Table of Contents
Previous Part.......
হাররানের বাজারে একজন তরুণ money changer (মুদ্রা-বদলকারী) বসে আছে। সামনে মুদ্রা, হিসাব, লোকজনের ভিড়। বাইরের চোখে তার জীবন এখানেই থেমে যেতে পারত। কিন্তু বাগদাদের জ্ঞান-ইতিহাসে অনেক সময় মানুষের পরিচয় জন্মপরিচয়ে শেষ হয় না। ভাষা, স্মৃতি, গণনা, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি আর সঠিক মানুষের নজর একটি জীবনকে অন্য পথে নিয়ে যায়। সাবিত ইবনে কুররার গল্প সেই রকমই।
সাবিত ইবনে কুররা আল-হাররানি আস-সাবি নবম শতকের এমন এক পণ্ডিত, যাকে কেবল translator (অনুবাদক) বললে কম বলা হয়। আবার কেবল mathematician (গণিতবিদ) বললেও তাঁর কাজের পুরো বিস্তার ধরা পড়ে না। তিনি অনুবাদক ছিলেন। গণিতবিদ ছিলেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানী ছিলেন। চিকিৎসক ছিলেন। mechanics (যন্ত্রবিদ্যা) ও statics (স্থিতিবিদ্যা)-এর আলোচনাতেও তাঁর নাম আসে। কিন্তু তাঁর আসল পরিচয় আরও গভীর। তিনি এমন এক মানুষ, যার হাতে অনুবাদ কেবল ভাষান্তর থাকেনি। তা মাপ, প্রমাণ, গতি, ভারসাম্য এবং নির্ভুলতার ভাষায় প্রবেশ করেছে।
Banu Musa (বানু মুসা)-এর অধ্যায় জ্ঞানকে যন্ত্রে নামিয়ে এনেছিল। সাবিত সেই জগতেরই আরেক মুখ। বানু মুসা যেখানে জ্ঞানকে জল, চাপ, ভালভ, ফোয়ারা ও যন্ত্রে বসায়, সাবিত সেখানে জ্ঞানকে জ্যামিতির প্রমাণে, সংখ্যার সম্পর্কের মধ্যে, আকাশের সংশোধিত হিসাবে এবং যন্ত্রগত ভারসাম্যের তত্ত্বে দাঁড় করান। এই দুজনকে আলাদা করা যায়, কিন্তু বিচ্ছিন্ন করা যায় না। সাবিতের বাগদাদে আগমনই বানু মুসার পাণ্ডিত্যিক কর্মজালের ভেতর দিয়ে।
হাররান থেকে বাগদাদ
সাবিতের জন্ম হাররানে, জাজিরা অঞ্চলের এক প্রাচীন শহরে। হাররান শুধু ভূগোলের নাম নয়। এটি ছিল ধর্মীয়, ভাষিক ও বৌদ্ধিক বহুত্বের এক বিশেষ পরিসর। সাবিত ছিলেন Sabian (সাবিয়ান) সম্প্রদায়ের মানুষ। Syriac (সিরিয়াক) ছিল তাঁর মাতৃভাষা। তিনি Greek (গ্রিক) ও Arabic (আরবি)-তেও দক্ষ ছিলেন। এই ভাষাগত ত্রিভুজ তাঁকে Graeco-Arabic translation movement (গ্রিক-আরবি অনুবাদ আন্দোলন)-এর জন্য খুব উপযোগী করে তোলে। Roshdi Rashed তাঁর সাবিত-সংক্রান্ত গবেষণায় হাররান থেকে বাগদাদে সাবিতের আগমন, ভাষাগত পটভূমি এবং বানু মুসা-সংযোগকে তাঁর বৌদ্ধিক জীবনের কেন্দ্রীয় বাঁক হিসেবে দেখিয়েছেন। Roshdi Rashed, “Thābit ibn Qurra, Scholar and Philosopher,” in Thābit ibn Qurra: Science and Philosophy in Ninth-Century Baghdad, pp. 3–13; Roshdi Rashed, “Thābit ibn Qurra: From Ḥarrān to Baghdad,” pp. 15–24.
