Table of Contents
![]() |
| আল-কিন্দি গ্রিক জ্ঞানকে অন্ধ অনুকরণে নয়, তাওহিদী চিন্তা, আকল ও ওহীর আলোকে আরবি-ইসলামী দর্শনের ভাষায় রূপ দেন |
Previous Part.......
Al-Kindi (আল-কিন্দি)-কে শুধু গ্রিক দর্শনের অনুবাদ-পরিসরের একজন পণ্ডিত হিসেবে পড়লে তাঁর ঐতিহাসিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়। তাঁর গুরুত্ব গ্রিক জ্ঞান গ্রহণে নয়; গ্রিক জ্ঞানকে আরবি-ইসলামী বৌদ্ধিক ভাষায় রূপান্তর করার মধ্যে। তিনি অনুকারী নন। তিনি প্রতিষ্ঠাতা। Arab philosophy (আরব দর্শন) এবং Islamic philosophy (ইসলামী দর্শন)-এর সূচনালগ্নে তিনি এমন এক ভাষা, পদ্ধতি ও চিন্তার পরিসর নির্মাণ করেন, যার ওপর পরে আল-ফারাবি, ইবনে সিনা, ইবনে রুশদ এবং মুসলিম দার্শনিক ঐতিহ্যের বড় অংশ দাঁড়াতে পারে।
তাঁকে “father of Arab philosophy” বলা হয় শুধু সম্মানসূচক বাক্য হিসেবে নয়। এর পেছনে ঐতিহাসিক কারণ আছে। Al-Kindi ছিলেন প্রথম বড় মুসলিম দার্শনিক, যিনি philosophy (দর্শন)-কে আরবি ভাষায়, মুসলিম বৌদ্ধিক পরিসরে, তাওহিদী দৃষ্টিভঙ্গির অধীনে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন। তাঁর কাজ কেবল গ্রিক ফিলোসোফি কপি করা ছিলো না; বরং সেই দর্শনকে এমন ভাষায় রূপ দেওয়া, যেখানে আল্লাহর একত্ব, সৃষ্টির অর্থ, আত্মা, জ্ঞান, আকল, ওহী এবং সত্য-অন্বেষণ একসঙ্গে আলোচিত হতে পারে।
Peter Adamson আল-কিন্দি সম্পর্কে লিখতে গিয়ে তাঁর কেন্দ্রীয় চিন্তা হিসেবে philosophy (দর্শন) এবং orthodox Islamic sciences (প্রচলিত ইসলামী জ্ঞানশাস্ত্র)-এর সামঞ্জস্যের প্রশ্নকে সামনে আনেন। আল-কিন্দির অনেক কাজ এমন বিষয় নিয়ে, যা theologians (ধর্মতাত্ত্বিক পণ্ডিত)-দেরও সরাসরি আগ্রহের জায়গা ছিল—আল্লাহর প্রকৃতি, আত্মা, prophetic knowledge (নববী জ্ঞান), এবং জ্ঞানের উৎস। Adamson, “Al-Kindī and the Reception of Greek Philosophy,” in The Cambridge Companion to Arabic Philosophy, 2005, pp. 32–34.
আরবি দর্শনের প্রথম নির্মাতা
Al-Kindi (আল-কিন্দি)-এর জন্ম কুফায়, একটি আরব অভিজাত পরিবারে। তাঁর শিক্ষা ও বৌদ্ধিক পরিণতি ঘটে বাগদাদে। আব্বাসীয় পৃষ্ঠপোষকতার অধীনে তিনি House of Wisdom (Bayt al-Hikmah/বায়তুল হিকমাহ)-এর অনুবাদ ও জ্ঞানচর্চার পরিসরের সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁর সময় ছিল এমন এক যুগ, যখন গ্রিক দর্শন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যা আরবি ভাষায় প্রবেশ করছে। কিন্তু শুধু অনুবাদ একটি দর্শন-ঐতিহ্য তৈরি করে না। অনুদিত জ্ঞানকে নতুন ভাষায় ধারণ করতে হয়। সেই ভাষায় নতুন পরিভাষা তৈরি করতে হয়। সেই জ্ঞানকে নিজের প্রশ্নের সামনে দাঁড় করাতে হয়। Al-Kindi এই কাজই করেন।
Felix Klein-Franke আল-কিন্দিকে ইসলামী দর্শনের ইতিহাসে প্রথম বড় ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখান। তাঁর বিশ্লেষণে আল-কিন্দির গুরুত্ব শুধু বহুশাস্ত্রীয় পাণ্ডিত্যে নয়; বরং আরবি ভাষায় philosophy (দর্শন)-কে প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায়। Klein-Franke, “Al-Kindi,” in Oliver Leaman and Seyyed Hossein Nasr, eds., History of Islamic Philosophy, 2001, pp. 165–167.
