Table of Contents
![]() |
তথ্য সমন্বয়, পাল্টা-গোয়েন্দাগিরি, প্রক্সি যুদ্ধ, Bayraktar TB2 এবং অপ্রতিসম কৌশলের মাধ্যমে হাকান ফিদানের নিরাপত্তা দর্শনের প্রতীকী উপস্থাপন |
Previous Part.......
পদ্ধতিগত সুরক্ষার অদৃশ্য প্রাচীর এবং খণ্ডিত করিডোর
জাতীয় নিরাপত্তা, পাল্টা-গোয়েন্দাগিরি কিংবা অপ্রতিসম যুদ্ধের গোলকধাঁধায় সবচেয়ে মারাত্মক আঘাতটি কখনো সীমান্ত পেরিয়ে বাইরে থেকে আসে না; সবচেয়ে গভীর ও রক্তক্ষয়ী ক্ষতটি তৈরি হয় তখন, যখন রাষ্ট্রের নিজস্ব নিরাপত্তা উইং বা সিস্টেমের ভেতরে এক ধরণের কাঠামোগত ফাটল ও তীব্র সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়। ড. হাকান ফিদান যখন তুরস্কের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এমআইটি-র সদর দপ্তরের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন, তখন তিনি এই চিরন্তন এবং কিছুটা রূঢ় সত্যটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার কাজে হাত দেন। তিনি খুব স্পষ্ট জানতেন যে, একটি দেশের বাহ্যিক নিরাপত্তা বা কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স ব্যবস্থা ততক্ষণ পর্যন্ত অপরাজেয় হয়ে উঠতে পারে না, যতক্ষণ না তার অভ্যন্তরীণ কাঠামোটি সম্পূর্ণ নিশ্ছিদ্র, লয়াল এবং ছদ্মবেশী শত্রু থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়। প্রথাগত ব্যুরোক্রেসি বা পুরাতন আমলাতান্ত্রিক মডেলগুলো সবসময় বাহ্যিক হুমকির দিকে এত বেশি ফোকাস রাখে যে, তাদের অজান্তেই সিস্টেমের ভেতরে এক ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক অন্ধত্ব বা ‘Institutional Blindness’-এর জন্ম হয়। ফিদান এই একমাত্রিক চিন্তার খোলস ভেঙে দিয়ে এমন একটি অদৃশ্য কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স প্রোটোকল তৈরি করেছিলেন, যা কোনো বাহ্যিক শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার আগে নিজের ঘরকে সম্পূর্ণ শুদ্ধ ও নিশ্ছিদ্র করতে বাধ্য করে (Atılır, A. 2018. "Türkiye'de İstihbarattan Sorumlu Kurumların Yapısı, Faaliyet Alanları, Aralarındaki Bilgi Paylaşımı ve Sorunların Belirlenmesi." Master's thesis, İstanbul Gelişim Üniversitesi, p. 15)।
কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স বা পাল্টা-গোয়েন্দাগিরির মূল মনস্তত্ত্ব হলো—প্রতিপক্ষের শক্তির সরাসরি মুখোমুখি না দাঁড়িয়ে, তার সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং গোপন দুর্বলতাগুলো খুঁজে বের করা এবং একই সাথে নিজের ভেতরের তথ্যের দেয়ালগুলো ভেঙে ফেলা।
আপাতদৃষ্টে প্রতিপক্ষের দেয়াল ভাঙাই যেখানে গোয়েন্দাগিরির মূল লক্ষ্য, সেখানে কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্সের ক্ষেত্রে ‘নিজের ভেতরের তথ্যের দেয়াল ভেঙে ফেলা’ এক গভীর আত্মশুদ্ধিমূলক ও প্রতিরক্ষামূলক কৌশল। এর প্রথম ও প্রধান উদ্দেশ্য হলো, নিজস্ব বিভিন্ন প্রশাসনিক বা গোয়েন্দা বিভাগের মধ্যে তথ্যের অতিরিক্ত গোপনীয়তা ও কৃত্রিম পৃথকীকরণ—যা 'কম্পার্টমেন্টালাইজেশন' নামে পরিচিত—তার দেয়ালটি উপড়ে ফেলা। তথ্যের এই অভ্যন্তরীণ দেয়ালগুলো ভেঙে যখন একটি সমন্বিত ও অবাধ প্রবাহ তৈরি করা হয়, তখনই কেবল সিস্টেমের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কোনো শত্রু বা তথ্য পাচারকারীকে (Mole) দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
দ্বিতীয়ত, এই প্রক্রিয়াটি প্রতিষ্ঠানের ভেতরের অতি-আত্মবিশ্বাস ও জড়তার দেয়ালকে গুঁড়িয়ে দেয়। নিজের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ নিশ্ছিদ্র—এমন অন্ধবিশ্বাস অনেক সময় এক ধরণের 'ইনস্টিটিউশনাল ব্লাইন্ডনেস' বা প্রাতিষ্ঠানিক অন্ধত্ব তৈরি করে। কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্সের মনস্তত্ত্ব এই প্রাতিষ্ঠানিক অন্ধত্বের দেয়াল ভেঙে নিজের সিস্টেমের সুপ্ত ফাঁকফোকরগুলো উন্মোচিত করে এবং তা সংস্কারের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের অনুপ্রবেশের পথ চিরতরে বন্ধ করে দেয়। এমনকি অনেক সময় কৌশলগত ছলাকলা বা 'ডিসিপশন অপারেশন'-এর অংশ হিসেবে নিজের তথ্যের দেয়ালকে ইচ্ছা করেই কিছুটা আলগা করে বা দুর্বল দেখিয়ে রাখা হয়; যেন সেই ফাঁক গলে ভেতরে আঘাত হানতে এসে প্রতিপক্ষ নিজেই পাল্টা-গোয়েন্দাদের পাতা ফাঁদে আটকা পড়ে। ফলে, পাল্টা-গোয়েন্দাগিরি কেবল প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার বাহ্যিক লড়াই নয়, বরং নিজের তথ্যের দেয়াল ভেঙে ও পুনর্গঠন করে পুরো সিস্টেমকে ভেতর থেকে নিশ্ছিদ্র ও অভেদ্য করে তোলার এক সূক্ষ্ম বুদ্ধিবৃত্তিক দর্শন।
