Table of Contents
![]() |
| ১৯৪৭ শুধু মানচিত্রের গল্প নয়; কেরালা, পাঞ্জাব, বাংলা, ইউপি, বিহার ও বোম্বের মুসলমানদের ত্যাগ, ভয়, স্মৃতি ও রাজনৈতিক শ্রমের ইতিহাস |
Previous Part.......
লাহোরের মঞ্চে দাবি উচ্চারিত হয়েছিল, কিন্তু দাবি তখনও ইতিহাস হয়ে ওঠেনি। দলিলের নিজের কোনো পা নেই। তাকে হেঁটে যেতে হয় শহর থেকে মফস্বলে। মফস্বল থেকে গ্রামে। সভা থেকে সংবাদপত্রে। আইনজীবীর টেবিল থেকে ছাত্রাবাসে। তহবিলের খাতায়। দাঙ্গাক্রান্ত ঘরে। আতঙ্কিত মুসলিম মহল্লায়। লাহোর প্রস্তাব সেই যাত্রার ভাষা দিলেও যাত্রা শুরু করেছিল মানুষ।
১৯৪০ সালের মার্চের পর জিন্নাহর রাজনৈতিক কাজ ছিল এই ভাষাকে সংগঠনে নামানো। প্রস্তাব পাস হওয়া যথেষ্ট ছিল না। Muslim India (মুসলিম ভারত) নিজের verdict (রায়) দিয়েছে, এটি দেখাতে হলে প্রাদেশিক লীগ, জেলা লীগ, প্রাথমিক সংগঠন, জনসভা, প্রচার ও মুসলিম জনমতকে একসঙ্গে নড়াতে হতো। লাহোর প্রস্তাবের পর জিন্নাহ প্রাদেশিক, জেলা ও প্রাথমিক লীগ সংগঠনগুলোকে জনসভা করার আহ্বান জানান, যাতে মুসলিম ভারতের সিদ্ধান্ত নিয়ে কারও মনে সন্দেহ না থাকে। তিনি ১৯ এপ্রিলকে Muslim self-determination and Muslim independence-day (মুসলিম আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মুসলিম স্বাধীনতা দিবস) হিসেবে পালনের আহ্বান জানান। (Farooq Ahmad Dar, “Jinnah and the Lahore Resolution,” p. 147)
৪৭-এর মালিকানার প্রশ্ন এখান থেকে শুরু হয়। পাকিস্তান দাবির ভূগোল শেষ পর্যন্ত পাঞ্জাব, বাংলা, সিন্ধ, সীমান্তপ্রদেশ এবং আসামের কিছু অংশে দৃশ্যমান হয়েছে। কিন্তু দাবির শক্তি শুধু সেই ভূগোলের ভিতর তৈরি হয়নি। বহু মুসলমান পাকিস্তান দাবির পক্ষে দাঁড়িয়েছিল, যাদের নিজের বাড়ি, জমি, বাজার, মসজিদ, কবরস্থান ও স্থানীয় সমাজ পাকিস্তানের মানচিত্রে যাবে না—এ কথা তারা জানত। ইউপি, বিহার, বোম্বে, মাদ্রাজ, মালাবার, হায়দারাবাদ—এই নামগুলো তাই peripheral history (পার্শ্ব-ইতিহাস) নয়। এগুলো রাষ্ট্রদাবির অদৃশ্য ভিত্তি।
যারা রাষ্ট্রের ভেতরে ঢুকবে না, তারা রাষ্ট্রদাবির জন্য এত ঝুঁকি নিল কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর “সাম্প্রদায়িক আবেগ” বলে শেষ করা যায় না। আবেগ ছিল, কিন্তু তা শূন্যে জন্মায়নি। তার পেছনে ছিল কংগ্রেস-শাসিত প্রদেশের অভিজ্ঞতা, সংখ্যাগুরু গণতন্ত্রের ভয়, শিক্ষানীতির ভিতরে সাংস্কৃতিক মুছে যাওয়ার আশঙ্কা, প্রতিনিধিত্ব হারানোর আতঙ্ক, Muslim middle class (মুসলিম মধ্যবিত্ত)-এর constitutional imagination (সাংবিধানিক কল্পনা), এবং all-India Muslim politics (সর্বভারতীয় মুসলিম রাজনীতি)-এর এমন এক ভাষা, যা স্থানীয় লাভ-ক্ষতির অঙ্ক ছাড়িয়ে Muslim nationhood (মুসলিম জাতিসত্তা)-এর প্রশ্নে পৌঁছেছিল।
কংগ্রেস মন্ত্রিসভার অভিজ্ঞতা; সংখ্যার ভিতরে মুছে যাওয়ার ভয়
১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পর কংগ্রেস যখন সাতটি প্রদেশে মন্ত্রিসভা গঠন করে, মুসলিম লীগের সামনে শুধু পরাজয়ের হিসাব খুলে যায়নি। খুলে গিয়েছিল ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের ভয়। নির্বাচনে মুসলিম লীগের দুর্বলতা স্পষ্ট ছিল। অনেক মুসলিম আসনে তারা প্রভাব দেখাতে পারেনি। বহু প্রদেশে মুসলমানদের স্থানীয় নেতৃত্ব বিভক্ত ছিল। কোথাও প্রাদেশিক জমিদার-রাজনীতি, কোথাও আঞ্চলিক মুসলিম দল, কোথাও ব্যক্তিগত ক্ষমতার অঙ্ক মুসলিম লীগের সর্বভারতীয় দাবিকে দুর্বল করে রেখেছিল। Ayesha Jalal এই সময়কে জিন্নাহ ও মুসলিম লীগের survival struggle (টিকে থাকার সংগ্রাম) হিসেবে পড়েছেন। কিন্তু এই সংগ্রাম শুধু সংগঠন বাঁচানোর ছিল না; মুসলমানদের আলাদা রাজনৈতিক কণ্ঠ বাঁচানোর প্রশ্নও ছিল। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, pp. 43–45)
কংগ্রেস নিজের বিজয়কে Indian nation (ভারতীয় জাতি)-এর বিজয় হিসেবে পড়তে চেয়েছিল। এই দাবির ভিতরে বিপদ ছিল। কংগ্রেস যদি জাতির একমাত্র ভাষা হয়ে যায়, তাহলে মুসলমানদের আলাদা political claim (রাজনৈতিক দাবি) কোথায় দাঁড়াবে? তারা কি শুধু religious minority (ধর্মীয় সংখ্যালঘু) হিসেবে থাকবে, নাকি historical-political community (ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক সম্প্রদায়) হিসেবে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলবে?
