Loading...

৪৭-কে নতুনভাবে লেখার প্রকল্প - ইতিহাস বদলানো নয়, কেন্দ্র বদলানো

৪৭-কে নতুনভাবে লেখার প্রকল্প - ইতিহাস বদলানো নয়, কেন্দ্র বদলানো
Advertisement
Advertisement — Place AdSense Code Here
Table of Contents

    ১৯৪৭, বঙ্গভাগ, পূর্ব বাংলা ও বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক আত্মপরিচয় নিয়ে মানচিত্র, জনসমাবেশ ও ঐতিহাসিক দলিলভিত্তিক ব্লগ ফিচার ইমেজ
    ৪৭ শুধু একটি সাল নয়; এটি বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক মর্যাদা, প্রতিনিধিত্ব ও রাষ্ট্রিক আত্মপরিচয়ের এক গভীর মোড়

    Previous Part.......

    ১৯৪৭-কে নতুনভাবে হাজির করার কাজ শুধু অতীতের পুনর্ব্যাখ্যা নয়। এটি বর্তমানের ক্ষমতা-সংগ্রাম। যে ৪৭-কে ব্যাখ্যা করে, সে ঠিক করে দেয় বাঙালি মুসলমান নিজের ইতিহাস কোথা থেকে শুরু করবে, কাকে নায়ক মেনে চলবে, কাকে অস্বস্তিকর মনে করবে, কোন সংগ্রামকে রাজনৈতিক মর্যাদা বলবে, আর কোন সংগ্রামকে সাম্প্রদায়িক ভুল বলে সরিয়ে রাখবে।

    এই কাজ সরাসরি হয় না। কেউ বলে না, ৪৭ মুছে ফেলো। বরং বলা হয়, ৪৭ ছিল ভুল। বলা হয়, ৪৭ ছিল বাইরের মুসলিম লীগের রাজনীতি। বলা হয়, বাঙালি মুসলমানের আসল ইতিহাস ভাষা, সংস্কৃতি, নদী, পল্লি, রবীন্দ্র-নজরুল, ৫২, ৬৯, ৭১। এই তালিকার অনেক কিছু সত্য। কিন্তু এই সত্যগুলো সাজানো হয় এমনভাবে, যাতে ৪৭-এর মুসলিম রাজনৈতিক ইতিহাস অদৃশ্য হয়ে যায়।

    এই বয়ানে ১৯৭১ দাঁড়ায়, কিন্তু ১৯৪৭ কেটে ফেলা হয়। যেন ৭১ এসেছে শূন্য থেকে। যেন পূর্ব বাংলার মুসলমান ১৯৪৭-এ কোনো রাজনৈতিক মর্যাদা দাবি করেনি। যেন মুসলিম জাতিসত্তা, প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন, কংগ্রেসের একক জাতীয় দাবির বিরুদ্ধে আপত্তি, পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী, প্রাদেশিক মুসলিম নেতৃত্ব, বাংলার মুসলিম কৃষকসমাজ—এসব ১৯৭১-এর সঙ্গে কোনো ধারাবাহিক সম্পর্ক রাখে না।

    এটাই কেন্দ্র বদলানোর কৌশল।

    ৪৭-কে মুসলিম রাজনৈতিক history (ইতিহাস)-এর কেন্দ্র থেকে সরিয়ে cultural Bengali identity (সাংস্কৃতিক বাঙালি পরিচয়)-এর উপকরণে বদলে দেওয়া হয়। তখন মুসলিম জাতীয়তাবাদ হয়ে যায় “সাম্প্রদায়িকতা”, আর বাঙালি জাতীয়তাবাদ হয়ে যায় “স্বাভাবিক” জাতির পথ। এই সরলীকরণ যত সুন্দর শোনায়, তত বিপজ্জনক। কারণ বাঙালি মুসলমানের ইতিহাস কখনো শুধু ভাষার ইতিহাস ছিল না, আবার শুধু ধর্মের ইতিহাসও ছিল না। তার ইতিহাস গঠিত হয়েছে ভাষা, মিল্লাত, জমি, কৃষকসমাজ, সাংবিধানিক ভয়, রাষ্ট্রিক মর্যাদা, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কাঠামো এবং হিন্দু অভিজাত আধিপত্যের সঙ্গে জটিল সংঘাতে।

