Loading...

অসম্ভব রাষ্ট্রের দিকে যাত্রা: দুর্বল হাত নিয়ে জিন্নাহর দরকষাকষি

অসম্ভব রাষ্ট্রের দিকে যাত্রা: দুর্বল হাত নিয়ে জিন্নাহর দরকষাকষি
Advertisement
Advertisement — Place AdSense Code Here
Table of Contents
    মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ, কংগ্রেস ও ব্রিটিশ প্রতিনিধিদের মধ্যে ১৯৪০-এর দশকের রাজনৈতিক দরকষাকষির নাটকীয় দৃশ্য, যেখানে ভারত বিভাজন, মুসলিম প্রতিনিধিত্ব ও পাকিস্তান প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা চলছে।
    দুর্বল হাত নিয়েও জিন্নাহ এমন এক রাজনৈতিক দরকষাকষি গড়ে তুলেছিলেন, যা শেষ পর্যন্ত ভারত বিভাজনের প্রশ্নকে এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব করে তোলে

    Previous Part.......

    সাম্রাজ্য ভাঙছিলমুসলমানের ভবিষ্যৎ ঝুলছিল

    বিশ শতকের চল্লিশের দশকে পৃথিবী আর আগের জায়গায় ছিল না। ইউরোপীয় সাম্রাজ্যগুলোর পুরোনো নিশ্চয়তা ভেঙে পড়ছিল। যুদ্ধ, অর্থনৈতিক ক্লান্তি, উপনিবেশিত জাতিগুলোর চাপ, নতুন রাষ্ট্রের দাবি—সব মিলিয়ে বিশ্বরাজনীতির বাতাস বদলে গেছে। খেলাফত আগেই পতিত। তুরস্ক নিজের জাতীয় রাষ্ট্রের পথে চলে গেছে। আরব অঞ্চলে জাতীয়তাবাদের ভাষা উঠছে। রাষ্ট্র, সীমান্ত, পতাকা, প্রতিনিধিত্ব—এসব আর শুধু ইউরোপীয় কূটনীতির শব্দ নয়; উপনিবেশিত মানুষের ভবিষ্যৎ-প্রশ্নের ভাষা হয়ে উঠছে।

    ভারতেও ব্রিটিশ শাসনের শেষ স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। ব্রিটিশরা আজ না হোক কাল যাবে। কিন্তু তাদের চলে যাওয়ার পর এই বিশাল ভূখণ্ডে ক্ষমতা কার হাতে যাবে, কোন জনগোষ্ঠী কী মর্যাদা পাবে, ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘুর সম্পর্ক কী হবে—এসব প্রশ্ন তখনও মীমাংসিত নয়।

    কংগ্রেসের উত্তর ছিল সরল ও উচ্চকণ্ঠ: ভারত এক, জাতি এক, স্বাধীনতা এক। তাদের পেছনে দীর্ঘ ঔপনিবেশিকতাবিরোধী সংগ্রাম, গান্ধীর নৈতিক প্রভাব, সারা দেশে সংগঠন, সংবাদমাধ্যম, অর্থশক্তি, প্রাদেশিক সরকার চালানোর অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক পরিচিতি। কংগ্রেস নিজেকে শুধু একটি দল হিসেবে নয়, ভারতের জাতীয় কণ্ঠ হিসেবে দাঁড় করাতে পেরেছিল।

    মুসলমানের প্রশ্ন ছিল অন্যরকম। ভারত স্বাধীন হলে মুসলমান কোথায় দাঁড়াবে? একসময় তারা এই ভূখণ্ডে ক্ষমতার অংশ ছিল, কিন্তু ঔপনিবেশিক যুগের শেষে তারা অনেক জায়গায় পিছিয়ে। শিক্ষা, প্রশাসন, আদালত, পুঁজি, সংবাদমাধ্যম, আধুনিক সংগঠন—সবখানে তাদের অবস্থান সমান নয়। তার ওপর যদি ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের ওপর দাঁড়ায়, তবে মুসলমান স্থায়ী সংখ্যালঘু হয়ে যাবে। এই ভয়কে আজ পেছন থেকে সাম্প্রদায়িকতা বলে উড়িয়ে দেওয়া সহজ, কিন্তু তখন এটি ছিল রাষ্ট্রের ভিতরে বাঁচার প্রশ্ন।

    Farooq Ahmad Dar দেখান, ব্রিটিশ শাসনের অধীনে প্রতিনিধিত্বের নতুন কাঠামো তৈরি হলে মুসলমানরা বুঝতে শুরু করে, সংখ্যাগরিষ্ঠতার রাজনীতিতে তাদের অবস্থান দুর্বল হতে পারে। প্রথমে তারা separate electorates (পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী) চেয়েছিল; পরে এই নিরাপত্তা-প্রশ্ন আরও বড় রাজনৈতিক সমাধানের দিকে এগোয়। (Farooq Ahmad Dar, “Jinnah and the Lahore Resolution,” p. 127)

