Table of Contents
![]() |
Previous Part.......
Al-Khwarizmi (আল-খাওয়ারিজমি)-এর নামের সঙ্গে আজ দুটি শব্দ সবচেয়ে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। Algebra (বীজগণিত) এবং algorithm (অ্যালগরিদম)। কিন্তু এই দুটি শব্দের পেছনে শুধু গণিতের ইতিহাস নেই। আছে এক সভ্যতার জ্ঞানকে মাপ, হিসাব, পদ্ধতি, সারণি, স্থানাঙ্ক এবং প্রয়োগের ভাষায় নামিয়ে আনার ইতিহাস। তাঁর হাতে সংখ্যা কেবল অঙ্কের চিহ্ন হয়ে থাকেনি। সংখ্যা আইন, বাণিজ্য, উত্তরাধিকার, ভূমি জরিপ, জ্যোতির্বিজ্ঞান, ভূগোল এবং প্রশাসনিক বাস্তবতার ভাষা হয়ে উঠেছে।
আল-খাওয়ারিজমি সেই পণ্ডিতদের একজন, যাঁদের কাজ দেখে বোঝা যায় Bayt al-Hikmah (বায়তুল হিকমাহ)-এর জ্ঞান-পরিসর শুধু বই সংগ্রহ বা অনুবাদের জায়গা ছিল না। সেখানে জ্ঞানকে ব্যবহারযোগ্য করা হতো। আল-কিন্দি দর্শনের ভাষা গড়েছিলেন। আল-খাওয়ারিজমি হিসাবের ভাষা গড়লেন। একজন চিন্তাকে তাওহিদ, আকল ও ওহীর আলোচনায় দাঁড় করালেন। অন্যজন সংখ্যা, সমীকরণ, সারণি ও মানচিত্রের মাধ্যমে জ্ঞানকে বাস্তব ব্যবহারের কাঠামো দিলেন।
তাঁকে শুধু mathematician (গণিতবিদ) বলা যায়। কিন্তু এই পরিচয় তাঁর পূর্ণ পরিসর ধরতে পারে না। তিনি গণিতবিদ ছিলেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানী ছিলেন। ভূগোলবিদ ছিলেন। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি ছিলেন method-builder (পদ্ধতি নির্মাতা)। তাঁর কাজের ভেতরে systematization (পদ্ধতিগত বিন্যাস)-এর শক্তি স্পষ্ট। তিনি শুধু সমস্যার উত্তর দেননি। তিনি সমস্যাকে ধরার নিয়ম তৈরি করেছেন। শুধু হিসাব করেননি। হিসাবকে পুনরাবৃত্তিযোগ্য পদ্ধতিতে পরিণত করেছেন। শুধু অন্য উৎসের জ্ঞান ব্যবহার করেননি। সেই জ্ঞানকে আরবি বৈজ্ঞানিক ভাষায় শৃঙ্খলিত করেছেন।
প্রাথমিক জীবন ও বাগদাদের জ্ঞান-পরিসর
আল-খাওয়ারিজমির জীবন সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য অল্প। তাঁর পূর্ণ নাম সাধারণত Muhammad ibn Musa al-Khwarizmi (মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খাওয়ারিজমি) হিসেবে পরিচিত। তাঁর nisbah (নিসবা/সম্পর্কসূচক নাম) খোরেজম অঞ্চলের দিকে ইঙ্গিত করে। এই অঞ্চল বৃহত্তর পারস্য-ইরানি জ্ঞানভূগোলের অংশ ছিল। তবে তাঁর বৌদ্ধিক জীবন ও প্রধান কাজ বাগদাদেই পরিণতি পায়। Ibn al-Nadim (ইবন আল-নদিম) ও al-Qifti (আল-কিফতি)-এর সূত্রে তাঁর পরিবারের খোরেজম-সংযোগের কথা পাওয়া যায়। Jeffrey Oaks, “Khwārizmī,” in The Oxford Encyclopedia of Philosophy, Science, and Technology in Islam, Vol. 1, pp. 451–459.
