Loading...

ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা এবং ভাষাগত জালিয়াতির প্রাতিষ্ঠানিক গোড়াপত্তন

ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা এবং ভাষাগত জালিয়াতির প্রাতিষ্ঠানিক গোড়াপত্তন
Advertisement
Advertisement — Place AdSense Code Here
Table of Contents
    ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা, উইলিয়াম কেরি, বাংলা ভাষার সংস্কৃতকরণ এবং ঔপনিবেশিক ভাষানীতির ঐতিহাসিক প্রতীকী চিত্র

    ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলা ভাষার প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর ও ঔপনিবেশিক ভাষানীতির প্রতীকী উপস্থাপনা

    ৪:২

    Previous Part.......

    ১৭৫৭ সালের পলাশী বিপর্যয়ের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন এ দেশের শাসনদণ্ড কুক্ষিগত করে, তখন তাদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় স্থানীয় জনগণের ভাষা ও মনস্তত্ত্বকে নিয়ন্ত্রণ করা। কোম্পানির নতুন ইংরেজ আমলা ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের এ দেশের ভাষা, আইন এবং সংস্কৃতি সম্পর্কে দীক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে কলকাতার বুকে গভর্নর জেনারেল লর্ড ওয়েলেসলির আদেশে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ’। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মনে হলেও, এই কলেজের মূল অন্তর্লীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী এবং ভয়ঙ্কর। এটি ছিল মূলত বাংলার আদি ভূমিপুত্র এবং মুসলমানদের হাজার বছরের সাধনায় গড়ে ওঠা জীবন্ত ও গণমুখী বাংলা ভাষার ওপর এক নজিরবিহীন প্রাতিষ্ঠানিক জেনোসাইড বা ভাষাগত জালিয়াতি চালানোর মূল কারখানা (আলী, মোহাম্মদ মজহার। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ও বাংলা সাহিত্য, বাংলা একাডেমী, পরিচ্ছেদ: ‘ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রতিষ্ঠা ও উদ্দেশ্য’, পৃষ্ঠা ৪২)।

    ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করা হয় খ্রিষ্টাব্দ পাদ্রি উইলিয়াম কেরি-কে। কেরি সাহেব এ দেশের সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা রূপান্তর করার জন্য রাজকীয় অর্থায়নে এক বিশাল পণ্ডিত সমাজ গড়ে তোলেন, যার সিংহভাগই ছিলেন কলকাতার নব্য-এলিট সংস্কৃতির ধারক উচ্চবর্ণের বৈদিক ব্রাহ্মণ ও কায়েস্ত পণ্ডিতেরা। এদের মধ্যে মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার, রামরাম বসু, এবং গোলকনাথ শর্মার মতন উগ্র সনাতনপন্থী পণ্ডিতেরা ছিলেন কেরির প্রধান সহযোগী। এই পণ্ডিতেরা ব্রিটিশদের প্রচ্ছন্ন ইশারায় এবং এক সুগভীর রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলা ভাষাকে তার স্বাভাবিক লোকজ ও ঐতিহাসিক বিবর্তনের ধারা থেকে জোরপূর্বক কেটে বের করার এক পদ্ধতিগত নীল-নকশা হাতে নেন, যার একমাত্র লক্ষ্যই ছিল মুসলিমদের এই ভূখণ্ডের সংস্কৃতি থেকে সম্পূর্ণ ব্রাত্য ও বিজাতীয় প্রমাণ করা।

    জীবন্ত আরবি-ফারসি শব্দ ছাঁটাইকরণ এবং ভাষার সংস্কৃতকরণের ঐতিহাসিক প্রবণতা

    মোঘল ও স্বাধীন সুলতানি আমলের দীর্ঘ সাড়ে পাঁচশো বছরের পারস্পরিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়ার ফলে বাংলা ভাষা এক অত্যন্ত সমৃদ্ধ, গতিশীল এবং গণমুখী রূপ ধারণ করেছিল। এ দেশের হিন্দু-মুসলিম সর্বস্তরের মানুষের প্রাত্যহিক মুখের ভাষায় হাজার হাজার অত্যন্ত জীবন্ত, চলিত এবং অবিচ্ছেদ্য আরবি, ফারসি ও তুর্কি শব্দ (যেমন—পানি, আব্বা, আম্মা, আইন, আদালত, গোসল, নাস্তা, দুনিয়া, রুটি) মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল, যা ‘মুসলমানী বাংলা’ বা ‘দোভাষী বাংলা’ নামে সমাদৃত ছিল। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতেরা এই জীবন্ত ও লৌকিক বাংলা রূপটিকে চিরতরে বিনাশ করার জন্য এক মারাত্মক ‘ভাষাগত শুচিতাবাদ’ (Linguistic Puritanism) বা সাংস্কৃতিক নিধনযজ্ঞের জোয়ার বইয়ে দেন।