Congress tricolour (কংগ্রেস তেরঙ্গা), Vande Mataram (বন্দে মাতরম), Vidya Mandir scheme, Wardha education scheme—এসব বিষয় মুসলিম লীগের প্রচারণায় শুধু সাংস্কৃতিক আপত্তি হিসেবে আসেনি। এগুলোকে মুসলমানরা ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের symbolic order (প্রতীকী কাঠামো)-এর নমুনা হিসেবে পড়েছিল। রাষ্ট্রের পতাকা কেমন হবে। স্কুলে কী শেখানো হবে। শিশুর historical consciousness (ঐতিহাসিক চেতনা) কোন স্মৃতি দিয়ে গড়া হবে। জাতীয় গান কোন আবেগকে বাধ্যতামূলক করবে। এগুলো শুধু সংস্কৃতির প্রশ্ন নয়। এগুলো ক্ষমতার প্রশ্ন। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, p. 43)
Jalal দেখান, Central Provinces-এ Vidya Mandir প্রশ্ন নিয়ে মুসলিম লীগের ভিতরেও ঐক্য ছিল না। কিছু মুসলিম লীগ সদস্য কংগ্রেস মন্ত্রিসভার সঙ্গে সমঝোতার পথে যেতে চেয়েছিলেন। Congress Muslim MLA-রা Vidya Mandir-কে anti-Muslim issue (মুসলিমবিরোধী প্রশ্ন) হিসেবে নিতে আগ্রহী ছিলেন না। কিন্তু জিন্নাহর দৃষ্টিতে এই বিভক্তি নিজেই বিপজ্জনক ছিল। কারণ মুসলিম প্রতিনিধিত্ব যদি প্রদেশে প্রদেশে কংগ্রেসের সঙ্গে আলাদা চুক্তিতে ভেঙে যায়, তাহলে all-India Muslim organisation (সর্বভারতীয় মুসলিম সংগঠন)-এর দাবি দুর্বল হয়ে পড়বে। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, p. 43)
মুসলিম লীগের ভয়কে শুধু propaganda (প্রচার-কৌশল) বলে উড়িয়ে দেওয়া ইতিহাসের ভুল হবে। propaganda ছিল। কিন্তু propaganda শূন্যে দাঁড়ায় না। তার পেছনে বাস্তব উৎকণ্ঠা না থাকলে তা জনমনে ঢোকে না। কংগ্রেস মন্ত্রিসভাগুলো মুসলমানদের কাছে সেই উৎকণ্ঠার ভাষা তৈরি করে। তারা দেখতে পেল, নির্বাচনী সংখ্যাগরিষ্ঠতা যদি political morality (রাজনৈতিক নৈতিকতা)-এর জায়গা দখল করে নেয়, তাহলে minority safeguards (সংখ্যালঘু সুরক্ষা), separate electorates (পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী), Muslim reservation (মুসলিম সংরক্ষণ), cultural autonomy (সাংস্কৃতিক স্বায়ত্ততা)—সবই “communal privilege” নামে বাতিল করা যায়।
Neeti Nair এই বদলের গভীরতা ধরেছেন। Lucknow Pact-এর সময় কংগ্রেস মুসলমানদের আলাদা রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব স্বীকার করেছিল। কিন্তু ত্রিশের দশকের শেষভাগে কংগ্রেসের নতুন ভাষা পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী ও সংরক্ষিত আসনকে national integration (জাতীয় সংহতি)-এর পথে communal compartment (সাম্প্রদায়িক খোপ) হিসেবে দেখাতে শুরু করে। মুসলমানদের কাছে এটি শুধু নীতির বদল ছিল না। এটি ছিল betrayal (বিশ্বাসভঙ্গ)। কংগ্রেস বলছিল, তারা সবার প্রতিনিধি। মুসলমানরা দেখছিল, “সবার” নামে তাদের আলাদা রাজনৈতিক সত্তাকেই অপ্রয়োজনীয় করে দেওয়া হচ্ছে। (Neeti Nair, Changing Homelands, pp. 159–161)
সংখ্যালঘু প্রদেশে এই ভয় সবচেয়ে তীব্রভাবে কাজ করে। পাঞ্জাব বা বাংলার মুসলমানের হাতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভর ছিল। ইউপি, বিহার, বোম্বে, মাদ্রাজ বা মালাবারের মুসলমানের হাতে তা ছিল না। তাদের জন্য ভবিষ্যৎ ভারতীয় রাষ্ট্রের প্রশ্ন ছিল সরাসরি নিরাপত্তার প্রশ্ন। ব্রিটিশ চলে গেলে রাষ্ট্রের ভাষা, শিক্ষা, আইন, প্রশাসন, প্রতীক, জাতীয় স্মৃতি—সবকিছু যদি কংগ্রেসীয় সংখ্যাগুরু রাজনীতির অধীনে যায়, তাহলে মুসলমানের রাজনৈতিক মর্যাদা কোথায় থাকবে?
লাহোরের বক্তৃতাগুলোতে এই ভয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। Chowdhury Khaliquzaman কংগ্রেস মন্ত্রিসভার অভিজ্ঞতাকে মুসলমানদের existence (অস্তিত্ব)-এর প্রশ্নে নিয়ে যান। Sardar Aurangzeb Khan সংখ্যাগরিষ্ঠ গণতন্ত্রের অন্ধ অঙ্কের বিরুদ্ধে বলেন, মুসলমানরা British democracy (ব্রিটিশ গণতন্ত্র) চাইবে না, যদি তার অর্থ হয় counting of heads (মাথা গোনা)। তাঁর কাছে মুসলমান শুধু ভোটের সংখ্যা নয়; separate nation (আলাদা জাতি)। এই জাতির political home (রাজনৈতিক ঘর) দরকার। Chundrigar কংগ্রেসের Constituent Assembly proposal (গণপরিষদ প্রস্তাব)-এর মধ্যে permanent minority (স্থায়ী সংখ্যালঘু)-তে আটকে যাওয়ার ভয় দেখেছিলেন। (Farooq Ahmad Dar, “Jinnah and the Lahore Resolution,” pp. 142–145)
এই ভয় ৪৭-এর এক গভীর চালিকাশক্তি। পাকিস্তান দাবি শুধু মানচিত্রের আকাঙ্ক্ষা ছিল না। এটি ছিল সংখ্যার ভিতরে মুছে না যাওয়ার দাবি।
ইউপি; মানচিত্রের বাইরে থেকেও ভাষার ভিতরে
ইউপি পাকিস্তানের মানচিত্র পায়নি। তবু পাকিস্তান দাবির রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করতে ইউপির মুসলমানদের ভূমিকা বাদ দিলে ৪৭-এর কেন্দ্রীয় যুক্তি দুর্বল হয়ে যায়। এই প্রদেশ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল না। এখানকার মুসলমানরা জানত, পাকিস্তান তৈরি হলেও তাদের ঘর, জমি, শহর, কবরস্থান সেই রাষ্ট্রে ঢুকবে না। তবু ইউপি মুসলিম রাজনীতির ভিতরে Pakistan demand (পাকিস্তান দাবি) গভীর শক্তি পেল। এই ঘটনা বুঝতে না পারলে ৪৭-কে শুধু territorial nationalism (ভূখণ্ডভিত্তিক জাতীয়তাবাদ)-এর অঙ্কে নামিয়ে আনা হয়।
ইউপির মুসলমানদের কাছে পাকিস্তান ছিল না শুধুই migration map (অভিবাসনের মানচিত্র)। এটি ছিল Muslim political recognition (মুসলিম রাজনৈতিক স্বীকৃতি)-এর ভাষা। আলীগড়ের শিক্ষা, আইনপেশা, সাংবাদিকতা, ছাত্ররাজনীতি, মুসলিম মধ্যবিত্তের সাংবিধানিক চিন্তা—সব মিলিয়ে ইউপি মুসলমানদের মধ্যে একটি political vocabulary (রাজনৈতিক শব্দভান্ডার) তৈরি করেছিল। representation (প্রতিনিধিত্ব), consent (সম্মতি), safeguard (সুরক্ষা), separate electorate (পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী), nationhood (জাতিসত্তা)—এই শব্দগুলো তাদের কাছে বিমূর্ত ছিল না। এগুলো ছিল সংখ্যাগুরু রাজনীতির ভেতরে বেঁচে থাকার ভাষা।