তাঁর জাতিগত পরিচয় নিয়ে আধুনিক আলোচনায় নানা মত আছে। কেউ তাঁকে পারস্য বংশোদ্ভূত বলেন, কেউ খোরেজমের সঙ্গে যুক্ত করেন, আবার তাঁর নামের আরেক পাঠ নিয়ে বাগদাদের কাছাকাছি Qutrubbul (কুতরুব্বুল)-এর কথাও ওঠে। এই বিতর্ক তাঁর চিন্তার মূল অর্থ নির্ধারণ করে না। তাঁর বৈজ্ঞানিক রচনা আরবিতে। তাঁর কর্মক্ষেত্র বাগদাদ। তাঁর পদ্ধতি আব্বাসীয় জ্ঞান-পরিসরের অংশ। George Saliba এ ধরনের পণ্ডিতদের ক্ষেত্রে জাতিগত সীমা দিয়ে বিজ্ঞানচর্চা বোঝার অসুবিধা দেখিয়েছেন। আল-খাওয়ারিজমি পারস্য বংশোদ্ভূত হলেও বাগদাদে কাজ করেছেন এবং তাঁর বৈজ্ঞানিক কাজ আরবিতেই রচিত। George Saliba, “Science and medicine,” Iranian Studies, 31.3–4, 1998, pp. 681–690.
আল-খাওয়ারিজমির কাজের সময়কাল সাধারণত আল-মামুনের যুগের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর প্রধান কাজ ৮১৩ থেকে ৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে বলে ধরা হয়। বাগদাদ তখন শুধু রাজনৈতিক রাজধানী নয়। সেটি বাণিজ্য, প্রশাসন, অনুবাদ, পাণ্ডুলিপি, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণিতচর্চার ঘন পরিবেশ। সেই পরিবেশে আল-খাওয়ারিজমি কাজ করেছেন। তাঁর সঙ্গে Bayt al-Hikmah (বায়তুল হিকমাহ)-এর সংযোগও ঐতিহাসিক স্মৃতিতে সংরক্ষিত হয়েছে। এই uploaded reference text-এ প্রায় ৮২০ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর House of Wisdom (বায়তুল হিকমাহ)-সংযোগ, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ভূগোলে তাঁর আরবি রচনার কথা এসেছে।
আল-খাওয়ারিজমির আরবি রচনাগুলো এক বহুমুখী জ্ঞানভূগোলের সাক্ষ্য বহন করে। ভারতীয় সংখ্যা, গ্রিক গণিত, পারস্য ও বাবিলনীয় জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্য, টলেমীয় ভূগোল—সবকিছু তাঁর কাছে আলাদা আলাদা উৎস হয়ে থাকেনি। তিনি এগুলোকে হিসাব, সারণি, সমীকরণ ও মাপের ভাষায় নতুনভাবে সাজিয়েছেন। ফলে তাঁর কাজকে কোনো এক উৎসের ধারাবাহিকতা হিসেবে পড়া যায় না। এটি বাগদাদের সেই জ্ঞান-পরিবেশের ফল, যেখানে জ্ঞান ভাষা বদলাত, পদ্ধতি পেত, তারপর ব্যবহারিক শক্তিতে পরিণত হতো।
সংখ্যার বিপ্লব
সংখ্যা সভ্যতার পুরোনো উপকরণ। কিন্তু সব সংখ্যা-পদ্ধতি একইভাবে কাজ করে না। কোথাও সংখ্যা শুধু গণনার চিহ্ন। কোথাও তা বাণিজ্যের সহায়ক। কোথাও তা আকাশের গতি ধরার উপায়। আল-খাওয়ারিজমির হাতে সংখ্যা আরও বড় রূপ নেয়। সংখ্যা নিয়ম পায়। পদ্ধতি পায়। স্থানিক মান পায়। ধাপে ধাপে গণনার শৃঙ্খলা পায়।
Indian arithmetic (ভারতীয় গণনা-পদ্ধতি) নিয়ে তাঁর কাজ decimal positional number system (দশমিক স্থানিক সংখ্যা-পদ্ধতি)-কে আরবি বৈজ্ঞানিক ভাষায় প্রতিষ্ঠিত করে। এই পদ্ধতিতে অঙ্কের মান তার অবস্থানের ওপর নির্ভর করে। একই চিহ্ন ভিন্ন স্থানে ভিন্ন মান ধারণ করে। শূন্যের ধারণা হিসাবকে নতুন গতি দেয়। যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ, বাণিজ্যিক হিসাব, জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গণনা, উত্তরাধিকার বণ্টন—সবক্ষেত্রেই এই পদ্ধতি সুবিধা তৈরি করে।
