Table of Contents
![]() |
| বাঙালি মুসলমানের ইতিহাস শুধু ভাষার নয়, মিল্লাত, মাটি ও আত্মমর্যাদারও ইতিহাস |
Previous Part.......
বাংলা, মুসলমান ও ইতিহাসের ফ্রেম যুদ্ধ
বাঙালি মুসলমানকে নিয়ে কথা উঠলেই একটি পুরোনো অস্বস্তি ফিরে আসে। তাকে কোথায় রাখা হবে? বাংলার ভেতরে, নাকি মুসলিম জগতের ভেতরে? ভাষার ইতিহাসে, নাকি মিল্লাতের ইতিহাসে? নদী, মাটি, ধানক্ষেত, পুঁথি, মক্তব, মসজিদ, দরগাহ, কলকাতার দূরত্ব, ঢাকার উত্থান, লাহোরের প্রস্তাব, ১৯৪৬-এর ভোট, ১৯৪৭-এর মানচিত্র—এসবের মধ্যে কোনটি তার আসল পরিচয়?
এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। সহজ উত্তর খুঁজলেই বাঙালি মুসলমানকে বিকৃত করতে হয়।
এক দল তাকে শুধু “বাঙালি” হিসেবে পড়তে চায়। তাদের চোখে তার মুসলমানি পরিচয় যেন ইতিহাসের বাড়তি বোঝা; যেন তা বাংলার ওপর পরে এসে বসেছে; যেন বাংলা ভাষা থাকলেই তার ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সভ্যতাগত চেতনার আর আলাদা কোনো অর্থ থাকে না। এই পাঠে ভাষা সবকিছু গিলে ফেলে। ইসলাম হয়ে যায় ব্যক্তিগত আচার, মিল্লাত হয়ে যায় সাম্প্রদায়িকতা, মুসলিম রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা হয়ে যায় ইতিহাসের ভুল রাস্তা।
আরেক দল তাকে শুধু “মুসলমান” হিসেবে পড়তে চায়। তাদের চোখে তার বাংলা ভাষা, আঞ্চলিক জীবন, কৃষকসমাজ, নদীভিত্তিক ভূগোল, মফস্বল, লোকজ সংস্কৃতি—এসব যেন বড় পরিচয়ের গৌণ অলংকার। এতে মুসলমান থাকে, কিন্তু বাঙালি মুসলমান থাকে না। সে যেন নিজের মাটি ছাড়া একটি বিমূর্ত পরিচয়ে ঝুলে থাকে।
দুই পাঠই অর্ধেক সত্য। আর অর্ধেক সত্য অনেক সময় সরাসরি মিথ্যার চেয়েও বেশি বিপজ্জনক।
বাঙালি মুসলমান দুই জগতের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা জাতিগত সত্তা। এই দাঁড়িয়ে থাকা দুর্বলতা নয়; বরং তার ইতিহাসের প্রকৃতি। তার মুখে বাংলা ভাষা, তার ঘরে ইসলামি রীতি, তার সামাজিক জীবনে আরবি-ফারসি শব্দ, তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘুর দ্বন্দ্ব, তার অর্থনৈতিক ইতিহাসে জমি ও কৃষকের প্রশ্ন, তার আত্মমর্যাদায় মিল্লাতের চেতনা। তাকে এক দিক থেকে পড়লে অন্য দিক অন্ধকারে পড়ে যায়।
শাহবাগী-জাতীয়তাবাদী ফ্রেম এই জটিলতাকে সাধারণত ভাষার মধ্যে বন্দি করে। সেখানে বাঙালি মুসলমানের মুসলমানি পরিচয়কে সন্দেহের চোখে দেখা হয়। মনে করা হয়, এ পরিচয় বাংলার স্বাভাবিক ধারার বাইরে থেকে এসেছে, তাই বাংলা জাতীয়তার ভেতরে তাকে যতটা সম্ভব নরম, ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় করে রাখতে হবে। এই পাঠের সুবিধা আছে। এতে ইতিহাস সহজ হয়ে যায়। ভাষা একমাত্র আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায়। ধর্ম, মিল্লাত, শরিয়তি চেতনা, মুসলিম রাজনীতি—এসবকে “সাম্প্রদায়িকতা” বলে দূরে সরানো যায়।
কিন্তু মুসলমানের নিজের ভেতরেও আরেক বিপদ আছে। সে কখনো নিজের মাটির রাজনৈতিক পূর্বপুরুষদের ভুলে গিয়ে দূরের প্রতীকে আশ্রয় নেয়। জিন্নাহকে মনে রাখে, কিন্তু সোহরাওয়ার্দীকে অস্বস্তিতে রাখে। লাহোর প্রস্তাব মনে রাখে, কিন্তু বাংলায় মুসলিম লীগের district organisation (জেলা-স্তরের সংগঠন), আবুল হাশিমের সাংগঠনিক শ্রম, ১৯৪৬ সালের নির্বাচনী বিস্ফোরণ, অখণ্ড বাংলার শেষ দরকষাকষি—এসবকে নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারে বসাতে পারে না। এতে মুসলিম পরিচয় থাকে, কিন্তু বাঙালি মুসলমানের নিজস্ব রাজনৈতিক শরীর অস্পষ্ট হয়ে যায়।
বাঙালি মুসলমানকে ভাষা থেকে কেটে ফেললে তার মাটির শরীর হারিয়ে যায়। আবার তাকে শুধু ভাষার মধ্যে গিলে ফেললে তার মিল্লাত, ঈমান, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সভ্যতাগত চেতনা মুছে যায়। তাকে পাকিস্তানের footnote (পাদটীকা) বানানোও ভুল; সর্বভারতীয় মুসলিম রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ বানানোও ভুল। তার পরিচয় বুঝতে হলে ভাষা, মিল্লাত, ভূমি, সামাজিক উত্তরাধিকার, শিক্ষাগত পশ্চাদপদতা, হিন্দু অভিজাত আধিপত্য, মুসলিম মধ্যবিত্তের উত্থান, কৃষকসমাজের বাস্তবতা এবং ৪৭-এর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা—সব একসঙ্গে পড়তে হবে।
“বাঙালি মুসলমান” কোনো নরম সাংস্কৃতিক শব্দ নয়। এটি একটি historical formation (ঐতিহাসিক গঠন)। তার ভিতরে আছে দাওয়াহ, দরগাহ, মসজিদ, মক্তব, ফারসি-আরবি শব্দ, বাংলা ভাষা, কৃষকজীবন, জমিদারি, ঔপনিবেশিক আদালত, আলীগড়ের প্রভাব, কলকাতার দূরত্ব, ঢাকা-মফস্বলের অস্বস্তি, পাকিস্তান আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, এবং পরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বয়ানের সঙ্গে সংঘাত।
তাকে শুধু রবীন্দ্রনাথের বাংলা দিয়ে বোঝা যায় না। তাকে শুধু করাচি-লাহোরের মুসলিম রাজনীতি দিয়েও বোঝা যায় না। সে বাংলার মাটিতে দাঁড়ানো মুসলমান, আবার মুসলিম ইতিহাসের দীর্ঘ আকাশের নিচে দাঁড়ানো বাঙালি।
এই দ্বৈততা কোনো দুর্বলতা নয়। এটিই তার ইতিহাস।
ভাষা আছে, কিন্তু ভাষাই শেষ কথা নয়
বাঙালি মুসলমান বাংলা ভাষায় কথা বলে। এ কথা নিয়ে তর্কের সুযোগ নেই। কিন্তু ভাষা কোনো জাতির পূর্ণ পরিচয় নয়। ভাষা মানুষকে মুখ দেয়, কিন্তু সেই মুখ কী বলবে, কোন ইতিহাস মনে রাখবে, কোন নৈতিকতার কাছে মাথা নত করবে, কোন অপমানকে রাজনৈতিক প্রশ্ন বানাবে—এসব ভাষা একা ঠিক করে না।
বাংলা ভাষা বাঙালি মুসলমানের ঘরের ভাষা, দুঃখের ভাষা, মাটির ভাষা। কিন্তু তার আত্মপরিচয়ের ভিতরে আছে ইসলামি শব্দভান্ডার, আরবি-ফারসি উৎসের সামাজিক ভাষা, ধর্মীয় রীতি, শরিয়তি চেতনা, মিল্লাতের ধারণা এবং মুসলিম ইতিহাসের দীর্ঘ ছায়া। বাংলার মুসলমান বাংলা বলেছে, কিন্তু তার বাংলা খালি শব্দের বাংলা নয়। সেই বাংলার ভিতরে আছে সালাম, দোয়া, হালাল-হারাম, ইমান-আকিদা, কবর-ফাতেহা, মসজিদ-মক্তব, শরিয়ত-তরিকত, দরগাহ-মাহফিল—একটি আলাদা সামাজিক জগতের চিহ্ন।
মোহাম্মদ আকরম খাঁর মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস এই জায়গায় দরকারি। তিনি বাঙালি মুসলমানের ভাষা ও সমাজকে এমনভাবে দেখেন, যেখানে বাংলা ভাষা আছে, কিন্তু সেই বাংলার ভেতরে মুসলমানি শব্দভান্ডার, আরবি-ফারসি প্রভাব, ধর্মীয় অভ্যাস, সামাজিক রূপান্তর এবং আলাদা ইতিহাসবোধ কাজ করছে। ভাষা এখানে শুধু ব্যাকরণ নয়; ভাষা সামাজিক পরিচয়ের বাহন। (মোহাম্মদ আকরম খাঁ, মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস, পৃ. ১০–১৮)
এই পার্থক্য না ধরলে “বাঙালি” শব্দটি খুব সহজে হিন্দু অভিজাতের সাংস্কৃতিক বাংলায় পরিণত হয়। ভাষা তখন নিরপেক্ষ থাকে না; ভাষার ভিতরে একটি বিশেষ ইতিহাস ঢুকে পড়ে। কলকাতাকেন্দ্রিক শিক্ষিত হিন্দু অভিজাত যখন বাংলা আধুনিকতার ভাষা তৈরি করছিল, তখন বাংলার মুসলমান একই গতিতে সেই ভাষার মালিক ছিল না। সে বাংলায় কথা বলেছে, কিন্তু বাংলা সাহিত্যিক আধুনিকতার কেন্দ্রীয় মঞ্চে তার প্রবেশ দেরিতে হয়েছে। সে বাংলা অঞ্চলের মানুষ, কিন্তু বাংলা নবজাগরণের আলো তার ঘরে একইভাবে পৌঁছায়নি।
এই ফারাক শুধু সাহিত্যিক নয়; রাজনৈতিকও।
বাংলায় ইসলাম কোনো হঠাৎ এসে পড়া পরিচয় নয়। নদী, বন্দর, বাণিজ্য, সুফি-সাধক, মসজিদ, খানকাহ, মক্তব, দরগাহ, মুসলিম শাসন, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভেতর দিয়ে ইসলাম এখানে একটি সামাজিক জগৎ তৈরি করেছে। ড. সায়ীদ ওয়াকিল দেখিয়েছেন, বাংলায় মুসলমান আগমন, ইসলাম প্রচার, সুফি-সাধকদের ভূমিকা, মুসলিম শাসন এবং বাংলা ভাষা-সাহিত্যে মুসলিম অবদান—এসব আলাদা আলাদা ঘটনা নয়; এগুলো মিলে মুসলিম বাংলার একটি দীর্ঘ সভ্যতাগত ধারাবাহিকতা তৈরি করে। (ড. সায়ীদ ওয়াকিল, বাংলায় ইসলাম ও মুসলিম সভ্যতা, পৃ. ৯–১৭)
