Table of Contents
![]() |
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ভাষানীতি, বঙ্কিমীয় সাংস্কৃতিক ইউটোপিয়া এবং আধুনিক সংখ্যাগুরুবাদী রাজনীতির ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার প্রতীকী উপস্থাপন |
Previous Part.......
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ভাষাগত জেনোসাইড এবং ‘ভদ্রলোক’ সংস্কৃতির জালিয়াতি
১৭৫৭ সালের পলাশী বিপর্যয়ের পর বাংলার রাজনৈতিক মঞ্চে মুসলিম শাসনের যে অবসান ঘটেছিল, তার সরাসরি সুদূরপ্রসারী এবং কুৎসিত সুযোগটি লুফে নেয় পূর্ববর্তী শতাব্দীর সেই সুবিধাভোগী উচ্চবর্ণের আর্য-এলিট রাঢ়ী ও বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ এবং কায়স্থ সমাজ। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লর্ড ক্লাইভ ও ওয়ারেন হেস্টিংসের বিশ্বস্ত ‘মুৎসুদ্দি’ বা দালাল হিসেবে কাজ করে এই নব্য-এলিট শ্রেণীটি ব্রিটিশদের পরম অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আনুকূল্য লাভ করে। ১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দে লর্ড কর্নওয়ালিস প্রবর্তিত ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ (Permanent Settlement) আইনের মাধ্যমে ব্রিটিশরা যখন বাংলার ঐতিহ্যবাহী মুসলিম জমিদার ও সাধারণ চাষীদের জমি ও লাখেরাজ নিষ্কর সম্পত্তিগুলো সুপরিকল্পিতভাবে কেড়ে নেয়, তখন সেই বিপুল ভূ-সম্পত্তি রাতারাতি কলকাতার এই উচ্চবর্ণের হিন্দু মুৎসুদ্দিদের হাতে তুলে দেওয়া হয় (মর্তুজা, গোলাম। ইতিহাসের ইতিকথা, আহমদ পাবলিশিং হাউস, পরিচ্ছেদ: ‘পলাশী উত্তর বাংলার বিপর্যয়’, পৃষ্ঠা ১১২)। এর ফলে গ্রামীণ বাংলায় এক নতুন শোষক শ্রেণী হিসেবে জন্ম নেয় কলকাতার ‘হিন্দু জমিদার ও বাবু সমাজ’। এই অর্থ ও ক্ষমতার জোরে বলীয়ান নব্য-বাবু শ্রেণীটি ১৮০১ সালে কলকাতার বুকে প্রতিষ্ঠিত ‘ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ’-এর ভাষাগত ল্যাবরেটরিকে নিজেদের একচেটিয়া ‘সাংস্কৃতিক জালিয়াতি’র প্রধান কারখানায় রূপান্তরিত করে।
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান পাদ্রি উইলিয়াম কেরি এবং তাঁর প্রধান সহযোগী উগ্র উচ্চবর্ণের পণ্ডিত মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারের নেতৃত্বে বাংলা ভাষার ওপর যে পদ্ধতিগত রূপান্তর চালানো হয়, তা ছিল মূলত মধ্যযুগের বল্লাল সেনের সেই পুরোনো বর্ণবাদী ‘কৌলিন্য প্রথারই’ এক আধুনিক ভাষাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্করণ। কেরি ও বিদ্যালঙ্কারের পণ্ডিত সমাজ সাধারণ মানুষের মুখের হাজার বছরের জীবন্ত, চলিত এবং লোকজ বাংলা থেকে হাজার হাজার স্বাভাবিক আরবি, ফারসি ও দেশজ অনার্য শব্দকে জোরপূর্বক এবং সুপরিকল্পিতভাবে ছেঁটে ফেলে বর্জন করেন (আহমদ, আবুল মনসুর। বাংলাদেশের কালচার, আহমদ পাবলিশিংহ্যাম হাউস, পরিচ্ছেদ: ‘ভাষা আন্দোলনের মর্মকথা’, পৃষ্ঠা ৭৪)। সেই শূন্যস্থানগুলো পূরণ করার জন্য তারা প্রাচীন, মৃত এবং অপ্রচলিত সংস্কৃত বা তৎসম শব্দ জোর করে বাংলা গদ্যের শরীরে ঢুকিয়ে দিয়ে এক কৃত্রিম ‘ভদ্রলোকি বাংলা’ বা সাধু ভাষার জন্ম দেয়।