এই সংখ্যাব্যবস্থা পরে ল্যাটিন অনুবাদের মাধ্যমে ইউরোপে প্রবেশ করে। Algoritmi de numero Indorum নামে পরিচিত ল্যাটিন ধারায় আল-খাওয়ারিজমির নাম Algoritmi রূপে প্রবেশ করে। এখান থেকেই algorism এবং পরে algorithm (অ্যালগরিদম) শব্দের ঐতিহাসিক সূত্র তৈরি হয়। Donald Knuth তাঁর The Art of Computer Programming-এর শুরুতে আল-খাওয়ারিজমির নামের সঙ্গে algorithm শব্দের ঐতিহাসিক সম্পর্ক উল্লেখ করেছেন। Donald Knuth, The Art of Computer Programming, Vol. 1, 3rd ed., p. 1.
Algorithm (অ্যালগরিদম) আজ digital civilization (ডিজিটাল সভ্যতা)-এর কেন্দ্রীয় শব্দ। কিন্তু আল-খাওয়ারিজমিকে আধুনিক কম্পিউটার বিজ্ঞানের সরাসরি নির্মাতা বানানো ঠিক নয়। তাঁর যুগে তাঁর কাজ ছিল গণনার পদ্ধতি গঠন। আধুনিক যুগে সেই পদ্ধতিগত চিন্তার শব্দ নতুন প্রযুক্তিগত জীবন পেয়েছে। ইতিহাসের সৌন্দর্য এখানেই। এক যুগের গণনাপদ্ধতি আরেক যুগে চিন্তার নতুন ভাষা হয়ে ওঠে।
Algebra ও আধুনিক গণিতের ভিত্তি
Algebra (বীজগণিত)-এর ইতিহাসে আল-খাওয়ারিজমির al-Kitāb al-mukhtaṣar fī ḥisāb al-jabr wa-l-muqābala এক মোড় ঘোরানো গ্রন্থ। এখানে al-jabr (আল-জাবর/পূরণ বা পুনঃস্থাপন) এবং al-muqabala (আল-মুকাবালা/সমতা বা ভারসাম্য)-এর মাধ্যমে equation (সমীকরণ)-কে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে সাজানো হয়েছে। এই গ্রন্থের নাম থেকেই algebra শব্দের জন্ম। কিন্তু নামের চেয়েও বড় বিষয় হলো পদ্ধতি। আল-খাওয়ারিজমি সমীকরণকে এমনভাবে ধরেছেন, যাতে অজানা রাশি নির্ণয়ের নিয়ম শেখানো যায়।
এই বই শুধু তাত্ত্বিক গণিতের গ্রন্থ নয়। বাণিজ্য, উত্তরাধিকার, ভূমি জরিপ, সম্পত্তি বণ্টন এবং দৈনন্দিন হিসাবের সমস্যা এর ভেতরে এসেছে। গণিত এখানে জীবনের বাইরে নয়। বাজারে দরকার। আইনে দরকার। জমিতে দরকার। পরিবারের সম্পত্তি বণ্টনে দরকার। আল-খাওয়ারিজমির বীজগণিত এই বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত বলেই তা শুধু পাণ্ডিত্য নয়, civilizational mathematics (সভ্যতাগত গণিত)।
Carl Boyer আল-খাওয়ারিজমির Al-Jabr-কে আধুনিক প্রাথমিক বীজগণিতের কাছাকাছি বলে চিহ্নিত করেন। তাঁর মূল্যায়নে Diophantus-কে কখনও বীজগণিতের জনক বলা হলেও এই উপাধি আল-খাওয়ারিজমির ক্ষেত্রে বেশি যথার্থ। কারণ আল-খাওয়ারিজমির গ্রন্থ কঠিন অনির্ণেয় সমস্যার সংগ্রহ নয়। এটি দ্বিতীয় ডিগ্রির সমীকরণসহ প্রাথমিক সমীকরণসমূহের সরল ও সংগঠিত ব্যাখ্যা। Carl B. Boyer, A History of Mathematics, 2nd ed., pp. 228–229, 252.