কংগ্রেসের Muslim mass contact movement (মুসলিম গণসংযোগ আন্দোলন) জিন্নাহর কাছে বিপজ্জনক মনে হয়। এটি মুসলমানদের সঙ্গে যোগাযোগের সাধারণ উদ্যোগ ছিল না; জিন্নাহর চোখে এটি মুসলিম লীগের representative claim (প্রতিনিধিত্ব দাবি)-এর ওপর আঘাত। কংগ্রেস যদি সরাসরি মুসলিম জনতার সঙ্গে কথা বলে এবং একই সঙ্গে মুসলিম নির্বাচিত নেতৃত্বকে পাশ কাটিয়ে যায়, তাহলে মুসলমানদের আলাদা রাজনৈতিক কণ্ঠ কংগ্রেসের “জাতীয়” ভাষার ভিতরে গলে যেতে পারে। Nair দেখান, ১৯৩৮ সালের গোড়ায় Nehru, Nawab Mohammad Ismail Khan এবং Jinnah-র মধ্যকার চিঠিপত্রে Muslim mass-contact movement নিয়ে সন্দেহ ও বিরোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। (Neeti Nair, Changing Homelands, p. 158)
ইউপির মুসলমানদের রাজনীতিকে তাই সহজে “অবাস্তব পাকিস্তান-স্বপ্ন” বলা যায় না। তারা এমন রাষ্ট্রের জন্য কাজ করেছে, যার নাগরিক তারা হবে না। বাইরে থেকে দেখলে এটি contradiction (বিরোধ)। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক কল্পনার ভিতরে এর যুক্তি ছিল। তারা ভাবছিল, যদি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলো রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পায়, তাহলে ভারতীয় মুসলমানের সামগ্রিক রাজনৈতিক ওজনও বদলাবে। মুসলমান আর scattered minority (ছড়ানো সংখ্যালঘু) থাকবে না; সে historical-political nation (ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক জাতিসত্তা) হিসেবে স্বীকৃতি পাবে।
এই যুক্তির সীমা ছিল। পাকিস্তান জন্মের পর ইউপির মুসলমান ভারতেই রয়ে যায়। রাষ্ট্রের জন্ম তাদের স্থানীয় নিরাপত্তা সরাসরি নিশ্চিত করেনি। বরং বহু ক্ষেত্রে সন্দেহের নাগরিকত্ব, আত্মপক্ষসমর্থন এবং রাজনৈতিক সংকোচ তাদের নতুন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু ১৯৪০-এর দশকে তাদের অংশগ্রহণকে পরবর্তী ফল দিয়ে বিচার করলে সে সময়ের political imagination (রাজনৈতিক কল্পনা) হারিয়ে যায়।
Gandhi-Jinnah talks (গান্ধী-জিন্নাহ আলোচনা)-এ self-determination (আত্মনিয়ন্ত্রণ) নিয়ে জিন্নাহর ভাষা এই জায়গা বুঝতে সাহায্য করে। Nair দেখান, জিন্নাহ আত্মনিয়ন্ত্রণকে territorial unit (ভৌগোলিক একক)-এর অধিকার হিসেবে নয়, Muslim nation (মুসলিম জাতি)-এর অধিকার হিসেবে ধরেছিলেন। তাঁর যুক্তিতে তখন কোনো sovereign Indian union (সার্বভৌম ভারতীয় ইউনিয়ন) ছিল না, যেখান থেকে মুসলমানরা secession (বিচ্ছেদ) চাইছে। প্রশ্ন ছিল দুই major nations (প্রধান জাতি)—হিন্দু ও মুসলমান—এর মধ্যে political settlement (রাজনৈতিক মীমাংসা)। (Neeti Nair, Changing Homelands, p. 165)
এই ভাষা ইউপি মুসলমানের অবস্থানকে অর্থ দেয়। তারা নিজেদের জেলা পাকিস্তানে নিতে চায়নি। তারা মুসলমান নামে একটি political nation (রাজনৈতিক জাতিসত্তা)-এর স্বীকৃতি চাইছিল। এই স্বীকৃতি তাদের জন্য পূর্ণ নিরাপত্তা হয়ে ফেরেনি—এটাই ৪৭-এর অস্বস্তি। কিন্তু তাদের অংশগ্রহণের অর্থ এই অস্বস্তির ভিতরেই আছে। ইউপি দেখায়, ৪৭ কেবল কোথায় সীমান্ত কাটা হলো তার ইতিহাস নয়; কারা সীমান্তের বাইরে থেকেও সেই দাবির ভাষা বানাল, সেটাও ইতিহাস।
বিহার; দাঙ্গার ভিতরে মুসলিম স্মৃতির ক্ষত
বিহারের ইতিহাস ৪৭-এর আলোচনায় ঢুকলে ভাষা বদলে যায়। এখানে প্রশ্ন শুধু সাংবিধানিক ভাষা, প্রতিনিধি বা তহবিল নয়। এখানে প্রশ্ন রক্ত, ভয়, প্রতিশোধ, ঘরবাড়ি, গুজব, জনতার হিংসা, এবং political memory (রাজনৈতিক স্মৃতি)-র ক্ষত।
১৯৪৬ সালের Bihar violence (বিহার সহিংসতা) কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। কলকাতা, নোয়াখালি, বিহার, গড়মুক্তেশ্বর—এই নামগুলো ১৯৪৬-এর উপমহাদেশীয় মানসিক ভূগোলকে বদলে দেয়। এক অঞ্চলের হত্যার খবর অন্য অঞ্চলে প্রতিশোধের ভাষা তৈরি করে। Butalia স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯৪৬-এ Bengal, Noakhali, Bihar, Garh Mukteshwar—সব জায়গায় সহিংসতা হয়েছিল, এবং হিন্দু-মুসলমান উভয় পক্ষই কখনও আক্রান্ত, কখনও আক্রমণকারী হয়েছে। (Urvashi Butalia, The Other Side of Silence, p. 56)
Nair দেখান, Calcutta killings (কলকাতা হত্যাকাণ্ড)-এর খবর Punjab-এ press (সংবাদমাধ্যম) ও স্থানীয় রাজনীতির ভিতরে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। Bengal এবং Bihar-এ সংঘটিত violence (সহিংসতা)-কে local Hindu Mahasabha leaders এবং Muslim League National Guards—দুই পক্ষই স্মৃতি ও প্রতিবাদের “দিন” বানিয়ে রাজনৈতিক কাজে লাগাতে থাকে। Lahore-এর ছাত্ররা “Noakhali Day” পালন করে “blood for blood” ধরনের slogan (স্লোগান) তোলে। (Neeti Nair, Changing Homelands, pp. 189–190)
এই বিবরণ বিহারকে শুধু বিহারের ভিতর আটকে রাখে না। এটি দেখায়, ১৯৪৬-এর violence memory (সহিংসতা-স্মৃতি) প্রদেশের সীমানা পেরিয়ে রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠছিল। বিহারের মুসলমান তাই শুধু স্থানীয় দাঙ্গার শিকার নয়; সে সর্বভারতীয় মুসলিম স্মৃতির আহত অংশ। তার ক্ষত পাঞ্জাবে প্রতিধ্বনি তোলে, বাংলার স্মৃতির সঙ্গে জোড়া লাগে, মুসলিম লীগের ভাষায় নিরাপত্তা ও মর্যাদার দাবিকে আরও তীব্র করে।
বিহারের মুসলমানদের অবস্থান পূর্ববাংলা বা পাঞ্জাবের মুসলমানদের মতো ছিল না। তারা সম্ভাব্য মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রের কেন্দ্র ছিল না। তাদের গ্রাম পাকিস্তানে যাবে না। জমি পাকিস্তানের প্রশাসনে ঢুকবে না। পাকিস্তান রাষ্ট্র জন্মালেও তা তাদের দরজায় পুলিশ, আদালত বা নিরাপত্তা নিয়ে আসবে না। তবু পাকিস্তান দাবির সঙ্গে তাদের সংহতি ছিল। এই সংহতি তাদের local vulnerability (স্থানীয় অরক্ষতা)-কে মুছে দেয়নি; বরং অনেক সময় আরও দৃশ্যমান করেছে।
