Loading...

ছদ্ম-সেক্যুলারিজমের মোড়ক এবং মঙ্গল শোভাযাত্রার পৌত্তলিক রূপরেখা

ছদ্ম-সেক্যুলারিজমের মোড়ক এবং মঙ্গল শোভাযাত্রার পৌত্তলিক রূপরেখা
Advertisement
Advertisement — Place AdSense Code Here
Table of Contents
    ছদ্ম-সেক্যুলারিজম, মঙ্গল শোভাযাত্রা এবং বাঙালি সাংস্কৃতিক পরিচয়কে ঘিরে চলমান বিতর্কের প্রতীকী উপস্থাপনা।

    ছদ্ম-সেক্যুলারিজম, মঙ্গল শোভাযাত্রা এবং বাঙালি সাংস্কৃতিক পরিচয়কে ঘিরে চলমান বিতর্কের প্রতীকী উপস্থাপনা

    ৫:৪

    ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের রাজপথের সেই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মূল চেতনাটি যখন সমসাময়িক স্বাধীন গণমাধ্যমের পাতায় ‘খেলাফৎ কায়েম’ এবং পুঁজিবাদমুক্ত ‘দারুল ইসলাম’ প্রতিষ্ঠার বিপ্লবী স্পিরিটের সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিল, তখন পরবর্তী দশকগুলোতে রাষ্ট্রযন্ত্র ও বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে এক সুগভীর ও পদ্ধতিগত রূপান্তর ঘটানো হয়। উনিশ শতকে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের মাধ্যমে যে উচ্চবর্ণের এলিট সমাজ বাংলা ভাষার ওপর নিজেদের আধিপত্য কায়েম করেছিল, তারা বিশ শতকের শেষভাগে এসে এ দেশের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক উৎসবগুলোর ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য এক নতুন সাংস্কৃতিক অস্ত্র তৈরি করে। এই চতুর মনস্তাত্ত্বিক কৌশলের অন্যতম প্রধান ও আধুনিক রূপটি হলো ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে প্রথম শুরু হওয়া এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে ‘সার্বজনীন বাঙালি সংস্কৃতি’ হিসেবে ব্র্যান্ডিং করা এই উৎসবটি আসলে কোনো ধর্মনিরপেক্ষ বা প্রাচীন লৌকিক উৎসব ছিল না; এটি ছিল মূলত ধর্মনিরপেক্ষতার ছদ্মবেশে উচ্চবর্ণের সনাতনপন্থী ও পৌত্তলিক ধর্মীয় আচারকে এ দেশের সংখ্যাগুরু মুসলিম সমাজের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়ার এক তীব্র কালচারাল ফ্যাসিবাদের বাস্তব রূপ।

    মঙ্গল শোভাযাত্রার ভেতরের প্রতিটি অনুষঙ্গ—যেমন বিশাল আকৃতির মাটির তৈরি প্যাঁচা, বাঘ, সিংহ, মুখোশ, এবং কৃত্রিম সূর্যের প্রতিকৃতি বহন করা—এগুলো কোনোটিই প্রাক-আর্য বা মধ্যযুগীয় বাংলার সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের লোকসংস্কৃতির অংশ ছিল না। এগুলো সরাসরি হিন্দু পুরাণের বিভিন্ন দেব-দেবীর বাহন এবং পৌত্তলিক উর্বরতার পূজার আধুনিক ও পরিমার্জিত রূপ। ‘মঙ্গল’ শব্দের ধর্মীয় অর্থটিকেই এখানে সুকৌশলে ধর্মনিরপেক্ষতার তকমা দিয়ে এমনভাবে প্রচার করা হয়, যেন কোনো মুসলিম যদি এই শোভাযাত্রায় অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানায় বা নিজের তাওহীদি বিশ্বাসের কারণে এর বিরোধিতা করে, তবে তাকে তৎক্ষণাৎ ‘বাঙালি সংস্কৃতির শত্রু’ বা অ-প্রগতিশীল মৌলবাদী হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া যায়। এই বলপ্রয়োগমূলক অনুপ্রবেশের মূল লক্ষ্যই ছিল—এ দেশের তরুণ প্রজন্মের মগজ থেকে ১৯৫২ সালের সেই মূল ঈমানী ও বিপ্লবী স্পিরিটকে চিরতরে মুছে দেওয়া এবং তাদের মনে এক স্থায়ী অপরাধবোধ তৈরি করা, যেন তারা নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় বজায় রেখে কখনো সংস্কৃতির মূলধারায় মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে (আহমদ, আবুল মনসুর। বাংলাদেশের কালচার, আহমদ পাবলিশিং হাউস,  প্রবন্ধ: ‘বাংলাদেশের কালচার’, পৃ. ২১-২৩) অথচ এদেশের ভূমিপুত্র যখন মুসলিমরা, তখন বহিরাগত আর্যদের দেবদেবী এবং ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে উৎসারিত কোনোকিছু এখানের সংস্কৃতি হতে পারে কীরূপে? বাঙালি সংস্কৃতি হয় কী করে অবাঙালি কোনোকিছু?