Solomon Gandz একই কারণে আল-খাওয়ারিজমিকে Diophantus-এর চেয়েও বেশি অর্থে “father of algebra” বলেছেন। তাঁর বক্তব্যে আল-খাওয়ারিজমি প্রথম algebra (বীজগণিত)-কে elementary form (প্রাথমিক রূপ)-এ এবং for its own sake (নিজস্ব শাস্ত্র হিসেবে) শিক্ষা দেন। Solomon Gandz, “The Sources of al-Khwarizmi’s Algebra,” Osiris, Vol. 1, 1936, pp. 263–277.
Victor Katz-ও আল-খাওয়ারিজমির al-jabr wa-l-muqabala গ্রন্থকে বর্তমান থাকা first true algebra text (প্রথম প্রকৃত বীজগণিত গ্রন্থ) হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। Victor J. Katz, “Stages in the History of Algebra with Implications for Teaching,” p. 190.
এইসব মূল্যায়ন আল-খাওয়ারিজমির কাজের গঠন বুঝতে সাহায্য করে। তিনি সমস্যা সমাধান করেছেন। তবে শুধু সমস্যা সমাধান করেননি। তিনি সমস্যার ধরন নির্ধারণ করেছেন। সমীকরণকে শ্রেণিবদ্ধ করেছেন। সমাধানের নিয়ম দিয়েছেন। আধুনিক প্রতীকী notation (প্রতীকী রূপ) তাঁর ছিল না। তবু তাঁর rhetorical algebra (বাক্যভিত্তিক বীজগণিত)-এর ভেতরে সমীকরণ, অজানা রাশি, ভারসাম্য ও পুনর্বিন্যাসের যে ধারণা কাজ করে, তা পরবর্তী গণিতের পথ খুলে দেয়।
Roshdi Rashed ও Angela Armstrong আল-খাওয়ারিজমির গ্রন্থকে Babylonian tablets (বাবিলনীয় ফলক) ও Diophantus-এর Arithmetica থেকে আলাদা করে দেখেছেন। তাঁদের মতে, আল-খাওয়ারিজমির কাজ কেবল সমাধানযোগ্য সমস্যার তালিকা নয়। এটি primitive terms (প্রাথমিক পদ) থেকে শুরু করে equation (সমীকরণ)-এর generic form (সাধারণ রূপ)-কে আলোচনার বস্তু বানায়। Roshdi Rashed and Angela Armstrong, The Development of Arabic Mathematics, pp. 11–12.