এখানে “ত্যাগ” শব্দটিকে সাবধানে ব্যবহার করতে হয়। বিহারের মুসলমানরা পাকিস্তান পায়নি, কিন্তু পাকিস্তান দাবির political cost (রাজনৈতিক মূল্য) দিয়েছে। তাদের ওপর সন্দেহ এসেছে। তাদের ঘর আঘাতের মুখে পড়েছে। দাঙ্গার স্মৃতি তাদের জাতিগত স্মৃতিতে ঢুকে গেছে। রাষ্ট্রের মানচিত্র তাদের ঘরে পৌঁছায়নি, কিন্তু রাষ্ট্রদাবির মূল্য তাদের ঘর পর্যন্ত পৌঁছেছে।
বিহার ৪৭-এর moral ledger (নৈতিক হিসাবখাতা)-কে কঠিন করে। পাকিস্তান জন্মের গল্পে বিহারের মুসলমানকে সহজে রাখা যায় না। সে founding citizen (প্রতিষ্ঠাতা নাগরিক) নয়। সে নতুন রাষ্ট্রের নাগরিকও নয়। কিন্তু সে রাষ্ট্রদাবির বাইরে নয়। তার ভয়, রক্ত, স্মৃতি ও রাজনৈতিক ঝুঁকি Pakistan demand (পাকিস্তান দাবি)-কে all-India Muslim question (সর্বভারতীয় মুসলিম প্রশ্ন)-এ পরিণত করার অংশ।
Butalia-র history-from-below (নিচুতলার ইতিহাস)-এর পদ্ধতি এখানে জরুরি। Partition (দেশভাগ)-এর বড় রাজনীতি শুধু নেতার চুক্তি, সীমান্ত কমিশন ও রাষ্ট্রীয় দলিলে থাকে না; ordinary people (সাধারণ মানুষ)-এর নীরবতা, trauma (আঘাত), women (নারী), children (শিশু), Dalits (দলিত), উদ্বাস্তু পরিবার—এসবের ভিতরেও থাকে। বিহারের মুসলমানকে শুধু casualty figure (মৃত্যুসংখ্যা) হিসেবে পড়লে হবে না। তাকে পড়তে হবে political wound (রাজনৈতিক ক্ষত) হিসেবে। (Urvashi Butalia, The Other Side of Silence, pp. 56–57)
বিহারের ইতিহাস তাই appendix (পরিশিষ্ট) নয়। এটি ৪৭-এর নৈতিক হিসাবের অংশ। যে ইতিহাস শুধু মানচিত্রে ঢোকা অঞ্চল দেখে, সে বিহারকে বাদ দেবে। কিন্তু যে ইতিহাস Muslim political memory (মুসলিম রাজনৈতিক স্মৃতি) পড়তে চায়, সে বিহারের ক্ষত এড়িয়ে যেতে পারে না।
বোম্বে; অর্থ, আইনি ভাষা ও মুসলিম ব্যবসায়ী নেটওয়ার্ক
বোম্বে পাকিস্তানের ভূগোল নয়, কিন্তু জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবনের শহর। এখানকার মুসলিম বণিক, পেশাজীবী, আইনজীবী, press (সংবাদমাধ্যম) ও commercial networks (বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক) মুসলিম রাজনীতির অর্থনৈতিক অবকাঠামো বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ। ৪৭-এর ইতিহাস শুধু প্রস্তাব, বক্তৃতা, দাঙ্গা ও ভোটে তৈরি হয়নি; তৈরি হয়েছে অর্থ, printing (মুদ্রণ), publicity (প্রচার), travel (ভ্রমণ), conference (সম্মেলন), fund (তহবিল), newspaper (সংবাদপত্র), legal defence (আইনি প্রতিরক্ষা)—এই সবকিছুর ভিতর দিয়ে।
এখানে অতিরিক্ত দাবি করা ঠিক হবে না। “বোম্বের ব্যবসায়ীরাই পাকিস্তান বানাল” বলা মিথ। আবার অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক বাদ দিয়ে মুসলিম লীগের বিস্তার বোঝাও দুর্বল। Muslim League একটি modern political organisation (আধুনিক রাজনৈতিক সংগঠন) হতে চাইছিল। সংগঠন চালাতে টাকা লাগে। সভা লাগে। সংবাদপত্র লাগে। মামলা-মোকদ্দমা, প্রচারপত্র, ভ্রমণ, সম্মেলন, প্রাদেশিক যোগাযোগ—সবকিছুর খরচ আছে।
Jinnah-এর রাজনৈতিক জগৎ এই শহুরে অর্থনৈতিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না। তাঁর রাজনীতির ভাষা আইন, সংবিধান, প্রতিনিধি, সম্মতি, দরকষাকষি—এই শব্দে গঠিত। বোম্বে এই ভাষাকে শহুরে পেশাজীবী সমাজ, ব্যবসায়ী পৃষ্ঠপোষকতা এবং সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত করে। I. I. Chundrigar-এর মতো নেতারা পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের বাণিজ্য দপ্তরের সঙ্গে যুক্ত হন, যা মুসলিম লীগের ভিতরে বাণিজ্যিক-প্রশাসনিক দক্ষতার একটি আলাদা স্তর দেখায়। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, p. 226)
বোম্বের গুরুত্ব তিনভাবে পড়া যায়।
প্রথমত, এটি মুসলিম লীগের elite political language (অভিজাত রাজনৈতিক ভাষা)-কে শহুরে আইনগত ও সাংগঠনিক রূপ দেয়। জিন্নাহ নিজে barrister politics (ব্যারিস্টার-রাজনীতি)-এর মানুষ। তাঁর রাজনৈতিক ভাষায় law (আইন), constitution (সংবিধান), consent (সম্মতি), representation (প্রতিনিধিত্ব)—এই শব্দগুলো শক্তিশালী।
দ্বিতীয়ত, বোম্বে অর্থনৈতিক মুসলিম সমাজের ভূমিকা দেখায়। মুসলিম জাতিসত্তার দাবি কেবল মসজিদ বা মাদরাসার ভাষায় সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি business community (ব্যবসায়ী সমাজ)-এর মধ্যেও প্রবেশ করেছিল।
তৃতীয়ত, পাকিস্তান demand (পাকিস্তান দাবি) বহু ধরনের Muslim social class (মুসলিম সামাজিক স্তর)-এর মধ্যে তৈরি হয়েছে। জমিদার, কৃষক, ছাত্র, উলামা, আইনজীবী, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী—সবাই একইভাবে কাজ করেনি, কিন্তু তারা একটি রাজনৈতিক লক্ষ্যের পাশে নিজেদের অবস্থান খুঁজে নিয়েছিল।
এই অর্থযুদ্ধ দৃশ্যমান নয়, কিন্তু রাষ্ট্রদাবির জন্য অপরিহার্য। যে ইতিহাস শুধু রক্ত দেখে, সে অর্থ দেখে না। যে শুধু নেতা দেখে, সে সংগঠন দেখে না। যে শুধু মানচিত্র দেখে, সে printing press (মুদ্রণযন্ত্র), subscription list (চাঁদার তালিকা), meeting fund (সভা-তহবিল), newspaper office (সংবাদপত্র অফিস), student hostel (ছাত্রাবাস)—এসব দেখে না। অথচ রাজনৈতিক দাবির শরীর এসব দিয়েই তৈরি হয়।
মালাবার ও কেরালা; দূরত্বের ভিতরে রাজনৈতিক সাড়া
কেরালা বা মালাবারকে ৪৭-এর আলোচনায় আনা কঠিন, কারণ এটি পাকিস্তান দাবির প্রচলিত ভূগোলের বাইরে। কিন্তু এই কঠিনতাই তাকে গুরুত্বপূর্ণ করে। যদি Muslim political imagination (মুসলিম রাজনৈতিক কল্পনা) শুধু পাঞ্জাব ও বাংলার জমির অঙ্কে আটকে থাকত, তাহলে মালাবারের মুসলমানদের রাজনৈতিক সাড়া ব্যাখ্যা করা কঠিন হতো।
