Loading...

করাচির নীতিগত দেউলিয়াগ্রস্ততা এবং পূর্ব বাংলার শাসনতান্ত্রিক ক্ষোভ

করাচির নীতিগত দেউলিয়াগ্রস্ততা এবং পূর্ব বাংলার শাসনতান্ত্রিক ক্ষোভ
Advertisement
Advertisement — Place AdSense Code Here
Table of Contents
    পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলনের রাজনৈতিক পটভূমি, পাকিস্তানের ভাষানীতি, শাসনতান্ত্রিক সংকট, সাংস্কৃতিক আধিপত্য এবং বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধের প্রতীকী ঐতিহাসিক চিত্র।

    উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার পর পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক ক্ষোভ, ভাষা আন্দোলনের সূচনা এবং সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের প্রতীকী দৃশ্য

    ৫:২

    Previous Part.......

    ১৯৪৭ সালের ভূ-রাজনৈতিক মহাবিপ্লবের পর পূর্ব বাংলার আপামর আমজনতা ও উদীয়মান মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণী যে নতুন রাজনৈতিক ভোরের স্বপ্ন দেখেছিল, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠীর চরম নীতিগত দেউলিয়াগ্রস্ততা এবং ভাষাগত অন্ধত্বের কারণে তা দ্রুত এক গভীর শাসনতান্ত্রিক সংকটে রূপ নেয়। করাচি ও লাহোর-কেন্দ্রিক যে পশ্চিম পাকিস্তানি আমলা ও পুঁজিপতি গোষ্ঠী ক্ষমতার মূল অলিন্দ দখল করেছিল, তারা পূর্ব বাংলার নদীমাতৃক জনপদের লৌকিক বাস্তবতা এবং এই মাটির সন্তানদের মনস্তত্ত্ব বুঝতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। সমগ্র পাকিস্তানের ৫৬ শতাংশ মানুষের মুখের ভাষা ‘বাংলা’ হওয়া সত্ত্বেও, ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকার রেসকোর্স ময়দান ও কার্জন হলে দাঁড়িয়ে যখন উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেন, তখন এই পললভূমির মুসলিম তরুণ ও প্রাজ্ঞ মানসে এক তীব্র রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক ক্ষোভের বারুদ জমা হতে শুরু করে।

    এই ভাষাগত আক্রমণটি কেবল কোনো অক্ষরের লড়াই ছিল না; এটি ছিল মূলত পূর্ব বাংলার সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর নতুন অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ভবিষ্যৎকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার এক নব্য-ঔপনিবেশিক চাল। করাচির এই উর্দুকেন্দ্রিক শোভিনিজম বা ভাষিক স্বৈরাচার পূর্ব বাংলার আপামর জনসাধারণের মনে এই আশঙ্কার জন্ম দেয় যে—তারা কেবল কলকাতার উচ্চবর্ণের হিন্দুদের তৈরি করা দেড়শত বছরের জমিদারির শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে কি আবার করাচির পুঁজিপতিদের নতুন শৃঙ্খলে বন্দী হতে যাচ্ছে? কেন্দ্রীয় সরকারের এই চরম গণবিচ্ছিন্ন নীতি এবং পূর্ব বাংলার প্রতি তাদের সৎভাইসুলভ আচরণ এ দেশের প্রগতিশীল মুসলিম তরুণদের রাষ্ট্রকাঠামোর বিরুদ্ধে এক অলিখিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে বাধ্য করে (উমর, বদরুদ্দীন। পূর্ববাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি, আনন্দধারা, পরিচ্ছেদ: ‘ভাষা আন্দোলনের আদি পটভূমি’, পৃষ্ঠা ১৪২)। কিন্তু এই শাসনতান্ত্রিক সংকটের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিকটি ছিল—করাচির এই ভুল চালের সুযোগ নিয়ে কলকাতার সেই পুরোনো ব্রাহ্মণ্যবাদী ও ছদ্ম-সেক্যুলার সংস্কৃতির ধারক-বাহকেরা পূর্ব বাংলার বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে পুনরায় এক চতুর ও দীর্ঘমেয়াদী প্রবেশদ্বার খুঁজে পায়।