হিসাব থেকে পদ্ধতি
আল-খাওয়ারিজমির বড় শক্তি তাঁর পদ্ধতিগত দৃষ্টিতে। সংখ্যা তাঁর কাছে কেবল পরিমাণ নয়। সংখ্যা সম্পর্ক প্রকাশ করে। একটি অজানা রাশি অন্য রাশির সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত। কোন অংশ পূরণ করতে হবে। কোন অংশ ভারসাম্যে আনতে হবে। কোন রাশিকে সরাতে হবে। কোন রাশিকে মিলাতে হবে। এই প্রশ্নগুলোই তাঁর গণিতকে সাধারণ হিসাব থেকে পদ্ধতিতে উন্নীত করে।
Al-jabr (পূরণ বা পুনঃস্থাপন) সমীকরণে ঘাটতি বা ঋণাত্মক অবস্থাকে পূরণ করে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনে। Al-muqabala (সমতা বা ভারসাম্য) একই ধরনের রাশিকে মুখোমুখি এনে সরল করে। এগুলো কেবল গণিতের কাজ নয়। এগুলো চিন্তার রীতি। বিশৃঙ্খল অবস্থাকে শৃঙ্খলায় আনা। বিচ্ছিন্ন সংখ্যাকে সম্পর্কের ভেতরে বসানো। অজানাকে জানা পদ্ধতির অধীনে নিয়ে আসা।
এই রীতি আব্বাসীয় জ্ঞানচর্চার বৃহত্তর স্বভাবের সঙ্গে মিলে যায়। গ্রন্থ সংগ্রহিত হচ্ছে। ভাষান্তরিত হচ্ছে। সংশোধিত হচ্ছে। নতুন পাণ্ডুলিপি তৈরি হচ্ছে। জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সারণি রচিত হচ্ছে। ভূগোল স্থানাঙ্কে নামছে। আল-খাওয়ারিজমির গণিত এই একই সভ্যতাগত বোধের সংখ্যাতাত্ত্বিক রূপ। জ্ঞানকে সাজাতে হবে। মাপতে হবে। শেখাতে হবে। প্রয়োগ করতে হবে।
জ্যোতির্বিজ্ঞান, সারণি ও সময়ের গণনা
আল-খাওয়ারিজমির Zij as-Sindhind জ্যোতির্বিজ্ঞানী সারণির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। Zij (জিজ/জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সারণি) ছিল আকাশকে গণনায় ধরার পদ্ধতি। সূর্য, চাঁদ, গ্রহ, পঞ্জিকা, সাইন মান, সময় ও আকাশীয় অবস্থান—এসব তথ্য সারণির মাধ্যমে ব্যবহারযোগ্য করা হতো। জ্যোতির্বিজ্ঞান তখন শুধু আকাশের দর্শন নয়। তা গণনা, পূর্বাভাস, সময়নির্ণয় ও পঞ্জিকার কাজ।
E. S. Kennedy ইসলামী astronomical tables (জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সারণি)-এর ওপর তাঁর জরিপে আল-খাওয়ারিজমির জিজ-ঐতিহ্যকে প্রাথমিক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রাখেন। E. S. Kennedy, “A Survey of Islamic Astronomical Tables,” Transactions of the American Philosophical Society, 46.2, 1956, pp. 26–29, 128. এই সারণি-সংস্কৃতি ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান, গ্রিক পদ্ধতি এবং আব্বাসীয় গণনার চাহিদাকে একত্র করে।
আকাশ মানুষ বহু আগে থেকেই দেখেছে। কিন্তু আকাশকে সারণিতে নামানো আলাদা কাজ। দেখা থেকে হিসাব। হিসাব থেকে সারণি। সারণি থেকে পূর্বাভাস। আল-খাওয়ারিজমির কাজ এই রূপান্তরের অংশ। তাঁর জ্যোতির্বিজ্ঞান observational curiosity (পর্যবেক্ষণমূলক কৌতূহল)-এ সীমাবদ্ধ নয়। এটি calculation culture (গণনাভিত্তিক জ্ঞানসংস্কৃতি)-এর অংশ।