মালাবারের মুসলমান পাঞ্জাবের জমিদার নয়, বাংলার কৃষক নয়, ইউপির আলীগড়-শিক্ষিত মধ্যবিত্ত নয়। তাদের দৈনন্দিন রাজনীতি ছিল Madras Presidency, local caste-land relations (স্থানীয় বর্ণ-জমি সম্পর্ক), coastal Muslim society (উপকূলীয় মুসলিম সমাজ), Malayalam public sphere (মালয়ালম জনপরিসর)—এসবের ভিতরে। তবু সর্বভারতীয় মুসলিম রাজনীতির ভাষা তাদের কাছে পৌঁছেছিল।
এই জায়গায় সতর্কতা দরকার। মালাবারকে পাঞ্জাব বা বাংলার মতো পাকিস্তান দাবির কেন্দ্র বানানো যাবে না। আবার তাকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন বলাও ভুল। Malabar Muslim League, Chandrika-র মতো সংবাদমাধ্যম, Mappila political memory (মাপ্পিলা রাজনৈতিক স্মৃতি), Khilafat memory (খিলাফত-স্মৃতি)—এসব মিলিয়ে মালাবারের মুসলিম রাজনীতি নিজের আলাদা পরিসর তৈরি করেছিল। এই পরিসর দেখায়, Muslim millat-consciousness (মুসলিম মিল্লাত-চেতনা) সব সময় সরাসরি মানচিত্রের রেখায় কাজ করে না। কখনও তা সংবাদপত্র, সংগঠন, স্মৃতি ও দূরের রাজনৈতিক সহমর্মিতায় কাজ করে।
এখানে millat (মিল্লাত) শুধু ধর্মীয় আবেগ নয়। এটি collective belonging (সমষ্টিগত অন্তর্ভুক্তি)-এর ভাষা, যেখানে দূরের মুসলমানের ভবিষ্যৎও নিজের রাজনৈতিক কল্পনায় ঢুকে পড়ে। মালাবার পাকিস্তানের ভূগোলে ঢোকেনি। কিন্তু ৪৭-এর all-India Muslim imagination (সর্বভারতীয় মুসলিম কল্পনা)-এর বিস্তার বুঝতে মালাবারকে বাদ দেওয়া যায় না।
হায়দারাবাদ; রাজ্য, অর্থ, স্বাধীনতার ভ্রান্তি ও পাকিস্তান-সংযোগ
হায়দারাবাদ ৪৭-এর মুসলিম ইতিহাসে আলাদা ধরনের অধ্যায়। এটি ব্রিটিশ ভারতের সরাসরি প্রদেশ নয়; princely state (দেশীয় রাজ্য)। নিজাম ছিলেন মুসলমান শাসক, কিন্তু প্রজাদের বড় অংশ হিন্দু। এই রাজনৈতিক বিন্যাস তাকে পাকিস্তান প্রশ্নে অদ্ভুত অবস্থানে দাঁড় করায়। হায়দারাবাদ ভৌগোলিকভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে সংযুক্ত নয়, কিন্তু Muslim power (মুসলিম ক্ষমতা), princely sovereignty (দেশীয় রাজ্যভিত্তিক সার্বভৌমত্ব), Indian Union (ভারতীয় ইউনিয়ন)-এর চাপ, পাকিস্তানের জন্ম, এবং post-1947 geopolitical bargaining (১৯৪৭-পরবর্তী ভূরাজনৈতিক দরকষাকষি)—সব মিলিয়ে এটি মুসলিম রাজনৈতিক কল্পনার এক উত্তপ্ত বিন্দু হয়ে ওঠে।
নিজাম প্রথমে ভারত বা পাকিস্তান—কোনোটাতেই যোগ দিতে চাননি; তিনি স্বাধীন অবস্থান ধরে রাখতে চাইছিলেন। কিন্তু ভারতীয় রাষ্ট্র গঠনের বাস্তবতায় এই অবস্থান দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১৯৪৮ সালে Operation Polo (অপারেশন পোলো)-র পর হায়দারাবাদ ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়।
হায়দারাবাদ নিয়ে দায়িত্বহীন ভাষা ব্যবহার করা যাবে না। “নিজাম পাকিস্তানকে সরাসরি অর্থ দিলেন” বলে চূড়ান্ত দাবি করলে source problem (সূত্রগত সমস্যা) তৈরি হয়। বেশি সঠিকভাবে বলতে হয়, হায়দারাবাদ ও পাকিস্তানের মধ্যে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক liaison (যোগাযোগ) ছিল, কিন্তু অর্থ-প্রশ্ন নিজেই disputed (বিতর্কিত)। এই জটিলতাই হায়দারাবাদকে গুরুত্বপূর্ণ করে। এটি Muslim political power (মুসলিম রাজনৈতিক ক্ষমতা)-এর শেষ princely shadow (দেশীয় রাজ্যভিত্তিক শেষ ছায়া), এবং নতুন nation-state (জাতিররাষ্ট্র)-এর কঠোর বাস্তবতার সঙ্গে সেই ছায়ার সংঘর্ষ।
হায়দারাবাদের নিজাম বুঝতে পারেননি, ১৯৪৭-এর পরে সাম্রাজ্যিক রাজ্যব্যবস্থার পুরোনো sovereignty (সার্বভৌমত্ব) আর আগের মতো টিকে থাকবে না। পাকিস্তান জন্মেছে Muslim nationhood (মুসলিম জাতিসত্তা)-এর রাষ্ট্রদাবি হিসেবে, কিন্তু হায়দারাবাদ ছিল Muslim-ruled princely state (মুসলিম-শাসিত দেশীয় রাজ্য), Muslim-majority nation-state (মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতিররাষ্ট্র) নয়। এই পার্থক্য মৌলিক।
তবু হায়দারাবাদের প্রশ্ন ৪৭-এর মুসলিম স্মৃতিতে থেকে যায়। কারণ মুসলমানদের চোখে এখানে ছিল ক্ষমতা হারানোর ভয়, সংখ্যাগুরু রাষ্ট্রে গিলে যাওয়ার ভয়, এবং ভারতীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের শক্তির সরাসরি প্রদর্শন। হায়দারাবাদ পাকিস্তান demand-এর মূল ভূগোল নয়, কিন্তু post-Partition Muslim anxiety (দেশভাগ-পরবর্তী মুসলিম উৎকণ্ঠা) বোঝার জন্য অপরিহার্য।
৪৭ কেবল British India (ব্রিটিশ ভারত)-এর প্রদেশ নিয়ে ছিল না; এটি Muslim power (মুসলিম ক্ষমতা)-এর নানা রূপের অবসান ও পুনর্গঠনের প্রশ্নও ছিল। কোথাও তা প্রাদেশিক সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভাষায় এসেছে, কোথাও সংখ্যালঘু নিরাপত্তার ভাষায়, কোথাও princely sovereignty (দেশীয় রাজ্যভিত্তিক সার্বভৌমত্ব)-এর ভ্রান্তিতে, কোথাও দাঙ্গার রক্তে।
মুসলিম লীগ; দল থেকে নেটওয়ার্ক
মুসলিম লীগকে শুধু একটি party (দল) হিসেবে পড়লে ৪৭-এর বিস্তার বোঝা যায় না। ১৯০৬ সালে জন্মের সময় লীগ অভিজাত সংগঠন ছিল। এই সত্য লুকানোর দরকার নেই। কিন্তু ১৯৪০-এর পর লীগ শুধু elite club (অভিজাত ক্লাব) থাকে না। প্রস্তাবের পর তাকে জনমতে নামতে হয়। প্রাদেশিক লীগ, জেলা লীগ, প্রাথমিক সংগঠন, ছাত্র, press (সংবাদমাধ্যম), তহবিল, সভা, স্থানীয় নেতৃত্ব—এই সব স্তরে দাবিকে ছড়িয়ে দিতে হয়।
লাহোরের পর জিন্নাহর আহ্বান এই রূপান্তরের দিকেই নির্দেশ করে। প্রাদেশিক, জেলা ও প্রাথমিক লীগ সংগঠনকে জনসভা করার নির্দেশ, ১৯ এপ্রিলকে self-determination and independence-day (আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীনতা দিবস) হিসেবে পালনের আহ্বান—এসব দেখায়, দাবি আর শুধু Working Committee বা annual session (বার্ষিক অধিবেশন)-এর ভাষায় আটকে নেই। (Farooq Ahmad Dar, “Jinnah and the Lahore Resolution,” p. 147)