হাকান ফিদান তাঁর মে ১৯৯৯ সালের বিলকেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক মাস্টার্স থিসিসেই স্পষ্ট করে তুলেছিলেন যে, একটি গোয়েন্দা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা তখনই ঘটে যখন বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ দপ্তরের মধ্যে তথ্যের কোনো প্রমিত আদান-প্রদান বা সুনির্দিষ্ট সমন্বয় ইউনিট থাকে না, যা অনিবার্যভাবে এজেন্সির পণ্যের বস্তুনিষ্ঠতাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয় এবং রাষ্ট্রের সুরক্ষায় এক মারাত্মক ফাটল বা নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করে (Fidan, Hakan. May, 1999. "Intelligence and Foreign Policy: A Comparison of British, American and Turkish Intelligence Systems." Master's Thesis, Institute of Economics and Social Sciences, Bilkent University, Ankara, p. 18). এই প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতার সুযোগ নিয়েই মূলত বিদেশি পরাশক্তি বা তাদের অর্থায়নে পুষ্ট প্রক্সি গ্রুপগুলো সিস্টেমের ফাঁক গলে রাষ্ট্রের মূল নীতিনির্ধারক কেন্দ্রে আঘাত হানার সুযোগ পায়। এই কারণেই ফিদান এমন এক বহুমাত্রিক এবং অপ্রতিসম কৌশলের প্রবর্তন করেন, যা শত্রুর আক্রমণের জন্য অপেক্ষা করে না; বরং শত্রুর মগজে যখন কোনো নাশকতার ছক জন্ম নেয়, ঠিক সেই মুহূর্তেই তার লজিস্টিক ও মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তিকে ম্যাপ করে তার চাল মাঝপথে কেটে দিতে পারে।
আঙ্কারার অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং ৩২৯ জন এজেন্টের ট্র্যাজেডি
২০১০ সালের শেষের দিকের একটি থমথমে রাত। আঙ্কারার এমআইটি সদর দপ্তরের একটি উচ্চসুরক্ষিত বন্ধ কক্ষে তখন জ্বলছিল নিভু নিভু আলো। হাকান ফিদান তাঁর টেবিলের ওপর রাখা একটি বিশেষ গোয়েন্দা ডায়েরির দিকে তাকিয়ে ছিলেন, যেখানে তুরস্কের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা উইংগুলোর মধ্যে চলমান এক নীরব ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের খুঁটিনাটি নথিবদ্ধ ছিল।
তৎকালীন তুর্কি মডেলে পুলিশ গোয়েন্দা বিভাগ (IDB) এবং জেন্ডারমারি গোয়েন্দা বিভাগের (JIB) কাজের আইনি পরিধি সুনির্দিষ্ট না থাকার কারণে তাদের মধ্যে প্রায়শই ক্ষমতার এক মারাত্মক দ্বন্দ্ব বিরাজ করত। জেন্ডারমারি—তুরস্কের একটি আধাসামরিক বাহিনী, যারা গ্রামীণ এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করত এবং সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে সক্রিয় ছিল। আর পুলিশ গোয়েন্দা বিভাগ ছিল শহরাঞ্চলের নিরাপত্তার দায়িত্বে। আইনের অস্পষ্টতা এই দুই সংস্থাকে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলেছিল—একই তথ্য নিয়ে তারা আলাদা আলাদা কাজ করত, কখনও কখনও একে অপরের গোপন অভিযান বানচাল করত।
এই প্রাতিষ্ঠানিক সংঘাতের সবচেয়ে ভয়াবহ ও কালো অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল "এরগেনেকন" ট্রায়ালের দিনগুলোতে, যখন পুলিশ গোয়েন্দা সংস্থা জেন্ডারমেরির ৩২৯ জন গোপন মাঠপর্যায়ের এজেন্টের নাম—যারা মূলত তুরস্কের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে পিকেকে-র বিরুদ্ধে তথ্য সংগ্রহ করতেন—কোনো রকম স্ক্রিনিং বা নিরাপত্তা ফিল্টার ছাড়াই সরাসরি আদালতের পাবলিক নথিতে অন্তর্ভুক্ত করে দেয় (Atılır, 2018, p. 16)। এই ৩২৯ জন এজেন্ট ছিলেন সমাজের নানা স্তরের সাধারণ মানুষ—৫৭ জন গ্রাম প্রধান, ৬৯ জন কৃষক, স্বর্ণকার, বিশ্ববিদ্যালয় কর্মচারী, অটো মেকানিক, মুদি দোকানদার, এমনকি মুফতি বিভাগের কর্মচারীও। তাদের প্রত্যেকেই গোপনে রাষ্ট্রের হয়ে কাজ করতেন, নিজেদের ও পরিবারের পরিচয় গোপন রেখে।