তাই বাংলার মুসলমানকে শুধু ঔপনিবেশিক যুগের ভোট-সত্তা হিসেবে পড়া ভুল। তার আগে আছে কয়েক শতকের ধর্মীয় চেতনা, সামাজিক বিন্যাস, ভাষাগত রূপান্তর এবং সভ্যতাগত উত্তরাধিকার। সে বাংলার মাটিতে গঠিত, কিন্তু তার মানসিক আকাশ শুধু আঞ্চলিক নয়। তার বাংলা জীবনের ভিতরেই ইসলাম ঘর বানিয়েছে।
এই জায়গায় ভাষাভিত্তিক পরিচয়ের সীমা স্পষ্ট হয়। ভাষা মিথ্যা নয়; কিন্তু ভাষা একা যথেষ্ট নয়। বাঙালি মুসলমান বাংলা ভাষার মানুষ, কিন্তু সে শুধু ভাষার মানুষ নয়। সে এমন এক সমাজের মানুষ, যার ধর্মীয় ও সভ্যতাগত চেতনা তাকে আরাকান থেকে দিল্লি, মক্কা থেকে বাগদাদ, সিলেট থেকে গৌড়, ঢাকা থেকে লাহোর—এক বিস্তৃত জগতে যুক্ত করে। সে যখন বাংলা বলে, তার ভেতরে শুধু অঞ্চল কথা বলে না; মিল্লাতও কথা বলে।
এ কারণেই “বাঙালি মুসলমান” শব্দটি সহজ নয়। এখানে “বাঙালি” ও “মুসলমান” পাশাপাশি বসে আছে, কিন্তু সবসময় শান্তিতে বসে নেই। কখনো ভাষা ধর্মকে সন্দেহ করে। কখনো ধর্ম ভাষাকে গৌণ করতে চায়। কখনো রাষ্ট্র একটিকে তুলে আরেকটিকে চাপা দেয়। কখনো রাজনীতি দুটিকে আলাদা শিবিরে ঠেলে দেয়। কিন্তু বাস্তব জীবনে বাঙালি মুসলমান এই দুটোকে আলাদা করে বাঁচেনি। সে বাংলা বলেছে, মুসলমান থেকেছে; মাঠে চাষ করেছে, ঈদ করেছে; পুঁথি পড়েছে, মক্তবে গেছে; নদীর সঙ্গে থেকেছে, কিবলার দিকে মুখ ফিরিয়েছে।
এই জীবনকে শুধু ভাষা দিয়ে মাপা যায় না। আবার শুধু বিমূর্ত মুসলিম পরিচয় দিয়েও মাপা যায় না। বাঙালি মুসলমানের পরিচয় ভাষার ভিতরে, কিন্তু ভাষার বাইরে; অঞ্চলের ভিতরে, কিন্তু অঞ্চলের বাইরে; বাংলার মাটিতে, কিন্তু মিল্লাতের চেতনায়।
মুসলিম বাংলার আলাদা বাস্তবতা
বাংলার মুসলমানকে বুঝতে হলে একটি কঠিন সত্য মানতে হবে। সে বাংলারই মানুষ, কিন্তু বাংলা সমাজে তার যাত্রাপথ হিন্দু অভিজাতের যাত্রাপথের মতো ছিল না। একই ভূখণ্ড, একই ভাষা, একই নদী—তবু ইতিহাসের অভিজ্ঞতা এক নয়।
হিন্দু অভিজাতের কাছে ঊনবিংশ শতাব্দী অনেক জায়গায় আধুনিক শিক্ষার দরজা, প্রশাসনিক সুযোগ, কলকাতাকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব এবং নতুন মধ্যবিত্ত শক্তির সময়। মুসলমানের কাছে একই শতাব্দী অনেক জায়গায় ক্ষমতা হারানোর পরবর্তী ধাক্কা, শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া, জমি-অর্থনীতি-প্রশাসনে দুর্বলতা, এবং নতুন রাষ্ট্রীয় ভাষা শেখার দেরির সময়।
এই ফারাক না ধরলে বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব বোঝা যায় না।
ইংরেজ শাসনের পর বাংলার মুসলমান শুধু এক শাসকশ্রেণি হারায়নি; সে হারিয়েছে ক্ষমতার ভাষা। ফারসি সরে গেছে, ইংরেজি এসেছে। পুরোনো দরবারি, প্রশাসনিক, শিক্ষাগত ও আইনি জগৎ বদলে গেছে। নতুন শিক্ষাব্যবস্থায় দ্রুত ঢুকেছে হিন্দু অভিজাত সমাজ। মুসলমান সমাজের বড় অংশ গ্রামীণ, কৃষিনির্ভর, দরিদ্র, শিক্ষায় পিছিয়ে। ফলে বাংলা ভাষায় দুজন মানুষ কথা বললেও রাষ্ট্র, চাকরি, আদালত, শিক্ষা ও মর্যাদার দৌড়ে তারা একই জায়গা থেকে শুরু করেনি।
আব্বাস আলী খানের বাংলার মুসলমানের ইতিহাস এই দীর্ঘ ভাঙন ও পুনর্গঠনের ধারাকে সামনে আনে। মুসলিম শাসন থেকে ইংরেজ শাসন, শিক্ষা-সংকট থেকে মুসলিম মধ্যবিত্তের উত্থান, মুসলিম লীগ থেকে পাকিস্তান আন্দোলন—এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো বাঙালি মুসলমানের দীর্ঘ আত্মসংগ্রামের আলাদা স্তর। (আব্বাস আলী খান, বাংলার মুসলমানের ইতিহাস, পৃ. ৫৭–৮০, ৮৬–৯৪, ৯৭–১১৬, ১৪০–১৮৮)
হিন্দু নবজাগরণকে অস্বীকার করার দরকার নেই। কিন্তু তাকে “বাংলার নবজাগরণ” বলে এককভাবে লিখলে সমস্যা আছে। কারণ সেই নবজাগরণের সামাজিক মালিকানা সমান ছিল না। বাংলা ভাষার আধুনিক সাহিত্য, মুদ্রণ, শিক্ষা, সংবাদপত্র, শহুরে সভা-সমিতি, কলকাতাকেন্দ্রিক বুদ্ধিবৃত্তি—এসবের কেন্দ্রে হিন্দু অভিজাতের শক্তি ছিল। মুসলমান সেখানে ছিল প্রান্তে, কখনো সন্দেহে, কখনো দেরিতে, কখনো নিজের আলাদা ভাষা ও আত্মমর্যাদার প্রশ্ন নিয়ে।
জয়া চ্যাটার্জীর বাংলা ভাগ হল এই হিন্দু অভিজাত রাজনীতির আরেক দিক খুলে দেয়। দেশভাগকে শুধু মুসলিম লীগের “সাম্প্রদায়িক দাবি” বলে পড়লে বাংলার বাস্তব রাজনীতি বোঝা যায় না। জমি, শ্রেণি, বর্ণ, হিন্দু অভিজাত স্বার্থ, Bengal Congress (বঙ্গীয় কংগ্রেস), Hindu Mahasabha (হিন্দু মহাসভা)—এসবের ভিতর দিয়েও বাংলা ভাগের রাজনীতি তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ মুসলমান আলাদা রাজনৈতিক ভাষা খুঁজেছে শুধু ধর্মীয় আবেগে নয়; সে এমন এক সামাজিক কাঠামোর মুখোমুখি ছিল, যেখানে ভাষার মিল থাকা সত্ত্বেও ক্ষমতার বণ্টন অসম ছিল। (জয়া চ্যাটার্জী, বাংলা ভাগ হল, পৃ. ১–৩, ২৩–৩৬, ৩৭–১২২)
এই অসমতার কারণেই মুসলমানের কাছে “মুসলমান” পরিচয় শুধু মসজিদের পরিচয় ছিল না। এটি ছিল রাজনৈতিক নিরাপত্তা, প্রতিনিধিত্ব, জমি, শিক্ষা, চাকরি, আত্মমর্যাদা এবং ভবিষ্যতের প্রশ্ন। সে কেন নিজেকে শুধু “বাঙালি” বলল না—এই প্রশ্ন করার আগে দেখতে হবে, “বাঙালি” শব্দের বাস্তব সামাজিক মালিক কে ছিল। যদি বাংলা আধুনিকতার মঞ্চে মুসলমান দেরিতে পৌঁছায়, যদি ভাষার নামে হিন্দু অভিজাত সংস্কৃতি মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়, যদি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় মুসলমানের প্রবেশ দুর্বল হয়, তাহলে মুসলমান আলাদা রাজনৈতিক ভাষা খুঁজবেই।
এখানে ধর্ম তার কাছে পালানোর পথ নয়। আত্মরক্ষার ভাষা।
এই কারণেই পূর্ববাংলার মুসলমান যখন ৪৭-এর দিকে এগোয়, সে শুধু প্রাদেশিক ক্ষোভ নিয়ে এগোয় না। সে শুধু কলকাতার আধিপত্য থেকে বের হতে চায় না। সে শুধু জমিদারি বা চাকরির অন্যায় হিসাব মেলাতে চায় না। সে নিজেকে বৃহত্তর Muslim nationhood (মুসলিম জাতিসত্তা)-এর ভিতরে দেখতে শুরু করে। এই জাতিসত্তা তার ভাষাকে মুছে দেয় না; বরং ভাষার বাইরে থাকা তার রাজনৈতিক ক্ষত ও সভ্যতাগত পরিচয়কে ভাষা দেয়।
বাঙালি মুসলমানের আলাদা বাস্তবতা এখানেই। সে বাংলার মানুষ, কিন্তু “বাংলা” তার কাছে সবসময় নিরাপদ ঘর ছিল না। সে মুসলমান, কিন্তু তার মুসলমানি আকাশে শুধু আরব-পারস্যের প্রতিধ্বনি নেই; আছে ধানক্ষেত, নদী, পীরের দরগাহ, মক্তব, গ্রামীণ দুঃখ, মসজিদের আযান, জমিদারের খাতা, আদালতের নোটিশ, কলকাতার দূরত্ব, এবং নিজের ভাগ্য নিজে লেখার আকাঙ্ক্ষা।
এই বাস্তবতাকে না বুঝলে “বাঙালি মুসলমান” শুধু শব্দ থাকে। ইতিহাস হয় না।
হিন্দু নবজাগরণ বনাম মুসলিম বাস্তবতার ফারাক
বাংলার ইতিহাসে “নবজাগরণ” শব্দটি খুব সহজে ব্যবহার করা হয়। যেন ঊনবিংশ শতাব্দীর কলকাতা উঠল, ইংরেজি শিক্ষা এল, মুদ্রণযন্ত্র ছড়াল, সংবাদপত্র তৈরি হলো, নতুন সাহিত্য জন্ম নিল—আর সেই আলো সমানভাবে পুরো বাংলায় পৌঁছে গেল। কিন্তু ইতিহাস এত সরল নয়। যে আলো কলকাতার হিন্দু অভিজাত ঘরে পৌঁছেছিল, তা একইভাবে পূর্ববঙ্গের মুসলমান কৃষক-সমাজে পৌঁছায়নি। একই ভূখণ্ডে থেকেও দুই সমাজ একই গতিতে আধুনিক হয়নি, একই ভাষায় কথা বলেও একই সামাজিক ক্ষমতার মালিক হয়নি।
হিন্দু নবজাগরণকে অস্বীকার করার দরকার নেই। তা করলে ইতিহাসের আরেক মিথ তৈরি হয়। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম, মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ—এরা বাংলা ভাষা ও আধুনিকতার এক বিরাট অধ্যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই নবজাগরণের সামাজিক ভিত্তি কার হাতে ছিল? এর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কারা ব্যবহার করল? আদালত, চাকরি, মুদ্রণ, সংবাদপত্র, সাহিত্যসভা, প্রশাসনিক পেশা—এসব জায়গায় কারা দ্রুত ঢুকল? আর কারা বাইরে রইল?