সাবিতের তরুণ বয়সের money changer (মুদ্রা-বদলকারী) পরিচয় অনেকের কাছে গল্পের মতো লাগে। কিন্তু এই পরিচয় তার বৌদ্ধিক চরিত্রের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মিলে যায়। মুদ্রা-বদলকারী শুধু কয়েন গোনে না। মান বোঝে। তুলনা করে। বিনিময় বোঝে। পরিমাপ বোঝে। এক মুদ্রা থেকে আরেক মুদ্রায় মানের রূপান্তর বোঝে। সাবিতের পরবর্তী জীবনেও যেন একই কাজ অন্য স্তরে দেখা যায়। তিনি ভাষা বদলান, কিন্তু মান হারাতে দেন না। গ্রিক পাঠ আরবিতে আসে, কিন্তু ধারণা নষ্ট হয় না। জ্যামিতি অনুবাদ হয়, কিন্তু প্রমাণের শরীর অক্ষত থাকে। আকাশের হিসাব সংশোধিত হয়, কিন্তু সংখ্যার শৃঙ্খলা ভাঙে না।
Muhammad ibn Musa তাঁর প্রতিভা শনাক্ত করেন। হাররানের বাজার থেকে সাবিতকে বাগদাদে নিয়ে আসা শুধু একজন প্রতিভাবান তরুণকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার ঘটনা নয়। এটি Bayt al-Hikmah (বায়তুল হিকমাহ)-এর জ্ঞান-পরিবেশের একটি গভীর চরিত্র দেখায়। জ্ঞান সেখানে জন্মগত গোত্রের একচেটিয়া সম্পদ ছিল না। ভাষা জানলে, শিখতে পারলে, গ্রন্থ বুঝতে পারলে, গণিতে প্রবেশ করতে পারলে, দরবার ও পণ্ডিতসমাজ তাকে কাজে লাগাতে পারত। বানু মুসার কর্মজাল এই কাজ করেছে। তারা প্রতিভাকে চিনেছে। বাগদাদের জ্ঞানযন্ত্রে বসিয়েছে। তারপর সেই প্রতিভা নিজেই নতুন জ্ঞান উৎপাদনের শক্তি হয়ে উঠেছে।
বানু মুসার কর্মপরিসর
সাবিত বাগদাদে এসে কোনো শূন্য জায়গায় প্রবেশ করেননি। তাঁর চারপাশে ছিল অনুবাদ, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, mechanics (যন্ত্রবিদ্যা), পৃষ্ঠপোষকতা এবং গ্রিক গ্রন্থসংগ্রহের এক ঘন পরিবেশ। বানু মুসা নিজেরা পণ্ডিত ছিলেন, কিন্তু আরও বড় কথা, তারা পাণ্ডিত্যিক নেটওয়ার্কের নির্মাতা ছিলেন। তাদের ঘর ও কর্মপরিসর ছিল এমন এক বৌদ্ধিক জায়গা, যেখানে গ্রন্থ আসে, অনুবাদ হয়, সংশোধন হয়, নতুন কাজের জন্য মানুষ জোগাড় হয়।
সাবিত সেই পরিসরে এসে কেবল অনুবাদক হিসেবে থাকেননি। তিনি ছাত্র, সহকর্মী, সংশোধক, গণিতবিদ এবং পরে স্বতন্ত্র পণ্ডিত হয়ে ওঠেন। তাঁর কাজের মধ্যে Apollonius (অ্যাপোলোনিয়াস), Archimedes (আর্কিমিডিস), Euclid (ইউক্লিড) ও Ptolemy (টলেমি)-এর উত্তরাধিকার প্রবেশ করে। তিনি গ্রিক থেকে আরবিতে অনুবাদ করেছেন। আগের অনুবাদ সংশোধন করেছেন। হুনাইন ইবনে ইসহাকের Euclid’s Elements (ইউক্লিডের এলিমেন্টস)-এর অনুবাদ পুনর্বিবেচনা করেছেন। ইসহাক ইবনে হুনাইনের Ptolemy’s Almagest (টলেমির আলমাজেস্ট)-এর অনুবাদও সংশোধনের সঙ্গে তাঁর নাম যুক্ত। Rosenfeld and Grigorian, “Thābit Ibn Qurra,” Complete Dictionary of Scientific Biography, pp. 288–295.