    স্বাধীনতা সবার কাছে একই অর্থ নিয়ে আসে না। যে সংখ্যাগরিষ্ঠ, তার কাছে স্বাধীনতা হতে পারে ক্ষমতার দরজা। যে স্থায়ী সংখ্যালঘু হয়ে পড়বে, তার কাছে একই স্বাধীনতা নতুন অধীনতার দরজাও হতে পারে। ভারতীয় মুসলমান এই দ্বিতীয় সম্ভাবনাটিই দেখতে শুরু করেছিল।

    পাকিস্তান তখনও মানচিত্র নয়; প্রায় অসম্ভব কল্পনা 

    আজ পাকিস্তান ইতিহাসের স্থির শব্দ। মানচিত্রে এসেছে, রাষ্ট্র হয়েছে, ভেঙেছে, তার পূর্বাংশ বাংলাদেশ হয়েছে। কিন্তু চল্লিশের দশকের শুরুতে পাকিস্তান কোনো প্রস্তুত রাষ্ট্র ছিল না। স্পষ্ট সীমানা নেই, প্রশাসনিক নকশা নেই, অর্থনৈতিক রূপরেখা নেই, সর্বসম্মত মুসলিম নেতৃত্ব নেই। অনেকের চোখে এটি ছিল অসম্ভব এক কল্পনা।

    চৌধুরী রহমত আলীর Now or Never: Are We to Live or Perish Forever? এই অস্থিরতার এক তীব্র দলিল। ক্যামব্রিজে বসে তিনি ভারতীয় মুসলমানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্ক প্রকাশ করলেন। তাঁর প্রশ্ন ছিল—ব্রিটিশরা চলে গেলে মুসলমান কি স্বাধীন থাকবে, না হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রের ভিতরে নতুন ধরনের অধীনতায় পড়বে? তাঁর “Pakistan” ধারণা এই ভয়, হতাশা ও ভবিষ্যৎ-আতঙ্ক থেকে বের হয়।

    কিন্তু সেই সময় মূলধারার মুসলিম রাজনীতিতে পাকিস্তান কোনো সর্বজনস্বীকৃত পরিকল্পনা ছিল না। মুসলমানের রাষ্ট্র বলতে কী বোঝায়, সেটাও পরিষ্কার নয়। এটি কি ইসলামী রাষ্ট্র? মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের স্বায়ত্তশাসন? সর্বভারতীয় দরকষাকষির চাপ? নাকি পূর্ণ স্বাধীন রাষ্ট্র? মুসলমানদের মধ্যেই উত্তর এক ছিল না।

    Dar দেখান, ১৯৩৩ সালে চৌধুরী রহমত আলীর পাকিস্তান-ধারণা মূলত উত্তর-পশ্চিম মুসলিম অঞ্চলকে কেন্দ্র করে ছিল; Bengal সেখানে ছিল না। ১৯৪০ সালের Lahore Resolution (লাহোর প্রস্তাব)-এর পরিসর তার চেয়ে আলাদা ও বিস্তৃত। (Farooq Ahmad Dar, “Jinnah and the Lahore Resolution,” pp. 148–149)

    লাহোর প্রস্তাবের মূল ভাষাতেও “Pakistan” শব্দ ছিল না। Dar দেখান, প্রস্তাবের text-এ শব্দটি অনুপস্থিত ছিল; জিন্নাহ বা অন্য কোনো মুসলিম লীগ নেতার লাহোর অধিবেশনের বক্তৃতাতেও শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি। পরে হিন্দু সংবাদমাধ্যম—Milap, Pratap, Bande Mataram—একে “Pakistan Resolution” বলতে শুরু করে। মুসলিম লীগ পরে শব্দটি গ্রহণ করে, কারণ আন্দোলনের জন্য একটি সংক্ষিপ্ত রাজনৈতিক নাম দরকার ছিল। (Farooq Ahmad Dar, “Jinnah and the Lahore Resolution,” pp. 148–149)

    তাই পাকিস্তানকে শুরু থেকেই প্রস্তুত রাষ্ট্র ধরে নিলে ৪৭ বোঝা যায় না। এটি ছিল এক ভয়ভরা রাজনৈতিক ভাষা, যা ধীরে ধীরে দাবিতে, দাবি থেকে ম্যান্ডেটে, ম্যান্ডেট থেকে দরকষাকষিতে, দরকষাকষি থেকে মানচিত্রে পৌঁছায়।

    রাষ্ট্র তৈরির যুগে কোন ভাষা কাজ করছিল

    চল্লিশের দশকের দুনিয়ায় রাষ্ট্র শুধু আবেগ দিয়ে তৈরি হচ্ছিল না। পতাকা, গান, কবিতা, ধর্মীয় আবেগ, ঐতিহাসিক গৌরব—এসব মানুষের মন জাগাতে পারে। কিন্তু সাম্রাজ্য যখন বিদায় নেয়, তখন ক্ষমতা হস্তান্তর হয় কাগজে, চুক্তিতে, কমিশনে, সীমানা-রেখায়, প্রতিনিধিত্বের দাবিতে। কে কাকে প্রতিনিধিত্ব করে, কোন ভূখণ্ড কার, কোন জনগোষ্ঠী কোথায় নিরাপদ, ভবিষ্যৎ সংবিধানে কার অধিকার কীভাবে রক্ষিত হবে—এসব প্রশ্নের ভাষা আলাদা।