এই প্রশ্ন করলেই দেখা যায়, “বাংলার নবজাগরণ” আসলে অনেকাংশে হিন্দু অভিজাতের নবজাগরণ। বাংলার মুসলমান তার বাইরে পুরোপুরি ছিল না, কিন্তু কেন্দ্রেও ছিল না। তার ভাষা বাংলা, কিন্তু বাংলা আধুনিকতার দালান সে বানায়নি; সে অনেক সময় সেই দালানের দরজায় দেরিতে এসে দাঁড়িয়েছে। তার দেরির পেছনে অলসতা একমাত্র কারণ নয়। ইংরেজ শাসনের পর সে একসঙ্গে হারিয়েছে ক্ষমতার পুরোনো ভাষা, প্রশাসনিক অবস্থান, শিক্ষাগত পথ, সামাজিক আত্মবিশ্বাস এবং নতুন রাষ্ট্রযন্ত্রে প্রবেশের প্রস্তুতি।
ফারসি সরে গিয়ে ইংরেজি এল। পুরোনো দরবারি জগৎ ভেঙে গেল। আদালত, চাকরি, শিক্ষা, মুদ্রণ, ব্যবসা—সব জায়গায় নতুন ভাষা ও নতুন দক্ষতার প্রয়োজন তৈরি হলো। হিন্দু অভিজাত সমাজ দ্রুত সেই ভাষা শিখল, নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিল, কলকাতাকে কেন্দ্র করে এক নতুন মধ্যবিত্ত শক্তি তৈরি করল। বাংলার মুসলমানের বড় অংশ তখনও গ্রামীণ, কৃষিনির্ভর, শিক্ষায় পিছিয়ে, সামাজিকভাবে ভাঙা। ফলে দুই সম্প্রদায় একই বাংলায় বাস করলেও আধুনিকতার দৌড়ে তাদের starting point (শুরুর অবস্থান) এক ছিল না।
আব্বাস আলী খান বাংলার মুসলমানের এই পতন ও পুনর্গঠনের ধারাকে শুধু রাজনৈতিক ঘটনার তালিকা হিসেবে দেখেননি। মুসলিম শাসন থেকে ইংরেজ শাসন, শিক্ষার সংকট, সামাজিক পশ্চাদপদতা, মুসলিম মধ্যবিত্তের ধীর উত্থান, মুসলিম লীগ, পাকিস্তান আন্দোলন—এসব তাঁর আলোচনায় এক দীর্ঘ আত্মসংগ্রামের পর্ব। এই ধারায় বোঝা যায়, বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক চেতনা হঠাৎ ১৯৪০ বা ১৯৪৭ সালে তৈরি হয়নি; তার পেছনে ছিল বহু দশকের বঞ্চনা, দেরি, অপমান ও সংগঠিত হওয়ার প্রয়োজন। (আব্বাস আলী খান, বাংলার মুসলমানের ইতিহাস, পৃ. ৫৭–৮০, ৮৬–৯৪, ৯৭–১১৬, ১৪০–১৮৮)
এখানে “ভাষা” প্রশ্নটি আবার ফিরে আসে। বাংলা ভাষা দুই সম্প্রদায়ের মুখে থাকলেও ভাষার সামাজিক মালিকানা সমান ছিল না। যে বাংলা সাহিত্যের আধুনিক রূপ কলকাতায় গড়ে উঠছিল, তার কেন্দ্র ছিল হিন্দু অভিজাতের শিক্ষিত সমাজ। মুসলমানও বাংলা বলত, কিন্তু তার বাংলার ভেতরে ছিল অন্য শব্দ, অন্য ধর্মীয় জীবন, অন্য সামাজিক অভিজ্ঞতা। আকরম খাঁ যখন মুসলমান সমাজের ভাষা, আরবি-ফারসি শব্দ, সামাজিক রীতি ও ঐতিহাসিক গঠনের কথা বলেন, তখন এই ফারাকটাই সামনে আসে। মুসলমানের বাংলা হিন্দু অভিজাতের বাংলা থেকে আলাদা কোনো ভাষা নয়, কিন্তু তার ভেতরের জীবন আলাদা। (মোহাম্মদ আকরম খাঁ, মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস, পৃ. ১০–১৮, ৫৭–৬১, ৮৬–৯২)
বাংলায় ইসলামও কেবল নামের ধর্ম হয়ে থাকেনি। নদীপথ, বাণিজ্য, সুফি-সাধক, মসজিদ, খানকাহ, মক্তব, মুসলিম শাসন, পীর-দরগাহ, পুঁথি ও লোকজ ধারার ভিতর দিয়ে ইসলাম বাংলায় একটি সামাজিক জগৎ তৈরি করেছে। ড. সায়ীদ ওয়াকিল বাংলায় মুসলমান আগমন, ইসলাম প্রচার, সুফি-সাধকদের ভূমিকা, মুসলিম শাসন এবং বাংলা ভাষা-সাহিত্যে মুসলিম অবদানের ধারাকে একসঙ্গে ধরেছেন। এতে বোঝা যায়, বাংলার মুসলমান কোনো ঔপনিবেশিক ভোট-সমীকরণের আকস্মিক ফল নয়; সে কয়েক শতকের ধর্মীয় চেতনা, ভাষাগত রূপান্তর ও সভ্যতাগত উত্তরাধিকার নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক সমাজ। (ড. সায়ীদ ওয়াকিল, বাংলায় ইসলাম ও মুসলিম সভ্যতা, পৃ. ৯–১৭)
এই জায়গায় হিন্দু নবজাগরণ ও মুসলিম বাস্তবতার ফারাক আরও পরিষ্কার হয়। হিন্দু অভিজাতের কাছে আধুনিকতা ছিল অনেক ক্ষেত্রে অগ্রগতির সিঁড়ি। মুসলমানের কাছে আধুনিকতা ছিল একই সঙ্গে প্রয়োজন ও আশঙ্কা। ইংরেজি শিক্ষা না নিলে সে পিছিয়ে পড়বে; কিন্তু ইংরেজি শিক্ষা নিতে গেলে তাকে পুরোনো ধর্মীয় শিক্ষার জগৎ, সামাজিক সন্দেহ, অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং অভিজাত হিন্দু-প্রাধান্যযুক্ত শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে লড়তে হবে। ফলে মুসলিম মধ্যবিত্তের জন্ম বিলম্বিত হয়। আর এই বিলম্ব পরবর্তীতে রাজনৈতিক ক্ষোভে রূপ নেয়।
এই ক্ষোভকে শুধু সাম্প্রদায়িকতা বললে ইতিহাসের অর্ধেক মুছে যায়। মুসলমান যখন আলাদা প্রতিনিধিত্ব চেয়েছে, আলাদা শিক্ষাগত উন্নতি চেয়েছে, আলাদা রাজনৈতিক নিরাপত্তা চেয়েছে, তখন সে কেবল ধর্মীয় আবেগে কথা বলেনি। সে এমন এক সমাজ থেকে কথা বলেছে, যে দেখেছে—ভাষার মিল থাকলেও ক্ষমতার দুনিয়ায় তার স্থান দুর্বল; বাংলার নাম থাকলেও বাংলার আধুনিক প্রতিষ্ঠানে তার অংশ কম; একই প্রদেশে থেকেও প্রশাসন, শিক্ষা, জমি, পেশা ও সাংস্কৃতিক নেতৃত্বে তার প্রবেশ সীমিত।
জয়া চ্যাটার্জী বাংলার দেশভাগকে এই সামাজিক বাস্তবতার ভিতরেই পড়তে বাধ্য করেন। তাঁর আলোচনায় দেশভাগ শুধু মুসলিম লীগের দাবি নয়; হিন্দু অভিজাত রাজনীতি, জমি-শ্রেণি-বর্ণের হিসাব, Bengal Congress (বঙ্গীয় কংগ্রেস), Hindu Mahasabha (হিন্দু মহাসভা), এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববাংলা সম্পর্কে হিন্দু অভিজাতের ভয়—এসব মিলেও বাংলা ভাগের পথ তৈরি করেছে। অর্থাৎ “বাংলা” নামে এক ভাষিক একতা ছিল, কিন্তু সেই একতার ভিতরে ক্ষমতার ভয়, শ্রেণিগত স্বার্থ, জমির হিসাব এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার আতঙ্ক কাজ করছিল। (জয়া চ্যাটার্জী, বাংলা ভাগ হল, পৃ. ১–৩, ২৩–৩৬, ৩৭–১২২)
এই কারণে “হিন্দু নবজাগরণ বনাম মুসলিম বাস্তবতা” কোনো স্লোগান নয়। এটি বাংলার দুই সামাজিক গতির ফারাক। একদিকে কলকাতাকেন্দ্রিক শিক্ষিত হিন্দু অভিজাত সমাজ ভাষা, সাহিত্য, প্রশাসন ও আধুনিক পেশার দখল নিয়ে নতুন যুগে প্রবেশ করছে। অন্যদিকে মুসলমান সমাজ নিজের পতনের হিসাব বুঝে উঠতে উঠতে দেরিতে শিক্ষা, সংগঠন ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের পথে হাঁটছে। এই দুই গতিকে এক করে “বাঙালি” বললে মুসলমানের ইতিহাস মুছে যায়। আবার হিন্দু নবজাগরণকে পুরো অস্বীকার করলেও বাংলার আধুনিকতার বড় অংশ বোঝা যায় না।
বাঙালি মুসলমানের আলাদা রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব এখান থেকেই জন্ম নেয়। সে বাংলা ভাষাকে অস্বীকার করেনি; কিন্তু ভাষার নামে নিজের অধিকার ছেড়ে দেয়নি। সে বাংলার মাটিকে অস্বীকার করেনি; কিন্তু সেই মাটিতে হিন্দু অভিজাতের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক প্রাধান্যকে নিজের ভাগ্য বলে মেনে নেয়নি। সে ইসলামকে শুধু মসজিদের ভিতরে রাখেনি; কারণ তার কাছে ইসলাম ছিল আত্মমর্যাদা, মিল্লাত, সামাজিক ন্যায়, রাজনৈতিক নিরাপত্তা এবং ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার ভাষা।
এই মনস্তত্ত্ব না ধরলে ১৯৪৬-এর ভোট বোঝা যায় না। মুসলমান কৃষক কেন মুসলিম লীগের দিকে গেল, কেন পাকিস্তান দাবির ভাষা পূর্ববাংলায় এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল, কেন “মুসলমান” পরিচয় তার কাছে শুধু ধর্মীয় পরিচয় রইল না—এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু দলীয় প্রচারণায় পাওয়া যাবে না। এর পেছনে ছিল দীর্ঘ বঞ্চনা, ভাষার ভেতরে অসম মর্যাদা, জমি ও ক্ষমতার প্রশ্ন, এবং এমন এক ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষা যেখানে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজ নিজের রাজনৈতিক ভাগ্য নিজে লিখতে পারবে।