    যে পাঠ এই জটিলতা মুছে দেয়, সে ইতিহাস লিখে না। সে ইতিহাসের মালিকানা বদলায়।

    মুসলিম রাজনৈতিক ইতিহাসকে আড়াল করার কৌশল

    ৪৭-এর মুসলিম রাজনৈতিক ইতিহাস বুঝতে হলে শুরুতেই একটি সহজ কথা মানতে হবে। ব্রিটিশ ভারতের মুসলমানরা নিজেদের শুধু ধর্মীয় সম্প্রদায় হিসেবে ভাবেনি। তারা প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে, ক্ষমতার প্রশ্নে, ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রে নিজেদের অবস্থানের প্রশ্নে আলাদা রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে চিন্তা করতে শুরু করেছিল। এই চিন্তা একদিনে তৈরি হয়নি।

    Dar দেখান, ব্রিটিশ শাসন রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের নতুন কাঠামো খুলে দিলে মুসলমানরা বুঝতে শুরু করে—গণতান্ত্রিক সংখ্যার রাজনীতিতে তারা স্থায়ী সংখ্যালঘু হয়ে যাবে। ভারতবর্ষের মোট জনসংখ্যায় তারা প্রায় এক-চতুর্থাংশ; হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতার তুলনায় অনেক কম। প্রথমে তাদের দাবি ছিল separate electorates (পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী)। পরে তারা বুঝল, শুধু পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে। (Farooq Ahmad Dar, “Jinnah and the Lahore Resolution,” p. 127)

    এই ভয় কোনো কল্পিত ভয় ছিল না। Nehru Report মুসলিম দাবির বড় অংশ প্রত্যাখ্যান করলে জিন্নাহর মতো একসময়কার Hindu-Muslim unity (হিন্দু-মুসলিম ঐক্য)-এর দূতও হতাশ হন। Dar-এর ভাষায়, এই অভিজ্ঞতার পর জিন্নাহ বুঝতে শুরু করেন যে, Western territorial nationalism (পশ্চিমা ভূখণ্ডভিত্তিক জাতীয়তাবাদ) ভারতীয় বাস্তবতায় সরলভাবে চলবে না। তিনি মুসলিম লীগকে drawing-room politics (ড্রয়িংরুম রাজনীতি) থেকে বের করে massroots (জনভিত্তি)-ওয়ালা সংগঠনে রূপ দিতে চান। (Dar, p. 128)

    এই জায়গাটা জরুরি। মুসলিম লীগের রাজনীতি শুধু ধর্মীয় উত্তেজনার ওপর দাঁড়ায়নি। দাঁড়িয়েছে প্রতিনিধিত্ব ও রাষ্ট্রিক নিরাপত্তার প্রশ্নে। কংগ্রেস যখন নিজেকে পুরো ভারতের জাতীয় প্রতিনিধি হিসেবে হাজির করে, মুসলিম রাজনীতি তখন প্রশ্ন তোলে—কিসের জাতীয়? কার জাতীয়? কোন সাংবিধানিক কাঠামোয় মুসলমানের অবস্থান কী হবে?

    Ayesha Jalal দেখান, জিন্নাহর রাজনীতির কেন্দ্রে ছিল all-India centre (সর্বভারতীয় কেন্দ্র)-এর প্রশ্ন। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোকে ব্যবহার করে তিনি পুরো ভারতজুড়ে মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার মতো একটি ক্ষমতা-সমতা চাইছিলেন। তাঁর দাবি শুধু উত্তর-পশ্চিম বা উত্তর-পূর্ব মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের জন্য ছিল না; ছড়িয়ে থাকা মুসলিম সংখ্যালঘুদের জন্যও ছিল। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, pp. xv–xvi)

