Loading...

হুব্বে নবী : আল্লাহর প্রেমেরই একটি শাখা

হুব্বে নবী : আল্লাহর প্রেমেরই একটি শাখা
Advertisement
Advertisement — Place AdSense Code Here
Table of Contents
    হুব্বে নবী ﷺ : আল্লাহর প্রেমেরই একটি শাখা—মদিনার পটভূমিতে আধ্যাত্মিক ধ্যানমগ্ন এক মুসলিমের প্রতীকী চিত্র।

    রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসা আল্লাহর ভালোবাসারই একটি শাখা এবং তাঁর অনুসরণই আল্লাহর নৈকট্যের পথ


    Previous Part.......

    মানুষের অন্তরে যে ثانوی محبت (দ্বিতীয় পর্যায়ের ভালোবাসা) জন্ম নেয়, তা হলো সেই পবিত্র সত্তার প্রতি ভালোবাসা, যার মহান হৃদয়কে আল্লাহ তা'আলা নিজের اسماء حسنیٰ (সুন্দরতম নামসমূহের) সর্বশ্রেষ্ঠ প্রকাশস্থল বানিয়েছেন। তিনি তাঁর সঙ্গে এমন এক ভালোবাসার সম্পর্ক স্থাপন করেছেন, যা আর কারও সঙ্গে স্থাপন করেননি এবং করবেনও না। محبتِ الٰہی (আল্লাহর প্রেম)-এর আকর্ষণ ও টান তাঁকে مقامِ محبوبیت (প্রিয়ত্বের মর্যাদা)-এর একক ও অদ্বিতীয় আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।


    আল্লাহ তা'আলা তাঁর محبتِ ذاتیہ (সত্তাগত ভালোবাসা) এবং صفتِ احدیّت (অহদিয়্যাতের গুণ)-এর এমন এক বিশেষ তাজাল্লি তাঁর ওপর বর্ষণ করেছেন, যা অন্য কারও ভাগ্যে জোটেনি। তাঁরই পবিত্র সত্তা ও মহান সত্যের ওপর সে তাজাল্লি নিক্ষিপ্ত হয়েছে। অতঃপর সেই সত্য জগতের বুকে আহমদ ও মুহাম্মাদ নামে প্রকাশিত হয়েছে।


    তিনি আর কেউ নন, দুই জাহানের সরদার, আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ ﷺ।


    তাঁর প্রতি এ ভালোবাসা কি এ কারণে যে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সুদর্শন? অথবা এ কারণে যে তিনি এক সম্ভ্রান্ত বংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন? কিংবা এ জন্য যে তিনি ছিলেন আবদুল্লাহর পুত্র? অথবা এ কারণে যে তিনি ছিলেন অতুলনীয় সাহসী, প্রজ্ঞাবান ও বিচক্ষণ?


    না, মোটেও তা নয়।


    বরং তাঁকে ভালোবাসার প্রকৃত কারণ হলো—তাঁর মাধ্যমেই আমরা আমাদের محبوبِ حقیقی (প্রকৃত প্রেমাস্পদ) আল্লাহু আহাদের পরিচয় লাভ করেছি। তাঁর মাধ্যমেই আমরা সঠিক পথের সন্ধান পেয়েছি। মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান করতে, صراطِ مستقیم (সরল-সঠিক পথ) দেখাতে গিয়ে তিনি যে দুঃখ-কষ্ট, নির্যাতন ও বিপদ-আপদ সহ্য করেছেন, সেগুলোর কথা কল্পনা করলেই হৃদয় কেঁপে ওঠে।

    এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—


    “আল্লাহর পথে আমি এমন ভীতি ও নির্যাতনের সম্মুখীন হয়েছি, যা আর কেউ হয়নি। আল্লাহর পথে আমি এমন কষ্ট ভোগ করেছি, যা আর কেউ ভোগ করেনি। এমন ত্রিশটি দিন-রাত আমার ওপর অতিক্রান্ত হয়েছে, যখন আমার ও বিলালের কাছে এমন কোনো খাদ্য ছিল না, যা কোনো প্রাণী খেতে পারে; কেবল এতটুকু ছিল, যা বিলালের বগলের নিচে লুকানো যেত।”