অনুবাদের এই কাজকে শুধু ভাষান্তর ভাবলে সাবিতকে বোঝা যায় না। গণিতের গ্রন্থ অনুবাদে শব্দের সমার্থক দিলেই হয় না। একটি theorem (উপপাদ্য)-এর গঠন বুঝতে হয়। একটি proof (প্রমাণ)-এর ধাপ কোথায় শুরু, কোথায় শেষ, কোথায় অনুমান, কোথায় সিদ্ধান্ত—সেটা ধরতে হয়। একটি জ্যামিতিক ধারণা ভুলভাবে ভাষান্তরিত হলে পুরো শাস্ত্রীয় যুক্তি বদলে যেতে পারে। তাই সাবিতের অনুবাদ ছিল philological labor (ভাষাতাত্ত্বিক শ্রম) এবং mathematical judgment (গাণিতিক বিচার)-এর সংযোগ।
এই কারণেই তিনি অনুবাদ-চক্রের সাধারণ কর্মী নন। তিনি অনুবাদকে নির্ভুলতার দিকে ঠেলে দিয়েছেন। গ্রিক জ্যামিতি আরবিতে এল, কিন্তু শুধু এল না। তা আরবি গণিতের নতুন আলোচনার ভিত্তি হলো। সাবিতের ভূমিকা সেই ভিত্তি শক্ত করার কাজে।
গ্রিক গণিতের আরবি পুনর্গঠন
সাবিত ইবনে কুররা গ্রিক গণিতের পাঠক ছিলেন। কিন্তু তাঁকে গ্রিক গণিতের অনুগামী বানালে ভুল হবে। তিনি উত্তরাধিকার গ্রহণ করেছেন, তারপর তাকে নিজের কাজের ভেতরে নতুন পথে চালিয়েছেন। Euclid (ইউক্লিড), Archimedes (আর্কিমিডিস), Apollonius (অ্যাপোলোনিয়াস)—এই নামগুলো তাঁর জগতের অংশ। তবে তাঁর কাজ কেবল তাদের গ্রন্থ উদ্ধার নয়। তিনি তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। কোথাও ব্যাখ্যা করেছেন। কোথাও সংশোধন করেছেন। কোথাও নতুন প্রমাণ দিয়েছেন। কোথাও সমস্যাকে আরও এগিয়ে নিয়েছেন।
তাঁর গণিতের একটি পরিচিত অংশ amicable numbers (বন্ধুসংখ্যা)-সংক্রান্ত। বন্ধুসংখ্যা বলতে এমন দুই সংখ্যা বোঝায়, যাদের প্রত্যেকটির proper divisors (নিজেকে বাদ দেওয়া গুণনীয়কসমূহ)-এর যোগফল অন্য সংখ্যাটির সমান। এটি শুনতে অদ্ভুত শখের গণিত মনে হতে পারে। কিন্তু সংখ্যা-তত্ত্বের ইতিহাসে এমন প্রশ্ন কেবল খেলা নয়। এটি সংখ্যা সম্পর্কের গভীরতা, প্যাটার্ন, সাধারণ নিয়ম এবং প্রমাণের প্রশ্ন খুলে দেয়। Sonja Brentjes ও Jan Hogendijk সাবিতের বন্ধুসংখ্যা-সংক্রান্ত নিয়ম নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং দেখিয়েছেন, তাঁর কাজ সংখ্যার সম্পর্ককে নিয়মের ভেতরে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা। Sonja Brentjes and Jan P. Hogendijk, “Notes on Thabit ibn Qurra and his Rule for Amicable Numbers,” Historia Mathematica, 16.4, 1989, pp. 373–378.
সাবিত Pythagorean theorem (পিথাগোরাসের উপপাদ্য)-এর সাধারণীকরণ নিয়েও কাজ করেন। পিথাগোরাসের উপপাদ্য স্কুলের বইয়ে সহজভাবে আসে। সমকোণী ত্রিভুজে অতিভুজের বর্গ দুই বাহুর বর্গের যোগফল। কিন্তু গণিতবিদের চোখে একটি বিখ্যাত উপপাদ্য কখনও শুধু একটি বাক্য নয়। প্রশ্ন হলো, এর প্রমাণ কতভাবে সম্ভব। কোন শর্তে এটি বিস্তৃত হতে পারে। কোন জ্যামিতিক গঠন এটিকে ধারণ করে। Aydin Sayili সাবিতের Pythagorean theorem (পিথাগোরাসের উপপাদ্য)-এর generalization (সাধারণীকরণ) বিষয়ে আলোচনা করেছেন। Aydin Sayili, “Thâbit ibn Qurra’s Generalization of the Pythagorean Theorem,” Isis, 51.1, 1960, pp. 35–37.