এই ভাষাগত উৎপীড়নের মূল উদ্দেশ্যই ছিল—একটি নতুন প্রাতিষ্ঠানিক দেয়াল (Institutional Barrier) তৈরি করা, যেন পূর্ব বাংলার সংখ্যাগুরু মুসলমান এবং এই মাটির আদিম অনার্য নিম্নবর্ণের দলিত ও নমঃশূদ্র হিন্দুরা চিরকাল নিরক্ষর ও ‘ক্ষেত’ তকমা পেয়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্তরের একেবারে তলানিতে পড়ে থাকে, আর ক্ষমতার মূল অলিন্দ সবসময় মুষ্টিমেয় উচ্চবর্ণের আর্য-এলিটদের খাসমহল বা ইউটোপিয়ার রাজত্ব হয়ে থাকে। এই কৃত্রিম ভাষার মাধ্যমে তারা ব্রিটিশদের সরকারি চাকুরি, শিক্ষা এবং আদালতের ওপর নিজেদের একচেটিয়া ঠিকাদারি কায়েম করে এবং এই মাটির আসল সন্তানদের তাঁদের নিজেদের ভূমি ও ভাষার অধিকার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত করে এক নজিরবিহীন সাংস্কৃতিক উদ্বাস্তুতে পরিণত করে।
বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের ব্রাহ্মণ্যবাদী ইউটোপিয়া রাষ্ট্রে অনার্যদের শূন্যস্থান
উনিশ শতকের কলকাতার ভদ্রলোক সমাজ এবং তথাকথিত বেঙ্গল রেনেসাঁসের প্রবক্তারা সাহিত্যের মাধ্যমে যে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ বা ‘চিরায়ত বাঙালি সংস্কৃতি’র মোড়ক তৈরি করেছিলেন, তা কোনো সর্বজনীন বা প্রগতিশীল গণজাগরণ ছিল না; তা ছিল আসলে কেবল ওই মুষ্টিমেয় উচ্চবর্ণের আর্যদের একচেটিয়া ‘ব্রাহ্মণ্যবাদী ইউটোপিয়া’ (Brahmanical Utopia)। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের তৈরি করা "আনন্দমঠ" (১৮৮২) উপন্যাসের ছত্রে ছত্রে সন্তান দলের মুখে ‘বন্দে মাতরম্’ স্লোগান বসিয়ে যে উগ্র ও সাম্প্রদায়িক মুসলিম-বিদ্বেষের বিষবৃক্ষ রোপণ করা হয়েছিল, সেই কাল্পনিক হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রে এই মাটির আদিম অনার্য দলিত ও নিম্নবর্ণের হিন্দুদেরও কোনো সমমর্যাদার স্পেস বা স্থান ছিল না (Sarkar, Sumit. The Swadeshi Movement in Bengal: 1903-1908, People's Publishing House, Chapter: ‘Trends in Bengal Nationalist Thought’, pp. 405-412)। বঙ্কিম বা শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্যের বিশাল ক্যানভাস জুড়েই এই দাস, নমঃশূদ্র, চণ্ডাল, কৈবর্ত বা ডোম-বাগ্দীদের সবসময় অত্যন্ত কুৎসিতভাবে ‘ছোটলোক’, ‘অস্পৃশ্য’, ‘চরিত্রহীন’ বা ‘বর্বর’ ভৃত্য হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যাদের কোনো উন্নত নৈতিকতা, নান্দনিক জ্ঞান বা বীরত্ব নেই।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কেন্দ্র করে নাগরিক এলিট সমাজ যে নান্দনিক ও সাংস্কৃতিক বলয় গড়ে তুলেছিল, তা গ্রামীণ লোকসংস্কৃতির স্বকীয় বিকাশকে বহুলাংশে আড়াল করে রেখেছিল। গ্রামীণ বাংলার অনার্য ও সাধারণ মানুষের ভাটিয়ালি, মুর্শিদি বা লৌকিক গানের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও নাগরিক সংস্কৃতির মোহে তরুণ সমাজ তা থেকে দূরে সরে যায়। আবুল মনসুর আহমদ তাঁর গ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে গ্রামীণ ঐতিহ্যকে অবহেলা করে তরুণরা কেবল শহরের প্রাতিষ্ঠানিক ‘ছায়ানটে’ রবীন্দ্রসংগীতের আধুনিক আবহ তৈরিতে মগ্ন থাকে এবং ধরে নেয় গ্রামীণ বাংলার নিজস্ব কোনো গীতি-ঐতিহ্য নেই। অথচ উচ্চবর্গের বা নবাব-জমিদারদের দরবারের উচ্চাঙ্গ সংগীতের চেয়ে গণ-জীবনের এই লোকজ সুরই ছিল প্রকৃত কালচার (আহমদ, আবুল মনসুর। বাংলাদেশের কালচার, আহমদ পাবলিশিং হাউস, পরিচ্ছেদ: ‘বাংলাদেশের কালচার’, পৃষ্ঠা ৩০, ৩২)। রবীন্দ্রনাথ বিশ্ব-কবি খেতাব পেলেও, মেজরিটি জনগোষ্ঠীর কৃষ্টির সাথে নাড়ির যোগ না থাকায় তিনি এদেশের জাতীয় কবি নন; বরং আমাদের উচিত অন্ধ রবীন্দ্র-পূজা বা অনুকরণ ছেড়ে নিজেদের সংস্কৃতির রিডিসকভারি করা (আহমদ, আবুল মনসুর। বাংলাদেশের কালচার, আহমদ পাবলিশিং হাউস, পরিচ্ছেদ: ‘বাংলাদেশের কালচার’, উপশিরোনাম: ‘বিশ্ব-কবি বনাম জাতীয় কবি’, পৃষ্ঠা ৩৯)। রবীন্দ্র-বঙ্কিমীয় এই উচ্চবর্ণের ইউটোপিয়া রাষ্ট্রে ‘বাঙালি’ সংজ্ঞার একমাত্র অলিখিত কোড ছিলো হলো—উচ্চবর্ণের আর্যদের লাইফস্টাইল, তাদের ফ্যাশন (ঠাকুরবাড়ির ধুতি-শাড়ি) এবং তাদের পৌরাণিক উৎসব (যেমন আজকের ছদ্ম-সেক্যুলার মঙ্গল শোভাযাত্রা)। এই কৃত্রিম ও জালিয়াতি নির্ভর সংজ্ঞায় নিম্নবর্ণের অনার্য হিন্দুরা হলো কেবলই আর্যদের সেবাদাস, আর বৃহত্তম জনসমষ্টি মুসলমানেরা হলো ‘বিজাতীয় শত্রু’।