    — জামে তিরমিযী, হাদীস নং ২৪৭২


    ইবনুল আরাবী (রাহি.) এ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন—


    এই হাদীসের অর্থ হলো, যখন নবী ﷺ মক্কা থেকে তায়েফের দিকে গমন করেন এবং সেখানে প্রধান ব্যক্তি আবদু ইয়ালীলের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করেন, যেন তিনি তাঁকে মক্কার কাফিরদের নির্যাতন থেকে রক্ষা করেন এবং তিনি স্বীয় প্রতিপালকের বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন। তখন সে ব্যক্তি দুষ্ট বালকদের তাঁর বিরুদ্ধে উসকে দেয়। তারা নবী ﷺ-কে পাথর নিক্ষেপ করতে থাকে, এমনকি তাঁর পবিত্র গোড়ালি রক্তাক্ত হয়ে যায়।


    সে কঠিন মুহূর্তে নবী ﷺ তাঁর সেই বিখ্যাত দোয়া করেন—

    اللَّهُمَّ إِنِّي أَشْكُو إِلَيْكَ ضَعْفَ قُوَّتِي، وَقِلَّةَ حِيلَتِي، وَهَوَانِي عَلَى النَّاسِ، يَا أَرْحَمَ الرَّاحِمِينَ، أَنْتَ رَبُّ الْمُسْتَضْعَفِينَ، وَأَنْتَ رَبِّي، إِلَى مَنْ تَكِلُنِي؟ إِلَى بَعِيدٍ يَتَجَهَّمُنِي، أَمْ إِلَى عَدُوٍّ مَلَّكْتَهُ أَمْرِي؟ إِنْ لَمْ يَكُنْ بِكَ عَلَيَّ غَضَبٌ فَلَا أُبَالِي، وَلَكِنَّ عَافِيَتَكَ أَوْسَعُ لِي، أَعُوذُ بِنُورِ وَجْهِكَ الَّذِي أَشْرَقَتْ لَهُ الظُّلُمَاتُ، وَصَلَحَ عَلَيْهِ أَمْرُ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ، مِنْ أَنْ تَنْزِلَ بِي غَضَبَكَ، أَوْ يَحِلَّ عَلَيَّ سَخَطُكَ، لَكَ الْعُتْبَى حَتَّى تَرْضَى، وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِكَ.


    “হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছেই আমার শক্তিহীনতা, অসহায়ত্ব এবং মানুষের কাছে আমার অমর্যাদার অভিযোগ পেশ করছি। হে সকল দয়ালুর চেয়ে অধিক দয়ালু! যদি আপনি আমার প্রতি অসন্তুষ্ট না হন, তবে আমি কোনো পরোয়া করি না আপনি আমাকে কার হাতে সঁপে দিচ্ছেন? এমন কোনো শত্রুর হাতে, যে আমার প্রতি রূঢ় আচরণ করবে? নাকি এমন কোনো নিকটাত্মীয়ের হাতে, যার কাছে আপনি আমার বিষয় অর্পণ করেছেন? তবে আপনার নিরাপত্তা ও অনুগ্রহই আমার কাম্য এবং অধিক প্রশস্ত বিষয়। আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি আপনার সেই মহিমান্বিত চেহারার নূরের, যার আলোয় সব অন্ধকার দূরীভূত হয়েছে এবং যার দ্বারা দুনিয়া ও আখিরাতের সমস্ত বিষয় সুশৃঙ্খল ও কল্যাণময় হয়েছে। আমি আপনার অসন্তোষ বা ক্রোধ আমার ওপর নেমে আসা থেকে আশ্রয় চাই। আপনার সন্তুষ্টি অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আমার সকল নিবেদন, সকল আরজি আপনারই দরবারে। আর আপনার সাহায্য ছাড়া আমার কোনো শক্তি ও সামর্থ্য নেই।"


    রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসার প্রকৃত কারণ


    আল্লাহু আহাদ (একক ও অদ্বিতীয় সত্তা) হযরত মুহাম্মাদ ﷺ-কে নিজের পথের نور (আলোকবর্তিকা) বানিয়েছেন। এ কারণেই তিনি ঘোষণা করেছেন—


    لَقَدْ جَاءَكُمْ مِنَ اللّٰهِ نُورٌ وَكِتَابٌ مُبِينٌ

    “নিশ্চয়ই তোমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক নূর এবং এক সুস্পষ্ট কিতাব এসে গেছে।”


    — সূরা আল-মায়িদাহ, ৫:১৫


    আর তিনি তাঁর বান্দাদের উদ্দেশে বলেছেন—


    যদি তোমরা সত্যিই আমার সন্ধানী হও এবং আমার ভালোবাসার দাবিদার হও, তাহলে মুহাম্মাদ ﷺ-এর পদাঙ্ক অনুসরণ করো। তাঁর অনুসরণে নিজেদের জীবন গড়ে তোলো। তাঁর পথ অবলম্বন করে পূর্ণতার স্তরে পৌঁছো। তাহলে তোমরা শুধু مقامِ محبت (ভালোবাসার মর্যাদা)-ই লাভ করবে না, বরং আমি তোমাদেরকে مقامِ محبوبیت (আমার প্রিয়ভাজন হওয়ার মর্যাদা) দান করব।


    আল্লাহর ভালোবাসা লাভের একমাত্র পথ : ইত্তিবায়ে রাসূল ﷺ 


    ﴿قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللّٰهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللّٰهُ﴾


    “বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমার অনুসরণ করো; আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন।”


    — সূরা আলে ইমরান, ৩:৩১


    আল্লাহ তাআলা আরও ঘোষণা করেছেন—


    হে আমার সন্ধানী বান্দারা! আমি মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে তোমাদের জন্য আদর্শরূপে প্রেরণ করেছি। তাঁর সমগ্র শিক্ষা, তাঁর পূর্ণ সীরাত, তাঁর জীবনসংগ্রাম এবং তাঁর রেখে যাওয়া পথই তোমাদের জন্য জীবনযাপনের বিধান।


    ﴿لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللّٰهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللّٰهَ﴾


    “যারা আল্লাহর সাক্ষাৎ ও পরকালের আশা রাখে, তাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।”


    — সূরা আল-আহযাব, ৩৩:২১


    আল্লাহ তাআলা এ কথাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তাঁর কাছে পৌঁছার পথ একটিই। আর এটিই সেই পথ, যার দিকে মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ ﷺ পূর্ণ بصیرت (অন্তর্দৃষ্টিসমৃদ্ধ জ্ঞান) সহকারে মানুষকে আহ্বান করেছেন।


    ﴿قُلْ هٰذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللّٰهِ عَلَىٰ بَصِيرَةٍ﴾


    “বলুন, এটাই আমার পথ। আমি সুস্পষ্ট অন্তর্দৃষ্টি সহকারে আল্লাহর দিকে আহ্বান করি।”


    — সূরা ইউসুফ, ১২:১০৮


    আল্লাহু আহাদ (একক ও অদ্বিতীয় সত্তা) বলেন—


    দেখো, আমি একক; আমার পথও একক। আমার প্রিয় রাসূল মুহাম্মাদ ﷺ-এর পথ ছেড়ে অন্য কোনো উপায়ে তোমরা কখনোই আমার কাছে পৌঁছতে পারবে না। তাঁর পথ থেকে সরে গিয়ে তোমরা আমাকে লাভ করতে পারবে না। তোমাদের হৃদয় আমার اسماء حسنیٰ (সুন্দরতম নামসমূহের) তাজাল্লির (ঐশী জ্যোতি প্রকাশের) কেন্দ্র হবে না। আমার مشاہدہ (দর্শন-উপলব্ধি) লাভ করবে না, আর আমার معیت (সান্নিধ্য)-এর রহস্যও তোমাদের সামনে উন্মোচিত হবে না।