    প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল এই ভাষার ভিতর দিয়ে। পোল্যান্ড আবার রাষ্ট্র হলো, চেকোস্লোভাকিয়া তৈরি হলো, যুগোস্লাভিয়া তৈরি হলো। অটোমান সাম্রাজ্য ভাঙার পর আরব অঞ্চলে নতুন ম্যান্ডেট, নতুন সীমানা, নতুন ক্ষমতার বিন্যাস তৈরি হলো। সেখানে জাতিগত দাবি ছিল, আবেগ ছিল, গান ছিল, শহীদের স্মারক ছিল; কিন্তু রাষ্ট্র দাঁড়িয়েছে কূটনীতি, সীমানা, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, প্রশাসনিক কাঠামো ও ক্ষমতার ভাগাভাগির ওপর।

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই ভাষা আরও কঠিন হয়ে উঠল। সাম্রাজ্য ভাঙবে, কিন্তু শুধু “আমরাও জাতি” বললেই রাষ্ট্র মিলবে না। প্রমাণ করতে হবে জনগোষ্ঠী আছে, রাজনৈতিক দাবি আছে, প্রতিনিধিত্ব আছে, ভূখণ্ড আছে, ক্ষমতা হস্তান্তরের পর নিরাপত্তার প্রশ্ন আছে।

    জিন্নাহ এই ভাষা বুঝেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, “মুসলমান বিপদে আছে” বললেই হবে না; বিপদকে সাংবিধানিক প্রশ্নে বদলাতে হবে। “আমরা আলাদা” বললেই হবে না; আলাদা সত্তার পেছনে নির্বাচনী ম্যান্ডেট দাঁড় করাতে হবে। শুধু ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে হবে না; ব্রিটিশ ও কংগ্রেসের সামনে বলতে হবে—মুসলমান একটি রাজনৈতিক জাতিসত্তা, তাদের সঙ্গে কথা বলতে হলে এমন প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলতে হবে, যার পেছনে মুসলিম জনমতের স্বীকৃতি আছে।

    অনেক মুসলিম নেতৃত্ব এই ভাষা পুরো ধরতে পারেনি। কেউ ধর্মীয় ভাষায় আটকে ছিল, কেউ অখণ্ড ভারতীয় জাতীয়তার ভিতরে নিরাপত্তা খুঁজছিল, কেউ প্রাদেশিক ক্ষমতার হিসাবেই সন্তুষ্ট ছিল, কেউ ভেবেছিল মুসলমানের ধর্মীয় পরিচয় নিজে থেকেই রাজনৈতিক নিরাপত্তা এনে দেবে। কিন্তু ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র বিদায় নেওয়ার মুহূর্তে শুধু নৈতিক আবেদন যথেষ্ট নয়। তখন দরকার প্রতিনিধিত্বের বৈধতা, সংখ্যার হিসাব, ভূখণ্ডের দাবি, দরকষাকষির শক্তি, প্রয়োজনে ক্ষমতা হস্তান্তর আটকে দেওয়ার সামর্থ্য।

    গান্ধী মানুষের হৃদয়ে কথা বলতেন। তাঁর ভাষা ছিল ত্যাগ, সত্যাগ্রহ, আত্মশুদ্ধি, নৈতিকতা। কংগ্রেস সেই আবেগের সঙ্গে সংগঠন, রাস্তা, সংবাদমাধ্যম, প্রাদেশিক সরকার ও আন্তর্জাতিক পরিচিতি জুড়ে দিয়েছিল। জিন্নাহর ভাষা ভিন্ন। তিনি জনতার ভেতরে গান তুলতে পারেননি; কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তরের টেবিলে এমন প্রশ্ন তুলেছিলেন, যার উত্তর না দিয়ে ভারত স্বাধীন করা কঠিন হয়ে গেল।

    ভারত যদি স্বাধীন হয়, মুসলমানের রাষ্ট্রিক অবস্থান কী হবে? কংগ্রেস যদি গোটা ভারতের প্রতিনিধি হয়, মুসলমানের আলাদা রাজনৈতিক কণ্ঠ কোথায়? সংখ্যাগরিষ্ঠের নামে রাষ্ট্র দাঁড়ালে সংখ্যালঘু মুসলমানের নিরাপত্তা কে দেবে?

    এই প্রশ্নগুলো মিছিলে আগুন ধরায় না, কিন্তু রাষ্ট্রভাগের টেবিলে ওজন রাখে। জিন্নাহ মুসলমানের আবেগকে সরাসরি রাষ্ট্র বানাননি; তিনি নিরাপত্তা-ভয়কে প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে, প্রতিনিধিত্বকে দরকষাকষির শক্তিতে, দরকষাকষিকে রাষ্ট্রিক দাবিতে বদলে দিয়েছেন। এটাই তাঁর বড় কাজ।