    উইলিয়াম কেরি এবং মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারের সরাসরি নির্দেশনায় কলেজের পণ্ডিতেরা অভিধান ও পাঠ্যপুস্তক থেকে সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত এই হাজার হাজার জীবন্ত আরবি-ফারসি শব্দকে জোরপূর্বক এবং সুপরিকল্পিতভাবে ছেঁটে ফেলে বর্জন করেন (আহমদ, আবুল মনসুর। বাংলাদেশের কালচার, আহমদ পাবলিশিং হাউস, পরিচ্ছেদ: ‘ভাষা ও সাহিত্য’, পৃষ্ঠা ৫৪)। শব্দ ছাঁটাইয়ের পর সেই শূন্যস্থানগুলো পূরণ করার জন্য তারা প্রাচীন, মৃত এবং অপ্রচলিত সংস্কৃত বা তৎসম শব্দ জোর করে বাংলা গদ্যের শরীরে ঢুকিয়ে দিতে শুরু করেন। তারা এই জালিয়াতির এক অদ্ভুত ন্যারেটিভ তৈরি করেন যে, বাংলা হলো সংস্কৃতের ‘দুহিতা’ বা কন্যা; সুতরাং সংস্কৃত শব্দ ছাড়া বাংলা ভাষা অশুদ্ধ ও ম্লেচ্ছ। এই কৃত্রিম সংস্কৃতকরণের মূল উদ্দেশ্যই ছিল—সাধারণ মানুষ এবং মুসলমানদের মুখের ভাষাকে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ‘অশুদ্ধ’, ‘তুচ্ছ’ ও ‘অপভাষা’ প্রমাণ করা এবং কলকাতার বাবুদের জন্য এক কৃত্রিম ‘ভদ্রলোকি বাংলা’ তৈরি করা, যা সাধারণ মানুষের বোধগম্যতার সম্পূর্ণ বাইরে ছিল।

    ‘ভদ্রলোকি বাংলা’র জন্ম এবং মুসলমানদের সাহিত্যিক প্রান্তিককরণ

    ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের এই ভাষাগত ল্যাবরেটরিতে পণ্ডিতদের কলমের খোঁচায় যে নতুন গদ্যের জন্ম হয়েছিল, তাকেই মূলত আধুনিক ‘ভদ্রলোকি বাংলা’ বা ‘সাধু ভাষা’ বলা হয়। এই ভাষাটি কোনো প্রাকৃতিক লোকজ বিবর্তনের ফসল ছিল না; এটি ছিল সম্পূর্ণ একটি রাজনৈতিক ও কৃত্রিম উৎপাদন। এই নতুন সংস্কৃতঘেঁষা ভাষাকে এমনভাবে সাজানো হয়েছিল, যেন তা কেবল কলকাতার উচ্চবর্ণের এলিট ও নব-জমিদারদের ড্রয়িংরুমের আভিজাত্যের প্রতীক হতে পারে। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও ভাষাবিদেরা দেখিয়েছেন কীভাবে এই নতুন ভাষার মাধ্যমে বাংলার সমাজকে রাতারাতি দুই ভাগে বিভক্ত করে দেওয়া হয়েছিল—একদিকে কলকাতার ইংরেজি ও সংস্কৃত জানা ‘ভদ্রলোক সমাজ’, আর অন্যদিকে এই মাটির আসল দাবিদার ও উৎপাদক ‘ক্ষেত বা অশিক্ষিত মুসলিম ও নিম্নবর্ণের আমজনতা’।

    এই ভাষাগত জালিয়াতির সরাসরি কুৎসিত প্রভাব গিয়ে পড়েছিল বাংলা সাহিত্যের ওপর। কলেজের পণ্ডিতেরা যে সমস্ত প্রথম বাংলা গদ্য ও পাঠ্যপুস্তক রচনা করেন (যেমন—মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারের পুরুষপরীক্ষা বা রামরাম বসুর প্রতাপাদিত্য চরিত্র), সেখানে মুসলিমদের অতীত ইতিহাস, ঐতিহ্য বা শব্দভাণ্ডারকে সম্পূর্ণ ব্রাত্য ও বহিষ্কার করে রাখা হয়েছিল (আলী, মোহাম্মদ মজহার। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ও বাংলা সাহিত্য, বাংলা একাডেমী, পৃষ্ঠা ৭৮)।

    মুসলমানদের হাজার বছরের সাহিত্যিক অবদানকে এক লহমায় ‘নিম্নমানের দোভাষী পুঁথি’ তকমা দিয়ে মূলধারার সাহিত্য ও শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে বাইরে ঠেলে দেওয়া হয়। এর ফলে, মুসলিমরা তাদের নিজস্ব জন্মভূমিতেই রাতারাতি ভাষাগতভাবে নিরক্ষর এবং সাংস্কৃতিক উদ্বাস্তুতে পরিণত হন। কারণ তাদের মুখের ভাষাকে ব্রিটিশদের আদালত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘অশুদ্ধ ও বেআইনি’ ঘোষণা করা হয়েছিল। এই প্রাতিষ্ঠানিক দখলদারিত্বই ছিল বাংলায় একটি নতুন ছদ্ম-ব্রাহ্মণ্য রাজ ও সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের গোড়াপত্তন, যার ক্ষত আজ পর্যন্ত বাঙালির মনস্তত্ত্বকে অবদমিত করে রেখেছে।

    Sazzad Chowdhury

    Sazzad Chowdhury

    Founder & Editor, House Of Wisdom. An independent Bengali knowledge publication exploring history, philosophy, Islamic intellectual tradition, literature, culture and civilization through references, historical sources and critical analysis.

    Author Profile

    Post a Comment