কিন্তু পুলিশ গোয়েন্দা বিভাগ—যারা এরগেনেকন মামলার তদন্তে জেন্ডারমারির কম্পিউটার জব্দ করেছিল—সেখান থেকে একটি গোপন তালিকা উদ্ধার করে। সেই তালিকায় ছিল ৩২৯ জন এজেন্টের নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর, গাড়ির নম্বর, পেশা এবং এমনকি তাদের স্ত্রী ও সন্তানদের বিস্তারিত তথ্য। কোনো প্রকার সেন্সরশিপ বা গোপনীয়তা রক্ষা না করেই তারা এই তালিকা আদালতের অভিযোগপত্রের পাবলিক নথির সাথে যুক্ত করে দেয়। একবার তা পাবলিক নথির অংশ হয়ে গেলে, সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হয়ে যায় এবং পুরো তালিকা জনসমক্ষে চলে আসে।
এই একটিমাত্র মারাত্মক ভুলের কারণে ছায়ার জগতের সেই ৩২৯ জন অপারেটিভের আসল পরিচয় এক রাতে সাধারণ মানুষের সামনে সম্পূর্ণ উন্মোচিত হয়ে পড়ে, যা ছিল কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্সের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন প্রাতিষ্ঠানিক দেউলিয়াত্ব।
ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের ভেতর প্রবেশ করলেন ফিদানের একজন অত্যন্ত বিশ্বস্ত কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স অফিসার। তাঁর মুখাবয়ব শীতে জমে থাকা বরফের চেয়েও বেশি বিবর্ণ দেখাচ্ছিল। তিনি টেবিলে একটি এনক্রিপ্টেড ফাইল রাখলেন—ভেতরে কেসিকে (KCK) ট্রায়ালের সময় আন্ডারকাভার এজেন্টদের ফাঁসের বিবরণ।
"তারা আমাদের আন্ডারকাভার নেটওয়ার্ক পুরোপুরি এক্সপোজড করে দিয়েছে, স্যার," অফিসারের কণ্ঠস্বর এক তীব্র উৎকণ্ঠায় কাঁপছিল। "সরকারি প্রসিকিউটরদের চরম অসচেতনতা এবং আইনি ভুলের কারণে আদালতের ফাইলের মাধ্যমে আমাদের বেশ কয়েকজন এজেন্টের ছদ্মবেশ, প্রক্সি গ্রুপগুলোর কাছে চলে গেছে।"
ফিদান এক সেকেন্ডের জন্যও প্যানিক বা উত্তেজিত হলেন না। তাঁর চোখের মণিতে কোনো রাগ বা ক্ষোভ প্রকাশ পেল না—শুধু এক ক্লান্ত বাস্তববাদ। কারণ, রাষ্ট্র যখন দেশের ভিতরে থাকা বিদেশি দালালদের, তার ভিতরের শত্রুদের শক্তহাতে দমন করার পরিবর্তে লালল-পালন করে, তাদের কর্মকাণ্ড ফাংশন করতে দেয়, এবং রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানের মধ্যে থাকে সমন্বয়হীনতা, কাঠামোগত বিশৃঙ্খলা এবং নড়বড়ে ও ভঙ্গুর অবস্থা; তখন এটা হবারই ছিলো। তাই তিনি যেনো এরজন্য প্রস্তুতই ছিলেন। খুব শান্ত অথচ ধীর স্বরে অফিসারকে জিজ্ঞেস করলেন, "মাঠপর্যায়ের সর্বশেষ পরিস্থিতি কী?"
"পরিচয় প্রকাশ পেয়ে যাওয়ায় মাঠপর্যায়ের কমপক্ষে ১০ জন এমআইটি এজেন্টকে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো নির্মমভাবে হত্যা করেছে, স্যার," অফিসার মাথা নিচু করে বললেন। "আর যারা বেঁচে আছে, তাদের প্রত্যেকেই এখন হুমকির মুখে। তারা জানেন না, পরবর্তী শিকার কে হবে।"
ফিদান চোখের পলক ফেললেন না। তিনি শান্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন, "এই ফাঁস কীভাবে সম্ভব হলো?"
"স্যার, তদন্তকারী প্রসিকিউটররা—যারা পরবর্তীতে FETO সদস্য হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন—ইচ্ছাকৃতভাবে এই গোপন তালিকা আদালতের পাবলিক নথিতে অন্তর্ভুক্ত করে দিয়েছেন," অফিসার জানালেন। "এটি কোনো সাধারণ ভুল ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক ধ্বংস করার একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। FETO-র এই কুম্পাসের মাধ্যমে তারা আমাদের আন্ডারকাভার এজেন্টদের সরাসরি শত্রুর হাতে তুলে দিয়েছে।"
ঘরের ভেতরের পরিবেশ তখন এক রুদ্ধশ্বাস ও তীব্র মনস্তাত্ত্বিক চাপে জমে গেল। ফিদান জানতেন—শুধু তথ্য ফাঁসই নয়; FETO রাষ্ট্রের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ককে শত্রুর হাতে তুলে দিয়েছিল—এবং শত্রু তা কাজে লাগিয়েছিল।
ফিদান ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে আছেন। নিজের চোখের সামনে নিজের এজেন্টদের এই নির্মম ট্র্যাজেডি প্রত্যক্ষ করছিলেন। তিনি ভালো করেই বুঝতে পারলেন, এই অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ ও তথ্যের দেয়াল (Information Silos) বন্ধ না করলে রাষ্ট্রকে কখনোই পরাশক্তিদের কাতারভুক্ত করা সম্ভব নয়। তিনি কোনো হুজুগে প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে এরদোয়ানের সরাসরি বিশেষ আইনি ডিক্রির মাধ্যমে সমস্ত অভ্যন্তরীণ দপ্তরের র ডাটা এক ছাতার নিচে এনে একটি সমন্বিত কেন্দ্রীয় ইন্টেলিজেন্স কোঅর্ডিনেট ইউনিট গঠন করেন, যা অন্যান্য দপ্তরের কর্মকর্তাদের তথ্যের দেয়াল তৈরি করার ক্ষমতা চিরতরে কেড়ে নেয় এবং সিস্টেমকে সম্পূর্ণ নিশ্ছিদ্র ও সুরক্ষিত করে তোলে (Atılır, 2018, p. 17)।