বর্তমান বিজেপির সংখ্যাগুরুবাদী রাজনীতি: বঙ্কিমীয় মাইন্ডসেটের আধুনিক সংস্করণ
ইতিহাসের এই দীর্ঘ ও জটিল পরিক্রমায় কলকাতার বাবুদের সেই পুরোনো ‘ব্রাহ্মণ্যবাদী ইউটোপিয়া’ এবং বঙ্কিমীয় ফ্যাসিবাদের মাইন্ডসেটটিই আজ একবিংশ শতাব্দীতে এসে ভারতের বর্তমান বিজেপি (BJP) ও আরএসএস (RSS)-এর হিন্দুত্ববাদী সংখ্যাগুরুবাদী (Majoritarian) রাজনীতির সরাসরি তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। দিল্লির বর্তমান শাসকেরা এবং তাদের বিশ্বব্যাপী প্রোপাগান্ডা সেলগুলো যে ‘অখণ্ড ভারত’ বা ‘বিশুদ্ধ হিন্দুত্ববাদে’র বয়ান বই, ইন্টারনেট ও এআই মেমোরিতে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তা আসলে সেই ১৮০১ সালের ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ভাষাগত জেনোসাইড এবং মধ্যযুগের বল্লাল সেনের কৌলিন্য প্রথারই এক বিপজ্জনক ডিজিটাল রূপান্তর মাত্র।
বিজেপির এই আধুনিক হিন্দুত্ববাদী মাইন্ডসেটের মূল চরিত্রটি ব্যবচ্ছেদ করলে দেখা যায়, তারা ভারতের কোটি কোটি দলিত, আদিবাসী এবং নিম্নবর্ণের অনার্য হিন্দুদের ‘হিন্দুত্বে’র ভোটের বাক্সে ব্যবহার করার জন্য সাময়িকভাবে বুকে টানার ভণ্ডামি করে, কিন্তু ভেতরের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি সবসময় সেই উচ্চবর্ণের আর্য-ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও কর্পোরেট বানিয়া এলিটদের হাতেই একচেটিয়াভাবে কুক্ষিগত করে রাখে। তারা দলিতদের তাদের নিজস্ব প্রকৃতি-কেন্দ্রিক লোকজ ধর্মবিশ্বাস ও কৃষ্টিগুলো (Animism) স্বাধীনভাবে চর্চা করতে দেয় না; বরং তাদের জোরপূর্বক এক কৃত্রিম, কর্পোরেট বৈদিক হিন্দুত্বের ছাঁচে ঢেলে দিয়ে তাদের মূল অনার্য আদিবাসী পরিচয়কে চিরতরে মুছে দিতে চায়, যা এক আধুনিক ‘সাংস্কৃতিক জেনোসাইড’।
তাদের তৈরি করা এনআরসি (NRC) বা সিএএ (CAA)-র মতন বর্ণবাদী আইনি দেয়ালগুলোর মূল লক্ষ্যই হলো—মুসলিমদের ‘বহিরাগত’ তকমা দিয়ে নাগরিকত্বহীন করা, আর নিম্নবর্ণের অনার্য দলিতদের চিরকাল উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ্য রাজের অধীনে দ্বিতীয় শ্রেণীর অনুগত গোলাম বানিয়ে রাখা। সুতরাং, বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠের সেই সন্তান দলের উগ্র রূপটিই আজ গেরুয়া পোশাক পরে আধুনিক কর্পোরেট রাষ্ট্রযন্ত্র ও মিডিয়া ফ্যাক্টরির সাহায্যে এই উপমহাদেশের বহুত্ববাদ ও লোকসংস্কৃতিকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছে। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে জন্ম নেওয়া তথাকথিত বাঙালি জাতীয়তাবাদ বা আধুনিক হিন্দুত্ববাদ, কোনোটিই এই মাটির আদিম সন্তানদের সংস্কৃতি নয়; আর না এটি প্রকৃত বাঙালি জাতীয়তাবাদ। এটি হলো বহিরাগত আর্য-উচ্চবর্ণের একচেটিয়া ক্ষমতার রাজত্ব কায়েম রাখার সুদীর্ঘ সাড়ে তিন হাজার বছরের এক সুপরিকল্পিত জালিয়াতি ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ।

Post a Comment