এখানে পূর্ববাংলার কৃষককে বিশেষভাবে দেখতে হবে। সে কলকাতার সাহিত্যসভায় ছিল না, কিন্তু বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সমাজের বাস্তব শরীর সে-ই। তার দারিদ্র্য, জমি, খাজনা, মহাজন, জমিদার, মসজিদ, মক্তব, পীর, পরিবার, মৌসুম, হাট—এসবের মধ্যে তার রাজনীতি গঠিত হয়েছে। পাকিস্তান তার কাছে সবসময় দার্শনিক রাষ্ট্রতত্ত্ব ছিল না; অনেক সময় ছিল মর্যাদার ভাষা, সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার আত্মবিশ্বাস, হিন্দু অভিজাত প্রাধান্য থেকে বের হওয়ার আশা, এবং নিজের সমাজকে নতুনভাবে দাঁড় করানোর স্বপ্ন।
এই স্বপ্নের ভিতরে ভুল ছিল, অস্পষ্টতা ছিল, পরে ভাঙনও এসেছে। কিন্তু স্বপ্নটি কেন জন্মেছিল, তা না বুঝে তাকে কেবল “সাম্প্রদায়িকতা” বলা বুদ্ধিবৃত্তিক অলসতা। আবার সেই স্বপ্নকে নির্ভুল মুক্তির কাহিনি বানানোও ইতিহাস নয়। বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক চেতনা জন্মেছে আঘাত, দেরি, আকাঙ্ক্ষা, ধর্মীয় আত্মপরিচয়, সামাজিক অপমান এবং ক্ষমতায় অংশ নেওয়ার তাগিদের মধ্যে দিয়ে।
এই ফারাক শুধু ক্ষোভ তৈরি করেনি; বাংলার মুসলমানকে সংগঠনের দিকে ঠেলে দিয়েছে। যে সমাজ একদিন ক্ষমতার ভাষা হারিয়েছিল, সে ধীরে ধীরে নতুন রাজনৈতিক ভাষা খুঁজতে শুরু করল। শিক্ষা, জমি, প্রতিনিধিত্ব, চাকরি, মর্যাদা—এসব আলাদা আলাদা দাবি হয়ে থাকেনি; এগুলো মিলেই মুসলিম বাংলার রাজনৈতিক আত্মপ্রকাশের ভিত তৈরি করল।
এই আত্মপ্রকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্ব দেখা যায় ১৯৪০-এর দশকে। তখন বাংলার মুসলমান আর শুধু অভিযোগের ভাষায় নেই; সে সংগঠন গড়ছে, জেলা পর্যায়ে নামছে, নির্বাচনকে নিজের শক্তি দেখানোর ময়দান বানাচ্ছে, কৃষকসমাজকে রাজনৈতিক ভাষার ভিতরে আনছে। এই সময়েই সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম সামনে আসেন। সোহরাওয়ার্দী প্রশাসনিক দক্ষতা ও সংগঠনী বাস্তবতার মানুষ; আবুল হাশিম সংগঠন, চিন্তা ও জনভিত্তির ভাষা তৈরির মানুষ। তাঁদের হাতে বাংলার মুসলিম রাজনীতি কেবল দাবি নয়, কাঠামো পেতে শুরু করে।
সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম: বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক আত্মপ্রকাশ
বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক আত্মপ্রকাশ শুধু একটি স্লোগানের ইতিহাস নয়। এটি সংগঠনের ইতিহাস, নেতৃত্বের ইতিহাস, কৃষকসমাজকে রাজনৈতিক ভাষায় আনার ইতিহাস। লাহোর প্রস্তাব মুসলিম জাতিসত্তার রাষ্ট্রীয় ভাষা দিয়েছিল; কিন্তু সেই ভাষা বাংলার গ্রাম, মফস্বল, জেলা, ভোট, কৃষকসমাজ ও প্রাদেশিক রাজনীতির শরীর পেয়েছে বাংলার ভিতরের নেতৃত্বের হাতে। এই জায়গায় সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমকে তাদের প্রকৃত ওজনে পড়তে হয়। তাঁরা ফজলুল হকের বিকল্প নন, জিন্নাহর প্রতিচ্ছবিও নন। তাঁরা বাংলার মুসলিম রাজনীতির নিজস্ব পরিণতির দুই আলাদা মুখ।
সোহরাওয়ার্দী ছিলেন organiser-administrator (সংগঠক-প্রশাসক)। তিনি রাজনীতিকে শুধু ভাষণ, আবেগ বা নৈতিক দাবির জায়গা থেকে দেখেননি। ক্ষমতা, প্রশাসন, দল, নির্বাচন, শহর, সংবাদপত্র, পৃষ্ঠপোষকতা, প্রাদেশিক দরকষাকষি—এসবের বাস্তব ভাষাও তিনি বুঝতেন। তাঁর রাজনীতি নিখুঁত নৈতিকতার কাহিনি নয়। সেখানে উচ্চাকাঙ্ক্ষা আছে, ক্ষমতার হিসাব আছে, প্রশাসনিক দক্ষতা আছে, বিরোধীকে ঠেলে দেওয়ার কৌশল আছে, আবার জনভিত্তির গুরুত্ব বোঝার বাস্তববুদ্ধিও আছে। বাংলার মুসলিম লীগকে তিনি কলকাতার সীমিত অভিজাত পরিসর থেকে বড় প্রাদেশিক শক্তির দিকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন।
আবুল হাশিম ছিলেন organisational-intellectual force (সংগঠনী-বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি)। তাঁর মধ্যে শুধু দলীয় কৌশল ছিল না; ছিল সংগঠনকে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা। তিনি বুঝেছিলেন, মুসলিম লীগ যদি কেবল মন্ত্রিত্ব, টিকিট, পদ আর ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষায় আটকে থাকে, তাহলে মুসলিম বাংলার বৃহত্তর সমাজকে ধরতে পারবে না। তাকে জেলায় নামতে হবে, কর্মী তৈরি করতে হবে, পাঠাগার খুলতে হবে, স্থানীয় সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হতে হবে, দরিদ্র মানুষের ভাষা ধরতে হবে। মুসলিম লীগের ভিতরে প্রাণ ঢোকানোর এই চেষ্টা তাঁকে আলাদা করে।
১৯৪০-এর দশকে বাংলার মুসলিম লীগ এক নতুন সন্ধিক্ষণে দাঁড়ায়। বাইরে থেকে এটি মুসলিম জাতিসত্তার দাবির প্রাদেশিক বাহন, কিন্তু ভেতরে ছিল নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, অভিজাত স্বার্থ, জেলা-সংগঠনের দুর্বলতা, কৃষকসমাজকে ধরার প্রয়োজন, এবং কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগের সঙ্গে প্রাদেশিক হিসাবের টানাপোড়েন। এই টানাপোড়েনকে শুধু দলীয় কলহ বলে উড়িয়ে দিলে ভুল হবে। এখানেই বাংলার মুসলিম রাজনীতি অভিজাত দরবারের সীমা পেরিয়ে জনভিত্তির দিকে এগোতে শুরু করে।
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে সোহরাওয়ার্দী দ্রুত দৃশ্যমান হয়ে ওঠেন। তিনি মন্ত্রিসভা, সংগঠন, নির্বাচন ও প্রাদেশিক ক্ষমতার সম্পর্ক বুঝতেন। নাজিমুদ্দিন-ঘনিষ্ঠ কলকাতার ব্যবসায়ী অভিজাতদের প্রভাব কমে এলে সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্ব লীগ সংগঠনের ভিতরে শক্ত জায়গা পায়। Bengal থেকে All-India Muslim League Council (সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ কাউন্সিল)-এ যাওয়া প্রতিনিধিদের বড় অংশ তাঁর প্রতি আনুগত্য দেখায়। ফলে তাঁর রাজনীতি কেবল প্রশাসনিক পদে সীমাবদ্ধ থাকেনি; সংগঠনের ভেতরেও তা কার্যকর হয়ে ওঠে। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, p. 104)
কিন্তু সোহরাওয়ার্দীর উত্থান একা ঘটেনি। আবুল হাশিম একই সময়ে বাংলার মুসলিম লীগের ভিতরে আরেক ধরনের কাজ শুরু করেন। তাঁর দৃষ্টি ছিল জেলার দিকে। তখন বাংলার সাতাশটি জেলার মধ্যে আঠারোটিতে District League (জেলা লীগ) থাকলেও সেগুলো প্রাণবন্ত সংগঠন ছিল না। নিয়মিত নির্বাচন দুর্বল, প্রাথমিক সদস্য সংগ্রহ অগভীর, স্থানীয় সমাজের সঙ্গে সংগঠনের যোগ শিথিল। এই অবস্থায় হাশিম সংগঠনকে কাগজের দল থেকে মানুষের দলে রূপ দিতে চাইছিলেন। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, p. 153)
এই জায়গায় তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব স্পষ্ট। তিনি বুঝেছিলেন, বাংলার মুসলমানের রাজনীতি কলকাতা বা ঢাকার কয়েকজন নেতার হাতে শেষ হয় না। পূর্ববঙ্গের গ্রাম, মফস্বল, কৃষক, দরিদ্র, ঋণগ্রস্ত, জমি-নির্ভর মুসলমান সমাজকে না ধরলে পাকিস্তানের দাবি কাগজে থাকবে, মাটিতে নামবে না। তাঁর কাছে সংগঠন মানে শুধু পদ নয়; সংগঠন মানে ধারাবাহিক কাজ। অফিস, কর্মী, পাঠাগার, বই, পত্রিকা, স্থানীয় সমস্যা—এসবের কথা তিনি তুলেছিলেন কারণ তিনি রাজনীতিকে সামাজিক শক্তিতে রূপ দিতে চেয়েছিলেন। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, pp. 104–105)