    শক্তির অসম ময়দান

    কংগ্রেসের সঙ্গে মুসলিম লীগের শক্তির তুলনা করলে বোঝা যায়, জিন্নাহ কী ধরনের ময়দানে নামেন। কংগ্রেসের পেছনে কয়েক দশকের সংগ্রাম। গান্ধীর নাম গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছেছে। সংগঠন আছে, রাস্তায় মানুষ নামানোর ক্ষমতা আছে, সংবাদমাধ্যমে প্রভাব আছে, প্রাদেশিক সরকার চালানোর অভিজ্ঞতা আছে। শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, শ্রমিক সংগঠন—বিভিন্ন স্তরে কংগ্রেসের প্রবেশ ছিল। কংগ্রেসের কাছে স্বাধীনতার ভাষা যেমন ছিল, রাষ্ট্র চালানোর অভিজ্ঞতার দাবিও ছিল।

    মুসলিম লীগ তার তুলনায় দুর্বল। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে এই দুর্বলতা প্রকাশ্য হয়ে যায়। মুসলিম আসনের বড় অংশে লীগ জিততে পারেনি। বহু অঞ্চলে মুসলমানরাই মুসলিম লীগকে নিজেদের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে মানেনি। পাঞ্জাবে ইউনিয়নিস্ট প্রভাব, সীমান্ত প্রদেশে কংগ্রেসপন্থী পশতুন রাজনীতি, বাংলায় প্রাদেশিক জটিলতা, সিন্ধে আলাদা হিসাব, দেওবন্দী আলেমদের আপত্তি, মওদূদীর ভিন্ন দৃষ্টিকোণ—সব মিলিয়ে মুসলিম সমাজ এক ছিল না।

    Ayesha Jalal দেখান, মুসলিম রাজনীতির ভেতরে প্রাদেশিক হিসাব ও সর্বভারতীয় দাবির সম্পর্ক ছিল জটিল। বাংলার ক্ষেত্রেও ফজলুল হক, কৃষকপ্রজা রাজনীতি, কলকাতাকেন্দ্রিক মুসলিম অভিজাত, মুসলিম লীগ—সব মিলিয়ে এক কঠিন বাস্তবতা কাজ করছিল। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, p. 24)

    জিন্নাহর সামনে তাই দুই দিকের লড়াই ছিল। একদিকে কংগ্রেস ও ব্রিটিশ, অন্যদিকে মুসলমানদের ভেতরের বিভক্তি। তিনি শুরুতেই মুসলমানের একক নেতা ছিলেন না; তাঁকে সেই জায়গায় পৌঁছাতে হয়েছে। তাঁর হাতে মাদরাসা-খানকার বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ছিল না, গ্রামবাংলা বা উত্তর ভারতের দরিদ্র মুসলমানের দৈনন্দিন ভাষাও তাঁর ভাষা ছিল না। তাঁর অস্ত্র ছিল আইন, সংবিধান, যুক্তি, প্রতিনিধিত্ব, সময়ের চাপ, এবং দরকষাকষির টেবিলে প্রশ্ন আটকানোর ক্ষমতা।

    এই ভাষা দূরের ছিল, কিন্তু তখন রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে কার্যকর ভাষা ছিল সেটাই।

    মুসলমানরাও এক কণ্ঠে ছিল না

    মুসলমানদের ভেতরের ভাঙনটি আলাদা করে দেখা দরকার। কারণ এই ভাঙন না দেখলে জিন্নাহর “sole spokesman” হয়ে ওঠার ইতিহাস বোঝা যায় না। দেওবন্দের মূলধারার অনেক আলেম অখণ্ড ভারতের পক্ষে ছিলেন। তাঁদের রাজনৈতিক ভাষা ছিল কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত। মওদূদী মুসলিম লীগের জাতীয়তাবাদী মুসলিম রাষ্ট্র-ধারণাকে ইসলামের যথার্থ রাজনৈতিক রূপ মনে করেননি। সীমান্ত প্রদেশে আবদুল গফ্ফার খানের নেতৃত্বে পশতুন রাজনীতি গান্ধীবাদী ধারায় চলেছে। পাঞ্জাবের মুসলিম জমিদার রাজনীতির নিজস্ব প্রাদেশিক হিসাব ছিল। বাংলার মুসলমানও দীর্ঘদিন বাংলার প্রাদেশিক বাস্তবতার ভিতরেই বেশি চিন্তা করেছে।

    এই ভাঙনের ভেতর দিয়ে জিন্নাহকে মুসলিম প্রতিনিধিত্বের একক দাবিতে পৌঁছাতে হয়েছে। তিনি চাইতেন ব্রিটিশ ও কংগ্রেস বুঝুক—মুসলমানের সঙ্গে কথা বলতে হলে মুসলিম লীগকে পাশ কাটানো যাবে না। কংগ্রেস যদি কিছু কংগ্রেসপন্থী মুসলমান, কিছু আলেম, কিছু প্রাদেশিক নেতা, কিছু আঞ্চলিক স্বার্থকে সামনে এনে বলে মুসলিম লীগ মুসলমানের একমাত্র প্রতিনিধি নয়, তবে জিন্নাহর দরকষাকষির শক্তি ভেঙে যাবে। তাই তাঁর কাছে একক প্রতিনিধিত্ব ছিল ব্যক্তিগত অহংকার নয়; রাজনৈতিক প্রয়োজন।