কামিশলির গোপন চুক্তি এবং প্রক্সি যুদ্ধক্ষেত্রের আসল সমীকরণ
অভ্যন্তরীণ সিস্টেমকে সম্পূর্ণ শুদ্ধ ও লয়াল করার পর হাকান ফিদান তাঁর এই অপ্রতিসম যুদ্ধকৌশলটি সরাসরি প্রয়োগ করেন তুরস্কের দক্ষিণ সীমান্ত সংলগ্ন মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত যুদ্ধক্ষেত্রগুলোতে। ২০১২ সালের ১৭ই মার্চ সিরিয়ার কামিশলি (Qamishli) অঞ্চলের একটি অন্ধকার গোপন বাঙ্কারে বাশার আল-আসাদের বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থা এবং কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী পিকেকে (PKK) নেতৃত্বের মধ্যে একটি অত্যন্ত গোপন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল তুরস্কের দক্ষিণ সীমান্তে একটি স্থায়ী 'সন্ত্রাস করিডোর' খাড়া করে আঙ্কারার অর্থনীতি ও স্থিতিশীলতা ধসিয়ে দেওয়া (Hovsepyan, L., & Manukyan, T. (2022). Turkish Domestic Factors and Ankara's Military Operations in Syria: Kurdish Threat and Expansionist Ambitions. Contemporary Eurasia, 11(2), 5-21)।
ফিদান যখন এই গোপন চুক্তির রিয়েল-টাইম ডাটা আঙ্কারার কমান্ড সেন্টারের স্ক্রিনে দেখতে পান, তখন তিনি প্রথাগত সম্মুখ যুদ্ধ বা বিশাল সামরিক ব্যাটালিয়ন নিয়ে পাহাড়ি অভিযানে নামার পুরাতন ও সেকেলে পদ্ধতিটি সম্পূর্ণ বর্জন করেন। তিনি তাঁর হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স (HUMINT) এবং সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে শত্রুর ফ্রন্টলাইনের যোদ্ধাদের উপেক্ষা করে, তাদের পেছনের ফাইন্যান্সিয়াল সাপ্লাই চেইন এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়নের গোপন নোডগুলো ম্যাপ করতে শুরু করেন (Hovsepyan & Manukyan, 2022, pp. 13-14)।
ফিদানের টিম প্রায় ৮৬ বিলিয়ন ডলারের এই আর্থিক ইকোসিস্টেমের প্রতিটি স্তর উন্মোচিত করতে থাকে। তারা চিহ্নিত করে—ড্রাগ ট্রাফিকিং, মানি লন্ডারিং, এবং জোরপূর্বক আদায় করা "কোয়ারশন ফি"—যা পিকেকের আয়ের প্রধান উৎস। মৌসুমি শ্রমিকদের ২৫% বেতন থেকে শুরু করে রিয়েল এস্টেট এজেন্টদের ৫০% কমিশন—এই অর্থের প্রতিটি ফোঁটা কুরিয়ার, হাওয়ালা ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন নোডে পৌঁছাচ্ছিল (Türkiye Today. (2025, July 16). FATF Report details PKK terrorist financing through extortion, diaspora campaigns.)।
কিন্তু ফিদান সেখানে থামেননি। তিনি আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোকে তাঁর প্রধান অস্ত্রে পরিণত করেন। FATF-এর রিপোর্ট ও জাতিসংঘের সন্ত্রাসবিরোধী রেজুলেশন (UN Resolution 1373) ব্যবহার করে তিনি পিকেকের অর্থায়ন নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞার একটি জাল তৈরি করেন (The Washington Institute for Near East Policy. (2023, July 13). Hakan Fidan and the New Turkish Diplomacy in Iraq)। সুইডেনের ব্যাংকিং খাত থেকে শুরু করে ইউরোপের একাধিক দেশ—যেখানে পিকেকের অর্থের গোপন আস্তানা ছিল—সেখানে আন্তর্জাতিক চাপের মাধ্যমে অ্যাকাউন্টগুলো ফ্রিজ করা হয়।
শত্রুর অর্থনৈতিক ফুসফুস যখন একে একে স্তব্ধ হতে থাকে, তখন সরাসরি কোনো বড় সামরিক সংঘাত ছাড়াই তাদের পুরো সিস্টেম ভেতর থেকে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে শুরু করে। অস্ত্র কেনার টাকা নেই, যোদ্ধাদের বেতন দেওয়া যায় না, লজিস্টিক সাপ্লাই চেইন থেমে যায়। ফিদান প্রমাণ করেছিলেন—সরাসরি যুদ্ধের চেয়ে শত্রুর মানিব্যাগ ধ্বংস করা বেশি কার্যকর (Yeni Şafak. (2026, March 25). Terörsüz Türkiye'de yeni aşama: Küresel finans ağı tasfiye edilecek)।
এই প্রো-অ্যাকটিভ ও ডাটানির্ভর প্রোটোকলই আঙ্কারাকে আধুনিক বিশ্বমঞ্চের একটি অন্যতম স্বাধীন পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। যা একজন সাধারণ লিডারের জন্য নিজের ক্যারিয়ার বা কুশলী অঙ্গনে তীব্র প্রতিকূলতা এড়িয়ে নিজের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার এক অসামান্য মানসিক শক্তি ও আত্মবিশ্বাস উপহার দেয় (Hovsepyan & Manukyan, 2022, pp. 13-14)।
বায়রাক্তারের আকাশ ও অলিখিত যুদ্ধের ডকট্রিন
