Table of Contents
![]() |
|
৫:৩
Previous Part.......
১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির ঢাকার রাজপথে যে ঐতিহাসিক রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম সংঘটিত হয়েছিল, তা বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রচলিত ধর্মনিরপেক্ষ বয়ানে এক সুপরিকল্পিত ঐতিহাসিক জালিয়াতি এবং অপব্যাখ্যার শিকার হয়েছে। আধুনিক কলকাতা-কেন্দ্রিক ভদ্রলোক সমাজ এবং এ দেশীয় ছদ্ম-সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী মহল তাদের প্রোপাগান্ডা ফ্যাক্টরির মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের মগেজ অবিরত এই অসত্য ধারণাই ইনজেক্ট করে আসছে যে—১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল এক ধরনের ধর্ম-বিমুখ, ধর্মনিরপেক্ষ এবং কলকাতার বাবুদের তৈরি করা ছদ্ম-সেক্যুলারিজম থেকে উৎসারিত এক আন্দোলন। কিন্তু ইতিহাসের আদিমতম খতিয়ান এবং ধুলোবালি ওড়ানো সমসাময়িক প্রাথমিক দলিলাদি ঘাঁটলে এই সম্পূর্ণ আধুনিক ন্যারেটিভ তাসের ঘরের মতন চূর্ণ হয়ে যায়। ১৯৫২ সালের ঢাকার রাজপথে মায়ের ভাষার অধিকার আদায়ের জন্য সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারের ঢেলে দেওয়া রক্তের সেই তাজা স্পিরিট কোনো কোলকাতা-কেন্দ্রিক আভিজাত্যবাদের অনুকরণে ছিল না; বরং তা ছিল এই পললভূমির মুসলিম মানসের নিজস্ব ধর্মীয়, লৌকিক এবং শাসনতান্ত্রিক ইনসাফ প্রতিষ্ঠার এক তীব্র ও বৈপ্লবিক গণবিস্ফোরণ।
এই ঐতিহাসিক সত্যের সবচেয়ে অকাট্য, প্রামাণ্য এবং জাজ্বল্যমান প্রাথমিক আর্কাইভাল দলিল (Primary Archival Evidence) পাওয়া যায় ভাষা আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে এ দেশের মানুষের মনস্তত্ত্ব ধারণ করা সমসাময়িক মূলধারার স্বাধীন পত্রিকাগুলোর পাতায়। ভাষা আন্দোলনের সেই মহান আত্মত্যাগকে পুঁজী করে তৎকালীন পূর্ব বাংলার মুসলিম বুদ্ধিজীবী এবং আমজনতা যে বৈপ্লবিক রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখছিলেন, তা কোনো কলকাতার ছদ্ম-ধর্মীয় নান্দনিকতার অধীনস্থ ছিল না। ভাষা আন্দোলনের প্রধানতম সংগঠন 'তমদ্দুন মজলিস'-এর মুখপত্র সাপ্তাহিক সৈনিক পত্রিকার সেই ঐতিহাসিক প্রধান শিরোনাম (Lead Headline) স্পষ্টাক্ষরে সাক্ষ্য দেয়, "রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের বিপ্লবী ঐতিহ্য নিয়ে সত্যিকারের খেলাফৎ কায়েমের জন্য দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে যেতে হবে।" এই দলিলের নিচে থাকা উপ-শিরোনামে আরও স্পষ্ট করে সমাজ পরিবর্তনের যে ডাক দেওয়া হয়েছিল, তা হলো, "আজকের পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা এবং স্বার্থান্বেষী নেতৃত্বের অবসান ঘটিয়ে দারুল ইসলাম কায়েম না করা পর্যন্ত জনগণের মুক্তি আসতে পারে না" (১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখপত্র সাপ্তাহিক সৈনিক, ইংরেজি তারিখ: ৯ মার্চ, ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দ। বাংলা তারিখ: ২৫ ফাল্গুন, ১৩৫৮ বঙ্গাব্দ। বার: রবিবার। ৪র্থ বর্ষের ২৭শ সংখ্যা)।