    Jalal জিন্নাহর রাজনীতিকে সর্বভারতীয় দরকষাকষির আলোকে পড়েন। তাঁর মতে, জিন্নাহ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলোর শক্তিকে ব্যবহার করে পুরো ভারতীয় মুসলমানের স্বার্থরক্ষার জন্য দরকষাকষির জায়গা তৈরি করতে চাইছিলেন। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, pp. xv–xvi)

    এই কাজ সহজ ছিল না। তিনি আলেম নন, পীর নন, বিপ্লবী জননেতা নন, কৃষকের স্বাভাবিক মুখ নন। তাঁর ব্যক্তিজীবন নিয়ে বিতর্ক আছে। কিন্তু তিনিই ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন মুসলিম ভয়ের বিভিন্ন রেখাকে এক রাজনৈতিক দাবির ভিতরে আনলেন। সবাই একই কারণে মুসলিম লীগের পেছনে যায়নি। কেউ কংগ্রেসকে ভয় করেছে, কেউ হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রকে, কেউ প্রাদেশিক নিরাপত্তা চেয়েছে, কেউ মুসলিম মর্যাদা, কেউ কেবল কংগ্রেসের একচেটিয়া দাবিকে অস্বীকার করতে চেয়েছে। জিন্নাহ এই ভিন্ন ভিন্ন স্রোতকে এক দরকষাকষির শক্তিতে পরিণত করেছেন।

    ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৬: দুর্বলতা থেকে ম্যান্ডেট 

    ১৯৩৭ সালের মুসলিম লীগ ও ১৯৪৬ সালের মুসলিম লীগ এক নয়। ১৯৩৭-এ দলটি মুসলমানের একক প্রতিনিধি নয়—এ কথা স্পষ্ট হয়ে যায়। ১৯৪৬-এ সেই দলই মুসলিম আসনে বিরাট ম্যান্ডেট পায়। এই রূপান্তর ছাড়া ৪৭ বোঝা যায় না।

    এই পরিবর্তনের পেছনে কংগ্রেস শাসিত প্রদেশের অভিজ্ঞতা, পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী নিয়ে উদ্বেগ, কংগ্রেসের “আমরাই গোটা ভারত” দাবি, মুসলমানের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক নিরাপত্তা-ভয়, এবং মুসলিম লীগের প্রচারণা কাজ করেছে। Neeti Nair দেখান, late 1930s-এ কংগ্রেসের পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী-বিরোধী অবস্থান মুসলমানদের কাছে বিশ্বাসভঙ্গের মতো মনে হয়েছিল এবং Hindu Raj (হিন্দু রাজ)-এর ভয়কে শক্তি দিয়েছিল। (Neeti Nair, Changing Homelands, pp. 159–161)

    ১৯৪৬-এর নির্বাচন জিন্নাহকে সেই রাজনৈতিক ভিত্তি দেয়, যা ছাড়া তাঁর দাবি দুর্বল থাকত। এরপর তিনি বলতে পারেন, মুসলমানের প্রশ্নে তাঁর সঙ্গে কথা না বলে সমাধান সম্ভব নয়। “Sole spokesman” হওয়া তাই শুধু ব্যক্তিগত দাবি ছিল না; নির্বাচনী ম্যান্ডেটের ওপর দাঁড়ানো দরকষাকষির ভাষা।

    ১৯৩৭ তাঁকে দেখিয়েছে মুসলমানের ভাঙা অবস্থা। ১৯৪৬ তাঁকে দিয়েছে মুসলিম প্রতিনিধিত্বের শক্তি। এই নয় বছরের ব্যবধানেই অসম্ভব পাকিস্তানের পথে রাজনীতি ঘন হয়ে ওঠে।

    লাহোর প্রস্তাব থেকে দরকষাকষির কঠিন পথ

    ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব মুসলিম রাজনীতিকে নতুন দিকে নিয়ে যায়। তবে প্রস্তাবের ভাষা পরে প্রচলিত “Pakistan Resolution” নামের মতো সরল ছিল না। সেখানে “Pakistan” শব্দ নেই, পূর্ণ মানচিত্র নেই, ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের সব খুঁটিনাটি নেই। আছে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের দাবি, স্বাধীনতা ও স্বায়ত্ততার জটিল ভাষা।

    Dar দেখান, লাহোর প্রস্তাব পাস হওয়ার পর জিন্নাহ ২৪ মার্চ ১৯৪০-কে Muslim India-এর ভবিষ্যৎ ইতিহাসে স্মরণীয় দিন বলেন এবং প্রাদেশিক, জেলা ও প্রাথমিক লীগ সংগঠনকে জনসভা করতে বলেন, যাতে মুসলিম ভারতের verdict (রায়) নিয়ে সন্দেহ না থাকে। (Farooq Ahmad Dar, “Jinnah and the Lahore Resolution,” p. 147)

    এর মানে, জিন্নাহ প্রস্তাবকে শুধু কাগজে রাখেননি। তিনি দাবিকে জনমতের ভাষায় নামাতে চেয়েছেন। দুর্বল সংগঠনকে এক রাজনৈতিক লক্ষ্যের চারপাশে বাঁধতে চেয়েছেন। পাকিস্তান তখনও পূর্ণ রাষ্ট্র নয়, কিন্তু রাষ্ট্রের সম্ভাবনা তখন থেকেই মুসলিম রাজনীতির কেন্দ্রীয় শক্তি হয়ে উঠতে থাকে।