এখানে “আরবি দর্শন” কথাটি ভাষাগত অর্থে সীমাবদ্ধ নয়। আরবি ছিল সেই ভাষা, যার ভিতর দিয়ে মুসলিম সভ্যতা নিজের জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রশ্ন, ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক, রাজনৈতিক পরিসর এবং বৈজ্ঞানিক চর্চাকে একত্র করছিল। Al-Kindi এই ভাষাকে দার্শনিকভাবে সক্ষম করেন। তাঁর আগে অনুবাদ ছিল। তাঁর হাতে অনুদিত ধারণা আরবি চিন্তার কাঠামোয় প্রবেশ করে। তাঁর কাজের ফলে “substance” (সত্তা), “cause” (কারণ), “intellect” (আকল বা বুদ্ধি), “soul” (নফস বা আত্মা), “truth” (সত্য), “first cause” (প্রথম কারণ), “unity” (একত্ব)—এসব ধারণা আরবি দার্শনিক আলোচনায় স্থায়ী স্থান পেতে শুরু করে।
Al-Kindi-র ঐতিহাসিক গুরুত্ব গ্রিক দর্শনকে তাওহিদ, আকল, ওহী ও আরবি দার্শনিক ভাষার ভেতরে পুনর্গঠনের মধ্যে। গ্রিক জ্ঞান তাঁর কাছে ছিল উপকরণ। তাঁর নিজস্ব বৌদ্ধিক লক্ষ্য ছিল, ইসলামী সত্যদৃষ্টির ভেতরে দর্শনের বৈধতা ও ভূমিকা নির্ধারণ। তিনি বাইরের জ্ঞানকে মুসলিম চিন্তার সামনে এনে অন্ধভাবে গ্রহণ করেননি। তিনি তাকে ভাষায় বসিয়েছেন। তাওহিদের সামনে দাঁড় করিয়েছেন। Reason and Revelation (আকল ও ওহী)-এর সম্পর্কের মধ্যে বিচার করেছেন।
যুক্তি ও ওহীর সংলাপ
Al-Kindi-এর দর্শনের কেন্দ্রে Reason and Revelation (আকল ও ওহী)-এর সম্পর্ক। তিনি দর্শনকে ওহীর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করাননি। আবার আকলকেও অস্বীকার করেননি। তাঁর চিন্তায় philosophy (দর্শন) হলো truth-seeking discipline (সত্য-অন্বেষী শাস্ত্র)। আর ওহী হলো সত্যের উচ্চতর, নিশ্চিত এবং নববী উৎস। এই দুইয়ের সম্পর্ক সংঘর্ষের নয়; স্তরগত পার্থক্য ও উদ্দেশ্যগত সামঞ্জস্যের।
Al-Kindi নবুয়ত ও দর্শনের মধ্যে পার্থক্য রেখেছেন। দার্শনিক দীর্ঘ অধ্যয়ন, যুক্তি ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে সত্যের দিকে এগোয়। নবী আল্লাহর পক্ষ থেকে সত্য লাভ করেন। নবীর জ্ঞান অধিক নিশ্চিত, অধিক সরলভাবে প্রাপ্ত, এবং সাধারণ মানুষের কাছে সত্য পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে অধিক কার্যকর। Adamson আল-কিন্দির এই অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেখান, তাঁর কাছে prophecy (নবুয়ত) এবং philosophy (দর্শন) সত্যের দুই ভিন্ন পথ, কিন্তু নবুয়ত জ্ঞানের শ্রেষ্ঠতর ও নিশ্চিততর রূপ। Adamson, “Al-Kindī and the Reception of Greek Philosophy,” pp. 46–47.