![]() |
| ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখপত্র সাপ্তাহিক সৈনিক |
এটি প্রমাণ করে যে, ১৯৫২ সালের আন্দোলনের মূল ভিত্তি এবং জনগণের অন্তরের গভীরতম আকাঙ্ক্ষাটি ছিল করাচি কিংবা কলকাতার পুঁজিবাদী ও শোষক ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে ইসলামের ইনসাফপূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং একটি সম্পূর্ণ বৈষম্যহীন ‘দারুল ইসলাম’ বা শান্তির রাজ্য সুপ্রতিষ্ঠিত করা।
ভাষা আন্দোলনের মূল ঈমানী স্পিরিট বনাম ছদ্ম-সেক্যুলার হাইজ্যাক
এই ঐতিহাসিক পত্রিকার পাতার ‘ভাষা আন্দোলনের গোড়ার কথা’ নামক পরিচ্ছেদটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পূর্ব বাংলার সংখ্যাগুরু মুসলমান জনসমষ্টি মায়ের ভাষার অধিকার রক্ষার এই সংগ্রামকে ইসলামের সেই চিরন্তন ন্যায়বিচার (আদল) এবং মদিনা সনদের সর্বজনীন বহুত্ববাদী আইনি দর্শনের আলোকেই অবলোকন করেছিলেন। তারা উর্দুর মতন একটি ভাষাকে জোরপূর্বক সবার ওপর চাপিয়ে দেওয়ার পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর এই একপেশে নীতিকে সরাসরি আল্লাহর দেওয়া লৌকিক ও প্রাক-আর্য ভাষার অধিকার হরণের শামিল তথা এক সুগভীর জুলুম হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। পূর্ব বাংলার মানুষের কাছে নিজের মাতৃভাষায় কথা বলার এবং সাহিত্য চর্চা করার অধিকার ছিল একটি ধর্মীয় আমানত, যা মুসলিম সুলতানদের সাড়ে পাঁচশো বছরের রাজকীয় সুরক্ষায় পুষ্ট হয়েছিল। সুতরাং, ১৯৫২ সালের ঢাকার রাজপথের প্রতিরোধ কোনো ধর্মহীন বা সেক্যুলার চেতনা থেকে আসেনি; বরং তা এসেছিল মুসলিমদের নিজস্ব আত্মপরিচয় ও ঈমানী স্পিরিটের গভীরতম উৎস থেকে, যেখানে অত্যাচারী সুলতানের সামনে দাঁড়িয়ে সত্য কথা বলাকেই সর্বোত্তম জিহাদ হিসেবে গণ্য করা হয়।
কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরিহাসটি ঘটে যখন এই মহান রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মূল ইসলামী ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র তৈরির স্পিরিটকে (যা এই প্রামাণ্য পত্রিকার পাতায় অকাট্যভাবে প্রমাণিত) পরবর্তীকালে রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতর লুকিয়ে থাকা দিল্লির এ দেশীয় দোসর ও ছদ্ম-সেক্যুলার এলিটরা সুপরিকল্পিতভাবে হাইজ্যাক করে ফেলে (আহমদ, আবুল মনসুর। বাংলাদেশের কালচার, আহমদ পাবলিশিং হাউস, পরিচ্ছেদ: ‘সংস্কৃতির রূপান্তর ও সংকট’, পৃষ্ঠা ৯৮)। তারা ভাষা আন্দোলনের এই খাঁটি গণমুখী ও ঈমানী রূপটিকে সাধারণ মানুষের নজর থেকে চিরতরে আড়াল করার জন্য এর ওপর ক্রমান্বয়ে এক কৃত্রিম, ছদ্ম-সেক্যুলার ও ব্রাহ্মণ্যবাদী আচারের ফ্যাসিবাদের মোড়ক জোরপূর্বক চাপিয়ে দিতে শুরু করে। তারা এমন এক প্রোপাগান্ডা আবহ তৈরি করে, যেন একুশে ফেব্রুয়ারি মানেই হলো—ইসলামী ঐতিহ্য বর্জন করে কলকাতার বাবুদের ড্রয়িংরুমের সংস্কৃতির দাসত্ব করা। এই কালচারাল হাইজ্যাকের মূল লক্ষ্যই ছিল তরুণ প্রজন্মকে তাদের আসল ইতিহাস থেকে সম্পূর্ণ অন্ধ করে রাখা। যাতে তারা কোনোদিন জানতে না পারে যে, এ দেশের ভাষা আন্দোলনের বিপ্লবী ঐতিহ্য আসলে একটি পুঁজিবাদমুক্ত ইনসাফের রাষ্ট্র ও ইসলামি সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পরম আকাঙ্ক্ষা ধারণ করত।