Euclid’s parallel postulate (ইউক্লিডের সমান্তরাল স্বীকার্য) নিয়েও তাঁর কাজ উল্লেখযোগ্য। এই স্বীকার্য শুধু জ্যামিতির একটি টেকনিক্যাল সমস্যা নয়। ইউক্লিডীয় জ্যামিতির ভিত এতে জড়িয়ে আছে। পরবর্তী শতাব্দীতে এই স্বীকার্য নিয়ে অসংখ্য গণিতবিদ ভাববেন। সাবিত সেই দীর্ঘ ইতিহাসের প্রারম্ভিক আরবি পর্যায়ের একটি নাম। A. I. Sabra তাঁর আলোচনায় সাবিতের Euclid’s parallels postulate (ইউক্লিডের সমান্তরাল স্বীকার্য)-সংক্রান্ত কাজ বিশ্লেষণ করেছেন। A. I. Sabra, “Thābit Ibn Qurra on Euclid’s Parallels Postulate,” Journal of the Warburg and Courtauld Institutes, 31, 1968, pp. 12–32.
এইসব কাজের ভেতরে একটি সাধারণ প্রবণতা আছে। সাবিত প্রমাণকে গুরুত্ব দেন। অনুমান নয়। কল্পনা নয়। কর্তৃত্বের পুনরুক্তিও নয়। রেখা, কোণ, অনুপাত, সংখ্যা, সমতা—এসবের মধ্যে যে সম্পর্ক, তাকে ধাপে ধাপে দেখাতে হবে। জ্ঞান সেখানে মুখের দাবি হয়ে থাকে না। প্রমাণে দাঁড়ায়।
জ্যামিতি, সংখ্যা ও প্রমাণের শৃঙ্খলা
সাবিতের জ্যামিতি দেখলে বোঝা যায়, তাঁর চিন্তা শুধু অনুবাদিত গ্রন্থের পাশে বসে নেই। তা নিজস্ব জীবন পেয়েছে। Conic sections (শঙ্কু-খণ্ড), heptagon (সপ্তভুজ), Archimedean geometry (আর্কিমিডীয় জ্যামিতি), paraboloid (পরাবৃত্তীয় ঘনরূপ)—এসব তাঁর আলোচনায় আসে। Jan Hogendijk regular heptagon (নিয়মিত সপ্তভুজ)-এর গ্রিক ও আরবি নির্মাণ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে সাবিতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পাঠ ও প্রমাণের ঐতিহ্য নিয়ে আলোচনা করেছেন। Jan P. Hogendijk, “Greek and Arabic Constructions of the Regular Heptagon,” Archive for History of Exact Sciences, 30.3–4, 1984, pp. 197–330.
শঙ্কু-খণ্ড বা conic sections (শঙ্কু-খণ্ড) শুনলে সাধারণ পাঠক ভাবতে পারে, এ যেন খুব দূরের জ্যামিতি। কিন্তু ইতিহাসে এগুলো পরবর্তী গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, optics (দৃষ্টিবিজ্ঞান) এবং mechanics (যন্ত্রবিদ্যা)-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। একটি বক্ররেখা কেবল রেখা নয়। তা গতি বোঝার ভাষা হতে পারে। আলো বোঝার ভাষা হতে পারে। আকাশীয় পিণ্ডের পথ বোঝার ভাষা হতে পারে। সাবিত এই জ্যামিতিক দুনিয়াকে আরবি ভাষায় শক্ত করেন।