    রবীন্দ্র-ধর্মের মনস্তাত্ত্বিক জাল এবং শেষকৃত্যের নান্দনিক ফ্যাসিবাদের রূপান্তর

    কলকাতার উচ্চবর্ণের এলিট সমাজ এবং তাদের এ দেশীয় বুদ্ধিবৃত্তিক দোসররা এ দেশের মানুষের মনস্তত্ত্বকে চিরতরে অবদমিত করার জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কেবল একজন নোবেলজয়ী কবি হিসেবে ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং তারা তাঁকে কেন্দ্র করে এক প্রাতিষ্ঠানিক ও ছদ্ম-ধর্মীয় অবতারের রূপ ধারণ করিয়েছে, যা আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘রবীন্দ্র-ধর্ম’ (Rabindra-Religion) নামে চিহ্নিত। এই রবীন্দ্র-ধর্ম কোনো সাধারণ কাব্যিক অনুরাগ বা গানের আসর নয়; এটি হলো এমন এক সুপরিকল্পিত নান্দনিক ফ্যাসিবাদ (Aesthetic Fascism), যা মানুষের মনস্তত্ত্বের সর্বোচ্চ স্তরকে এমনভাবে শাসন করে যাতে সে তার নিজস্ব Abrahamic বা তাওহীদি বিশ্বাসের শেষকৃত্য ও ধর্মীয় অনুশাসনগুলো ভুলে এক অবোধ্য ছদ্ম-পৌত্তলিক নান্দনিকতার দাসত্ব বরণ করে নেয়।

    এই কুৎসিত রূপান্তরের সবচেয়ে বড় প্রমাণ আমরা দেখতে পাই আধুনিক নব্য-শিক্ষিত এবং ছদ্ম-সেক্যুলার এলিটদের যাপিত জীবনে। একজন মুসলিমের মৃত্যুর পর যেখানে ইসলামী শরিয়াহর বিধান অনুযায়ী অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে কাফন-দাফন, জানাজা এবং আল্লাহর দরবারে মাগফিরাতের দোয়া করার হাজার বছরের বাঙালি ও ধর্মীয় ঐতিহ্য রয়েছে, সেখানে এই রবীন্দ্র-ধর্মের অনুসারীরা মৃতদেহকে শহীদ মিনার বা চারুকলার চত্বরে এনে কৃত্রিম ফুল ছিটিয়ে এবং রবীন্দ্রসংগীত বা নির্দিষ্ট ছন্দের গান গেয়ে এক অদ্ভুত ধর্মনিরপেক্ষ-পবিত্র আচারের (Secular-Sacred Ritual) সূচনা করেছে। তারা মৃতব্যক্তির পরকালীন মুক্তির দোয়ার পরিবর্তে গানের পঙ্ক্তি উচ্চারণকে নিজেদের আত্মিক সান্ত্বনা হিসেবে গ্রহণ করছে। এই মনস্তাত্ত্বিক জালটি এ দেশের তরুণদের মগজে এমনভাবে জারিত করা হয়েছে যে, তারা নিজেদের অজান্তেই কুরআন-সুন্নাহর শাশ্বত বিধান ও সংস্কৃতির চেয়ে কলকাতার ঠাকুরবাড়ির তৈরি করা জীবনদর্শনকে বেশি আধুনিক ও আভিজাত্যের প্রতীক মনে করতে শুরু করেছে। এটি কোনো নির্দোষ প্রগতিশীলতা নয়, এটি হলো একটি স্বাধীন মুসলিম সংখ্যাগুরু জাতির নিজস্ব আত্মিক ও মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তিকে সমূলে উপড়ে ফেলার এক সুগভীর ও দীর্ঘমেয়াদী বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসন। যার শেকড় প্রোথিত রয়েছে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে এবং বঙ্কিমীয় কামনা বাসনায়।