    এই ইতিহাস শাহবাগী ফ্রেমে প্রায়ই হারিয়ে যায়। সেখানে মুসলিম রাজনীতি মানে “সাম্প্রদায়িকতা”, আর কংগ্রেসীয়/সাংস্কৃতিক জাতীয়তা মানে “অগ্রগতি”। কিন্তু বাস্তব ইতিহাস এত পরিষ্কার রঙে আঁকা নয়। Nair দেখান, পাঞ্জাবের হিন্দু রাজনীতিতেও partition-thinking (ভাগ-চিন্তা), minority fear (সংখ্যালঘু-ভয়), Hindu consolidation (হিন্দু সংগঠন), এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশে হিন্দু অবস্থান নিয়ে গভীর উদ্বেগ কাজ করছিল। Partition-কে শুধু মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িকতার ফল বানালে এই দিকগুলো অদৃশ্য হয়ে যায়। (Neeti Nair, Changing Homelands, pp. 1–4, 147–148)

    “বাঙালি জাতীয়তাবাদ”-এর নতুন প্যাকেজিং

    ৪৭-কে নতুনভাবে লেখার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো “বাঙালি জাতীয়তাবাদ”কে এমনভাবে প্যাকেজ করা, যাতে মুসলিম রাজনৈতিক ইতিহাস অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। এই পাঠে ভাষাই সব। সংস্কৃতিই সব। বাঙালিত্বই জাতির একমাত্র প্রাকৃতিক ঘর। ধর্মীয় পরিচয়, মুসলিম মিল্লাত, মুসলিম রাজনৈতিক নিরাপত্তা, পৃথক প্রতিনিধিত্বের ইতিহাস—এসব হয়ে যায় অস্বস্তিকর অতিরিক্ত জিনিস।

    কিন্তু বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিজেই কোনো নির্দোষ, সর্বজনগ্রাহ্য, সকলের কাছে সমান নিরাপদ ঘর ছিল না। ঊনবিংশ শতকের বাঙালি জাতীয়তাবাদ গড়ে ওঠে প্রধানত হিন্দু অভিজাত, কলকাতাকেন্দ্রিক, ইংরেজি শিক্ষিত, সংস্কৃতঘেঁষা সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক পরিসরে। মুসলমান সমাজ সেই জায়গায় পুরোপুরি অংশ নিতে পারেনি, অনেক সময় নিতেও চায়নি। আবার অনেক সময় নেওয়ার মতো সাংস্কৃতিক নিরাপত্তাও পায়নি। বাংলায় মুসলমানের ভাষা, শিক্ষা, জমি, কৃষকজীবন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সামাজিক মর্যাদা—সব আলাদা বাস্তবতায় গড়ে উঠেছে।

    তাই ১৯৪৭-এর আগে বাঙালি মুসলমান যখন মুসলিম রাজনৈতিক পরিচয়ের দিকে যায়, সেটি বাংলা-বিদ্বেষ নয়। সেটি নিজের রাজনৈতিক নিরাপত্তা খোঁজা। যে সমাজ জমিদারি, শিক্ষা, চাকরি, আদালত, প্রশাসন, সাহিত্যিক রুচি—সব জায়গায় পিছিয়ে আছে, সে শুধু “আমরা সবাই বাঙালি” শুনে নিশ্চিন্ত হয়নি। কারণ সে জানত, বাঙালিত্বের ঘরেও মালিকানা অসম।

    এই জায়গা না বুঝলে মুসলিম লীগকে বোঝা যায় না। ১৯৪৬-এর নির্বাচনে বাংলার মুসলমানরা শুধু কোনো বিমূর্ত পাকিস্তান-স্বপ্নে ভোট দেয়নি; তারা নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, কৃষকসমাজের অভিমান, হিন্দু অভিজাত আধিপত্যের ভয়, মুসলিম নেতৃত্বের সংগঠনী ভাষা—এসবের মধ্যে দাঁড়িয়ে ভোট দিয়েছে। বাংলার মুসলিম রাজনীতি কেবল জিন্নাহর দূর থেকে দেওয়া নির্দেশ ছিল না। আবার তা সর্বভারতীয় মুসলিম রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্নও ছিল না। এই দ্বৈততা ধরতে না পারলেই ইতিহাসের কেন্দ্র বদলে যায়।

    জিন্নাহ কেন অনুপস্থিত?