আবুল হাশিমের draft manifesto (খসড়া ইশতেহার) এই দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে পাকিস্তানের ভাষা ছিল, কিন্তু শুধু মানচিত্রের ভাষা ছিল না। equality (সমতা), fraternity (ভ্রাতৃত্ব), poor people’s rights (দরিদ্র মানুষের অধিকার), vested interests (স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী)-এর বিরুদ্ধে অবস্থান—এসব বিষয় তাঁর রাজনৈতিক ভাষায় আসে। তিনি মুসলিম লীগের দাবিকে শুধু মুসলমান বনাম হিন্দু প্রশ্নে আটকে রাখেননি; দরিদ্র মুসলমান, কৃষকসমাজ, সামাজিক অন্যায় এবং ক্ষমতার দখলদার শ্রেণির প্রশ্নও তাঁর ভাবনার মধ্যে ছিল। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, p. 105)
এই জায়গায় বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক আত্মপ্রকাশ নতুন রূপ পায়। আগে মুসলমানের প্রশ্ন ছিল শিক্ষা, চাকরি, প্রতিনিধিত্ব, জমি, সামাজিক মর্যাদা, সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভয় ও ভবিষ্যতের আশা—অনেক সময় বিচ্ছিন্নভাবে। সোহরাওয়ার্দী ও হাশিমের হাতে এগুলো দলীয় কাঠামো পেতে থাকে। পাকিস্তান দাবির ভিতরে পূর্ববাংলার মুসলমান কৃষকসমাজ নিজের সামাজিক ক্ষোভ, ক্ষমতায় ওঠার সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যৎ বদলের ভাষা দেখতে শুরু করে।
১৯৪৫ সালের Parliamentary Board (পার্লামেন্টারি বোর্ড)-এর লড়াই এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। নাজিমুদ্দিন আগের দিন পর্যন্ত কয়েকটি আসন নিশ্চিত ধরে ফেলেছেন বলে মনে করছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম বাকি পাঁচটি আসন জিতে নেন। এতে সোহরাওয়ার্দীর বোর্ড-প্রাধান্য নিশ্চিত হয় এবং নির্বাচনের পর League parliamentary party leadership (লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির নেতৃত্ব)-এর পথ খুলে যায়। এটি কেবল ব্যক্তিগত ক্ষমতার সংঘর্ষ ছিল না; বাংলার মুসলিম লীগে পুরোনো অভিজাত ভারসাম্য ভেঙে নতুন শক্তির প্রবেশের লক্ষণ ছিল। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, p. 156)
সোহরাওয়ার্দীর সম্পর্ক জিন্নাহর সঙ্গে সরল আনুগত্যের সম্পর্ক ছিল না। কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ বাংলাকে দরকার করত, কিন্তু বাংলার রাজনীতি কেন্দ্রের হাতে পুরোপুরি ছিল না। সোহরাওয়ার্দী বাংলায় শক্তিশালী হয়ে উঠলে তিনি কেন্দ্রের কাছে সুবিধাজনকও হন, অস্বস্তিকরও হন। জিন্নাহ জানতেন, বাংলাকে বাদ দিয়ে মুসলিম ভারতের দাবি বড় হয় না। আবার বাংলার প্রাদেশিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও সোহরাওয়ার্দীর স্বাধীন রাজনৈতিক চালচলন কেন্দ্রীয় কৌশলকে জটিল করত। এই সম্পর্ক ছিল দরকার, দূরত্ব ও দরকষাকষির সম্পর্ক। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, p. 158)
১৯৪৬ সালের নির্বাচনে এই দীর্ঘ প্রস্তুতির ফল দেখা যায়। বাংলার মুসলমান সমাজের একটি বড় অংশ মুসলিম লীগের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এর পেছনে কেবল জিন্নাহর নাম ছিল না, কেবল পাকিস্তানের বিমূর্ত স্লোগানও ছিল না। ছিল জেলা-স্তরের সংগঠন, প্রাদেশিক নেতৃত্ব, কৃষকসমাজের জমে থাকা ক্ষোভ, হিন্দু অভিজাত আধিপত্য থেকে বের হওয়ার আকাঙ্ক্ষা, এবং মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজ হিসেবে নিজের ভবিষ্যৎ দাবি করার আত্মবিশ্বাস। যে মুসলমান এতদিন বাংলার আধুনিকতার প্রান্তে ছিল, সে ভোটের মাধ্যমে নিজের সংখ্যাকে রাজনৈতিক ভাষায় পরিণত করল।
এই নির্বাচনী সাফল্যকে শুধু ধর্মীয় উন্মাদনা বলে ব্যাখ্যা করা সহজ। কিন্তু তা করলে সামাজিক ইতিহাস মুছে যায়। পূর্ববাংলার কৃষক মুসলিম লীগকে ভোট দিয়েছে শুধু ফতোয়া শুনে নয়। তার জীবনে জমির প্রশ্ন ছিল, ঋণের প্রশ্ন ছিল, মর্যাদার প্রশ্ন ছিল, হিন্দু জমিদার-মহাজন-অভিজাতের সঙ্গে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ছিল, প্রশাসনিক বঞ্চনা ছিল, শিক্ষাগত পিছিয়ে পড়া ছিল। পাকিস্তান দাবির ভাষা তার কাছে অনেক সময় এইসব বিচ্ছিন্ন ক্ষতের একত্রিত রাজনৈতিক নাম হয়ে উঠেছিল।
মুসলিম কৃষকসমাজকে তাই সরল করে দেখা যাবে না। সে সবসময় তাত্ত্বিক ভাষায় nationhood (জাতিসত্তা) বোঝেনি; কিন্তু নিজের দীনতা, অপমান, সংখ্যাগরিষ্ঠতা, ধর্মীয় পরিচয় এবং ভবিষ্যৎ বদলের আশা একসঙ্গে অনুভব করেছে। রাজনীতি সবসময় বইয়ের ধারণা দিয়ে চলে না। অনেক সময় তা জমির মাপ, খাজনার চাপ, আদালতের ভয়, মহাজনের খাতা, মসজিদের আযান, গ্রামের পীর, বাজারের গুজব, নেতার ভাষণ আর আসন্ন বদলের আকাঙ্ক্ষা দিয়ে চলে। মুসলিম লীগ এই অনুভূতিকে ধরতে পেরেছিল বলেই ১৯৪৬-এ পূর্ববাংলার মুসলমান সমাজ তার দিকে যায়।
এই আত্মপ্রকাশের ভেতরেও সীমাবদ্ধতা ছিল। মুসলিম লীগ দরিদ্র মানুষের খাঁটি দল হয়ে যায়নি; তার ভিতরে অভিজাত, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, জমিদার, মধ্যবিত্ত, উচ্চাকাঙ্ক্ষী নেতা—সবাই ছিল। সোহরাওয়ার্দী নিজেও কৃষকের ঘরের মানুষ নন। আবুল হাশিম দরিদ্র মুসলমানের ভাষা ধরতে চাইলেও সংগঠন সবসময় সেই আদর্শে চলেনি। তবু এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বাংলার মুসলিম রাজনীতি আগের চেয়ে বড় পরিসরে পৌঁছায়। সে কেবল elite bargaining (অভিজাত দরকষাকষি) থাকে না; mass politics (জনরাজনীতি)-এর ভিতরে ঢুকে পড়ে।
সোহরাওয়ার্দীকে তাই শুধু কলকাতার রাজনীতিক হিসেবে পড়লে ভুল হবে। তিনি ছিলেন প্রশাসনিক শক্তি, সংগঠনী বাস্তবতা বোঝা মানুষ, ক্ষমতার ময়দানে অভ্যস্ত নেতা। তাঁর হাতে বাংলার মুসলিম লীগ নির্বাচনী রাজনীতির কঠিন অঙ্ক শিখেছিল। তিনি জানতেন, শুধু আদর্শ দিয়ে দল চলে না; টিকিট, জেলা, প্রভাব, অর্থ, সংবাদ, প্রশাসন—সব লাগে। এই বাস্তববোধ তাঁকে কার্যকর করেছে, আবার বিতর্কিতও করেছে।
আবুল হাশিমকে শুধু সংগঠক বললেও কম বলা হয়। তিনি সংগঠনের ভিতরে ধারণা ঢোকাতে চেয়েছিলেন। মুসলিম লীগের লক্ষ্য কী, পাকিস্তান দাবির সামাজিক অর্থ কী, দরিদ্র মুসলমানের অধিকার কোথায়, সংগঠন জেলার মানুষের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হবে—এসব প্রশ্ন তাঁর কাছে বাস্তব ছিল। তাঁর ভাষায় মুসলিম রাজনীতি কেবল সংখ্যার রাজনীতি নয়; নৈতিক ও সামাজিক দাবির রাজনীতিও। এখানেই তিনি সোহরাওয়ার্দীর পাশে থেকেও আলাদা।
দুজনের সম্পর্কও সরল ছিল না। তাঁরা একে অন্যকে প্রয়োজন করতেন। সোহরাওয়ার্দীর দরকার ছিল সংগঠনের জনভিত্তি, জেলা-প্রবেশ, ধারণাগত শক্তি। হাশিমের দরকার ছিল এমন প্রশাসনিক-রাজনৈতিক মুখ, যে প্রাদেশিক ক্ষমতার স্তরে দাঁড়াতে পারে। তাঁদের মিলন রোমান্টিক ঐক্য নয়; রাজনৈতিক প্রয়োজনের মিলন। কিন্তু ইতিহাসে অনেক বড় পরিবর্তন এমন অসম্পূর্ণ মিলন থেকেই জন্ম নেয়।