২০১৬ সালের মে মাসের একটি গুমোট রাত। আঙ্কারার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভূগর্ভস্থ ওয়ার রুমে এয়ার কন্ডিশনারের একটানা গুঞ্জন ছাড়া আর কোনো শব্দ ছিল না। হাকান ফিদান একটি দীর্ঘ আয়তাকার টেবিলের এক প্রান্তে স্তব্ধ হয়ে বসে ছিলেন। তাঁর সামনে রাখা বিশাল ডিজিটাল স্ক্রিনে দক্ষিণ সীমান্তের একটি লাইভ ইনফ্রারেড ম্যাপ জ্বলজ্বল করছিল, যেখানে বাশার আল-আসাদের অনুগত বাহিনী এবং সিরিয়ান কুর্দি মিলিশিয়াদের মুভমেন্ট লাল বিন্দুর মতো ভেসে উঠছিল। টেবিলের অপর প্রান্তে তুর্কি সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব জেনারেল হুলুসি আকার এবং স্পেশাল ফোর্সের প্রধান মেজর জেনারেল জেকাই আকসাকাল্লিসহ কয়েকজন সিনিয়র জেনারেল গম্ভীর মুখে খসড়া ফাইলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। এর ঠিক কয়েক দিন আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিল, তারা ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দোহাই দিয়ে সিরিয়ার কুর্দি যোদ্ধাদের (YPG) ভারী সাঁজোয়া যান এবং আধুনিক অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইল সরবরাহ করতে যাচ্ছে—যা ছিল আঙ্কারার জাতীয় নিরাপত্তার রেড-লাইনের ওপর এক চরম প্রকাশ্য চাবুক (Hovsepyan, L., & Manukyan, T. 2022. "Turkish Domestic Factors and Ankara's Military Operations in Syria: Kurdish Threat and Expansionist Ambitions." Contemporary Eurasia, Vol. 11, No. 2, pp. 5-13)।
"মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই বিমান সরবরাহের পর কুর্দিরা অলরেডি ইউফ্রেটিস নদীর পশ্চিম তীরে আমাদের বর্ডার নোডগুলোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে, জনাব ফিদান," জেনারেল হুলুসি আকার তাঁর হাতের কলমটি টেবিলের ওপর ঠুকে কিছুটা ক্ষুব্ধ স্বরে বললেন। "আমাদের প্রথাগত ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটালিয়নগুলো যদি এখনই সীমান্তে সম্মুখ প্রতিরোধ গড়ে না তোলে, তবে এক সপ্তাহের মধ্যে তারা পুরো সীমান্ত বরাবর একটি সংযুক্ত করিডোর তৈরি করে ফেলবে"।
ঘরের ভেতরের উত্তাপ তখন কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সব দেয়াল ভেঙে এক চরম সংবেদনশীলতায় রূপ নিচ্ছিল। কিন্তু হাকান ফিদান বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না। তিনি সোজা হয়ে বসে রইলেন নিশ্চল পাথরের মতো। তাঁর চোখের মণি চিরচেনা সেই অপলক ও ভাবলেশহীন নিবদ্ধ করে আছেন জেনারেল আকারের প্রতি। তারপর শান্তভাবে, দৃঢ়চিত্তে ফিদান যখন নীরবতা ভাঙলেন, তখন তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল বরফের মতো শীতল অথচ ধারালো তরবারির মতো তীক্ষ্ণ। তিনি খুব ধীর স্বরে বললেন, "জেনারেল আকার, আপনি যদি আপনার বিশাল ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটালিয়ন নিয়ে পাহাড়ি অঞ্চলে সম্মুখ যুদ্ধে নামেন, তবে আপনি সিআইএ এবং আসাদের পাতা ফাঁদের ভেতর সরাসরি হেঁটে ঢুকবেন। প্রক্সি ওয়ারফেয়ারের এই রিয়েল-টাইম খেলায় আমাদের শত্রুর শক্তির জায়গায় আঘাত করা যাবে না। আমাদের আঘাত করতে হবে তার সবচেয়ে অরক্ষিত এবং অদৃশ্য লজিস্টিকস নোডগুলোতে"। তিনি টেবিলের ওপর তাঁর ব্যক্তিগত ডিভাইসটি অন করলেন। স্ক্রিনে ভেসে উঠল তুরস্কের নিজস্ব তৈরি একটি উন্নত ড্রোন প্রোটোটাইপের টেকনিক্যাল ডেটা—Bayraktar TB2।
"আমরা সীমান্তে কোনো সাধারণ সৈন্য পাঠিয়ে শক্তি অপচয় করব না," ফিদান জেনারেলদের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন। "আমরা এই ড্রোনের সাহায্যে আকাশের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেব। আমাদের কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স টিম অলরেডি সমাজবিজ্ঞানী ও স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের ডেটা ব্যবহার করে কুর্দি মিলিশিয়াদের পেছনের মূল লজিস্টিক ও অর্থনৈতিক নোডগুলো ম্যাপ করে ফেলেছে। ড্রোনের নিখুঁত স্থানাঙ্ক বা কোঅর্ডিনেটসের সাহায্যে আমরা তাদের সম্মুখ বাহিনীকে অবশ করে দেব, কোনো বড় শোরগোল বা প্রকাশ্য যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়াই"।