এই অবস্থান খুব সূক্ষ্ম। Al-Kindi দর্শনকে বাতিল করেন না। তিনি বলেন না, আকল অপ্রয়োজনীয়। তিনি এটাও বলেন না, মানবিক যুক্তিই চূড়ান্ত। তাঁর চিন্তায় আকল দরকার, কারণ মানুষকে বুঝতে হবে। ওহী দরকার, কারণ মানুষ নিজে চূড়ান্ত সত্যের উৎস নয়। দর্শন দরকার, কারণ তা সত্যকে যুক্তির ভাষায় অনুসন্ধান করে। নবুয়ত দরকার, কারণ তা সত্যকে আল্লাহর পক্ষ থেকে নিশ্চিত করে।
এই ভারসাম্য ইসলামী জ্ঞানতত্ত্বের ভেতরে বড় কাজ করে। একদিকে অন্ধ অনুকরণকে রোধ করে। অন্যদিকে অন্ধ যুক্তিবাদকেও সীমায় রাখে। Al-Kindi দেখান, আকল যদি ওহীর অধীনে সত্য খোঁজে, তবে দর্শন বিপজ্জনক নয়। কিন্তু দর্শন যদি নিজের সীমা ভুলে যায়, তবে তা তাওহিদের সঙ্গে সংঘর্ষে পড়ে।
এ কারণেই তাঁর দর্শন ইসলামী। শুধু তাঁর নাম মুসলিম বলে নয়। তাঁর চিন্তার কেন্দ্র তাওহিদ। তাঁর metaphysics (অধিবিদ্যা) আল্লাহর একত্বের প্রশ্নে দাঁড়ায়। তাঁর epistemology (জ্ঞানতত্ত্ব) নববী জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্বকে স্বীকার করে। তাঁর reason (আকল/যুক্তি) ওহীর বিকল্প নয়; ওহী বোঝার মানবিক ক্ষমতা।
ইসলামী জ্ঞানতত্ত্বের ভিত্তি
Al-Kindi-এর জ্ঞানচিন্তা বুঝতে হলে তাকে শুধু দার্শনিক গ্রন্থকার হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। তিনি এমন সময়ে লিখছেন, যখন আরবি ভাষা scientific and philosophical language (বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক ভাষা)-এ পরিণত হচ্ছে। অনুবাদ আন্দোলন গ্রিক ধারণা এনে দিয়েছে। কিন্তু সেই ধারণাগুলো আরবিতে স্থায়ী করার জন্য দরকার ছিল দার্শনিক গঠন। Al-Kindi সেই গঠন তৈরি করেন।
Islamic epistemology (ইসলামী জ্ঞানতত্ত্ব)-এর মধ্যে তিনটি স্তর একসঙ্গে কাজ করে—ʿilm (ইলম/জ্ঞান), ʿaql (আকল/বুদ্ধি), এবং ḥikmah (হিকমাহ/প্রজ্ঞা)। Al-Kindi এই তিনকে সরাসরি একই পরিভাষায় সবসময় সাজাননি। কিন্তু তাঁর চিন্তায় তাদের কার্যগত সম্পর্ক দেখা যায়। ইলম হলো জ্ঞানের উপাদান। আকল হলো বোঝার শক্তি। হিকমাহ হলো সত্যের যথার্থ উপলব্ধি ও প্রয়োগ। তাঁর দর্শনের কাজ ছিল এই তিনকে গ্রিক দার্শনিক ভাষার সঙ্গে মিলিয়ে একটি আরবি-ইসলামী দার্শনিক ব্যাকরণ তৈরি করা।