এই কারণেই বাংলার মুসলমানের রাজনৈতিক আত্মপ্রকাশকে শুধু জিন্নাহর কেন্দ্রীয় ডাক দিয়ে বোঝা যায় না। জিন্নাহ সর্বভারতীয় দরকষাকষির মুখ ছিলেন, কিন্তু বাংলার মুসলমানকে জেলা, ভোট, কৃষকসমাজ ও প্রাদেশিক সংগঠনের ভিতরে রাজনৈতিক শক্তি বানানোর কাজ বাংলার ভিতরেই হয়েছে। সোহরাওয়ার্দী ও হাশিম সেই ভেতরের কাজের দুই আলাদা মুখ।
এখানে ফজলুল হকের প্রশ্নও ফিরে আসে। তিনি বাংলার মুসলমানের কৃষক-প্রজা বাস্তবতার বড় মুখ, লাহোর প্রস্তাবের পেশকারী, এক ঐতিহাসিক চরিত্র। কিন্তু লাহোরের পর বাংলার পাকিস্তান-রাজনীতির দীর্ঘ সংগঠনী কাঠামো তাঁর হাতে থাকেনি। সোহরাওয়ার্দী-হাশিম পর্বে বাংলার মুসলিম রাজনীতি নতুন শরীর পায়। ফজলুল হক বাংলাকে লাহোরে উচ্চারণযোগ্য করেছিলেন; সোহরাওয়ার্দী ও হাশিম বাংলাকে সংগঠন, নির্বাচন ও দরকষাকষির বাস্তবতায় নামিয়ে আনেন।
সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের গুরুত্ব এখানেই শেষ নয়। তাঁদের রাজনীতি পাকিস্তান দাবির প্রাদেশিক সংগঠনে আটকে থাকেনি; ১৯৪৭-এর মুখে বাংলার ভবিষ্যৎ নিয়েও তারা আলাদা করে ভাবতে বাধ্য হয়েছিলেন। অখণ্ড বাংলা প্রশ্নে সেই চিন্তার শেষ ঝলক দেখা যায়। সেখানে বাংলা কেবল ভারত-পাকিস্তানের মাঝখানে কাটা একটি ভূখণ্ড নয়; বাংলা ছিল জনসংখ্যা, শহর, বন্দর, কৃষি, ভাষা, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং হিন্দু অভিজাতের সঙ্গে ক্ষমতা-বণ্টনের কঠিন অঙ্ক।
সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম বাংলার মুসলিম রাজনীতিকে এমন জায়গায় নিয়ে গিয়েছিলেন, যেখানে বাঙালি মুসলমান নিজেকে শুধু কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগের অনুসারী হিসেবে নয়, নিজের ভূখণ্ড ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে সক্ষম রাজনৈতিক সমাজ হিসেবেও দেখতে শুরু করে। অখণ্ড বাংলা সফল হয়নি; কিন্তু ব্যর্থতার ভিতরেও এই সক্ষমতাটুকু স্পষ্ট হয়ে যায়।
বাংলার মুসলমান তাই একরৈখিক পরিচয়ের মানুষ নয়। সে লাহোরের সঙ্গে যুক্ত, কিন্তু লাহোরেই শেষ নয়। সে বাংলার ভাষায় কথা বলে, কিন্তু ভাষাতেই শেষ নয়। সে মুসলিম মিল্লাতের অংশ, কিন্তু নিজের মাটি, কৃষকসমাজ, পূর্ববঙ্গের অভিজ্ঞতা, কলকাতার দূরত্ব এবং প্রাদেশিক রাজনীতির হিসাবও তার ভেতরে কাজ করে। এই বহুমাত্রিক অবস্থান থেকেই “বাঙালি মুসলমান” ধারণার অন্তর্দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।
“বাঙালি মুসলমান” ধারণার অন্তর্দ্বন্দ্ব
“বাঙালি মুসলমান” কথাটি শুনতে সহজ, কিন্তু এর ভিতরেই একটি টান লুকিয়ে আছে। “বাঙালি” শব্দটি তাকে ভাষা, মাটি, নদী, অঞ্চল ও লোকজীবনের সঙ্গে যুক্ত করে। “মুসলমান” শব্দটি তাকে আকিদা, মিল্লাত, শরিয়ত, ইতিহাসবোধ ও বৃহত্তর মুসলিম জগতের সঙ্গে যুক্ত করে। সমস্যা এই দুই পরিচয়ের অস্তিত্বে নয়; সমস্যা শুরু হয় যখন একটি পরিচয় অন্যটিকে শর্ত দিয়ে গ্রহণ করতে চায়।
“বাঙালি” হতে হলে মুসলমানিকে নরম করতে হবে—এই দাবি যেমন ভুল, তেমনি “মুসলমান” হতে হলে বাংলাকে গৌণ করতে হবে—এই দাবিও ভুল। বাঙালি মুসলমানের বাস্তব জীবন এই দুই দাবির কোনোটিকেই পুরো মানে না। সে বাংলা ভাষায় ঘর করে, কিন্তু তার ঘরের ভেতরে আরবি-ফারসি শব্দ, সালাম-দোয়া, হালাল-হারাম, ঈদ-জুমা, মক্তব-মসজিদ, পীর-দরগাহ, শরিয়তি ধারণা এবং মিল্লাতের চেতনা কাজ করে। সে মুসলমান, কিন্তু তার মুসলমানি কোনো ভাসমান বিমূর্ততা নয়; তা পূর্ববাংলার জমি, নদী, হাট, কৃষিজীবন, দরিদ্রতা, সামাজিক অপমান ও বঞ্চনার ভিতর দিয়ে গঠিত।
এই জায়গাতেই প্রথম প্রশ্ন ওঠে: কোন বাংলা?
বাংলা ভাষা এক হলেও তার সামাজিক মালিকানা এক ছিল না। কলকাতাকেন্দ্রিক শিক্ষিত হিন্দু অভিজাতের হাতে যে আধুনিক বাংলা সাহিত্য, সংবাদপত্র, শিক্ষিত ভাষা ও সাংস্কৃতিক রুচি তৈরি হলো, তা নিজেকে অনেক সময় “বাংলা”র স্বাভাবিক মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করল। সেই মানদণ্ডের পাশে মুসলমানের বাংলা দাঁড়াল অস্বস্তি নিয়ে। তার পুঁথি, তার ফারসি-আরবি শব্দ, তার ধর্মীয় রীতি, তার গ্রামীণ উচ্চারণ, তার ইসলামী সামাজিক শব্দভান্ডার—এসবকে বাংলা ভাষার কেন্দ্র নয়, প্রান্ত হিসেবে দেখা হলো।
এখানে একটি সহজ অথচ গভীর তুলনা দরকার। একজন বাঙালি হিন্দু তার ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বাঙালি হতে পারে—এ নিয়ে সাধারণত প্রশ্ন ওঠে না। দুর্গাপূজা, কালীপূজা, শঙ্খ, সিঁদুর, উলুধ্বনি, গীতা, পুরাণ, মন্দির, সংস্কৃত উৎসের শব্দ, দেবদেবীর কাহিনি, হিন্দু পারিবারিক রীতি—এসব তার বাঙালিত্বকে বাতিল করে না। বরং বহু সময় এগুলোই “বাংলা সংস্কৃতি” নামে স্বাভাবিক মর্যাদা পায়। তার ঘরের পূজা ধর্মীয়, কিন্তু একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক। তার পুরাণ ধর্মীয়, কিন্তু একই সঙ্গে সাহিত্যিক। তার দেবদেবীর কাহিনি ধর্মীয়, কিন্তু একই সঙ্গে লোকঐতিহ্য। তার সংস্কৃত শব্দ ধর্মীয় উৎসের, কিন্তু ভাষার মর্যাদায় গ্রহণযোগ্য।
তাহলে বাঙালি মুসলমানের ক্ষেত্রে একই মাপকাঠি কাজ করবে না কেন? তার সালাম, দোয়া, ঈদ, জুমা, আজান, মক্তব, মসজিদ, কোরআনি শব্দ, ফারসি-আরবি প্রভাব, শরিয়তি বোধ, মিল্লাতের ধারণা—এসব থাকলেই তার বাঙালিত্ব সন্দেহের মুখে পড়বে কেন? বাঙালি হিন্দুর ধর্মীয় উত্তরাধিকার যদি বাংলা সংস্কৃতির অংশ হতে পারে, বাঙালি মুসলমানের ধর্মীয় ও সামাজিক উত্তরাধিকার বাংলা সংস্কৃতির বাইরে থাকবে কোন যুক্তিতে?
সমস্যা ধর্মীয় পরিচয়ে নয়। সমস্যা হলো কোন ধর্মীয় পরিচয়কে “বাংলা সংস্কৃতি”র স্বাভাবিক অংশ বানানো হয়, আর কোনটিকে “সাম্প্রদায়িক”, “বাইরের”, “অ-বাঙালি” বা “আরবীয়” বলে প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয়। বাঙালি হিন্দুর সংস্কৃত শব্দ ভাষার ঐশ্বর্য, কিন্তু বাঙালি মুসলমানের আরবি-ফারসি শব্দ ভাষার দূষণ—এই বিচার নিরপেক্ষ নয়। বাঙালি হিন্দুর পূজা উৎসব সংস্কৃতি, কিন্তু বাঙালি মুসলমানের ঈদ ধর্মীয়তা—এই বিভাজনও নির্দোষ নয়। এখানে ভাষাভিত্তিক বাঙালিত্বের ভিতরে লুকানো সাংস্কৃতিক পক্ষপাত ধরা পড়ে।
এই পক্ষপাতের কারণেই “বাঙালি” শব্দটি বাঙালি মুসলমানের কাছে একসঙ্গে আপন ও অস্বস্তিকর। আপন, কারণ সে এই ভাষায় জন্মেছে, কেঁদেছে, গান গেয়েছে, সন্তানকে ডেকেছে, বাজার করেছে, মাঠে কাজ করেছে। অস্বস্তিকর, কারণ এই ভাষার আধুনিক মর্যাদার মঞ্চে তাকে অনেক সময় অতিথির মতো দাঁড়াতে হয়েছে। ভাষা তার, কিন্তু ভাষার কর্তৃত্ব অন্যের হাতে। ঘর তার, কিন্তু ঘরের মানচিত্র অন্য কেউ এঁকেছে—এমন অনুভূতি তার রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বে দাগ কেটেছে।
মোহাম্মদ আকরম খাঁর আলোচনায় এই ফারাক স্পষ্ট হয়। তিনি মুসলমান সমাজের ভাষা, আরবি-ফারসি শব্দপ্রবাহ, সামাজিক রীতি এবং বাংলার ভিতরে মুসলিম পরিচয়ের গঠনকে আলাদা গুরুত্ব দিয়েছেন। এতে বোঝা যায়, বাঙালি মুসলমান বাংলা ভাষার বাইরে ছিল না; কিন্তু তার বাংলা হিন্দু অভিজাতের সাংস্কৃতিক বাংলার অনুবর্তীও ছিল না। তার বাংলার ভিতরে মুসলিম সমাজের অভিজ্ঞতা, ধর্মীয় শব্দ, সামাজিক সম্পর্ক ও আলাদা ইতিহাসবোধ কাজ করছিল। (মোহাম্মদ আকরম খাঁ, মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস, পৃ. ১০–১৮, ৫৭–৬১, ৮৬–৯২)
তারপর আসে দ্বিতীয় প্রশ্ন: কোন মুসলমান?