জেনারেল আকার ফিদানের চোখের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, এই শান্ত একাডেমিশিয়ানের বুদ্ধিবৃত্তিক ডকট্রিন প্রথাগত সামরিক চিন্তার চেয়ে বহুগুণ বেশি বিধ্বংসী। তিনি খসড়া ফাইলে নিজের সই করে দিয়ে খুব মৃদু স্বরে বললেন, "আপনার এই অলিখিত ডকট্রিন যদি মাঠে ফেইল করে, হাকান, তবে তার মাশুল পুরো রাষ্ট্রকে দিতে হবে"।
ফিদান চোখের পলক ফেললেন না। তিনি খুব শান্তভাবে উত্তর দিলেন, "ইতিহাস সবসময় বিজয়ীদের পক্ষে লেখা হয়, জেনারেল। আর বিজয়ী হতে হলে আমাদের নিজেদের শর্তেই যুদ্ধক্ষেত্রের মানচিত্র পুনর্গঠন করতে হবে" (Hovsepyan, L., & Manukyan, T. 2022. "Turkish Domestic Factors and Ankara's Military Operations in Syria: Kurdish Threat and Expansionist Ambitions." Contemporary Eurasia, Vol. 11, No. 2, pp. 13-14)।
ওসলোর ছায়া এবং ইউরোপের ব্যাংকিং করিডোর
এই রুদ্ধদ্বার বৈঠকের এক সপ্তাহের মধ্যেই হাকান ফিদানের তৈরি করা অপ্রতিসম কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স ব্লুপ্রিন্ট মাঠে সম্পূর্ণ সক্রিয় হয়ে ওঠে। তিনি তাঁর কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স অপারেটিভদের নির্দেশ দেন সরাসরি অস্ত্রের লড়াইয়ে শক্তি অপচয় না করে, প্রতিপক্ষের সবচেয়ে মূল্যবান এবং অরক্ষিত অর্থনৈতিক করিডোরগুলোতে আঘাত হানতে। এমআইটি-র ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালিস্টরা সম্পূর্ণ রাডারের নিচে থেকে ইউরোপের বিভিন্ন ব্যাংকিং চ্যানেলে ও সুইজারল্যান্ডের ভেন্যুতে লুকিয়ে থাকা ওই বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর গোপন অর্থ রুট এবং তেলের চোরাচালানের নোডগুলো এক এক করে ম্যাপ করতে শুরু করেন (Tremblay, P. (2016, February 1). Turkey plans shiny new HQ for shadowy intelligence operations. Al-Monitor)।
কয়েক দিনের রুদ্ধশ্বাস সাইবার অপারেশনের মাধ্যমে তুর্কি ইন্টেলিজেন্স ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি নির্দিষ্ট ব্যাংকিং নোড আন্তর্জাতিক আইনি ফ্রেমওয়ার্কের সাহায্যে অবশ বা ফ্রিজ করে দিতে সক্ষম হয়। প্রক্সি নেটওয়ার্কগুলো যখন তাদের অর্থনৈতিক ফুসফুস হারিয়ে তীব্র সংকটে পড়ে এবং নিজেদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল সামলাতে ছটফট করতে থাকে, ফিদান ঠিক সেই মুহূর্তে উত্তর সিরিয়ার ইউফ্রেটিস নদীর পশ্চিম তীরে বায়রাক্তার ড্রোনের নিখুঁত রিয়েল-টাইম ফুটেজ ব্যবহার করে তাদের ফ্রন্টলাইনের কমান্ডোদের যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেন। সরাসরি কোনো বড় সামরিক সংঘাত ছাড়াই শত্রুর পুরো সিস্টেমকে ভেতর থেকে ধসিয়ে দেওয়ার এই অপ্রতিসম কৌশলই তুরস্কের জাতীয় নিরাপত্তা প্রাচীরকে নিশ্ছিদ্র করে তোলে, যা ছিল আধুনিক বিশ্বমঞ্চে গোয়েন্দা কূটনীতির এক নজিরবিহীন কৌশলগত প্রদর্শনী (Shurupova, Viktoriia. 2025. "Turkish Multidimensional Strategy; Israel/Palestine in Specific." VIIMES Research Paper, Vienna, pp. 63-66)। এই নিখুঁত ও সমান্তরাল পরিকল্পনার কারণেই পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর বিপুল পরিমাণ লজিস্টিক সাপোর্ট থাকা সত্ত্বেও ওই বিচ্ছিন্নতাবাদী মিলিশিয়ারা তুরস্কের দক্ষিণ সীমান্তে তাদের কাঙ্খিত ‘সন্ত্রাস করিডোর’ খাড়া করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়।
প্রতিপক্ষ যখন বুঝতে পারল যে তারা একটি ফাঁকা অবান্তর জায়গাকে কেন্দ্র করে নিজেদের সমস্ত সামরিক সম্পদ অপচয় করে ফেলেছে, ততক্ষণে ফিদানের আন্ডারকাভার টাস্কফোর্স সম্পূর্ণ ভিন্ন দিক থেকে এসে তাদের মূল লক্ষ্য হাসিল করে সম্পূর্ণ রাডারের নিচ দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়—যেন তারা কখনো ছিলই না। (Fidan, H. (2023). Turkish Foreign Policy at the Turn of the 'Century of Türkiye': Challenges, Vision, Objectives, and Transformation. Insight Turkey, 25(3), 11-25)।
দামেস্কের ছায়া এবং বাফার জোনের কৌশলগত স্থিতিশীলতা