Franz Rosenthal ইসলামী সভ্যতায় ʿilm (ইলম/জ্ঞান)-কে কেন্দ্রীয় সভ্যতাগত ধারণা হিসেবে পড়েন। তাঁর মতে, ইসলামী সভ্যতার স্বতন্ত্র চরিত্র নির্মাণে জ্ঞানের ধারণা এত গভীরভাবে কাজ করেছে যে, সমাজ, ধর্ম, শিক্ষা, আদব, আমল, মর্যাদা ও ক্ষমতা—সব ক্ষেত্রেই ইলমের ছাপ দেখা যায়। Rosenthal, Knowledge Triumphant, pp. 1–4, 19–22. এই পটভূমি ছাড়া Al-Kindi-কে বোঝা যায় না। তিনি এমন এক সভ্যতায় দর্শন শুরু করছেন, যেখানে জ্ঞান আগে থেকেই উচ্চ নৈতিক ও ধর্মীয় মর্যাদার ধারণা।
Greek philosophy (গ্রিক দর্শন) তাঁর কাছে তাই শূন্যে আসেনি। তা প্রবেশ করেছে এমন এক সভ্যতায়, যেখানে জ্ঞানকে আল্লাহর নিদর্শন বোঝার উপায়, সত্য অনুসন্ধানের দায়িত্ব এবং মানবিক পরিপূর্ণতার অংশ হিসেবে দেখা হয়। Al-Kindi এই পরিবেশে philosophy (দর্শন)-কে বৈধতা দেন। তিনি দেখাতে চান, সত্য যেখানেই থাকুক, তা গ্রহণযোগ্য। তবে গ্রহণের মানদণ্ড ইসলামী। সত্য তাওহিদের বিরুদ্ধে যেতে পারে না। সত্য ওহীর নিশ্চিততার বিপরীতে দাঁড়াতে পারে না। সত্য আল্লাহর একত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে না।
তাওহিদী অধিবিদ্যা ও প্রথম দর্শন
Al-Kindi-এর metaphysics (অধিবিদ্যা)-এর কেন্দ্রে আল্লাহর absolute oneness (পরম একত্ব)। তিনি আল্লাহকে শুধু কোনো দার্শনিক “first cause” (প্রথম কারণ) হিসেবে নেন না। তাঁর কাছে আল্লাহ সত্যিকারের এক। সৃষ্ট বস্তু সংখ্যায় এক হলেও তার ভেতরে বহুত্ব থাকে। একটি দেহ এক, কিন্তু অংশে বিভক্ত। একটি প্রজাতি এক নামে পরিচিত, কিন্তু তার অনেক ফর্দ বা সত্তা রয়েছে। আল্লাহর একত্ব এই ধরনের নয়। তাঁর একত্ব অস্তিত্বে, ধারণায়, বাস্তবতায় এবং পরম অর্থে।
Adamson আল-কিন্দির ঈশ্বরচিন্তা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দেখান, তিনি divine unity (ঐশী একত্ব)-কে এমনভাবে বোঝেন, যা কোনো সৃষ্ট বস্তুর একত্বের সঙ্গে তুলনীয় নয়। এই কারণেই তাঁর theology (ধর্মতত্ত্ব)-এ negative theology (নিরাকরণমূলক ঈশ্বরতত্ত্ব)-এর রূপরেখা দেখা যায়। আল্লাহকে সৃষ্ট বস্তুর গুণ দিয়ে পুরোপুরি ধরার চেষ্টা করলে বহুত্ব ঢুকে পড়ে। Adamson, “Al-Kindī and the Reception of Greek Philosophy,” pp. 35–39.
