Loading...

অধ্যায় চার: পলাশী-উত্তর বাংলা এবং ‘ভদ্রলোক’ সংস্কৃতির কারখানা

অধ্যায় চার: পলাশী-উত্তর বাংলা এবং ‘ভদ্রলোক’ সংস্কৃতির কারখানা
Advertisement
Advertisement — Place AdSense Code Here
Table of Contents
    পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলায় ব্রিটিশ শাসনের উত্থান, ভদ্রলোক সমাজের বিকাশ এবং ঔপনিবেশিক সামাজিক রূপান্তরের প্রতীকী ঐতিহাসিক ইলাস্ট্রেশন।

    পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলার রাজনৈতিক পরিবর্তন, ব্রিটিশ শাসনের প্রতিষ্ঠা এবং নতুন ভদ্রলোক সমাজের উত্থানের প্রতীকী ঐতিহাসিক চিত্র


    Previous Part.......

    ৪:১

    ১৭৫৭ সালের রাজনৈতিক বিপর্যয় এবং একটি সভ্যতার মেরুদণ্ড ভাঙার ইতিহাস

    বাংলার দীর্ঘ ও গৌরবময় মধ্যযুগীয় ইতিহাসের ক্যানভাসে ১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন পলাশীর আম্রকাননে যে রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি ঘটেছিল, তা কেবল নবাব সিরাজউদ্দৌলার ব্যক্তিগত পতন কিংবা কোনো একটি স্বাধীন রাজবংশের অবসান ছিল না; তা ছিল মূলত এই পললভূমির মুসলিম সমাজ ও লৌকিক সংস্কৃতির মেরুদণ্ডকে সুপরিকল্পিতভাবে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার এক সর্বগ্রাসী ঔপনিবেশিক সূচনা। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ধূর্ত বণিক ক্লাইভ যখন স্থানীয় মীর জাফর, উমিচাঁদ ও জগৎশেঠদের মতন অর্থলোভী সামন্তদের চক্রান্তকে পুঁজি করে বাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতা জবরদখল করে, তখন থেকেই এ দেশের বৃহত্তম ও প্রাচীনতম উৎপাদক সমাজদেহে এক নজিরবিহীন অন্ধকার নেমে আসে।

    এই বিপর্যয় কোনো রাতারাতি ঘটে যাওয়া আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এটি ছিল এক সুগভীর ও দীর্ঘমেয়াদী ঔপনিবেশিক কৌশল, যার মূল লক্ষ্যই ছিল বাংলার মুসলিম মনন, অর্থনীতি এবং তাদের শতাব্দীপ্রাচীন প্রাতিষ্ঠানিক শ্রেষ্ঠত্বকে সমূলে বিনাশ করা। স্বাধীন সুলতানি ও মোঘল আমলে যে মুসলিম সমাজ এ দেশের কৃষি, আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্য, এবং সাহিত্যিক পৃষ্ঠপোষকতার প্রধান চালিকাশক্তি ছিল, পলাশী বিপর্যয়ের পর তারা এক লহমায় নিজেদের মাতৃভূমিতেই চরম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হতে শুরু করে (আহমদ, আবুল মনসুর। বাংলাদেশের কালচার, আহমদ পাবলিশিং হাউস, পরিচ্ছেদ: ‘ঐতিহাসিক রূপান্তর ও সংকট’, পৃষ্ঠা ৫২)। কোম্পানির নতুন শাসকেরা খুব ভালো করেই জানত, যদি বাংলার এই মুসলিম সমাজকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে সম্পূর্ণ নিঃস্ব না করা যায়, তবে এই বদ্বীপে তাদের ঔপনিবেশিক জবরদখল কোনোদিনই দীর্ঘস্থায়ী বা নিরাপদ হবে না। এই উদ্দেশ্যে তারা প্রথম আঘাতটি হানে এই দেশের ভূমিব্যবস্থা এবং মুসলিমদের অর্থনৈতিক আয়ের প্রধান উৎসগুলোর ওপর, যা পরবর্তীতে বাংলার সামগ্রিক সাংস্কৃতিক ভারসাম্যকে চিরতরে ওলটপালট করে দিয়েছিল।