    ক্যাবিনেট মিশন এবং ভেঙে যাওয়া শেষ সমঝোতা

    Cabinet Mission Plan ছিল অখণ্ড ভারত বাঁচানোর শেষ বড় চেষ্টা। পরিকল্পনাটি এমন ছিল যে ভারত এক থাকবে, কিন্তু প্রদেশগুলো গোষ্ঠী আকারে স্বায়ত্ততার কিছু সুযোগ পাবে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোর জন্য এটি একটি সম্ভাব্য নিরাপত্তা কাঠামো হতে পারত। পুরো পাকিস্তান না হলেও মুসলিম রাজনীতির কিছু প্রধান দাবি হয়তো রক্ষা পেত।

    জিন্নাহ এই সম্ভাবনাকে সরাসরি ফেলে দেননি। কারণ তাঁর রাজনীতি কেবল বিচ্ছেদের রাজনীতি ছিল না; ছিল দরকষাকষির রাজনীতি। কিন্তু নেহরুর কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাবনা মুসলিম লীগের সন্দেহ বাড়ায়। যদি ভবিষ্যৎ গণপরিষদে কংগ্রেস সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে গোষ্ঠীভিত্তিক স্বায়ত্ততার কাঠামো বদলে দিতে পারে, তবে মুসলমানের নিরাপত্তা কোথায়? কাগজে দেওয়া নিশ্চয়তা কাল সংখ্যাগরিষ্ঠের হাতে বাতিল হলে মুসলমান কী করবে?

    এই জায়গায় পাকিস্তান দাবির চরিত্র বদলায়। আগে এটি দরকষাকষির উচ্চ দাবি ছিল, এখন তা নিরাপত্তার শেষ আশ্রয় হয়ে ওঠে। অখণ্ড ভারতের ভিতরে মুসলিম স্বায়ত্ততার নিশ্চয়তা যদি বিশ্বাসযোগ্য না থাকে, তবে আলাদা রাষ্ট্রের দাবি আর কেবল কল্পনা থাকে না।

    জিন্নাহর হাতে সময় কম ছিল। ব্রিটিশরা দ্রুত বের হতে চায়। কংগ্রেস ক্ষমতা নিতে চায়। এমন মুহূর্তে তিনি জানতেন, মুসলিম দাবিকে অগ্রাহ্য করলে ক্ষমতা হস্তান্তর শান্তিপূর্ণ থাকবে না।

    Direct Action এবং আলোচনার টেবিলে চাপ

    Direct Action নিয়ে লিখতে গেলে উচ্ছ্বাসের জায়গা নেই। এর সঙ্গে দাঙ্গা, রক্তপাত, সাম্প্রদায়িক আতঙ্ক, মানুষের মৃত্যু জড়িয়ে আছে। একে রোমান্টিক করা যায় না। কিন্তু শুধু সহিংসতার ভাষায় পড়লেও এর রাজনৈতিক অর্থ হারিয়ে যায়।

    জিন্নাহ ও মুসলিম লীগ Direct Action-এর মাধ্যমে দেখাতে চেয়েছিল, মুসলিম লীগের দাবি পাশ কাটিয়ে ব্রিটিশ ভারতকে শান্তিপূর্ণভাবে স্বাধীন করা যাবে না। এটি ছিল আলোচনার টেবিলে মুসলিম লীগকে অগ্রাহ্য করার খরচ দেখানো। সেই খরচ মানুষের রক্তে লেখা হয়েছে—তাই ঘটনাটি নৈতিকভাবে কঠিন। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে সংকেতটি স্পষ্ট ছিল, মুসলিম প্রশ্নের সমাধান ছাড়া ক্ষমতা হস্তান্তর করলে ভারত অশান্ত হবে।

    জিন্নাহর হাতে সেনাবাহিনী ছিল না। প্রশাসন ছিল না। কংগ্রেসের মতো বিস্তৃত সংগঠনও ছিল না। তাঁর শক্তি ছিল ১৯৪৬-এর ম্যান্ডেট, ব্রিটিশ প্রস্থানের সময়চাপ, কংগ্রেসের ক্ষমতাগ্রহণের তাড়াহুড়া, এবং মুসলিম দাবিকে অগ্রাহ্য করলে অচলাবস্থা তৈরির ক্ষমতা।

    দুর্বল হাত নিয়ে তিনি বড় দান খেলেছেন। তাঁর সব তাস শক্ত ছিল না, কিন্তু তিনি টেবিলের হিসাব বদলে দেন।

    সংখ্যালঘু প্রদেশের মুসলমানদের কঠিন ভূমিকা

    পাকিস্তান আন্দোলনের সবচেয়ে বেদনাময় স্তরগুলোর একটি হলো সংখ্যালঘু প্রদেশের মুসলমানদের ভূমিকা। বিহার, উত্তর প্রদেশ, বোম্বে, মাদ্রাজ—এসব অঞ্চলের মুসলমান জানত, পাকিস্তান হলে সবাই নতুন রাষ্ট্রে যাবে না। তাদের ঘর, বাজার, কবর, মসজিদ, ভাষা, পরিবার—সব থাকবে ভারতের ভিতরে। তবু তারা পাকিস্তানের দাবিতে সাড়া দিয়েছে।

