাজনৈতিক আকাশে পুনরায় এক ঘনঘোর অন্ধকার আমাবস্যার মেঘ ঘনীভূত হয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকেরা বাংলায় পা রেখেই তাদের ‘ভাগ কর এবং শাসন কর’ নীতি বাস্তবায়নের জন্য এবং মুসলিমদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করার উদ্দেশ্যে এক নতুন চক্রান্তের জাল বোনে। এই সুগভীর চক্রান্তের অংশ হিসেবেই তারা কলকাতার উচ্চবর্ণের হিন্দুদের ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। ১৮০১ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কীভাবে বাংলা ভাষার ওপর এক নজিরবিহীন ভাষাগত জেনোসাইড ও জালিয়াতি চালিয়ে মুসলিমদের সাধনার গণমুখী বাংলাকে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল—তা আমরা পরবর্তী অধ্যায়ে খতিয়ান ধরে-ধরে আলোচনা করব।

Post a Comment