Table of Contents
![]() |
১৯৪৭ সালের ভূ-রাজনৈতিক রূপান্তর, পূর্ব বাংলার আত্মপরিচয়ের নবজাগরণ এবং কলকাতা-কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক আধিপত্য থেকে মুক্তির প্রতীকী চিত্র |
৫:১
Previous Part.......
১৯৪৭ সালের ভূ-রাজনৈতিক রূপান্তর এবং কলকাতার সাংস্কৃতিক শৃঙ্খল মুক্তি
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে, ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে ভারতীয় উপমহাদেশের মানচিত্রে যে দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগ এবং নতুন ভূ-রাজনৈতিক সীমানা নির্ধারিত হয়েছিল, তা পূর্ব বাংলার সংখ্যাগুরু মুসলিম ও অনার্য জনগোষ্ঠীর জন্য কোনো সাধারণ ভূখণ্ড বিভাজন ছিল না। এটি ছিল মূলত উনিশ শতক থেকে গড়ে ওঠা কলকাতা-কেন্দ্রিক উচ্চবর্ণের হিন্দু জমিদার, বাবু শ্রেণী এবং তাদের পৃষ্ঠপোষক ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির সুদীর্ঘ দেড়শত বছরের মনস্তাত্ত্বিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শৃঙ্খল থেকে এই পললভূমির আমজনতার এক ঐতিহাসিক মুক্তি। পলাশী বিপর্যয়ের পর থেকে যে পূর্ব বাংলা কেবল কলকাতার ভদ্রলোক সমাজের সস্তা কাঁচামাল সরবরাহকারী এবং কৃষকদের শোষণের চারণভূমিতে পরিণত হয়েছিল, ১৯৪৭ সালের দেশভাগ সেই ঔপনিবেশিক শোষণ প্রক্রিয়ার ওপর এক চরম ও চূড়ান্ত কুঠারাঘাত হানে।
এই ভূ-রাজনৈতিক রূপান্তরের সবচেয়ে গভীর মনস্তাত্ত্বিক দিকটি ছিল—পূর্ব বাংলার মানুষের আত্মপরিচয় অনভিমুখীনতার অবসান। উনিশ শতকে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ল্যাবরেটরিতে তৈরি হওয়া কৃত্রিম ‘ভদ্রলোকি বাংলা’ এবং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়দের সাহিত্যের মাধ্যমে যে কালচারাল ফ্যাসিবাদের বিস্তার ঘটানো হয়েছিল, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের মাধ্যমে তার প্রাতিষ্ঠানিক দেয়ালটি প্রথমবারের মতো ধসে পড়ে। পূর্ব বাংলার মুসলমানেরা এতকাল যে সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত হীনম্মন্যতার শিকার হচ্ছিলেন, নিজেদের একটি স্বাধীন রাজনৈতিক ভূখণ্ড (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) লাভের পর তাঁরা এক নতুন আত্মমর্যাদার সুর খুঁজে পান। কলকাতার বাবুদের নান্দনিক ফ্যাসিবাদের (Aesthetic Fascism) যে দাপট এতকাল ঢাকার মতন প্রাচীন শহরগুলোকে প্রান্তিক করে রেখেছিল, ১৯৪৭ সালের পর থেকে এই পললভূমির বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র কলকাতার খাসমহল থেকে স্থানান্তরিত হয়ে ঢাকার নিজস্ব আব-হাওয়ায় থিতু হতে শুরু করে (আহমদ, আবুল মনসুর। বাংলাদেশের কালচার, আহমদ পাবলিশিং হাউস, পরিচ্ছেদ: ‘সংস্কৃতির রূপান্তর ও সংকট’, পৃষ্ঠা ৯৬)। এটি ছিল মূলত একটি জাতির মনন ও কৃষ্টির ডিকলোনাইজেশন বা ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল মুক্তির প্রথম দৃশ্যমান অধ্যায়।
পূর্ব বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ এবং আত্মপরিচয়ের নবজাগরণ
কলকাতার জমিদারদের একচেটিয়া জমিদারি উচ্ছেদ এবং পূর্ব বাংলায় নতুন প্রজাস্বত্ব আইন পাসের ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। এতকাল যে মুসলিম ও নিম্নবর্ণের চাষী সমাজ কেবল খাজনা দেওয়ার দাস হিসেবে বেঁচে ছিল, তারা এবার নিজেদের ভূমির প্রকৃত মালিকানা লাভ করে। এই অর্থনৈতিক মুক্তির সমান্তরালে পূর্ব বাংলায় এক শক্তিশালী, উচ্চশিক্ষিত ও সচল মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণীর (Muslim Middle Class) দ্রুত বিকাশ ঘটতে শুরু করে। এই নব্য-মধ্যবিত্ত শ্রেণীটি কলকাতার বাবুদের তৈরি করা সেই কৃত্রিম ‘ভদ্রলোক’ পরিচয়ের অনুকরণ করতে অস্বীকৃতি জানায়; বরং তারা নিজেদের হাজার বছরের লৌকিক ঐতিহ্য, ধর্মীয় কৃষ্টি এবং উৎপাদনমুখী পেশাগত গৌরবকে কেন্দ্র করে এক নতুন আত্মপরিচয় অন্বেষণের যাত্রা শুরু করে।