    এটি কেবল রাজনৈতিক সমর্থন নয়। এতে আত্মত্যাগের এক কঠিন মাত্রা আছে। যারা রাষ্ট্রের ভেতরে যাবে না, তারাও রাষ্ট্রের দাবি শক্ত করেছে। তাদের ভোট, প্রচার, সভা, ভয়, আশা—সব জিন্নাহর দরকষাকষির শক্তি বাড়িয়েছে। তারা বুঝেছিল, মুসলমানের ভবিষ্যৎ শুধু নিজের প্রদেশের প্রশ্ন নয়; এটি উপমহাদেশীয় মুসলিম নিরাপত্তার প্রশ্ন।

    সংখ্যালঘু প্রদেশের মুসলমানদের বাদ দিলে পাকিস্তান আন্দোলনকে সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলোর স্থানীয় দাবি বলে মনে হয়। কিন্তু তা নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলো রাষ্ট্রের ভূগোল দিয়েছে; সংখ্যালঘু প্রদেশের মুসলমানরা দিয়েছে মুসলিম প্রশ্নের সর্বভারতীয় নৈতিক চাপ।

    পাকিস্তান জন্মের পর তাদের অনেকেই কঠিন বাস্তবতায় পড়ে। কেউ থাকে, কেউ যায়, কেউ সন্দেহের চোখে দেখা হয়, কেউ দাঙ্গার শিকার হয়। তবু তাদের ভূমিকা মুছে ফেলা যায় না। যারা পাকিস্তানের ভিতরে যায়নি, তারাও পাকিস্তান দাবির ইতিহাসে আছে।

    কীটদুষ্ট পাকিস্তান: পূর্ণ স্বপ্ন নয়, অসম্পূর্ণ আশ্রয়

    ১৯৪৭-এ যে পাকিস্তান জন্ম নিল, তা পূর্ণ স্বপ্নের রাষ্ট্র নয়। পাঞ্জাব ভাগ হলো। বাংলা ভাগ হলো। কলকাতা গেল। শিল্পোন্নত অঞ্চল হারাল। নতুন রাষ্ট্র পেল ছিন্ন ভূগোল, দুর্বল অর্থনীতি, প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা, শরণার্থী সংকট, কাশ্মীর প্রশ্ন, কেন্দ্র-প্রদেশ জটিলতা। পূর্ব বাংলার ক্ষেত্রে বাস্তবতা আরও কঠিন—সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ, কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্র পশ্চিমে; কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি, কিন্তু শিল্পকেন্দ্রের অভাব; ভাষা বাংলা, কিন্তু রাষ্ট্রীয় উচ্চপরিসরে অন্য ভাষা ও অন্য ক্ষমতাবৃত্ত।

    Jalal পাকিস্তানের জন্মের বাস্তবতাকে “moth-eaten” বা কীটদুষ্ট বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করে দেখান। দাবি ছিল বড়, প্রাপ্তি হলো কাটা-ছেঁড়া, অসম্পূর্ণ, বহু বৈপরীত্যে ভরা রাষ্ট্র। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, pp. 3–4)

    তবু এই অসম্পূর্ণতা ৪৭-এর গুরুত্ব কমায় না। বরং দেখায় মুসলমানরা পূর্ণ জয় পায়নি; পেয়েছে অসম্পূর্ণ আশ্রয়। সেই আশ্রয় পরবর্তী সময়ে পূর্ব বাংলার সঙ্গে অন্যায় করেছে, ভাষা-অর্থনীতি-ক্ষমতায় বঞ্চিত করেছে, শেষ পর্যন্ত ৭১-এর জন্ম দিয়েছে। কিন্তু জন্মের মুহূর্তে পাকিস্তান ছিল ভারতীয় মুসলমানের রাজনৈতিক মর্যাদা-দাবির এক বাস্তব রূপ—দুর্বল, অসম্পূর্ণ, বিপজ্জনক, তবু বাস্তব।

    পাকিস্তান রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে—এ সত্য। কিন্তু পাকিস্তান দাবির উৎস মিথ্যা ছিল—এ কথা সত্য নয়। আবার পাকিস্তান দাবির উৎস বাস্তব ছিল বলে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অপরাধ ঢেকে দেওয়া যায় না।

    ৪৭ ছিল আশ্রয়ের দাবি।
    ৭১ ছিল ভাঙা আশ্রয়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।

    জিন্নাহর দুর্বল হাত: আইন, সময় আর অচলাবস্থার রাজনীতি 

    জিন্নাহকে বোঝার জন্য তাঁকে ভালোবাসা জরুরি নয়। ঘৃণা করাও যথেষ্ট নয়। তাঁকে তাঁর রাজনৈতিক কাজের জায়গায় দেখতে হবে। তিনি আলেম নন, দরবেশ নন, কৃষকের স্বাভাবিক ভাষার নেতা নন, বিপ্লবী কবিও নন। তিনি ছিলেন আইনজীবী, সংবিধান-ভাষার মানুষ, দরকষাকষির কৌশলী। তাঁর জীবনধারা বহু মুসলমানের জীবন থেকে দূরের। তাঁর ব্যক্তিগত ধর্মাচরণ নিয়ে বিতর্ক আছে। তাঁর ভাষা ইংরেজি, রাজনৈতিক ভঙ্গি অভিজাত। কিন্তু এইসব দিয়ে তাঁর কাজ বাতিল করা যায় না।