কিন্তু এই রূপান্তর সরল ছিল না। Muslim-majority provinces (মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ)—বিশেষ করে Punjab ও Bengal—জিন্নাহর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণে সহজে আসেনি। Punjab-এ Unionist politics (ইউনিয়নিস্ট রাজনীতি) এত শক্তিশালী ছিল যে জিন্নাহর কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ সেখানে দীর্ঘদিন দুর্বল থাকে। Fazl-i-Husain ও Sikandar Hayat Khan প্রাদেশিক স্বায়ত্ততা নিয়ে জিন্নাহর হস্তক্ষেপকে সন্দেহের চোখে দেখেছিলেন। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, p. 21)
Bengal-এও সমস্যা কম ছিল না। Fazlul Huq প্রাদেশিক সরকারের স্বার্থ ও বাংলার মুসলমানদের নিজস্ব অবস্থানকে গুরুত্ব দিতেন। War effort (যুদ্ধ-প্রচেষ্টা) নিয়ে লীগের high command (কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব) প্রাদেশিক premiers (প্রাদেশিক প্রধানমন্ত্রী)-এর ওপর নিয়ন্ত্রণ চাইলে Huq বাধা দেন। Jalal দেখান, Huq কেন্দ্রীয় লীগের নির্দেশ মানতে অস্বীকার করে AIML-এর সঙ্গে ভেঙে যান এবং অভিযোগ করেন, মুসলিম সংখ্যালঘু প্রদেশের নেতারা Bengal ও Punjab-এর মুসলমানদের স্বার্থ বিপন্ন করছে। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, p. 69)
আরেকদিকে Bengal Muslim League-এর সংগঠনও নিখুঁত ছিল না। ১৯৪৫ সালে লীগের inspector Bengal Provincial Muslim League-এর প্রশাসনিক দুর্বলতা, জেলা সংগঠনের অভাব, সদস্যসংখ্যার অনিশ্চয়তা, factional rivalry (গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব)—এসব দেখেছিলেন। অর্থাৎ Muslim League একদিনে শৃঙ্খলাবদ্ধ জাতীয় যন্ত্র হয়ে ওঠেনি। এটি ছিল ভাঙাচোরা, প্রাদেশিক, অসংগঠিত, তবু দ্রুত প্রসারমান একটি রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, p. 154)
এই বাস্তবতা জিন্নাহর গুরুত্ব কমায় না; তাঁর কাজের কঠিনতা দেখায়। তিনি একটি বিভক্ত, প্রাদেশিক, শ্রেণিভেদপূর্ণ, ভাষাগতভাবে বিচ্ছিন্ন মুসলিম সমাজকে এক constitutional demand (সাংবিধানিক দাবি)-এর ভিতরে আনতে চাচ্ছিলেন। তাঁর শক্তি ছিল এই বিচ্ছিন্নতাকে অস্বীকার না করে একটি বড় রাজনৈতিক প্রতীকে রূপ দেওয়া।
মুসলিম লীগ তাই ১৯৪০-এর পর কাগজের সংগঠন নয়; একটি networked political machine (নেটওয়ার্কভিত্তিক রাজনৈতিক যন্ত্র) হতে শুরু করে। এর ভিতরে পাঞ্জাবের landed politics (জমিদারভিত্তিক রাজনীতি) আছে, বাংলার কৃষক-প্রজা বাস্তবতা আছে, ইউপির শিক্ষিত মধ্যবিত্ত আছে, বোম্বের অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা আছে, মালাবারের মুসলিম সংবাদমাধ্যম আছে, বিহারের আঘাত আছে, হায়দারাবাদের princely anxiety (দেশীয় রাজ্যভিত্তিক উৎকণ্ঠা) আছে। সব এক নয়। কিন্তু এক দাবির দিকে টানা।
সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ দরজা খুলেছে, সংখ্যালঘু প্রদেশ ভিত্তি দিয়েছে
Bengal and Punjab (বাংলা ও পাঞ্জাব) ছাড়া Pakistan demand (পাকিস্তান দাবি) রাষ্ট্রীয় বাস্তবতা পেত না। এই সত্যকে ছোট করলে ইতিহাসের শরীর ভেঙে যায়। পূর্বে বাংলা, পশ্চিমে পাঞ্জাব—এই দুই অঞ্চল পাকিস্তানকে viable statehood (বাস্তব রাষ্ট্র-সম্ভাবনা) দিয়েছে। রাষ্ট্র শুধু স্লোগান দিয়ে দাঁড়ায় না। রাষ্ট্রের জন্য লাগে ভূখণ্ড, জনসংখ্যা, প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা, কৃষিভিত্তি, নদী, বন্দর, সামরিক অবস্থান, সীমান্ত, এবং এমন জনসমাজ যারা সেই রাষ্ট্রকে নিজেদের ভবিষ্যৎ হিসেবে কল্পনা করতে পারে। বাংলা ও পাঞ্জাব সেই বাস্তব শরীর দিয়েছে।
কিন্তু রাষ্ট্রের শরীর আর রাষ্ট্রদাবির শক্তি এক জিনিস নয়। বাংলা ও পাঞ্জাব পাকিস্তানকে ভূগোল দিয়েছে; সংখ্যালঘু প্রদেশের মুসলমানরা সেই দাবিকে all-India Muslim politics (সর্বভারতীয় মুসলিম রাজনীতি)-এর মর্যাদা দিয়েছে। ইউপি, বিহার, বোম্বে, মালাবার, মাদ্রাজ, হায়দারাবাদ—এই নামগুলো পাকিস্তানের চূড়ান্ত মানচিত্রে বড় অক্ষরে লেখা হয়নি। তবু দাবির পেছনের ভাষা, ভয়, অর্থ, প্রচার, তর্ক, তহবিল, জনমত ও নৈতিক চাপের ভিতরে তাদের উপস্থিতি ছিল।
Ayesha Jalal জিন্নাহর রাজনৈতিক অবস্থানকে এমন এক constitutional claim (সাংবিধানিক দাবি) হিসেবে পড়েন, যেখানে মুসলমানদের minority (সংখ্যালঘু) নয়, nation (জাতি) হিসেবে স্বীকৃতি দাবি করা হয়। তাঁর মতে, জিন্নাহর যুক্তি ছিল—India’s unitary centre (ভারতের একক কেন্দ্র) ব্রিটিশ সৃষ্ট কাঠামো; ব্রিটিশ গেলে নতুন all-India centre (সর্বভারতীয় কেন্দ্র) মুসলিম প্রদেশ এবং দেশীয় রাজ্যগুলোর সম্মতি ছাড়া দাঁড়াতে পারে না। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, p. 240)
এই যুক্তি সংখ্যালঘু প্রদেশের মুসলমানদের অবস্থানও ব্যাখ্যা করে। তারা রাষ্ট্রের মানচিত্রে ঢুকবে না, কিন্তু মুসলমান নামের জাতিসত্তা যদি রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পায়, তাহলে সর্বভারতীয় ক্ষমতার অঙ্ক বদলাবে—এই আশাই তাদের অংশগ্রহণে শক্তি দিয়েছে।
বাংলা ও পাঞ্জাবকে ছোট করে সংখ্যালঘু প্রদেশের ভূমিকা বড় করা ভুল। আবার বাংলা-পাঞ্জাবকে একমাত্র মালিক বানিয়ে বাকি মুসলিম সমাজকে footnote (পাদটীকা)-এ নামিয়ে দেওয়াও ভুল। পাকিস্তান দাবির শরীর গঠিত হয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশে; কিন্তু তার সর্বভারতীয় নৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে সেইসব মুসলমানের অংশগ্রহণে, যারা জানত, সফলতার পরও তারা নতুন রাষ্ট্রের নাগরিক হবে না।
কেন ৪৭ শুধু বাংলার ইতিহাস নয়?