    জিন্নাহকে অনুপস্থিত রাখার সুবিধা আছে। তাঁকে বাদ দিলে ৪৭-এর প্রশ্ন constitutional bargaining (সাংবিধানিক দরকষাকষি), all-India Muslim representation (সর্বভারতীয় মুসলিম প্রতিনিধিত্ব), centre-province relation (কেন্দ্র-প্রদেশ সম্পর্ক), Muslim minority problem (মুসলিম সংখ্যালঘু সমস্যা)—এসব কঠিন জায়গা থেকে সরে আসে। তখন ৪৭-কে সহজে বলা যায়—কিছু নেতার সাম্প্রদায়িক সিদ্ধান্ত।

    কিন্তু জিন্নাহকে সামনে আনলে চিত্র বদলে যায়। Dar দেখান, জিন্নাহ শুধু বক্তৃতার মানুষ ছিলেন না; তিনি মুসলিম লীগকে জনভিত্তির দিকে নিতে চেয়েছিলেন। তাঁর বুঝ ছিল, মুসলিম লীগ mass support (জনসমর্থন) ছাড়া নিজের দাবি চাপাতে পারবে না। (Dar, p. 128)

    লাহোর প্রস্তাবের পর তাঁর ভূমিকা আরও স্পষ্ট। Dar দেখান, resolution পাস হওয়ার পর জিন্নাহ ২৪ মার্চ ১৯৪০-কে Muslim India (মুসলিম ভারতের) ভবিষ্যৎ ইতিহাসের red letter day (স্মরণীয় দিন) বলেন। তিনি ঘোষণা করেন, লাহোর প্রস্তাব মুসলমানদের ultimate goal (চূড়ান্ত লক্ষ্য) সবচেয়ে পরিষ্কার ভাষায় সংজ্ঞায়িত করেছে। এরপর তিনি প্রাদেশিক, জেলা ও প্রাথমিক লীগ সংগঠনগুলোকে জনসভা করার আহ্বান জানান, যাতে Muslim India-এর verdict (রায়) নিয়ে সন্দেহ না থাকে। (Dar, p. 147)

    এই তথ্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটি দেখায়, লাহোর প্রস্তাব শুধু কাগজের ঘোষণা ছিল না। তা সংগঠন, প্রচার, জনমত ও রাজনৈতিক ভাষায় নামানো হচ্ছিল। জিন্নাহকে সরিয়ে দিলে এই রূপান্তর অদৃশ্য হয়। তখন ইতিহাসে শুধু লাহোরের মঞ্চ থাকে, কিন্তু মঞ্চ থেকে জনতার দিকে যাওয়ার পথ থাকে না।

    তবে জিন্নাহকে ফিরিয়ে আনা মানে বাংলার মুসলিম নেতৃত্বকে মুছে দেওয়া নয়। জিন্নাহ all-India bargaining (সর্বভারতীয় দরকষাকষি)-এর মুখ। কিন্তু বাংলার মাটিতে সংগঠন বানিয়েছে বাংলার মানুষ। সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, জেলা মুসলিম লীগ, কৃষকসমাজ, নির্বাচনী কাঠামো—এসব ছাড়া পূর্ব বাংলার মুসলিম রাজনীতির শরীর বোঝা যায় না। জিন্নাহকে বাদ দিলে কেন্দ্র হারায়; বাংলাকে বাদ দিলে শরীর হারায়। ইতিহাসের কাজ কারও মূর্তি বানানো নয়। মাপ ঠিক রাখা।

    ইকবাল কেন অস্বস্তিকর?

    ইকবালকে অনুপস্থিত রাখাও সুবিধাজনক। কারণ ইকবালকে সামনে আনলে মুসলিম জাতিসত্তার বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি সামনে আসে। তখন ৪৭ শুধু জিন্নাহর কৌশল, ব্রিটিশ বিভাজননীতি, বা মুসলিম লীগের ভোট-রাজনীতি থাকে না। তখন প্রশ্ন আসে—ভারতবর্ষের মুসলমান নিজেদের কীভাবে বুঝছিল? ইসলামকে তারা শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাস হিসেবে দেখছিল, না সামাজিক-রাজনৈতিক সভ্যতার ভিত্তি হিসেবেও দেখছিল?