ভূগোল, মানচিত্র ও মাপের পৃথিবী
আল-খাওয়ারিজমির Kitab Surat al-Ard পৃথিবীকে মাপের ভাষায় ধরার কাজ। Ptolemy (টলেমি)-এর Geography তাঁর পেছনে আছে, কিন্তু তিনি টলেমির তথ্যকে কপি করে থামেননি। শহর, অঞ্চল, নদী, সাগর ও স্থানের latitude and longitude (অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমা)-এর তালিকা দিয়ে তিনি পৃথিবীকে সংখ্যায় ধরার চেষ্টা করেছেন।
Edward S. Kennedy mathematical geography (গাণিতিক ভূগোল)-এর আলোচনায় আল-খাওয়ারিজমির ভূগোলচর্চাকে টলেমীয় উত্তরাধিকার সংশোধন ও আরবি রূপান্তরের অংশ হিসেবে দেখেছেন। Edward S. Kennedy, “Mathematical Geography,” in Roshdi Rashed and Régis Morelon, eds., Encyclopedia of the History of Arabic Science, Vol. 1, pp. 185–201, esp. p. 188. তাঁর কাজ ভূমধ্যসাগরের দৈর্ঘ্য, এশিয়া-আফ্রিকার স্থানাঙ্ক এবং মানচিত্রচিন্তার ক্ষেত্রে সংশোধনের পথ খুলে দেয়।
এখানে ভূগোল বর্ণনা নয়। ভূগোল মাপ। শহর গল্পের জায়গা নয়। স্থানাঙ্কের জায়গা। সমুদ্র বিস্ময়ের বস্তু নয়। মানচিত্রের অংশ। পৃথিবী ভ্রমণের মঞ্চ নয়। গণনাযোগ্য জগৎ। এই পরিবর্তন আল-খাওয়ারিজমির জ্ঞানচর্চাকে গণিতের বাইরে নিয়ে যায়। সংখ্যা এখানে পৃথিবী বোঝার ভাষা।
জ্ঞানকে প্রয়োগযোগ্য করার শিল্প
আল-খাওয়ারিজমির কাজের প্রকৃত অর্থ সংখ্যার ইতিহাসে নয়; সংখ্যাকে সভ্যতার কাজে বসানোর ইতিহাসে। তাঁর হাতে বীজগণিত আইন, বাণিজ্য ও উত্তরাধিকারের কাজে লাগে। সংখ্যা গণনার পদ্ধতি পায়। Algorithm (অ্যালগরিদম) শব্দের দূরবর্তী ঐতিহাসিক উৎস তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত হয়। জ্যোতির্বিজ্ঞান সারণিতে নামে। ভূগোল স্থানাঙ্কে দাঁড়ায়। পৃথিবী মাপের ভাষায় কথা বলে।
একটি সভ্যতা শুধু বড় ধারণা তৈরি করলে শক্তিশালী হয় না। ধারণাকে ব্যবহারযোগ্য না করতে পারলে। আল-খাওয়ারিজমির কাজ সেই ব্যবহারযোগ্যতার জ্ঞান। তিনি তত্ত্বকে অস্বীকার করেননি। কিন্তু তত্ত্বকে হিসাব, সারণি, সমীকরণ ও মাপের শৃঙ্খলায় নামিয়েছেন। এই জায়গাতেই তাঁর ঐতিহাসিক মর্যাদা।
আল-খাওয়ারিজমি সংখ্যা নিয়ে কাজ করেননি শুধু। তিনি সংখ্যাকে সভ্যতার ভাষা বানিয়েছেন। তাঁর হাতে calculation (হিসাব) method (পদ্ধতি)-তে রূপ নিয়েছে। Method (পদ্ধতি) science (বিজ্ঞান)-এর ভিত্তি হয়েছে। আর সেই ভিত্তি বাগদাদ থেকে বহু দূরে, ল্যাটিন ইউরোপ পর্যন্ত, দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করেছে।

Post a Comment