    তিনি দুর্বল মুসলিম লীগকে মুসলমানের একক প্রতিনিধিত্বের দাবিতে নিয়ে গেলেন। ১৯৩৭-এর ব্যর্থতা থেকে ১৯৪৬-এর ম্যান্ডেট তৈরি হলো। কংগ্রেসের সর্বভারতীয় দাবির সামনে মুসলিম প্রশ্নকে আলাদা রাজনৈতিক প্রশ্ন বানালেন। ব্রিটিশ প্রস্থানের সময়সীমাকে দরকষাকষির শক্তিতে বদলে দিলেন। Cabinet Mission ভাঙনের পর পাকিস্তানকে জরুরি দাবিতে পরিণত করলেন। Direct Action-এর অন্ধকার বাস্তবতা দেখিয়ে দিল মুসলিম লীগকে বাদ দিলে ক্ষমতা হস্তান্তর শান্ত হবে না।

    এই রাজনীতিতে কঠোরতা আছে, শীতলতা আছে, নৈতিক জটিলতা আছে। কিন্তু কার্যকারিতা অস্বীকার করা যায় না। তাঁর হাতে সেনা ছিল না, রাষ্ট্র ছিল না, কংগ্রেসের মতো সংগঠন ছিল না, গান্ধীর মতো নৈতিক ব্যক্তিত্বও ছিল না। তবু তিনি সাম্রাজ্য ও কংগ্রেসকে এমন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করালেন, যার উত্তর না দিয়ে ভারত স্বাধীন করা সম্ভব হলো না।

    তিনি একা নন। ৪৭-এর ইতিহাসে মুসলিম জনতা আছে, প্রাদেশিক নেতা আছে, সংখ্যালঘু প্রদেশের মুসলমান আছে, কৃষকসমাজ আছে, শহুরে মুসলিম অভিজাত আছে। কিন্তু জিন্নাহকে বাদ দিলে দরকষাকষির কেন্দ্র হারিয়ে যায়।

    তিনি অসম্ভবকে মানচিত্রে নামিয়েছেন—পূর্ণ নয়, কাটা-ছেঁড়া। শান্ত নয়, রক্তাক্ত। ন্যায়ভিত্তিক নয়, কিন্তু রাষ্ট্রিকভাবে বাস্তব।

    যে ফল ভোগ করে অস্বীকার করা যায় না

    আজ পূর্ব বাংলার মুসলমান রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ভিতরে নিজের ধর্মীয় জীবন পালন করে, কুরবানি করে, সংখ্যাগরিষ্ঠতার আত্মবিশ্বাসে কথা বলে। এই বাস্তবতার পেছনে ৪৭-এর রাজনৈতিক কাঠামো কাজ করছে—এ কথা অস্বীকার করা কঠিন। বাংলাদেশ ১৯৭১-এ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু পূর্ব বাংলার আলাদা রাষ্ট্রিক ভূখণ্ডের সম্ভাবনা ১৯৪৭ ছাড়া তৈরি হতো কি না, প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

    জিন্নাহকে অন্ধ বন্দনা দরকার নেই। ইতিহাসে বন্দনা দরকারও নয়। কিন্তু তাঁর দরকষাকষির ফল ভোগ করে তাঁকে সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় বলা ইতিহাসের মাপ হারানো।

    কেউ বলতে পারে, জিন্নাহ কলকাতা আনতে পারেননি, আসাম আনতে পারেননি, আরাকান আনতে পারেননি, পূর্ণ বাংলা রাখতে পারেননি। প্রশ্নগুলো উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু দেখতে হবে, তিনি কী হাতে নিয়ে টেবিলে বসেছিলেন। তাঁর হাতে সেনাবাহিনী ছিল না, শিল্পপতি-নির্ভর রাষ্ট্রযন্ত্র ছিল না, আন্তর্জাতিক সমর্থন ছিল না, মুসলমানদের পূর্ণ ঐক্য ছিল না। তিনি যে রাষ্ট্র পেয়েছেন, তা অসম্পূর্ণ। কিন্তু সেই অসম্পূর্ণ রাষ্ট্রও ছিল এক অস্বাভাবিক রাজনৈতিক অর্জন।

    যারা আজ ৪৭-এর ফল ভোগ করে ৪৭-কে কেবল লজ্জা বলে, তারা বর্তমান ঘরে বসে ঘরের ভিত্তি ভুলে যেতে চায়। এই ভুল শুধু কৃতজ্ঞতার অভাব নয়; এটি আত্মপরিচয়ের অলসতা।

    House of Wisdom

    House of Wisdom

    House of Wisdom — Inspired by the legacy of Baghdad’s Bayt al-Hikmah, where ideas meet knowledge, culture, philosophy, and civilization through thoughtful exploration.

    Post a Comment