    Dar দেখান, ১৯৩০ সালের Allahabad Address (এলাহাবাদ ভাষণ)-এ ইকবাল ইসলামকে নিজের social and economic system (সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা)-সহ একটি জীবনদৃষ্টি হিসেবে দেখান, যার বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক সত্তা দরকার। ইকবাল জিন্নাহকে চিঠিতে লিখেছিলেন, ইসলামের শরিয়ত-ভিত্তিক বিকাশ একটি free Muslim State or States ছাড়া সম্ভব নয়—এটি তাঁর বহু বছরের conviction (দৃঢ় বিশ্বাস)। (Dar, p. 128)

    আরও এগিয়ে Dar দেখান, ১৯৩৮ সালের Sindh Provincial Muslim League Conference-এ মুসলমানদের national entity (জাতিগত সত্তা) ছাড়তে না চাওয়ার ভাষা উঠে আসে। সেখানে “Muslim States” এবং Hindus and Muslims as two nations (হিন্দু-মুসলমান দুই জাতি) ধারণা রাজনৈতিকভাবে আরও স্পষ্ট হয়। Dar এই Sind resolution-কে Lahore Resolution-এর forerunner (পূর্বসূরি) বলেছেন। (Dar, pp. 128–129)

    তাহলে ইকবালকে বাদ দিলে ৪৭-এর বুদ্ধিবৃত্তিক ধারাবাহিকতা ভেঙে যায়। মুসলিম জাতিসত্তা তখন শুধু শেষ মুহূর্তের রাজনৈতিক কৌশল মনে হয়। কিন্তু ইকবাল থাকলে বোঝা যায়, মুসলমানদের এক অংশ ভারতীয় জাতীয়তার ভিতরে নিজেদের গিলে যাওয়ার ভয় করছিল এবং ইসলামকে সামাজিক-রাজনৈতিক পরিসরে চিন্তা করছিল। এই চিন্তার সমালোচনা করা যায়। কিন্তু তাকে মুছে ফেলা যায় না।

    ইকবাল অস্বস্তিকর কারণ তিনি ইতিহাসে ধারণার ওজন ফেরত আনেন।

    লাহোর প্রস্তাবের ভাষা বদলে দেওয়ার রাজনীতি

    লাহোর প্রস্তাব নিয়ে সবচেয়ে বড় মিথ হলো—এটি শুরু থেকেই “Pakistan Resolution”। বাস্তবতা আলাদা। Dar স্পষ্ট লিখেছেন, resolution-এর text-এ “Pakistan” শব্দ ছিল না। জিন্নাহ বা অন্য কোনো মুসলিম লীগ নেতার লাহোর অধিবেশনের বক্তৃতাতেও শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি। তখন “Pakistan” শব্দটি মূলত চৌধুরী রহমত আলী ও Cambridge circle-এর ১৯৩৩ সালের Now or Never pamphlet-এর সঙ্গে যুক্ত ছিল; সেখানে উত্তর-পশ্চিম মুসলিম অঞ্চল ছিল, Bengal ছিল না। লাহোর প্রস্তাবের scope (পরিসর) ছিল তার চেয়ে বিস্তৃত। (Dar, pp. 148–149)

    Dar আরও দেখান, প্রথমে Hindu newspapers—Milap, Pratap, Vande Mataram—resolution-কে “Pakistan Resolution” বলতে শুরু করে। মুসলিম লীগ ও জিন্নাহ পরে শব্দটি গ্রহণ করেন। ১৯৪০ সালের ২৫ ডিসেম্বর দিল্লি অধিবেশনে জিন্নাহ বলেন, তাঁদের একটি শব্দ দরকার ছিল; সংবাদমাধ্যম সেই শব্দ চাপিয়ে দিয়েছিল, আর তারা সেটিকে Lahore Resolution-এর synonym (সমার্থক) হিসেবে ব্যবহার করতে সুবিধাজনক মনে করেছে। (Dar, pp. 148–149)

    এই ঘটনাটি শুধু নামের ইতিহাস নয়। এটি দেখায়, political naming (রাজনৈতিক নামকরণ) নিজেই ইতিহাস বদলে দেয়। লাহোর প্রস্তাবের “Independent States” ভাষা, প্রাদেশিক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল, কেন্দ্রীয় দরকষাকষি, মুসলিম সংখ্যালঘু রক্ষা—এসব জটিলতা ধীরে ধীরে “Pakistan Resolution” নামে একরৈখিক হয়ে যায়।