সিরিয়া সংকটের পরবর্তী বছরগুলোতে তুরস্কের দক্ষিণ সীমান্তে যখন অপ্রতিসম যুদ্ধের সমীকরণটি আরও জটিল রূপ ধারণ করে, তখন আঙ্কারার কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স ডকট্রিনটি কেবল ফ্রন্টলাইনের লজিস্টিকস অবরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। হাকান ফিদান তাঁর কর্মকর্তাদের সবসময় একটি মৌলিক মনস্তাত্ত্বিক সত্য মনে করিয়ে দিতেন—গোয়েন্দা কার্যক্রমের মূল লক্ষ্যই হলো রাজনৈতিক ও সামরিক অনিশ্চয়তা কমানো; কারণ যে দেশ যত বেশি তার প্রতিপক্ষের সক্ষমতা ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারে, তত বেশি সে যুদ্ধ ও ভুল সিদ্ধান্ত এড়াতে পারে (Fidan, 1999, p. 41)।
এই প্রাগম্যাটিক বা বাস্তবমুখী চিন্তার আলোকেই তুরস্ক উত্তর সিরিয়ার আল-বাব এবং জারাবলুস অঞ্চলে প্রথাগত ডিক্রি জারির পরিবর্তে স্থানীয় সুরক্ষার এক অভূতপূর্ব বাফার জোন গড়ে তোলে। আর্মেনিয়ার ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের ২০২২ সালের বিশেষ আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক জার্নালে ড. লেভন হোভসেপিয়ান উল্লেখ করেন যে, হাকান ফিদান সীমান্তে কেবল সামরিক চৌকি বসানোর পুরাতন অভ্যাস বর্জন করে সেখানে সমাজবিজ্ঞানীদের দেওয়া ডেটা অনুযায়ী প্রায় ৭০০টি স্কুল পুনর্নির্মাণ এবং গাজীআন্তেপ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম চালু করেন (Hovsepyan & Manukyan, 2022, p. 14)।
এই ধরণের সফট পাওয়ার এবং হাই-টেক সার্ভেইলেন্সের সমন্বিত ইকোসিস্টেমের কারণে বাইরের কোনো পরাশক্তি বা তাদের অর্থায়নে পুষ্ট বিচ্ছিন্নতাবাদী মিলিশিয়ারা ওই বাফার জোনের ভেতর নতুন কোনো নাশকতার ছক কাটার ন্যূনতম সুযোগও পায়নি। বাস্তব সময়ের এই খেলাটি আরও বড় এক ভূরাজনৈতিক মোড় নেয় যখন ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সিরিয়ার শাসনকাঠামোতে আকস্মিকভাবে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে এবং বাশার আল-আসাদের পতনের পর দামেস্কে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসে (Shurupova, 2025, p. 74)। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে চলা গৃহযুদ্ধের পর বাশার আল-আসাদের পতনের নেপথ্যে আঙ্কারার যে ছায়ার আড়ালের দীর্ঘমেয়াদী কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স ব্লুপ্রিন্ট কাজ করেছিল, তা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে হাকান ফিদানের কৌশলগত মেধার এক অবিচ্ছেদ্য স্বাক্ষর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়।
কিন্তু এই ব্লুপ্রিন্টের সবচেয়ে নিখুঁত ও অদৃশ্য অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল ডিজিটাল যুদ্ধক্ষেত্রে—একটি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের ভেতর, যার নাম ছিল "STFD-686"। ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে, আসাদ সরকারের পতনের প্রায় পাঁচ মাস আগে, সিরিয়ার সেনা অফিসারদের মধ্যে 'STFD-686' (Syria Trust for Development) নামে এই অ্যাপ্লিকেশনটি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। অ্যাপটিকে ফার্স্ট লেডি আসমা আল-আসাদের সমর্থিত একটি মানবিক উদ্যোগ হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল। এর লোগো, ডোমেইন, এমনকি নামকরণও ছিল আসমা আল-আসাদের রিয়েল ফাউন্ডেশনের হুবহু অনুকরণ (Al Jazeera, ২০২৫; Euronews, ২০২৫)। সৈন্যদের প্রতি মাসে ৪০০,০০০ সিরিয়ান পাউন্ড (প্রায় ৪০ ডলার) আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। দশ বছরের গৃহযুদ্ধে জর্জরিত সিরিয়ান সেনাবাহিনীর সৈন্যরা, যাদের মাসিক বেতন তখন মাত্র ২০ ডলারে নেমে এসেছিল, এই প্রস্তাবকে অস্বীকার করার মতো অবস্থায় ছিল না (Gigazine, ২০২৫)।
অ্যাপটির পেছনের অপারেটররা সৈন্যদের কাছ থেকে নাম, জন্ম তারিখ, পরিবারের আকারের পাশাপাশি সামরিক পদবী, ইউনিটের নাম, মোতায়েনের স্থানাঙ্ক এবং কমান্ড চেইনের তথ্য সংগ্রহ করতে থাকে। অ্যাপটি ইনস্টল হওয়ার সাথে সাথেই 'Spy Max' নামের স্পাইওয়্যার সক্রিয় হয়ে যেত—এটি অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইসের জন্য তৈরি একটি রিমোট অ্যাক্সেস ট্রোজান (RAT), যা অপারেটরদের সৈন্যদের ফোন কল, ফাইল, ছবি, ক্যামেরা, মাইক্রোফোন এমনকি রিয়েল-টাইম লোকেশন পর্যন্ত সম্পূর্ণ অ্যাক্সেস দিত (CisoClub, ২০২৫; Caliber.Az, ২০২৫)। ফেসবুক ইন্টিগ্রেশনের মাধ্যমে সোশ্যাল গ্রাফ ও প্রাইভেট মেসেজও সংগ্রহ করা হতো।