    আবুল মনসুর আহমদের সমাজতাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ: সংস্কৃতির ঠিকাদারি বনাম সত্যের দর্পণ

    উচ্চবর্ণের হিন্দুদের চাপিয়ে দেওয়া এই কালচারাল হেজিমনি বা সংস্কৃতির একচেটিয়া ঠিকাদারির বিরুদ্ধে এ দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমাজবিজ্ঞানী, সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদ আবুল মনসুর আহমদ তাঁর কালজয়ী তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে এক ক্ষুরধার আঘাত করেছেন। তিনি তাঁর সুপ্রসিদ্ধ সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় দালিলিকভাবে প্রমাণ করে গেছেন যে—আজ আধুনিক মিডিয়া ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় যাকে ‘বাঙালি কালচার’ বলে জোরপূর্বক বিশ্বমঞ্চে চালানো হচ্ছে, তা আসলে এই মাটির কোটি কোটি আমজনতা, ভূমিপুত্র বা মুসলিমদের সংস্কৃতি নয়; বরং তা হলো উনিশ শতকের ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের গর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া ব্রিটিশ-উচ্চবর্ণ হিন্দু আঁতাতের এক কৃত্রিম, ছদ্ম-সেক্যুলার ও ব্রাহ্মণ্যবাদী চক্রান্ত।

    আবুল মনসুর আহমদ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন কীভাবে কলকাতার বাবুরা নিজেদের ধর্মীয় উৎসব ও আচারের অনুষঙ্গগুলোকে ‘ধর্মনিরপেক্ষ ও সার্বজনীন’ তকমা দিয়ে এ দেশের মানুষের ওপর বাধ্যতামূলক করেছে, অথচ এই মাটির মুসলমানদের হাজার বছরের লোকজ ঐতিহ্য—যেমন বিসমিল্লাহখানি, শবে বরাত, আকিকা, কিংবা পুঁথি পাঠের আসরকে—‘ক্ষেত’ বা সাম্প্রদায়িক তকমা দিয়ে মূলধারা থেকে ছেঁটে ফেলেছে (আহমদ, আবুল মনসুর। বাংলাদেশের কালচার, আহমদ পাবলিশিং হাউস, প্রবন্ধ: ‘বাংলাদেশের কালচার’, পৃ. ২১-২৩)। তিনি এই মনস্তাত্ত্বিক অবদমনের মুখোশ উন্মোচন করে সতর্ক করেছিলেন যে, এ দেশের মুসলমানেরা যদি তাদের নিজস্ব ধর্মীয় ও লৌকিক স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে এই কৃত্রিম ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতির দাসত্ব বর্জন করতে না পারে, তবে তারা রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হলেও সামাজিকভাবে সবসময় দিল্লির মনস্তাত্ত্বিক উপনিবেশ হয়েই দিনাতিপাত করবে। তাঁর এই অকাট্য তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদই আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই কালচারাল ওয়ার বা সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক হাতিয়ার, যা তরুণ প্রজন্মকে তাদের হারিয়ে যাওয়া আসল আত্মপরিচয় ও গৌরবময় লোকসংস্কৃতির অধিকার পুনরুদ্ধারের পথ দেখায়।

    Sazzad Chowdhury

    Sazzad Chowdhury

    Founder & Editor, House Of Wisdom. An independent Bengali knowledge publication exploring history, philosophy, Islamic intellectual tradition, literature, culture and civilization through references, historical sources and critical analysis.

    Author Profile

    Post a Comment