    এ কারণেই তিনি ঘোষণা করেছেন—


    إِنَّ هٰذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَنْ سَبِيلِهِ


    “নিশ্চয়ই এটাই আমার সরল পথ। সুতরাং তোমরা এ পথই অনুসরণ করো। আর বিভিন্ন পথের অনুসরণ করো না; অন্যথায় সেগুলো তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে।”


    — সূরা আল-আন‘আম, ৬:১৫৩


    রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে উদ্দেশ করে বলেছেন—


    وَإِنَّكَ لَتَهْدِي إِلَىٰ صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ ۝ صِرَاطِ اللَّهِ الَّذِي لَهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ ۗ أَلَا إِلَى اللَّهِ تَصِيرُ الْأُمُورُ


    “নিশ্চয়ই আপনি মানুষকে সরল পথের দিকনির্দেশনা দেন; সেই আল্লাহর পথে, যাঁরই মালিকানায় রয়েছে আসমানসমূহ ও জমিনের সবকিছু। জেনে রাখো, সব বিষয়ই শেষ পর্যন্ত আল্লাহর কাছেই প্রত্যাবর্তন করে।”


    — সূরা আশ-শূরা, ৪২:৫২-৫৩


    দেখো, মুহাম্মাদ ﷺ-ই সেই মহান মাধ্যম, যার হৃদয়ে আমি আমার কালাম অবতীর্ণ করেছি।


    نَزَلَ بِهِ الرُّوحُ الْأَمِينُ ۝ عَلَىٰ قَلْبِكَ


    “বিশ্বস্ত রূহ (জিবরীল) এ বাণী নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছে আপনার হৃদয়ে।”


    — সূরা আশ-শু‘আরা, ২৬:১৯৩-১৯৪


    আর আমি আমার ওহি তাঁর জবানেই প্রবাহিত করেছি।


    وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَىٰ ۝ إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَىٰ


    “তিনি নিজের প্রবৃত্তির তাড়নায় কোনো কথা বলেন না। তাঁর মুখ থেকে যা উচ্চারিত হয়, তা তো কেবল সেই ওহি, যা তাঁর প্রতি প্রত্যাদেশ করা হয়।”


    — সূরা আন-নাজম, ৫৩:৩-৪


    আমি তাঁর সঙ্গে আমার নিয়ামত পূর্ণাঙ্গ ও পরিপূর্ণ করে দিয়েছি।


    اَلْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَاَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِيْ وَرَضِيْتُ لَكُمُ الْاِسْلَامَ دِيْنًا


    “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।”


    — সূরা আল-মায়িদাহ, ৫:৩


    وَمَنْ يَّبْتَغِ غَيْرَ الْاِسْلَامِ دِيْنًا فَلَنْ يُّقْبَلَ مِنْهُ


    “আর যে ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন অনুসন্ধান করবে, তা কখনো তার কাছ থেকে গ্রহণ করা হবে না।”


    — সূরা আলে ইমরান, ৩:৮৫


    তরীকত, তাসাওউফ ও ইস্তিকামাতের প্রকৃত অর্থ


    তরীকত (আল্লাহর দিকে অগ্রসর হওয়ার আধ্যাত্মিক পথ), হাকীকত (বস্তুর অন্তর্নিহিত সত্যের উপলব্ধি), মারিফত (আল্লাহ-পরিচয়ের গভীর জ্ঞান), সুলূক (আত্মিক পথপরিক্রমা), তাসাওউফ (আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের সাধনা) এবং ‘ইলমুল-ইহসান (ইহসান বা উৎকর্ষ সাধনের জ্ঞান)—এসবই মূলত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অনুসরণ ও আনুগত্যের মাধ্যমে পরিপূর্ণতার সর্বোচ্চ স্তর অর্জনের নাম।