এই পর্যায়ে তাঁর সঙ্গে আল-খাওয়ারিজমির পার্থক্য পরিষ্কার হয়। আল-খাওয়ারিজমির গণিত society-facing (সমাজমুখী)। বাণিজ্য, উত্তরাধিকার, জরিপ, হিসাব—এসবের দিকে তার মুখ। সাবিতের গণিত proof-facing (প্রমাণমুখী)। রেখা, অনুপাত, উপপাদ্য, সংখ্যার সম্পর্ক, জ্যামিতিক গঠন—এসবের দিকে তার দৃষ্টি। দুজনের দরকার আলাদা। একজন গণনার ভাষা দেয়। অন্যজন নির্ভুলতার ভাষা শক্ত করে।
প্রমাণের শৃঙ্খলা সভ্যতার জন্য বিলাসিতা নয়। যে সভ্যতা প্রমাণ শেখে না, সে সহজেই ভাষণ, রূপক, কর্তৃত্ব ও মুখস্থ জ্ঞানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। সাবিতের মতো পণ্ডিতরা দেখান, জ্ঞানকে খাড়া করতে হলে ধাপ লাগে। সংজ্ঞা লাগে। শর্ত লাগে। প্রমাণ লাগে। ভুল প্রমাণ হলে ঠিক করতে হয়। পুরোনো অনুবাদ দুর্বল হলে সংশোধন করতে হয়। এই মনোভাব Bayt al-Hikmah-এর জ্ঞানচর্চাকে কেবল অনুবাদের স্তরে আটকে রাখেনি।
যন্ত্রবিদ্যা, ভারসাম্য ও গতির ধারণা
সাবিতের আরেকটি বড় দিক mechanics (যন্ত্রবিদ্যা) ও statics (স্থিতিবিদ্যা)। Banu Musa যন্ত্র বানায়, ফোয়ারা চালায়, ভালভ ও চাপের খেলা দেখায়। সাবিত সেখানে ভারসাম্য, ওজন, লিভার, গতির কারণ, স্থিতির শর্ত—এসবের তাত্ত্বিক আলোচনায় প্রবেশ করেন।
Kitab fi’l-Qarastun বা steelyard (তুলাদণ্ড)-সংক্রান্ত কাজ তাঁর mechanics (যন্ত্রবিদ্যা)-এর সঙ্গে যুক্ত। Steelyard (তুলাদণ্ড) সাধারণ যন্ত্র মনে হতে পারে। কিন্তু এর ভেতরে আছে weight (ওজন), arm length (বাহুর দৈর্ঘ্য), balance point (ভারসাম্যবিন্দু), force (বল), distance (দূরত্ব)-এর সম্পর্ক। একটি দণ্ডে কোথায় কত ভার দিলে সমতা থাকবে—এই প্রশ্ন থেকেই mechanics (যন্ত্রবিদ্যা)-এর মৌলিক ভাষা তৈরি হয়।
Mohammed Abattouy আরবি প্রেক্ষাপটে Greek mechanics (গ্রিক যন্ত্রবিদ্যা)-এর প্রবেশ ও রূপান্তর নিয়ে যে বিশ্লেষণ করেছেন, সেখানে সাবিত ইবনে কুররা, al-Isfizari এবং আরবি mechanics tradition (যন্ত্রবিদ্যা-ঐতিহ্য)-এর সম্পর্ক আলোচিত হয়েছে। Abattouy দেখান, সাবিতের কাজ Aristotelian dynamics (এরিস্টটলীয় গতি-ধারণা), Euclidean mechanics (ইউক্লিডীয় যন্ত্রবিদ্যা) এবং Archimedean tradition (আর্কিমিডীয় ঐতিহ্য)-এর সংলাপে দাঁড়িয়ে আছে। Mohammed Abattouy, “Greek Mechanics in Arabic Context: Thābit ibn Qurra, al-Isfizārī and the Arabic Traditions of Aristotelian and Euclidean Mechanics,” Science in Context, 14.1–2, 2001, pp. 179–247.