বাংলার মুসলমানের ভূমিকা বিশাল। এই সত্য নিয়ে কোনো দ্বিধা নেই। ভোট, জনসংখ্যা, পূর্ববঙ্গের কৃষকসমাজ, ফজলুল হকের লাহোরে প্রস্তাব পেশ করা, পূর্বাঞ্চলের রাষ্ট্রীয় সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে বাংলা পাকিস্তান দাবিকে বাস্তব রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক ওজন দিয়েছে। কিন্তু বাংলার ভূমিকা বড় বলেই ৪৭-কে শুধু “বাঙালির ইতিহাস” বানানো যায় না।
কারণ পূর্ববাংলার মুসলমান নিজেও নিজেকে একমাত্র ভাষাভিত্তিক বাঙালি পরিচয়ে পড়েনি। সে ভাষায় বাঙালি, অঞ্চলে পূর্ববঙ্গীয়, সমাজে কৃষিভিত্তিক মুসলমান, ধর্মে মুসলিম, রাজনীতিতে all-India Muslim question (সর্বভারতীয় মুসলিম প্রশ্ন)-এর অংশ, স্মৃতিতে Muslim millat (মুসলিম মিল্লাত)-এর সদস্য। এই বহুস্তরীয় পরিচয় বাদ দিলে পূর্ববাংলার মুসলমানকে বোঝা যায় না।
জয়া চ্যাটার্জীর বাংলা ভাগ হল বাংলার দেশভাগকে শুধু মুসলিম লীগের দাবির ফল হিসেবে না পড়ে Hindu communalism (হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা), Bengal Congress (বঙ্গীয় কংগ্রেস), Hindu Mahasabha (হিন্দু মহাসভা), land-class-caste politics (জমি-শ্রেণি-বর্ণ রাজনীতি), এবং Hindu bhadralok (হিন্দু ভদ্রলোক)-এর রাজনৈতিক অবস্থানের ভিতর দিয়ে পড়ার রাস্তা খুলে দেয়। বাংলা ভাগের দায়কে একমুখীভাবে মুসলিম লীগের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার বদলে এই বই বাংলার অভ্যন্তরীণ হিন্দু রাজনীতি, ভদ্রলোক স্বার্থ, জমি-শ্রেণি-বর্ণের সম্পর্ক এবং সাম্প্রদায়িক সংগঠনের ভূমিকা সামনে আনে। (জয়া চ্যাটার্জী, বাংলা ভাগ হল, পৃ. ১–৩, ২৩–৩৬, ৩৭–১২২)
মুহাম্মদ আসাদের বাংলা যেভাবে ভাগ হল বাংলার ভাগকে বাঙালি মুসলমানের pro-partition framing (দেশভাগ-সমর্থক ফ্রেমিং), Bengal-Assam Pakistan zone (বাংলা-আসাম পাকিস্তান অঞ্চল), map-consciousness (মানচিত্র-চেতনা) এবং মুসলিম লীগের দাবির ভাষায় পড়তে সাহায্য করে। বইটির শুরুতেই অবিভক্ত বাংলা, র্যাডক্লিফ রেখা, হিন্দু মহাসভা ও জাতীয় প্রতিষ্ঠানের বিস্তার, এবং বাংলাদেশের মানচিত্র পাশাপাশি এসেছে। পরে ১৯৪৬ সালের দিল্লি মুসলিম লীগ আইনসভা সদস্যদের প্রস্তাবের অংশও দেওয়া হয়েছে, যেখানে Bengal and Assam in the North-East এবং Punjab, North-West Frontier Province, Sind and Baluchistan in the North-West-কে Pakistan zones হিসেবে উল্লেখ করা হয়। (মুহাম্মদ আসাদ, বাংলা যেভাবে ভাগ হল, পৃ. ৮–১১, ১৮–১৯)
আব্বাস আলী খানের বাংলার মুসলমানের ইতিহাস বাঙালি মুসলমানকে শুধু ১৯৪৭-এর রাজনৈতিক জনতা হিসেবে নয়, দীর্ঘ social formation (সামাজিক গঠন), Muslim rule (মুসলিম শাসন), colonial transition (ঔপনিবেশিক রূপান্তর), শিক্ষা-সংকট, Muslim League politics (মুসলিম লীগ রাজনীতি), Pakistan movement (পাকিস্তান আন্দোলন), এবং ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতার ভিতরে রাখে। তাঁর আলোচনায় বাংলার মুসলমানের আগমন, মুসলিম শাসনের পটভূমি, ইংরেজ-পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থা, মুসলিম সমাজের দুর্দশা, মুসলিম লীগের উত্থান, পাকিস্তান আন্দোলন এবং ভাষা-প্রশ্ন একই দীর্ঘ ইতিহাসের আলাদা স্তর হয়ে আসে। (আব্বাস আলী খান, বাংলার মুসলমানের ইতিহাস, পৃ. ১৩, ৫৭–৮০, ৮৬–৯৪, ৯৭–১১৬, ১৪০–১৮৮, ৩৫০, ৩৬৩–৪৩০)
মোহাম্মদ আকরম খাঁর মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস বাঙালি মুসলমানের পরিচয়ের আরও গভীর সামাজিক স্তর খুলে দেয়। ভাষা, আরবি-ফারসি শব্দভান্ডার, শব্দের সামাজিক চলন, মুসলমান সমাজ, ধর্মীয় পরিচয়, বাংলায় ইসলামের আগমন, এবং বাংলার মুসলিম সামাজিক অবস্থার প্রশ্ন সেখানে আছে। এই সূত্র মনে করিয়ে দেয়, বাঙালি মুসলমানের পরিচয় শুধু আধুনিক ভোটরাজনীতিতে তৈরি হয়নি; তার পেছনে ভাষা, ধর্ম, সামাজিক স্মৃতি ও সভ্যতাগত ধারাবাহিকতা আছে। (মোহাম্মদ আকরম খাঁ, মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস, পৃ. ৯–১৬, ১৭–১৮, ৫৭–৬১, ৮৬–৯২)