    রিয়াজত (আত্মসংযম ও সাধনা), মুজাহাদা (নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম) এবং তাযকিয়া (আত্মশুদ্ধি ও পরিশুদ্ধি সাধন)-এর অর্থ এ নয় যে, মানুষ তার স্বভাবজাত চাহিদা, কামনা-বাসনার শক্তিগুলোকে দমন করে ফেলবে কিংবা সেগুলোকে নির্মূল করার চেষ্টা করবে। কারণ এতে সফল হওয়া প্রায় অসম্ভব। উপরন্তু, এসব শক্তি মানবপ্রকৃতিরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। বরং এর প্রকৃত অর্থ হলো, মানুষ শরিয়তের নির্দেশনার আলোকে তার স্বভাবজাত প্রবণতাগুলোর সংশোধন ও পরিশুদ্ধি সাধন করবে এবং সেগুলোকে বাড়াবাড়ি ও শৈথিল্যের দুই প্রান্ত থেকে রক্ষা করে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় প্রতিষ্ঠিত করবে। এই অবস্থারই নাম ইস্তিকামাত (সত্য ও সরল পথে অবিচল থাকা)।


    আল্লাহ তাআলা বলেন—


    إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنْتُمْ تُوعَدُونَ ۝ نَحْنُ أَوْلِيَاؤُكُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ


    “নিশ্চয় যারা বলে, ‘আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ’, অতঃপর তারা অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতারা অবতীর্ণ হয়ে বলে, ‘তোমরা ভয় করো না, দুঃখ করো না; বরং সেই জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ করো, যার প্রতিশ্রুতি তোমাদের দেওয়া হয়েছিল। দুনিয়ার জীবনেও আমরা তোমাদের সহচর ছিলাম এবং আখিরাতেও থাকব।’”


    — সূরা ফুসসিলাত, ৪১:৩০–৩১


    আর অন্য এক স্থানে আল্লাহ তাআলা বলেন—


    قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُوحَىٰ إِلَيَّ أَنَّمَا إِلَٰهُكُمْ إِلَٰهٌ وَاحِدٌ فَاسْتَقِيمُوا إِلَيْهِ وَاسْتَغْفِرُوهُ


    “বলুন, আমি তো তোমাদেরই মতো একজন মানুষ। আমার প্রতি ওহি প্রেরিত হয় যে, তোমাদের উপাস্য একমাত্র উপাস্য। সুতরাং তোমরা তাঁরই দিকে অবিচল থাকো এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করো।”


    — সূরা ফুসসিলাত, ৪১:৬।


    তাসাওউফের উদ্দেশ্য ও প্রকৃত লক্ষ্য


    তরীকত (আল্লাহর দিকে অগ্রসর হওয়ার আধ্যাত্মিক পথ) ও সুলূক (আত্মিক পথপরিক্রমা)-এর উদ্দেশ্য হলো, বান্দার অন্তরে আল্লাহ আহাদের সঙ্গে এমন এক গভীর ভালোবাসা, মহিমাবোধ ও শ্রদ্ধার সম্পর্ক সৃষ্টি হওয়া, যার ফলে আল্লাহ আহাদের ভালোবাসা ও হুযূরী (আল্লাহর উপস্থিতির গভীর অনুভব) বান্দার হৃদয়ে উন্মোচিত হয়ে যায়। তখন সে বাসীরাত (অন্তর্দৃষ্টি)-এর চোখে আল্লাহ তাআলার মুশাহাদা (দর্শন-উপলব্ধি) করতে থাকে।


    এর ফলে তার হৃদয় ও দেহ, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও সমগ্র সত্তার ওপর আল্লাহ তাআলার ভালোবাসা, সম্মান, নৈকট্য ও সান্নিধ্যের এমন এক কর্তৃত্ব ও প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয় যে, তার হৃদয়ের ওপর اسماء حسنیٰ (আল্লাহর সুন্দরতম নামসমূহ)-এর তাজাল্লী (ঐশী জ্যোতি প্রকাশ) একের পর এক বিকশিত ও প্রতিফলিত হতে থাকে। যেমন ফুলের মধ্যে সুগন্ধ সঞ্চারিত থাকে এবং দুধের মধ্যে ঘি সুপ্ত অবস্থায় নিহিত থাকে, তেমনি বান্দার অন্তরেও ঐশী গুণাবলির প্রভাব ক্রমশ প্রকাশিত হতে থাকে।