সাবিত motion (গতি) সম্পর্কে এমন ধারণাও দেন, যেখানে জগৎকে শুধু প্রকৃতিগত স্থান বা Aristotelian natural place (এরিস্টটলীয় স্বাভাবিক স্থান)-এর ধারণা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। ওজন, আকর্ষণ, উপাদানের পারস্পরিক সম্পর্ক, ওঠা-নামা, ভারসাম্য—এসব তাঁর আলোচনায় প্রবেশ করে। তাঁর সব ধারণা আধুনিক physics (পদার্থবিদ্যা)-এর ভাষায় সরাসরি দাঁড় করানো যাবে না। তা করলে ইতিহাস বিকৃত হবে। কিন্তু তাঁর চেষ্টা স্পষ্ট। প্রকৃতিকে গতির সম্পর্ক দিয়ে বোঝা। বস্তু কীভাবে স্থির থাকে, কীভাবে নড়ে, কীভাবে ভারসাম্য পায়—এই প্রশ্নকে যুক্তির আলোতে আনা।
এই জায়গায় সাবিতকে Banu Musa-এর পরে পড়া সবচেয়ে মানানসই। বানু মুসা যন্ত্রের আচরণ দেখায়। সাবিত সেই আচরণের পেছনে থাকা সম্পর্ক নিয়ে ভাবে। যন্ত্র চোখে দেখা যায়। Statics (স্থিতিবিদ্যা) চিন্তায় ধরা পড়ে। একদিকে পাত্রে জল ওঠে-নামে। অন্যদিকে দণ্ডে ওজন সরে। দুদিকেই প্রশ্ন একই। কীভাবে বস্তু কাজ করে।
জ্যোতির্বিজ্ঞান ও আকাশের সংশোধিত হিসাব
সাবিতের জ্যোতির্বিজ্ঞানও তাঁর গণিতের মতো সংশোধনী মনোভাব বহন করে। তিনি Ptolemaic astronomy (টলেমীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান)-এর পাঠক। কিন্তু আবারও তিনি কেবল অনুসারী নন। তিনি প্রশ্ন করেন। সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ, fixed stars (স্থির নক্ষত্র), sidereal year (নাক্ষত্রিক বছর), sundial (সূর্যঘড়ি)—এসব বিষয়ে তাঁর কাজ আছে।
Francis J. Carmody সাবিতের astronomical works (জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক রচনা)-এর ওপর গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছেন। তাঁর আলোচনায় সাবিতের solar year (সৌর বছর), Ptolemaic system (টলেমীয় পদ্ধতি) এবং মধ্যযুগীয় ল্যাটিন জ্যোতির্বিজ্ঞানে সাবিত-নামাঙ্কিত পাঠের প্রবাহ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা আছে। Francis J. Carmody, “Notes on the Astronomical Works of Thabit b. Qurra,” Isis, 46.3, 1955, pp. 235–242.
আকাশ নিয়ে চিন্তা প্রাচীন সভ্যতাগুলোর পুরোনো অভ্যাস। কিন্তু সাবিতের মতো পণ্ডিতরা আকাশকে শুধু পুরাণ, জ্যোতিষ বা বিস্ময়ের ক্ষেত্র হিসেবে রাখেন না। আকাশকে হিসাব করতে হয়। বছরের দৈর্ঘ্য নির্ণয় করতে হয়। সূর্যের প্রত্যাবর্তন মাপতে হয়। পূর্বসূরির হিসাব যাচাই করতে হয়। ভুল থাকলে প্রশ্ন করতে হয়। জ্যোতির্বিজ্ঞান এখানে mathematical astronomy (গাণিতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান)-এ প্রবেশ করে।
এই মনোভাব আল-খাওয়ারিজমির জিজ-সংস্কৃতির সঙ্গে কথা বলে। আল-খাওয়ারিজমি সারণি নির্মাণ করেন। সাবিত সেই সারণি ও পূর্ববর্তী মডেলের পেছনে থাকা গাণিতিক প্রশ্নে প্রবেশ করেন। একজন আকাশকে সংখ্যা ও সারণিতে ধরেন। অন্যজন সেই সংখ্যার নির্ভুলতা, মডেল ও গাণিতিক গঠনের দিকে তাকান।
চিকিৎসা, দর্শন ও বহুশাস্ত্রীয়তা
সাবিতের পরিচয় শুধু গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে আটকে নেই। তিনি চিকিৎসা নিয়েও লিখেছেন। al-Dhakhira fi ilm al-tibb বা চিকিৎসাশাস্ত্রের ভাণ্ডার, Kitab al-Rawda fi’l-tibb, চোখের রোগ, গুটি বসন্ত ও হাম, পিত্তপাথর, পশুচিকিৎসা—এসব বিষয়ে তাঁর রচনার উল্লেখ পাওয়া যায়। Rosenfeld and Grigorian, pp. 292–295.