শুধু “মুসলমান” বললেও বাঙালি মুসলমানের আরেক দিক অদৃশ্য হয়ে যায়। সে দিল্লি, লাহোর, মক্কা, বাগদাদ, ইস্তাম্বুলের দীর্ঘ মুসলিম ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে—এ সত্য। কিন্তু সে একই সঙ্গে পূর্ববাংলার কাদা, নদী, কৃষিজমি, বর্ষা, খাজনা, জমিদার, মহাজন, মক্তব, পীর, গ্রামীণ মসজিদ ও মফস্বলের মানুষ। তার মুসলমানি জীবন শরিয়তি ধারণার সঙ্গে যেমন যুক্ত, তেমনি জমির বাস্তবতার সঙ্গেও যুক্ত। তার ধর্ম শুধু তত্ত্ব নয়; সামাজিক বেঁচে থাকার ভাষা।
ড. সায়ীদ ওয়াকিল বাংলায় ইসলাম আগমন, ইসলাম প্রচার, সুফি-সাধকদের ভূমিকা, মুসলিম শাসন এবং বাংলা ভাষা-সাহিত্যে মুসলিম অবদানের ধারাকে যে ভাবে দেখিয়েছেন, তা এই বাস্তবতা বোঝার দরজা খুলে দেয়। বাংলায় ইসলাম কেবল বাইরে থেকে এসে বসেনি; নদীপথ, বাণিজ্য, সুফি-সাধক, খানকাহ, মসজিদ, মক্তব, পুঁথি, ভাষা ও লোকজ ধারার ভিতর দিয়ে এখানে সামাজিক জগৎ তৈরি করেছে। (ড. সায়ীদ ওয়াকিল, বাংলায় ইসলাম ও মুসলিম সভ্যতা, পৃ. ৯–১৭)
তাই বাঙালি মুসলমানকে আরব-পারস্যের প্রতিধ্বনি বলে ছোট করা ভুল; আবার তাকে কেবল গ্রামীণ লোকসংস্কৃতির মুসলমান বানানোও ভুল। তার ভিতরে উভয় স্তর আছে। সে মিল্লাতের সঙ্গে যুক্ত, কিন্তু মিল্লাত তার জীবনে মাটিহীন নয়। তার ঈমান আকাশের দিকে তাকায়, কিন্তু তার পা ধানের জমিতে। তার কিবলা মক্কা, কিন্তু তার সামাজিক ভাষা পূর্ববাংলার মাটিতে তৈরি।
এই দ্বৈততা থেকেই মুসলিম মধ্যবিত্তের আত্মসংগ্রাম জন্ম নেয়। হিন্দু অভিজাত আধুনিকতার সামনে মুসলিম সমাজ পিছিয়ে পড়েছিল—এ কথা শুধু অভিযোগ নয়, ইতিহাসের বাস্তবতা। ইংরেজি শিক্ষা, নতুন চাকরি, আদালত, সংবাদপত্র, আধুনিক পেশা, শহুরে সংস্কৃতি—এসবের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেয় হিন্দু অভিজাত সমাজ। মুসলমান সমাজের বড় অংশ তখনও গ্রামীণ, দরিদ্র, শিক্ষা থেকে দূরে, পুরোনো ক্ষমতা হারানোর ধাক্কায় অবসন্ন। আব্বাস আলী খান এই দীর্ঘ ভাঙন ও পুনর্গঠনের ধারাকে মুসলিম শাসনের পতন, শিক্ষা-সংকট, মধ্যবিত্তের উত্থান এবং রাজনৈতিক সংগঠনের দিকে অগ্রসরতার ভিতরে পড়েছেন। (আব্বাস আলী খান, বাংলার মুসলমানের ইতিহাস, পৃ. ৫৭–৮০, ৮৬–৯৪, ৯৭–১১৬, ১৪০–১৮৮)
মুসলিম মধ্যবিত্তের সংকট ছিল কঠিন। তাকে আধুনিক হতে হবে, কিন্তু নিজের মুসলমানি পরিচয় হারিয়ে নয়। তাকে ইংরেজি শিক্ষা নিতে হবে, কিন্তু হিন্দু অভিজাতের সাংস্কৃতিক অধীনতায় গিয়ে নয়। তাকে বাংলা ভাষায় লিখতে হবে, কিন্তু সেই বাংলায় নিজের ধর্মীয় ও সামাজিক শব্দভান্ডারের জায়গা চাই। তাকে রাষ্ট্রের ভাষা শিখতে হবে, কিন্তু মক্তব-মসজিদ-সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নয়। এই আত্মসংগ্রাম তাকে কখনো দ্বিধাগ্রস্ত করেছে, কখনো রক্ষণশীল করেছে, কখনো অগ্রসর করেছে, কখনো তীব্র রাজনৈতিক করেছে।
এইখানেই “বাঙালি মুসলমান” ধারণার সংকট। সে যখন বাংলা জাতীয়তার ভিতরে ঢোকে, তখন তাকে প্রমাণ করতে হয় সে যথেষ্ট “বাঙালি”। সে যখন মুসলিম রাজনীতির ভিতরে দাঁড়ায়, তখন তাকে প্রমাণ করতে হয় সে যথেষ্ট “মুসলমান”। যেন তার নিজের অস্তিত্বের স্বাভাবিকতা নেই; তাকে বারবার দুই আদালতে নিজের পরিচয়ের সাক্ষ্য দিতে হয়।
হিন্দু অভিজাত সংস্কৃতির সামনে সে অশুদ্ধ বাংলা, গ্রামীণ বাংলা, মুসলমানি বাংলা। আবার বিমূর্ত মুসলিম রাজনীতির সামনে সে আঞ্চলিক, ভাষাপ্রবণ, পূর্ববাংলার মানুষ। একদিকে তাকে বলা হয়, ধর্ম কমাও, ভাষায় মিশে যাও। অন্যদিকে তাকে বলা হয়, অঞ্চল কমাও, মিল্লাতে মিশে যাও। অথচ বাস্তব বাঙালি মুসলমান neither (না) একেবারে ধর্মহীন ভাষা, nor (না) মাটিহীন মিল্লাত। সে দুইয়ের সংঘাতে গঠিত এক জটিল জাতিগত সত্তা।
এই সংকট শুধু তত্ত্বের নয়। ঘরের ভাষায়ও আছে, শিক্ষার পথে আছে, নামাজের সারিতে আছে, সাহিত্য পঠনে আছে, রাজনৈতিক স্লোগানে আছে। মুসলিম পরিবারের ছেলে যখন ইংরেজি স্কুলে যায়, সে শুধু পড়তে যায় না; সে এক নতুন সামাজিক শ্রেণিতে ঢোকার চেষ্টা করে। সে যখন বাংলা সাহিত্য পড়ে, সে শুধু ভাষা শেখে না; সে দেখে সেই সাহিত্যে তার ঘর কতখানি আছে। সে যখন মুসলিম ইতিহাস পড়ে, সে শুধু অতীত খোঁজে না; সে নিজের অধঃপতনের বিপরীতে উত্থান ও মর্যাদার ভাষা খোঁজে।
এখানে ধর্ম তার কাছে কেবল ব্যক্তিগত বিশ্বাস নয়। ধর্ম তার পরিচয়ের আশ্রয়, অধঃপতনের বিপরীতে উত্থান ও মর্যাদার উৎস, সংখ্যার ভেতরে শক্তি, ইতিহাসের সঙ্গে যোগ, এবং ভবিষ্যৎ কল্পনার ভাষা। আবার ভাষাও তার কাছে কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়। ভাষা তার মায়ের মুখ, ঘরের সুর, নদীর নাম, মাটির গন্ধ, শৈশব, বাজার, পুঁথি, গান, কান্না। এই দুই জিনিসকে আলাদা করতে গেলে বাঙালি মুসলমানকে কেটে ফেলতে হয়।
তাই তার অন্তর্দ্বন্দ্ব অস্বাভাবিক নয়। বরং এই দ্বন্দ্বই তার বাস্তবতা। সে কোনো প্রস্তুত জাতির সরল গল্প নয়। সে ইতিহাসের চাপ, ধর্মীয় চেতনা, ভাষাগত ঘর, সামাজিক পশ্চাদপদতা, হিন্দু অভিজাত আধিপত্য, ঔপনিবেশিক পুনর্গঠন, কৃষকসমাজের বেদনা এবং মুসলিম মধ্যবিত্তের আত্মসংগ্রাম থেকে গঠিত। তাকে বোঝার জন্য একমাত্রিক ভাষা যথেষ্ট নয়।
এই কারণেই বাঙালি মুসলমানের প্রশ্নে ইতিহাসের ফ্রেম যুদ্ধ এত তীব্র। যে ফ্রেম ভাষাকে একমাত্র সত্য বানায়, সে মুসলমানের আকিদাগত ও সভ্যতাগত চেতনাকে অস্বস্তি মনে করে। যে ফ্রেম মিল্লাতকে একমাত্র সত্য বানায়, সে বাংলার মাটি ও ভাষাকে গৌণ করতে চায়। কিন্তু বাঙালি মুসলমান এই দুই ফ্রেমের কোনোটির মধ্যে পুরো ধরা পড়ে না। তার সত্য মাঝখানে নয়; তার সত্য বহুস্তরে।
সে বাংলা ভাষার মানুষ, কিন্তু বাংলা ভাষার নামে হিন্দু অভিজাত সংস্কৃতির অধীনতা মানে না। সে মুসলমান, কিন্তু মুসলমানির নামে নিজের মাটি ও ভাষাকে পরিত্যাগ করে না। সে পূর্ববাংলার সন্তান, কিন্তু শুধু প্রাদেশিক ক্ষোভে সীমাবদ্ধ নয়। সে মিল্লাতের অংশ, কিন্তু মিল্লাত তার জীবনে নদী, জমি, কৃষক ও সমাজ ছাড়া পূর্ণ হয় না।
“বাঙালি মুসলমান” তাই কোনো আপসের শব্দ নয়। এটি দ্বন্দ্বের শব্দ, আত্মসংগ্রামের শব্দ, অসমাপ্ত গঠনের শব্দ। এই শব্দের ভিতরে ভাষা আছে, আকিদা আছে, জমি আছে, দারিদ্র্য আছে, মর্যাদার দাবি আছে, রাজনীতি আছে, এবং একটি দীর্ঘ প্রশ্ন আছে—আমরা কার ইতিহাসে নিজেদের পড়ব?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনো সহজ হয়নি।
ভাষার ভিতরে মিল্লাত, মিল্লাতের ভিতরে বাংলা
বাঙালি মুসলমানকে বুঝতে গেলে একটি সহজ কিন্তু কঠিন সত্য মানতে হয়। তাকে অর্ধেক করে পড়া যায় না। ভাষা তার পরিচয়ের এক দরজা, কিন্তু একমাত্র দরজা নয়। ইসলাম তার আত্মপরিচয়ের কেন্দ্র, কিন্তু সে মাটিহীন কোনো বিমূর্ত মুসলমানও নয়। তার ভিতরে বাংলা আছে, মিল্লাত আছে, নদী আছে, মসজিদ আছে, কৃষকসমাজ আছে, ইতিহাসবোধ আছে, জমির দুঃখ আছে, মর্যাদার দাবি আছে।