তাই যারা ৪৭-কে শুধু বাংলা বনাম ভারত, বা বাংলা বনাম পাকিস্তানের পরবর্তী hindsight (পরবর্তী দৃষ্টিভঙ্গি) দিয়ে পড়ে, তারা ১৯৪০-এর দশকের Muslim political imagination (মুসলিম রাজনৈতিক কল্পনা) হারিয়ে ফেলে। পূর্ববাংলার মুসলমান পাকিস্তান চেয়েছিল শুধু কলকাতার হিন্দু ভদ্রসমাজের আধিপত্য থেকে বের হওয়ার জন্য নয়; শুধু জমিদারি-প্রশাসনিক বঞ্চনার জন্য নয়; শুধু কৃষকসমাজের ক্ষমতার জন্য নয়। এগুলো ছিল, কিন্তু এগুলো একা ছিল না। এর সঙ্গে ছিল বৃহত্তর Muslim nationhood (মুসলিম জাতিসত্তা)-এর প্রশ্ন।
বাঙালি মুসলমানের ইতিহাস ভাষার ইতিহাস, কিন্তু শুধু ভাষার ইতিহাস নয়। এটি social history (সামাজিক ইতিহাস), Islamic civilizational memory (ইসলামি সভ্যতাগত স্মৃতি), law-consciousness (আইনবোধ), কৃষকজীবন, অঞ্চল, জাতিগত স্মৃতি এবং Muslim millat-consciousness (মুসলিম মিল্লাত-চেতনা)-এর মিলিত ইতিহাস।
৪৭-কে শুধু “বাঙালির ইতিহাস” বানালে এই বহুস্তরীয়তা হারিয়ে যায়। তখন পূর্ববাংলার মুসলমানকে কেবল ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার পূর্বসূরি হিসেবে দেখা হয়, মুসলিম জাতিসত্তার সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে নয়। এই পাঠ ১৯৭১-এর পরে সুবিধাজনক হতে পারে, কিন্তু ১৯৪০-এর দশকের রাজনৈতিক বাস্তবতা ব্যাখ্যা করতে পারে না।
মানচিত্রের বাইরে থাকা মানুষদের ফিরিয়ে আনা
৪৭-এর ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি আলো পড়ে মানচিত্রে। কোন জেলা কোথায় গেল, কোন সীমান্ত কাটা হলো, কোন ট্রেন এলো, কোন শহর জ্বলল—এসব অপরিহার্য। কিন্তু মানচিত্রের আগে ছিল রাজনৈতিক কল্পনা। মানচিত্রের আগে ছিল ভয়। মানচিত্রের আগে ছিল সংগঠন। মানচিত্রের আগে ছিল সেইসব মানুষ, যাদের অনেকেই পরে মানচিত্রের বাইরে থেকে গেল।
ইউপির মুসলমান, যে পাকিস্তানের ভূখণ্ড পায়নি, কিন্তু Muslim representation (মুসলিম প্রতিনিধিত্ব)-এর ভাষা গড়তে সাহায্য করেছে। বিহারের মুসলমান, যে দাঙ্গার ভিতর জাতিগত স্মৃতির ক্ষত বহন করেছে। বোম্বের মুসলিম অর্থনৈতিক সমাজ, যার press patronage (সংবাদপত্র-পৃষ্ঠপোষকতা), merchant networks (ব্যবসায়ী নেটওয়ার্ক), fund-raising (তহবিল সংগ্রহ) ও publicity (প্রচার) রাজনৈতিক দাবিকে শহুরে অবকাঠামো দিয়েছে। মালাবারের মুসলমান, যে দূরত্ব সত্ত্বেও Partition controversy (দেশভাগ-বিতর্ক)-র ভেতরে নিজের অবস্থান খুঁজেছে। হায়দারাবাদের মুসলিম শাসকশ্রেণি, যারা পুরোনো sovereignty (সার্বভৌমত্ব) ধরে রাখতে গিয়ে নতুন nation-state (জাতিরাষ্ট্র)-এর কঠোরতা বুঝেছে। আর বাংলা-পাঞ্জাবের মুসলমান, যারা রাষ্ট্রের ভূগোল ও রক্তের সবচেয়ে দৃশ্যমান ভার বহন করেছে।
এই স্রোতগুলো একরকম নয়, কিন্তু বিচ্ছিন্নও নয়। এগুলো মিলে ৪৭-এর মুসলিম রাজনৈতিক ইতিহাস তৈরি করেছে। কেউ রাষ্ট্রের ভূগোল দিয়েছে, কেউ দাবির ভাষা দিয়েছে, কেউ নৈতিক চাপ দিয়েছে, কেউ অর্থ দিয়েছে, কেউ ক্ষত দিয়েছে, কেউ স্মৃতি দিয়েছে।
রাষ্ট্র মানচিত্রে জন্ম নেয়, কিন্তু জাতিসত্তা জন্ম নেয় স্মৃতিতে। ৪৭-এর স্মৃতি তাই শুধু ঢাকায়, লাহোরে, করাচিতে বা কলকাতায় আটকে নেই। তার রেখা গেছে আলীগড়ের ছাত্রাবাসে, বিহারের ক্ষতবিক্ষত গ্রামে, বোম্বের ব্যবসায়ী মহলে, মালাবারের সংবাদপত্রে, হায়দারাবাদের দরবারে, পাঞ্জাবের রক্তাক্ত পথে।
এই মানুষদের বাদ দিলে ৪৭ শুধু রাষ্ট্রপ্রাপ্তদের ইতিহাস হয়ে যায়। কিন্তু Muslim nationhood (মুসলিম জাতিসত্তা)-এর অসমাপ্ত ইতিহাস বুঝতে হলে রাষ্ট্রপ্রাপ্তদের পাশাপাশি রাষ্ট্রের বাইরে থেকে যাওয়া মুসলমানের ত্যাগও পড়তে হবে। ৪৭-এর পূর্ণ স্মৃতি সেই দুই দিক মিলেই তৈরি—মানচিত্রে যারা ঢুকেছে, আর মানচিত্রের বাইরে থেকেও যারা সেই মানচিত্রের রাজনীতিতে নিজের অংশ রেখে গেছে।
এই জায়গা থেকেই পরের প্রশ্ন শুরু হবে। বাঙালি মুসলমান কি শুধু ভাষার ভিতরে গঠিত, নাকি ভাষা, ধর্ম, অঞ্চল, আইনবোধ, সামাজিক স্মৃতি, মিল্লাত-চেতনা এবং সর্বভারতীয় মুসলিম রাজনীতির মিলনে তার জাতিগত স্মৃতি তৈরি হয়েছে? ৪৭-এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে এই প্রশ্ন এড়ানো যায় না। এখান থেকেই বাঙালি মুসলমানের নিজস্ব ইতিহাসে প্রবেশ করতে হবে।

Post a Comment