এই বহুশাস্ত্রীয়তা নবম শতকের বাগদাদে অস্বাভাবিক ছিল না। একজন পণ্ডিত ভাষা জানেন, জ্যামিতি জানেন, জ্যোতির্বিজ্ঞান জানেন, চিকিৎসা পড়েন, দর্শন নিয়ে লেখেন। আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় দেয়াল তখন ছিল না। কিন্তু এর মানে এই নয় যে সবকিছু এলোমেলো ছিল। বরং জ্ঞানের কেন্দ্রে ছিল ভাষা, যুক্তি, মাপ, প্রমাণ ও পাণ্ডিত্যিক শৃঙ্খলা। সাবিতের কাজ এই শৃঙ্খলাকে একাধিক শাস্ত্রে ছড়িয়ে দেয়।
তাঁর দার্শনিক ও ধর্মীয় লেখার কথাও সূত্রে আসে। Syriac (সিরিয়াক)-এ তিনি ধর্মীয় ও দার্শনিক বিষয়েও লিখেছেন বলে Bar Hebraeus এবং অন্য ঐতিহাসিক সূত্রের বর্ণনা আছে। এই তথ্য তাঁর পরিচয়কে আরও জটিল করে। তিনি মুসলিম নন, কিন্তু ইসলামী সভ্যতার জ্ঞান-পরিসরের কেন্দ্রে কাজ করছেন। তিনি সাবিয়ান, কিন্তু আরবি ভাষায় গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞান নির্মাণ করছেন। তিনি সিরিয়াকভাষী, কিন্তু গ্রিক জ্ঞান আরবিতে পুনর্গঠন করছেন। এই বহুত্ব আব্বাসীয় জ্ঞানচর্চার দুর্বলতা নয়। শক্তি।
জ্ঞান যখন মাপে, প্রমাণে ও গতিতে দাঁড়ায়
সাবিত ইবনে কুররার কাজের ভেতর দিয়ে Bayt al-Hikmah-এর জ্ঞান-ব্যবস্থার আরেকটি স্তর দেখা যায়। হুনাইন ইবনে ইসহাক অনুবাদকে পাণ্ডুলিপি-তুলনা ও অর্থের সততায় দাঁড় করান। আল-কিন্দি দর্শনকে তাওহিদ, আকল ও ওহীর আলোচনায় আনেন। আল-খাওয়ারিজমি সংখ্যা ও সমীকরণকে পদ্ধতি দেন। Banu Musa জ্ঞানকে যন্ত্রে বসান। সাবিত সেই ধারার ভেতরে মাপ, প্রমাণ, গতিবিদ্যা ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সংশোধনের ভাষা শক্ত করেন।
তাঁর গল্প আমাদের একটি সহজ কিন্তু জরুরি কথা মনে করিয়ে দেয়। জ্ঞান শুধু সংগ্রহ করলে সভ্যতা হয় না। জ্ঞানকে যাচাই করতে হয়। মাপতে হয়। অনুবাদ ঠিক করতে হয়। প্রমাণ দাঁড় করাতে হয়। ভারসাম্য বুঝতে হয়। গতি ব্যাখ্যা করতে হয়। আকাশের হিসাব নতুন করে দেখতে হয়। সাবিত এই কাজগুলো করেছেন।
হাররানের বাজার থেকে বাগদাদের পাণ্ডিত্যিক কর্মজালে এসে তিনি যে জীবন গড়েছেন, তা ব্যক্তিগত প্রতিভার গল্পের চেয়েও বড়। এটি আব্বাসীয় জ্ঞানপরিসরের গল্প। সেই পরিসর প্রতিভাকে চিনত, ভাষাকে কাজে লাগাত, অনুবাদকে সংশোধনে নিয়ে যেত, গণিতকে প্রমাণে শক্ত করত, যন্ত্রবিদ্যাকে ভারসাম্যের তত্ত্বে আনত। সাবিত ইবনে কুররা সেই পরিবেশের এক কঠোর, নির্ভুল, গভীর মুখ।
তাঁর হাতে জ্ঞান শুধু ভাষা বদলায় না। রেখায় দাঁড়ায়। সংখ্যায় দাঁড়ায়। প্রমাণে দাঁড়ায়। ওজনে দাঁড়ায়। গতির প্রশ্নে দাঁড়ায়। আর এই দাঁড়ানোই তাঁকে Bayt al-Hikmah-এর বৃহত্তর ইতিহাসে অপরিহার্য করে তোলে।

Post a Comment