    তখন বান্দা নিজের জান ও প্রাণ আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের সাধনায় নিবেদিত করে দেয়। সে সর্বদা তাঁর সন্তুষ্টি অন্বেষণে মগ্ন থাকে এবং ধীরে ধীরে মাকামে উবূদিয়্যাত (পরিপূর্ণ বন্দেগীর স্তর)-এ এমন দৃঢ় ও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় যে, সে প্রতিটি বিষয়ে এবং প্রতিটি অবস্থায় আল্লাহ তাআলার ইবাদতেই নিমগ্ন থাকে। তখন তার অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়ায় যে, আল্লাহ তাআলার ইবাদত, তাঁর যিকির, তাঁর সঙ্গে মুনাজাত ও একান্ত কথোপকথনের মধ্যেই সে এক বিশেষ স্বাদ, আনন্দ ও প্রশান্তি অনুভব করতে থাকে; যেমন ক্ষুধার্ত ব্যক্তি খাদ্য পেয়ে আনন্দিত হয়।


    মাকামে উবূদিয়্যাত ও হালাওয়াতে ঈমান 


    হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে—


    قَالَ ﷺ: ذَاقَ طَعْمَ الْإِيمَانِ مَنْ رَضِيَ بِاللّٰهِ رَبًّا وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا وَبِمُحَمَّدٍ ﷺ رَسُولًا


    রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “সে ব্যক্তি ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করেছে, যে আল্লাহকে রব হিসেবে, ইসলামকে দ্বীন হিসেবে এবং মুহাম্মাদ ﷺ-কে রাসূল হিসেবে সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করেছে।”


    — সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩৪


    হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—


    ثَلَاثٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ حَلَاوَةَ الْإِيمَانِ: أَنْ يَكُونَ اللّٰهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا، وَأَنْ يُحِبَّ الْمَرْءَ لَا يُحِبُّهُ إِلَّا لِلّٰهِ، وَأَنْ يَكْرَهَ أَنْ يَعُودَ فِي الْكُفْرِ كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ فِي النَّارِ


    “তিনটি গুণ যার মধ্যে থাকবে, সে ঈমানের মাধুর্য লাভ করবে: আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তার কাছে অন্য সবকিছুর চেয়ে অধিক প্রিয় হওয়া; কাউকে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ভালোবাসা; এবং কুফরিতে ফিরে যাওয়াকে এমন অপছন্দ করা, যেমন সে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে অপছন্দ করে।”


    — সহীহ আল-বুখারী, হাদীস নং ১৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৩


    এ কারণেই রাসূলুল্লাহ ﷺ এ দোয়া করতেন—


    اللَّهُمَّ اجْعَلْ حُبَّكَ أَحَبَّ إِلَيَّ مِنْ نَفْسِي وَأَهْلِي وَمِنَ الْمَاءِ الْبَارِدِ


    “হে আল্লাহ! আপনার ভালোবাসাকে আমার কাছে আমার নিজের প্রাণ, আমার পরিবার-পরিজন এবং শীতল পানির চেয়েও অধিক প্রিয় করে দিন।”


    — জামে‘ আত-তিরমিযী, হাদীস নং ৩৪৯০ (অর্থগতভাবে)


    হযরত সিদ্দীকে আকবর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “যে ব্যক্তির অন্তরে আল্লাহর খাঁটি ভালোবাসার একটি কণাও প্রবেশ করে, তার কাছে সমগ্র দুনিয়া ও তার সবকিছুই তুচ্ছ হয়ে যায়।”


    Sazzad Chowdhury

    Sazzad Chowdhury

    Founder & Editor, House Of Wisdom. An independent Bengali knowledge publication exploring history, philosophy, Islamic intellectual tradition, literature, culture and civilization through references, historical sources and critical analysis.

    Author Profile

    Post a Comment