এই তাওহিদী অবস্থানই তাঁকে গ্রিক metaphysics (অধিবিদ্যা)-এর অন্ধ অনুসারী হতে দেয়নি। Aristotelian philosophy (এরিস্টটলীয় দর্শন) এবং Neoplatonic thought (নব্য-প্লেটোনীয় চিন্তা)-এর উপাদান তিনি ব্যবহার করেছেন, কিন্তু আল্লাহর একত্বকে সৃষ্ট জগতের কোনো স্তরগত ধারাবাহিকতার মধ্যে হারিয়ে দেননি। তাঁর কাছে আল্লাহ active creator (সক্রিয় স্রষ্টা)। জগত আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল। কারণ-কার্য সম্পর্ক আছে, কিন্তু সেই সম্পর্ক আল্লাহর সৃষ্টিশক্তির বাইরে স্বাধীন নয়।
এই অবস্থান ইসলামী দর্শনের সূচনাবিন্দু হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ Al-Kindi দর্শনের ভাষায় তাওহিদ ব্যাখ্যা করতে চান। তিনি ধর্মতত্ত্বকে দর্শনের অধীন করেন না। দর্শনকে তাওহিদের সেবায় নিয়ে আসেন। এই জায়গায় তাঁর মৌলিকতা। তিনি Greek tools (গ্রিক পদ্ধতি) ব্যবহার করেন, কিন্তু Islamic truth-structure (ইসলামী সত্য-গঠন)-এর ভিতর থেকে।
জ্ঞান, বিজ্ঞান ও পদ্ধতির বিস্তার
Al-Kindi শুধুমাত্র metaphysics (অধিবিদ্যা)-র দার্শনিক ছিলেন না। তিনি গণিত, চিকিৎসা, সঙ্গীততত্ত্ব, জ্যোতির্বিজ্ঞান, optics (দৃষ্টিবিজ্ঞান), cryptography (গুপ্তলিপি-বিশ্লেষণ), pharmacology (ঔষধতত্ত্ব), meteorology (আবহবিদ্যা) সহ বহু শাস্ত্রে কাজ করেছেন। Ibn al-Nadim তাঁর al-Fihrist-এ আল-কিন্দির বিপুল রচনার কথা উল্লেখ করেন। বিভিন্ন শাস্ত্রে তাঁর শতাধিক গ্রন্থের তালিকা পাওয়া যায়। al-Nadim, The Fihrist, trans. Bayard Dodge, pp. 440, 589, 1071.
এই বহুশাস্ত্রীয়তা কোনো বিচ্ছিন্ন পাণ্ডিত্য নয়। এটি তাঁর দর্শনের সঙ্গে যুক্ত। Al-Kindi-এর কাছে জ্ঞান বিভক্ত হলেও সত্য এক। গণিত, চিকিৎসা, সঙ্গীত, দর্শন, যুক্তি—এসব আলাদা শাস্ত্র, কিন্তু সত্যের জগতে তারা বিচ্ছিন্ন নয়। তাওহিদী দৃষ্টিতে জগত এক সৃষ্ট জগত। তার নিয়ম, পরিমাপ, গঠন, সুর, দেহ, আলো, সংখ্যা—সবই চিন্তার বিষয়।
Mathematics (গণিত)-এ তাঁর কাজ Hindu-Arabic numerals (হিন্দু-আরবি সংখ্যা)-এর প্রচার ও ব্যবহারিক বিকাশের সঙ্গে যুক্ত। Cryptography (গুপ্তলিপি-বিশ্লেষণ)-এ তাঁর frequency analysis (বর্ণ-ঘনত্ব বিশ্লেষণ) পদ্ধতি পরবর্তী ক্রিপ্টবিশ্লেষণের ইতিহাসে একটি বড় সূচনা হিসেবে গণ্য হয়। Simon Singh তাঁর The Code Book-এ আল-কিন্দির frequency analysis-কে cryptanalysis (গুপ্তলিপি ভাঙার শাস্ত্র)-এর প্রথম সুসংগঠিত উদাহরণগুলোর একটি হিসেবে আলোচনা করেন। Singh, The Code Book, pp. 14–20.
Medicine (চিকিৎসা)-এ তাঁর De Gradibus ঔষধের কার্যকারিতা মাপতে mathematical scale (গাণিতিক মাত্রা)-এর ব্যবহার দেখায়। Prioreschi এটিকে medicine (চিকিৎসাবিজ্ঞান)-এ serious quantification (গুরুতর পরিমাণগত নির্ণয়)-এর প্রাথমিক প্রচেষ্টাগুলোর একটি হিসেবে দেখেছেন। Prioreschi, A History of Medicine, Vol. 4, pp. 227–235; Prioreschi, “Al-Kindi, A Precursor of the Scientific Revolution,” 2002, pp. 17–19.