বদরুদ্দীন উমরের খতিয়ান: ঢাকাই মুসলিম রক্তের সংগ্রাম বনাম কলকাতার পুরোনো জাল
ভাষা আন্দোলনের এই উত্তাল দিনগুলোতে পূর্ব বাংলার ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের গতিপ্রকৃতি এবং এর বিপরীতে কলকাতার পুরোনো ব্রাহ্মণ্যবাদী বয়ানের ছদ্মবেশী অনুপ্রবেশের চরিত্রটি নিখুঁতভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছেন প্রখ্যাত রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঐতিহাসিক ড. বদরুদ্দীন উমর। তিনি তাঁর তিনখণ্ডে বিভক্ত প্রামাণ্যগ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির আন্দোলনটি ছিল সম্পূর্ণভাবে পূর্ব বাংলার নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার ফসল, যার সাথে কলকাতার কোনো দূরতম সম্পর্ক ছিল না (উমর, বদরুদ্দীন। পূর্ববাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি, আনন্দধারা, পরিচ্ছেদ: ‘একুশে ফেব্রুয়ারি ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম’, পৃষ্ঠা ১৪২)। কলকাতার বাবু সমাজ উনিশ শতকে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের মাধ্যমে যে ভাষাকে মুসলমানদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে নিজেদের ব্রাহ্মণ্যবাদী রাজনীতির খাসমহল বানিয়েছিল, ১৯৫২ সালে ঢাকার রাজপথে মুসলিম যুবকেরা নিজেদের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে সেই ভাষার ওপর থেকে উচ্চবর্ণের সেই কৃত্রিম ও একচেটিয়া মালিকানার জাল চিরতরে ছিন্ন করে দেন।
ড. বদরুদ্দীন উমর স্পষ্ট করে দেখিয়েছেন কীভাবে ঢাকার সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ, রিকশাচালক, নবাবপুরের ব্যবসায়ী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম ছাত্রসমাজ একতাবদ্ধ হয়ে করাচির স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। এটি ছিল মূলত বাংলা ভাষার ওপর থেকে সংস্কৃতায়নের শৃঙ্খল মুক্ত করে একে আবার সাধারণ মানুষের লৌকিক ও গণমুখী রূপের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার সংগ্রাম। কিন্তু এই বিজয়ের পরপরই কলকাতার পুরোনো বয়ানের ধারকেরা ছদ্মবেশে পূর্ব বাংলার বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে প্রবেশ করে এই রক্তের প্রকৃত মালিকানা হাইজ্যাক করার চক্রান্ত শুরু করে। যা এই মাটির আসল ভূমিপুত্রদের প্রকৃত সাংস্কৃতিক মুক্তির পথকে পুনরায় এক অবরুদ্ধ ও শ্বাসরুদ্ধকর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছিল (উমর, বদরুদ্দীন। পূর্ববাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি, পৃষ্ঠা ১৪৮)। এই সুগভীর চক্রান্তের পরবর্তী ও সবচেয়ে কুৎসিত ধাপগুলোই আজ আধুনিক সমাজে 'মঙ্গল শোভাযাত্রা' বা পৌত্তলিক আচারের ছদ্ম-সেক্যুলার রূপ পরিগ্রহ করে আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে গ্রাস করে চলেছে।


Post a Comment