এই তথ্য ব্যবহার করে জুলানি বাহিনী সিরিয়ান সেনাবাহিনীর দুর্বল পয়েন্টগুলোর ডিজিটাল মানচিত্র পায়। এর ফলে দূরবর্তী ইউনিটগুলোকে বিচ্ছিন্ন ও সরবরাহবিহীন করা হয়, উচ্চপদস্থ অফিসারদের আদেশ আটকানো বা বাতিল করা হয়, এবং আলেপ্পোর পুরো প্রতিরক্ষা লাইন ভেঙে পড়ে। এই সাইবার অপারেশনটির পেছনে কে ছিল—এটি এখনও সম্পূর্ণ নিশ্চিত নয়। অ্যাপটির একটি ব্যাকএন্ড ডোমেইন "মার্কিন সার্ভারে" হোস্ট করা ছিল, যা ওয়াশিংটনের দিকে ইঙ্গিত করতে পারে। কিন্তু এটি বিভ্রান্তিকর 'ফলস ফ্ল্যাগ'ও হতে পারে। সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মত হলো—এটি একটি মাল্টি-অ্যাক্টর অপারেশন ছিল। যেখানে স্থানীয় বিরোধী গোয়েন্দা, আঞ্চলিক সম্পদ এবং বিদেশি সাইবার দক্ষতা একত্রিত হয়েছিল (Nouvel Hay, ২০২৫)।
তবে অপারেশনটির নকশা ও বাস্তবায়নের পদ্ধতি—প্রতিপক্ষের অর্থনৈতিক দুর্বলতাকে কাজে লাগানো, সফটওয়্যারের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ, এবং তারপর সেই তথ্যকে অস্ত্রে পরিণত করা—হাকান ফিদানের গোয়েন্দা দর্শনের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়। এটি ফিদানের "রাজনৈতিক ও সামরিক অনিশ্চয়তা কমানো"-র থিসিসের এক অত্যাধুনিক প্রয়োগ। যেখানে শত্রুর অর্থনৈতিক ফুসফুসকে কাজে লাগিয়ে তার পুরো কমান্ড স্ট্রাকচারকে ভেতর থেকে ধসিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
জার্মান-তুর্কি সংবাদমাধ্যম নেক্সট টোয়েন্টিফোর নিউজ-এর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের বিশেষ পলিটিক্যাল ফোকাসে উল্লেখ করা হয় যে, দামেস্কের নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পুরো মিডিয়া কন্ডাক্ট, তাদের প্রথম কূটনৈতিক বিবৃতি এবং ভূরাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণের প্রতিটি ক্ষেত্রে হাকান ফিদানের সুনির্দিষ্ট ছক এবং অ্যাডভাইস পর্দার আড়াল থেকে সুনিপুণ রোডম্যাপ হিসেবে কাজ করেছিল (nex24.news, ২০২৬)। এই অভূতপূর্ব পারসেপশন কন্ট্রোলের ফলেই আঙ্কারা তার দক্ষিণ সীমান্তের চিরস্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ইরাক ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের লজিস্টিকস করিডোরে নিজের একক আধিপত্য অক্ষুণ্ণ রাখতে সক্ষম হয়। যা প্রমাণ করে যে, একটি সুসংগঠিত কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্ক (পাল্টা-গোয়েন্দা জাল) কীভাবে শুধু নিজের দেশের সীমানাই রক্ষা করে না, বরং প্রতিবেশীর ঘরের ভেতরের ইতিহাসকেও নিজের জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে সম্পূর্ণ পুনরুদ্ধার করতে পারে।
ভিয়েনার আন্তর্জাতিক ইনস্টিটিউটের ২০২৫ সালের বিশেষ গবেষণা প্রতিবেদনে ভিক্টোরিয়া শুরূপোভা উল্লেখ করেন যে, হাকান ফিদানের কাজের ধারায় 'কৌশলগত নীরবতা' এবং আবেগহীন শারীরিক ভাষা প্রতিপক্ষের অবচেতন মনে এক তীব্র অনিশ্চয়তার জন্ম দেয়—কারণ তারা জানত যে এই শান্ত মানুষের স্থির চেহারার পেছনে সবসময় একটি বিকল্প পরিকল্পনা প্রস্তুত থাকে (Shurupova, ২০২৫, p. ২৪)। এই শীতল ও বাস্তবভিত্তিক শৈলীর কারণেই আন্তর্জাতিক আলোচনার টেবিলে আঙ্কারা কখনো নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেনি। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের আগে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা দেন যে, ওয়াশিংটন তুরস্কের ওপর আরোপিত CAATSA নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে এবং F-35 যুদ্ধবিমান কর্মসূচিতে তুরস্কের প্রত্যাবর্তনের বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে (Hürriyet Daily News, ২০২৬; Daily Sabah, ২০২৬)। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান স্পষ্ট করে বলেন, "মিত্রদের মধ্যে নিষেধাজ্ঞা থাকা উচিত নয়" (AZERTAC, ২০২৬)। এই অগ্রগতি আধুনিক তুর্কি কূটনীতির ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে রইল। একটি প্রমাণ যে, চরম বৈশ্বিক চাপের মুখেও একটি সুসংহত কৌশল ও ধৈর্যপূর্ণ কূটনীতি পরাশক্তির মনোভাবকেও বদলে দিতে পারে। আর এই সাফল্যের পেছনে ছিল ফিদানের সেই দীর্ঘদিনের চিন্তার বাস্তব প্রয়োগ, যা তিনি ১৯৯৯ সালে লিখেছিলেন, গোয়েন্দার নিরপেক্ষতা ও বস্তুনিষ্ঠতাই পারে রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করতে (Fidan, ১৯৯৯, pp. ৩৪-৩৫)।

Post a Comment