    ফারসি ভাষার বিদায় এবং ব্রিটিশ-উচ্চবর্ণ হিন্দু আঁতাতের নতুন অর্থনৈতিক সমীকরণ

    মোঘল ও সুলতানি আমলে বাংলার রাজভাষা এবং জ্ঞানচর্চার প্রধান মাধ্যম ছিল ফারসি। এই ফারসি ভাষা কেবল মুসলমানদের রাজকীয় প্রতীক ছিল না; এটি ছিল সর্বস্তরের মানুষের প্রাতিষ্ঠানিক চাকরি, আইনি বিচারব্যবস্থা এবং কর আদায়ের একমাত্র দাপ্তরিক মাধ্যম। তবে এটি মনে রাখা প্রয়োজন যে, সুলতানি বা মোঘল আমলে ফারসি রাজভাষা বা দাপ্তরিক মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হলেও এর মাধ্যমে বাংলা ভাষা কখনো উপেক্ষিত বা দমিত ছিল না; বরং রাজকীয় ফারসি ও লোকজ বাংলার এক চমৎকার সহাবস্থান ছিল যেখানে সুলতানরা নিজস্ব অর্থায়নে বাংলা সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। কিন্তু কোম্পানি আমলের শুরুতে বাংলার মুসলিম সমাজকে চিরতরে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে পঙ্গু করার জন্য ব্রিটিশ শাসকেরা এক নতুন এবং অত্যন্ত চতুর সামাজিক সমীকরণ তৈরি করে। ব্রিটিশরা ক্ষমতা সুসংহত করার পরপরই এক রাজকীয় ফরমানের মাধ্যমে ফারসি ভাষাকে দাপ্তরিক স্তর থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে ইংরেজি ও স্থানীয় সংস্কৃতঘেঁষা রূপকে বাধ্যতামূলক করার দিকে ধাবিত হয়। এই ভাষাগত পরিবর্তনের সমান্তরালে যে অর্থনৈতিক জেনোসাইড বা নিধনযজ্ঞটি চালানো হয়েছিল, তার চূড়ান্ত রূপ প্রকাশ পায় ১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দে লর্ড কর্নওয়ালিস প্রবর্তিত ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ (Permanent Settlement) আইনের মাধ্যমে। মোঘল আমলে যে হাজার হাজার মুসলিম জমিদারের অধীনে বাংলার কৃষি ও ভূমিব্যবস্থা সচল ছিল এবং মুসলিমদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনার জন্য যে বিশাল পরিমাণ ‘লাখেরাজ’ বা নিষ্কর ভূমি বরাদ্দ ছিল, কর্নওয়ালিসের এই নতুন সামন্তবাদী আইনে সেই লাখেরাজ সম্পত্তিগুলো এক নিমেষে বাজেয়াপ্ত করা হয় (মর্তুজা, গোলাম। ইতিহাসের ইতিকথা, পরিচ্ছেদ: ‘পলাশী উত্তর বাংলার বিপর্যয়’, পৃষ্ঠা ১১২)।

    এর ফলে, রাতারাতি বাংলার শত শত ঐতিহ্যবাহী মুসলিম পরিবার, মক্তব ও মাদ্রাসাগুলো চরম অর্থনৈতিক দেউলিয়াগ্রস্ততার মধ্যে পতিত হয়। ব্রিটিশরা মুসলিমদের কাছ থেকে জমি ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে তা সুপরিকল্পিতভাবে কলকাতার উচ্চবর্ণের হিন্দু ব্যবসায়ী, জগৎশেঠদের উত্তরসূরি এবং কোম্পানির বিশ্বস্ত মুৎসুদ্দিদের হাতে তুলে দেয়। এই চতুর রাজনৈতিক আঁতাতের ফলেই বাংলায় এক নতুন শোষক শ্রেণী হিসেবে গড়ে ওঠে উচ্চবর্ণের ‘হিন্দু জমিদার ও ভদ্রলোক সমাজ’। এই নব্য-এলিট শ্রেণীটি ব্রিটিশদের প্রতি এতটাই অন্ধ অনুগত ছিল যে, তারা নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য মুসলিমদের চিরতরে সাংস্কৃতিক ও সামাজিকভাবে প্রান্তিক করে রাখার ঔপনিবেশিক এজেন্ডাকে সানন্দে নিজেদের কাঁধে তুলে নেয়, যা পরবর্তীতে বাংলা সংস্কৃতির ওপর তাদের একচেটিয়া দখলদারিত্ব কায়েম করার পথ সুগম করেছিল (আলী, মোহাম্মদ মজহার। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ও বাংলা সাহিত্য, বাংলা একাডেমী, পৃষ্ঠা ৭৪)।