এই সব কাজের মধ্যে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে। Al-Kindi জ্ঞানকে বিচ্ছিন্ন তথ্য হিসেবে নেন না। তিনি পদ্ধতি খোঁজেন। মাপ, অনুপাত, কারণ, প্রমাণ, ভাষা, শ্রেণিবিন্যাস—এসব তাঁর জ্ঞানচিন্তার অংশ। ফলে তিনি শুধু দর্শনের সূচনাকারী নন; তিনি আরবি-ইসলামী rational inquiry (আকলভিত্তিক অনুসন্ধান)-এরও এক বড় নির্মাতা।
যুক্তি, ওহী ও ইসলামী দর্শনের ভবিষ্যৎ
Al-Kindi-এর ঐতিহাসিক কাজ অসম্পূর্ণ ছিল। পরে আল-ফারাবি দর্শনকে আরও পদ্ধতিগত করেন। ইবনে সিনা metaphysics (অধিবিদ্যা), psychology (নফসতত্ত্ব) এবং epistemology (জ্ঞানতত্ত্ব)-কে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। গাজালি দার্শনিকদের কঠোর সমালোচনা করেন। ইবনে রুশদ আবার দর্শন ও শরিয়াহর সম্পর্ক নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু এই সব পরবর্তী বিতর্কের দরজা Al-Kindi খুলে দেন।
Deborah Black-এর আলোচনায় আল-কিন্দির কাজকে পরবর্তী philosophers and theologians (দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিক)-দের বিতর্কের বীজ বহনকারী হিসেবে দেখা হয়েছে। তাঁর চিন্তায় দর্শন, তাওহিদ, আকল, ওহী এবং metaphysics (অধিবিদ্যা)-এর যে সম্পর্ক তৈরি হয়, তা পরে ইসলামী দর্শনের বড় বড় প্রশ্নে ফিরে আসে। Black, cited in the al-Kindi reference tradition, pp. 168–171.
Al-Kindi-এর সীমাও ছিল। তাঁর ভাষা পরবর্তী দার্শনিকদের মতো পরিণত নয়। তাঁর Aristotelianism (এরিস্টটলীয়তা) অনেক সময় Neoplatonic framework (নব্য-প্লেটোনীয় কাঠামো)-এর সঙ্গে মিশে যায়। তাঁর দার্শনিক নির্মাণে কোথাও কোথাও অমসৃণতা আছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠাতাদের কাজ সবসময় পরিণত ব্যবস্থার মতো মসৃণ হয় না। তারা দরজা খুলে দেন। ভাষা তৈরি করেন। প্রশ্নকে বৈধতা দেন। পথের প্রথম পাথর বসান।
Al-Kindi সেই কাজ করেছেন। তিনি Muslim philosophy (মুসলিম দর্শন)-কে জন্ম দিয়েছেন এই অর্থে যে, তিনি মুসলিম বৌদ্ধিক পরিসরে দর্শনকে বৈধ ভাষা, প্রশ্ন, উদ্দেশ্য ও তাওহিদী সীমার মধ্যে দাঁড় করিয়েছেন। তিনি গ্রিক দর্শনের অনুসারী নন; তিনি গ্রিক জ্ঞানকে আরবি-ইসলামী জ্ঞানতত্ত্বে রূপান্তরকারী প্রথম মহান নির্মাতাদের একজন। তাঁর কাছে Reason and Revelation (আকল ও ওহী) শত্রু নয়। আকল সত্যের দিকে হাঁটে। ওহী সত্যের আলো দেয়। দর্শন সেই আলোর মধ্যে চিন্তার শৃঙ্খলা খোঁজে।
এই কারণেই Al-Kindi-র নাম অনুবাদ আন্দোলনের পাশে, Bayt al-Hikmah-এর পাশে, এবং ইসলামী জ্ঞানতত্ত্বের সূচনালগ্নে স্থায়ীভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি প্রমাণ করেছেন, মুসলিম সভ্যতা বাইরের জ্ঞানকে ভয় পায়নি। আবার অন্ধ অনুসরণও করেনি। সে জ্ঞানকে নিজের ভাষায় এনেছে। নিজের তাওহিদী দৃষ্টিতে বিচার করেছে। নিজের intellectual grammar (বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যাকরণ)-এ রূপ দিয়েছে। Al-Kindi সেই রূপান্তরের প্রথম বড় দার্শনিক কণ্ঠ।

Post a Comment