এই কারণেই তাকে শুধু “বাঙালি” বললে সে পূর্ণ ধরা পড়ে না। আবার শুধু “মুসলমান” বললেও ধরা পড়ে না। “বাঙালি” শব্দে যদি হিন্দু অভিজাত সংস্কৃতির মানদণ্ড লুকিয়ে থাকে, তাহলে মুসলমানের বাংলা সেখানে অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। “মুসলমান” শব্দে যদি অঞ্চলহীন এক বিমূর্ত পরিচয় বোঝানো হয়, তাহলে পূর্ববাংলার নদী, ভাষা, কৃষিজীবন, দারিদ্র্য, জমি ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা অদৃশ্য হয়ে যায়। দুই ক্ষেত্রেই বাঙালি মুসলমানকে তার পূর্ণতা থেকে বঞ্চিত করা হয়।
বাঙালি হিন্দুর ধর্মীয় উত্তরাধিকার বাংলা সংস্কৃতির অংশ হতে পারে, অথচ বাঙালি মুসলমানের ধর্মীয়-সামাজিক উত্তরাধিকার বাংলা সংস্কৃতির বাইরে ঠেলে দেওয়া হবে—এ বিচার টেকে না। দুর্গাপূজা, পুরাণ, শঙ্খ, সিঁদুর, সংস্কৃত শব্দ, মন্দির, দেবদেবীর কাহিনি যদি বাংলার সাংস্কৃতিক শরীরে জায়গা পায়, তাহলে সালাম, দোয়া, আজান, ঈদ, মক্তব, মসজিদ, পুঁথি, আরবি-ফারসি শব্দ, শরিয়তি বোধ ও মিল্লাতের চেতনা কেন পাবে না? বাংলা যদি সত্যিই সবার হয়, তাহলে তার ভাষা ও সংস্কৃতির ভিতরে মুসলমানের ঘরও পূর্ণ মর্যাদায় থাকতে হবে।
আকরম খাঁর আলোচনায় মুসলমান সমাজের ভাষা, আরবি-ফারসি শব্দপ্রবাহ ও সামাজিক রীতির যে ছবি দেখা যায়, তা এই সত্যকে জোর দেয়। মুসলমান বাংলা ভাষার বাইরে ছিল না; কিন্তু তার বাংলা ছিল নিজস্ব সামাজিক অভিজ্ঞতায় গড়া বাংলা। সেই বাংলাকে হিন্দু অভিজাত সংস্কৃতির নিচু অনুবাদ ভাবলে বাংলারই ক্ষতি হয়। (মোহাম্মদ আকরম খাঁ, মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস, পৃ. ১০–১৮, ৫৭–৬১, ৮৬–৯২)
আবার বাংলার মুসলমানকে শুধু ধর্মীয় জনসমষ্টি ভাবলেও ভুল হয়। বাংলায় ইসলাম নদীপথ, বাণিজ্য, সুফি-সাধক, মসজিদ, খানকাহ, মক্তব, পুঁথি, ভাষা ও লোকজ ধারার ভিতর দিয়ে সামাজিক জগৎ তৈরি করেছে। এখানে ইসলাম শুধু রাজদরবারের ইতিহাস নয়, শুধু ফকির-পীরের কাহিনিও নয়; এটি গ্রাম, পরিবার, শিক্ষা, ভাষা, নৈতিকতা ও সামাজিক সম্পর্কের ভিতর দিয়ে বসতি গড়েছে। ড. সায়ীদ ওয়াকিল বাংলায় ইসলাম আগমন, ইসলাম প্রচার, সুফি-সাধকদের ভূমিকা, মুসলিম শাসন এবং বাংলা ভাষা-সাহিত্যে মুসলিম অবদানের ধারাকে এই বৃহত্তর সামাজিক পরিসরে দেখিয়েছেন। (ড. সায়ীদ ওয়াকিল, বাংলায় ইসলাম ও মুসলিম সভ্যতা, পৃ. ৯–১৭)
এই দীর্ঘ গঠনের ওপর ঔপনিবেশিক যুগের আঘাত এসে পড়ে। ক্ষমতার ভাষা বদলায়, শিক্ষা বদলায়, আদালত বদলায়, চাকরির পথ বদলায়, শহুরে মর্যাদার মানদণ্ড বদলায়। হিন্দু অভিজাত সমাজ দ্রুত নতুন ব্যবস্থায় জায়গা করে নেয়; মুসলমান সমাজের বড় অংশ পিছিয়ে পড়ে। এই পিছিয়ে পড়া কেবল শিক্ষাগত সমস্যা নয়; এটি আত্মমর্যাদা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও সামাজিক অবস্থানের সংকট। আব্বাস আলী খান মুসলিম শাসনের পতন, ইংরেজ শাসনের পরে মুসলমানের দুরবস্থা, শিক্ষা-সংকট, মধ্যবিত্তের উত্থান এবং রাজনৈতিক সংগঠনের দিকে অগ্রসরতার ধারাকে এক দীর্ঘ আত্মসংগ্রাম হিসেবে ধরেছেন। (আব্বাস আলী খান, বাংলার মুসলমানের ইতিহাস, পৃ. ৫৭–৮০, ৮৬–৯৪, ৯৭–১১৬, ১৪০–১৮৮)
এই আত্মসংগ্রাম থেকেই মুসলিম বাংলার রাজনৈতিক চেতনা তৈরি হয়। তার পথ একরৈখিক নয়। সেখানে কৃষকের জমি আছে, মধ্যবিত্তের শিক্ষা আছে, ধর্মীয় পরিচয়ের মর্যাদা আছে, হিন্দু অভিজাত আধিপত্যের বিরুদ্ধে ক্ষোভ আছে, মুসলিম জাতিসত্তার বৃহত্তর আকর্ষণ আছে। তাই ৪৭ তার কাছে কেবল মানচিত্রের ঘটনা নয়; মুসলিম রাজনৈতিক আত্মমর্যাদার ভাষা। আবার ভাষা, প্রাদেশিক অধিকার ও অর্থনৈতিক ন্যায়ের প্রশ্নে পরে যে বিস্ফোরণ তৈরি হয়, সেটিও তার ইতিহাসের বাইরে নয়। আব্বাস আলী খান ভাষা আন্দোলন ও পূর্ববাংলার রাজনৈতিক অগ্রগতিকে এই ধারাবাহিকতার ভেতরেই পড়েছেন। (আব্বাস আলী খান, বাংলার মুসলমানের ইতিহাস, পৃ. ৩৫০, ৩৬৩–৪৩০)
রাষ্ট্রীয় বয়ান এই জটিলতাকে প্রায়ই সহ্য করতে পারে না। পাকিস্তানি বয়ান তার বাংলাকে সন্দেহ করেছে। বাংলা ভাষা, পূর্ববাংলার অধিকার, প্রাদেশিক আত্মমর্যাদা—এসবকে সে বহু সময় কেন্দ্রীয় মুসলিম ঐক্যের জন্য ঝুঁকি ভেবেছে। অন্যদিকে পরবর্তী সেক্যুলার বাঙালি বয়ান তার মুসলিম রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে সন্দেহ করেছে। ৪৭-এর মুসলিম জাতিসত্তার উত্থানকে অনেক সময় অস্বস্তিকর অতীত হিসেবে সরিয়ে রাখতে চেয়েছে। এক পক্ষ তার ভাষাকে ছোট করেছে, আরেক পক্ষ তার মিল্লাত-চেতনাকে ছোট করেছে। ফলে বাঙালি মুসলমানকে বারবার অর্ধেক পরিচয় নিয়ে দাঁড়াতে বলা হয়েছে।
কিন্তু তার ইতিহাস অর্ধেক নয়।
সে ৪৭-এ ছিল, ৫২-তেও ছিল, ৭১-এও ছিল। এই তিন অভিজ্ঞতাকে একে অন্যের বিরুদ্ধে দাঁড় করালে তার ইতিহাস ছিঁড়ে যায়। ৪৭ ছাড়া তার মুসলিম রাজনৈতিক উত্থান বোঝা যায় না। ৫২ ছাড়া তার ভাষাগত আত্মমর্যাদা বোঝা যায় না। ৭১ ছাড়া তার রাষ্ট্রীয় মুক্তি ও পূর্ববাংলার রাজনৈতিক অধিকারের বিস্ফোরণ বোঝা যায় না। এগুলো শত্রু অধ্যায় নয়; এগুলো এক জটিল জাতিগত সত্তার আলাদা আলাদা চাপ, আঘাত ও উত্তরণের মুহূর্ত।
বাঙালি মুসলমান তাই কোনো সহজ স্লোগানের মানুষ নয়। সে “শুধু বাঙালি” নয়, “শুধু মুসলমান”ও নয়। সে বাংলার মাটিতে দাঁড়ানো মুসলমান; মুসলিম ইতিহাসের আকাশে দাঁড়ানো বাঙালি। তার ভাষা বাংলা, কিন্তু তার আত্মা শুধু ভাষায় বন্দি নয়। তার ধর্ম ইসলাম, কিন্তু তার জীবন মাটিহীন কোনো অনুবাদ নয়। তার মিল্লাত আছে, কিন্তু সেই মিল্লাত নদী, জমি, হাট, মসজিদ, মক্তব, পরিবার, গ্রাম ও কৃষকের জীবন ছাড়া পূর্ণ হয় না।
এই সত্য মানতে না চাইলেই ইতিহাসের ফ্রেম যুদ্ধ শুরু হয়। এক ফ্রেম তাকে ভাষার নামে ধর্মহীন করতে চায়। আরেক ফ্রেম তাকে ধর্মের নামে অঞ্চলহীন করতে চায়। এক ফ্রেম তাকে রবীন্দ্রনাথের বাংলায় গিলে ফেলে; আরেক ফ্রেম তাকে লাহোর-করাচির রাজনীতিতে হারিয়ে ফেলে। অথচ সে এ দুটির কোনোটাতেই পুরো মাপে না। তার নিজের মাপ আছে।
এই মাপ ধরতে হলে বাঙালি মুসলমানকে নিজের ইতিহাসে ফিরিয়ে আনতে হবে। সেখানে হিন্দু অভিজাতের নির্মিত সাংস্কৃতিক মানদণ্ডের বাইরে তার বাংলা আছে। সেখানে বিমূর্ত মুসলিম রাজনীতির বাইরে তার মাটি আছে। সেখানে অধঃপতনের বিপরীতে উত্থানের চেষ্টা আছে। সেখানে মক্তবের পাশে বাংলা ভাষা আছে, ধানক্ষেতের পাশে মিল্লাত আছে, পূর্ববঙ্গের অপমানের পাশে মুসলিম জাতিসত্তার দাবি আছে।
বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের লড়াই এখানেই। সে নিজের নামের ভেতরেই দুই দিককে বহন করে—বাংলা ও ইসলাম, মাটি ও মিল্লাত, ভাষা ও আকিদা, অঞ্চল ও উম্মাহ। এই বহন করা তার দুর্বলতা নয়; তার ইতিহাসের গভীরতা। তাকে যে ফ্রেমে বন্দি করা যায় না, সেটাই তার শক্তি।
এই শক্তিকে চিনতে না পারলে ৪৭ বোঝা যাবে না। ৭১-ও বোঝা যাবে না। আর বাঙালি মুসলমান—যে জাতিগত সত্তা এই দুই ইতিহাসের মধ্য দিয়ে নিজের পথ করেছে—তাকেও বোঝা যাবে না।

Post a Comment