এই নবজাগরণের মূল সুরটি ছিল অত্যন্ত খাঁটি ও গণমুখী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে যে নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক বলয় গড়ে উঠছিল, তার প্রধান লক্ষ্যই ছিল বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে উনিশ শতকের সেই কৃত্রিম সংস্কৃতায়নের খাঁচা থেকে মুক্ত করে আবার সাধারণ মানুষের মুখের ভাষারূপের কাছাকাছি ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া। মুসলিম সমাজমানসে এতকাল যে ‘বাঙালি’ এবং ‘মুসলিম’ পরিচয়কে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দাঁড় করিয়ে রাখার চক্রান্ত চলেছিল, এই নব্য-মধ্যবিত্ত শ্রেণীটি সেই ফাঁদ ভেঙে ফেলার আপ্রাণ চেষ্টা শুরু করে। তারা প্রমাণ করতে শুরু করে যে, এই মাটির আব-হাওয়ায় বেড়ে ওঠা এবং এই পলিমাটির ভাষায় কথা বলা প্রতিটি মুসলমানই এই ভূমির সবচেয়ে আদিম ও খাঁটি সন্তান, যাদের রক্তধারা আর্য বা কর্ণাটকীয় সেন রাজাদের চেয়েও প্রাচীন। এই আত্মপরিচয়ের নবজাগরণই পরবর্তীতে পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, যা কলকাতার পুরোনো ব্রাহ্মণ্যবাদী এজেন্ডার বাহকদের মনে এক নতুন আতঙ্কের জন্ম দেয়।
ব্রাহ্মণ্য রাজের আকাঙ্ক্ষা এবং দিল্লির মনস্তাত্ত্বিক ছায়া
কলকাতার উচ্চবর্ণের এলিট সমাজ যখন দেখল যে—তলোয়ারের জোর কিংবা ফোর্ট উইলিয়ামের আইনি দেয়াল দিয়েও পূর্ব বাংলার এই মুসলিম জাগরণকে আর আটকে রাখা যাচ্ছে না, তখন তারা তাদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখার জন্য এক নতুন চতুর মনস্তাত্ত্বিক কৌশল গ্রহণ করে। ১৯৪৭ সালে ভৌগোলিকভাবে দেশভাগ হলেও, মনস্তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্তরে কলকাতার সেই পুরোনো হেজিমনি বা আধিপত্যের ছায়া পূর্ব বাংলার একাংশের এলিট শ্রেণীর মগজে সুকৌশলে জারিত করে রাখা হয়েছিল। দিল্লির নতুন রাজনৈতিক কেন্দ্রের প্রচ্ছন্ন ইশারায় এবং কলকাতার নব্য-সংস্কৃতিবাদীদের মদদে এমন এক তাত্ত্বিক ন্যারেটিভ তৈরি করা শুরু হয়, যার মূল লক্ষ্যই ছিল পূর্ব বাংলার এই নতুন স্বাধীন মনস্তত্ত্বকে পুনরায় ভারতের সাংস্কৃতিক বলয়ের অধীনে ফিরিয়ে নেওয়া।
এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের মূল হাতিয়ার ছিল—ধর্মনিরপেক্ষতা বা ‘সেক্যুলারিজমে’র এক কৃত্রিম মোড়ক। তারা পূর্ব বাংলার তরুণ সমাজকে বোঝাতে শুরু করে যে, ১৯৪৭ সালের দেশভাগ ছিল একটি ‘ভুল সিদ্ধান্ত’ এবং মুসলমানদের নিজস্ব ধর্মীয় ও লৌকিক স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখাটাই হলো এক ধরনের ‘প্রতিক্রিয়াশীলতা’ বা সাম্প্রদায়িকতা। তারা আধুনিক শিক্ষার নামে, প্রগতির নামে পুনরায় সেই উনিশ শতকের বঙ্কিমীয় ও রবীন্দ্র-ভাবধারাকে পূর্ব বাংলার মূলধারার সংস্কৃতি হিসেবে গিলিয়ে দেওয়ার এক নতুন চক্রান্তের জাল বোনে (আহমদ, খোন্দকার আশরাফ। The Bengali Mind: Essays on Culture and Literature, বাংলা একাডেমী, পরিচ্ছেদ: ‘Elite Aesthetics’, পৃষ্ঠা ১১২)। এর একমাত্র উদ্দেশ্যই ছিল—পূর্ব বাংলার মুসলমানেরা যেন কোনোদিন নিজেদের একটি স্বাধীন, স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং ইসলামী মূল্যবোধসম্পন্ন জাতি হিসেবে বিশ্বমঞ্চে খাড়া করতে না পারে। তারা চেয়েছে পূর্ব বাংলা রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হলেও সামাজিকভাবে যেন সবসময় কলকাতার ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতির দাসত্ব করে যায়। এই শ্বাসরুদ্ধকর মনস্তাত্ত্বিক আগ্রাসনের লগ্নেই পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক মঞ্চে ঘটে এক নতুন ঐতিহাসিক রূপান্তর, যার ফলে কলকাতার এই গভীর চক্রান্তের জালটি পুনরায় ছিন্নভিন্ন হওয়ার বারুদ তৈরি হতে শুরু করে।

Post a Comment