    কলকাতার ছদ্ম-বয়ানের প্রবেশদ্বার এবং ধর্মনিরপেক্ষতার নতুন মোড়ক

    পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী যখন পূর্ব বাংলার মুসলিমদের মুখের ভাষাকে ‘অশুদ্ধ বা হিন্দুদের দ্বারা প্রভাবিত’ বলে অবিরত শ্লোগান দিতে শুরু করল, তখন কলকাতার নব্য-সংস্কৃতিবাদীরা এবং তাদের এ দেশীয় দোসররা এই চরম নীতিগত ভুলের মোক্ষম সুযোগটি লুফে নেয়। তারা পূর্ব বাংলার তরুণ সমাজের এই ভাষাগত ক্ষোভকে পুঁজি করে তাদের মগজে এক সুগভীর তাত্ত্বিক জাল বুনতে শুরু করে। তারা অত্যন্ত চতুরতার সাথে এই বয়ান তৈরি করতে শুরু করে যে—পূর্ব বাংলার মানুষের প্রকৃত মুক্তি নাকি পাকিস্তানের ইসলামী বা খেলাফতকামী শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে সম্ভব নয়; বরং তাদের পুনরায় সেই উনিশ শতকের কলকাতার বাবুদের তৈরি করা ‘ছদ্ম-সেক্যুলার’ ও সংস্কৃতঘেঁষা ভাবধারার বলয়ে ফিরে যেতে হবে (Sarkar, Sumit. The Swadeshi Movement in Bengal: 1903-1908, People's Publishing House, pp. 415-420)।

    এই মনস্তাত্ত্বিক আগ্রাসনের অংশ হিসেবে তারা ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ ও ‘সার্বজনীন বাঙালি কালচার’-এর এক নতুন মোহনীয় মোড়ক আবিষ্কার করে। এই মোড়কের মূল উদ্দেশ্যই ছিল—পূর্ব বাংলার মুসলিম মধ্যবিত্তদের মনে তাঁদের হাজার বছরের নিজস্ব লোকজ ইসলাম, মক্তব-মাদ্রাসার ঐতিহ্য এবং সুফি-সাধকদের তৈরি করা স্বাধীন আত্মপরিচয়ের বিরুদ্ধে এক ধরনের তীব্র হীনম্মন্যতা ও বিমুখতা তৈরি করা। তারা এই প্রচারণাকে এমন এক স্তরে নিয়ে যায়, যেখানে একজন মানুষকে যদি ‘বাঙালি ও প্রগতিশীল’ হতে হয়, তবে তাকে তার মুসলিম স্বাতন্ত্র্য ও ধর্মীয় ঐতিহ্যকে বিসর্জন দিতে হবে। কলকাতার এই ছদ্ম-বয়ান পূর্ব বাংলার মূলধারার সংবাদমাধ্যম ও বিশ্ববিদ্যালয়ের একাংশের মগজে সুকৌশলে জারিত হতে শুরু করে, যার একমাত্র রাজনৈতিক লক্ষ্যই ছিল—পূর্ব বাংলার ভূখণ্ডকে ভারতের একটি ছদ্ম-সাংস্কৃতিক উপনিবেশ বা ব্রাহ্মণ্য রাজের খাসমহলে রূপান্তরিত করা, যেন এ দেশের মানুষ করাচির শৃঙ্খল ভাঙতে গিয়ে অবচেতনভাবেই কলকাতার বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব বরণ করে নেয় (আহমদ, আবুল মনসুর। বাংলাদেশের কালচার, আহমদ পাবলিশিং হাউস, পৃষ্ঠা ১০২)।