    ‘ভদ্রলোকি’ সংস্কৃতির কারখানা এবং নব্য-এলিটদের মনস্তাত্ত্বিক রূপরেখা

    ব্রিটিশদের এই সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক আনুকূল্য এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের গর্ভ থেকে কলকাতার বুকে যে নতুন সমাজটির জন্ম হয়েছিল, তারাই ইতিহাসে ‘ভদ্রলোক’ বা ‘বাবু সমাজ’ নামে পরিচিত। এই ভদ্রলোক সমাজ কোনো প্রাকৃতিক বিবর্তনের মাধ্যমে গড়ে ওঠেনি; এটি ছিল মূলত ফোর্ট উইলিয়াম এবং কোম্পানির ঔপনিবেশিক ফ্যাক্টরিতে তৈরি হওয়া এক কৃত্রিম সামাজিক শ্রেণী। এই শ্রেণীর মানুষেরা ধনে-ধান্যে এবং শিক্ষায় ব্রিটিশদের অনুকরণ করত, কিন্তু মনস্তাত্ত্বিকভাবে তারা ধারণ করত এক চরম গোঁড়া ব্রাহ্মণ্যবাদী ও মুসলিম-বিদ্বেষী ভাবধারা।

    এই নব্য-এলিট ভদ্রলোকেরা যখন তাদের পূর্বপুরুষ সেনদের ন্যায় কলকাতার আলিশান প্রাসাদে বসে ক্ষমতার স্বাদ উপভোগ করছিল, তখন বাংলার আসল ভূমিপুত্র ও মুসলিম সমাজের অবস্থা ছিল চরম শোচনীয়। তাদের জমি হাতছাড়া হয়েছিল, তাদের স্কুল-মাদ্রাসাগুলো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং তাদের মুখের ভাষা ও সংস্কৃতিকে ‘তুচ্ছ ও নিকৃষ্ট’ প্রমাণ করার এক নজিরবিহীন প্রাতিষ্ঠানিক মেকানিজম শুরু হয়েছিল। এই ভদ্রলোক সমাজ নিজেদেরকে ‘প্রগতিশীল ও আধুনিক’ বলে দাবি করলেও, তাদের প্রধানতম এজেন্ডাই ছিল—এই বদ্বীপের হাজার বছরের লোকজ ঐতিহ্য এবং মুসলিমদের গৌরবময় অতীতকে ইতিহাস থেকে সম্পূর্ণ মুছে দেওয়া।

    তারা এমন এক সংস্কৃতির কারখানা গড়ে তুলেছিল, যেখানে সংস্কৃতির একমাত্র মাপকাঠি ছিল কলকাতার উচ্চবর্ণের লাইফস্টাইল এবং তাদের ধর্মীয় অনুষঙ্গ। যে সাধারণ মানুষ ও মুসলিম শাসকেরা মধ্যযুগ ধরে পরম মমতায় বাংলা ভাষাকে আগলে রেখেছিলেন, এই নতুন বাবু সমাজ ব্রিটিশদের সাথে আঁতাত করে সেই ভাষার ওপরই নিজেদের একচেটিয়া ঠিকাদারি কায়েম করার শেষ প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এই প্রাতিষ্ঠানিক জালিয়াতির পরবর্তী ও সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ধাপটিই ঘটেছিল ১৮০০ সালে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে।

    Sazzad Chowdhury

    Sazzad Chowdhury

    Founder & Editor, House Of Wisdom. An independent Bengali knowledge publication exploring history, philosophy, Islamic intellectual tradition, literature, culture and civilization through references, historical sources and critical analysis.

    Author Profile

    Post a Comment