    খোন্দকার আশরাফ আহমদের ব্যবচ্ছেদ: রবীন্দ্র-নান্দনিকতার ছদ্মবেশী আধিপত্য

    করাচির এই ভাষিক স্বৈরাচারের সমসাময়িক কালে পূর্ব বাংলার এলিট ও বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে কীভাবে কলকাতার রবীন্দ্র-নান্দনিকতা এক ছদ্মবেশী আধিপত্যের রূপ নিয়েছিল, তার এক সুগভীর ও নিরপেক্ষ সমাজতাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ হাজির করেছেন প্রখ্যাত চিন্তাবিদ ও গবেষক খোন্দকার আশরাফ আহমদ। তিনি তাঁর গবেষণামূলক কাজের খতিয়ানে স্পষ্ট দেখিয়েছেন যে, উনিশ শতকের শেষভাগে কলকাতার ব্রাহ্মো-ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কেবল একজন সাহিত্যিক হিসেবে দাঁড় করায়নি; বরং তারা তাঁকে কেন্দ্র করে এক সুপরিকল্পিত ছদ্ম-ধর্মীয় ও নান্দনিক বলয়ের জন্ম দিয়েছিল, যা মুসলমানদের হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী আত্মিক ও লৌকিক দর্শনকে সমূলে উচ্ছেদ করার প্রধান বুদ্ধিবৃত্তিক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছিল (আহমদ, খোন্দকার আশরাফ। The Bengali Mind: Essays on Culture and Literature, বাংলা একাডেমী, পরিচ্ছেদ: ‘Elite Aesthetics’, পৃষ্ঠা ১১২-১২৫)।

    খোন্দকার আশরাফ আহমদ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছেন যে, করাচির উর্দুকেন্দ্রিক নিপীড়নের প্রতিক্রিয়ায় পূর্ব বাংলার একাংশের বুদ্ধিজীবীরা ইসলামের সেই চিরন্তন ন্যায়বিচার ও মদিনা সনদের সর্বজনীন বহুত্ববাদী আদর্শের দিকে না গিয়ে, সুকৌশলে কলকাতার রবীন্দ্র-মেটাফিজিক্স বা ছদ্ম-ধর্মীয় নান্দনিকতাকে পূর্ব বাংলার অবদমিত মুসলিম মননে ইনজেক্ট করতে শুরু করেন। এই ‘রবীন্দ্র-ধর্ম’ (Rabindra-Religion) কোনো সাধারণ কাব্যিক অনুরাগ ছিল না; এটি ছিল এমন এক কৃত্রিম আধ্যাত্মিক ধারা, যা মানুষের মনস্তত্ত্বকে এমনভাবে শাসন করে যাতে সে তার নিজস্ব Abrahamic বা তাওহীদি বিশ্বাসের শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এক অবোধ্য ছদ্ম-পৌত্তলিক নান্দনিকতার দাসত্ব করে যায়। ড. মযহারুল ইসলামও তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন কীভাবে বাংলার প্রাক-আর্য সাধারণ মানুষের লালন বা বাউলের মতন লোকজ গানের খাঁটি সুর ও সম্পদগুলোকে গ্রামীণ শেকড় থেকে উপড়ে নিয়ে শান্তিনিকেতনি উচ্চাঙ্গের ‘বাবু সম্পত্তিতে’ পরিণত করা হয়েছিল, যার একমাত্র লক্ষ্যই ছিল গণসংস্কৃতির ওপর কলকাতার উচ্চবর্ণের নান্দনিক ফ্যাসিবাদের (Aesthetic Fascism) একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা (ইসলাম, ড. মযহারুল। রবীন্দ্রনাথ ও লোকসংস্কৃতি, বাংলা একাডেমী, পৃষ্ঠা ৭৪)। এই কালচারাল হাইজ্যাকের ফলেই পূর্ব বাংলার নব্য-শিক্ষিত সমাজের একটি বড় অংশ নিজেদের অজান্তেই করাচির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নামে কলকাতার ছদ্ম-সেক্যুলার ফাঁদে পা দিয়ে বসেছিল, যা এই মাটির আসল ভূমিপুত্রদের প্রকৃত সাংস্কৃতিক মুক্তির পথকে বহু বছরের জন্য অবরুদ্ধ করে দেয়।

    Sazzad Chowdhury

    Sazzad Chowdhury

    Founder & Editor, House Of Wisdom. An independent Bengali knowledge publication exploring history, philosophy, Islamic intellectual tradition, literature, culture and civilization through references, historical sources and critical analysis.

    Author Profile

    Post a Comment