    শাহবাগী বয়ান এই একরৈখিকতাকে উল্টোভাবে ব্যবহার করে। বুঝাতে চায়, পাকিস্তান ভুল ছিল, তাই ৪৭-ও ভুল। পাকিস্তান রাষ্ট্র ব্যর্থ, তাই মুসলিম রাজনৈতিক জাতিসত্তাও ব্যর্থ। অথচ দুটো এক জিনিস নয়। পাকিস্তান রাষ্ট্রের ব্যর্থতা ইতিহাসের সত্য। কিন্তু সেই ব্যর্থতা ১৯৪৭-এর মুসলিম রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে মুছে দেয় না।

    রাষ্ট্র ব্যর্থ হতে পারে। আকাঙ্ক্ষার ইতিহাস তবু থাকে।

    শাহবাগী বয়ান এই ব্যর্থতাকে কীভাবে ব্যবহার করে

    শাহবাগী বয়ান সবসময় সরাসরি বলে না যে ৪৭ মুছে ফেলতে হবে। বয়ান সাধারণত এভাবে কাজ করে না। সে আগে শব্দ বদলায়, তারপর গ্রহণযোগ্যতার মানদণ্ড বদলায়, শেষে ইতিহাসের কেন্দ্র বদলায়। পাকিস্তান রাষ্ট্রের ব্যর্থতাকে সামনে আনা হয়; সেটি আনা উচিতও। পাকিস্তান পূর্ব বাংলার সঙ্গে অন্যায় করেছে, ভাষা-প্রশ্নে ঔদ্ধত্য দেখিয়েছে, অর্থনীতিতে বৈষম্য করেছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে ক্ষমতায় রূপ নিতে দেয়নি, সেনাবাহিনী দিয়ে গণহত্যা চালিয়েছে। এগুলো ইতিহাসের কঠিন সত্য।

    কিন্তু এরপর ধীরে ধীরে সেই ব্যর্থতার দায় ১৯৪৭-এর মুসলিম রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার ওপর চাপানো হয়। যেন পাকিস্তান রাষ্ট্র অন্যায় করেছে, তাই মুসলমানের রাষ্ট্রিক মর্যাদা-দাবিও অন্যায় ছিল। যেন পাকিস্তান ভেঙেছে, তাই মুসলিম জাতিসত্তার ধারণাও ভেঙে গেছে। যেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অপরাধ করেছে, তাই লাহোর প্রস্তাবও অপরাধের পূর্বকথা। এই লাফটাই আসল সমস্যা।

    এই লাফ প্রমাণ করতে কোনো একক স্লোগান খুঁজে লাভ নেই। প্রমাণ আছে ফ্রেমের ভিতরে। শাহবাগের রাজনৈতিক ভাষায় ১৯৭১ শুধু পাকিস্তানি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ন্যায়যুদ্ধ হিসেবে থাকে না; তা সেক্যুলার-বাঙালি জাতীয়তাবাদের একমাত্র বৈধ উৎসে পরিণত হয়। Asif Iqbal শাহবাগ-হেফাজত সংঘাত বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখান, শাহবাগকে অনেকেই ১৯৭১-এর nationalist fervor (জাতীয়তাবাদী উত্তাপ)-এর পুনর্জাগরণ হিসেবে দেখেছিল, এবং সেই বয়ান দ্রুত Bengali nationalism (বাঙালি জাতীয়তাবাদ)-কে religiocentric nationalism (ধর্মকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদ)-এর বিপরীতে দাঁড় করায়। অর্থাৎ ৭১ এখানে শুধু স্বাধীনতার ঘটনা নয়; ৭১ হয়ে ওঠে পরিচয় যাচাইয়ের মাপকাঠি। এই ফ্রেমে ৪৭-এর মুসলিম রাজনৈতিক ইতিহাস স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহজনক হয়ে পড়ে। কারণ ৪৭ ভাষাভিত্তিক সেক্যুলার বাঙালি জাতীয়তাবাদের ফল নয়। ৪৭ এসেছে মুসলিম জাতিসত্তা, প্রতিনিধিত্ব, নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রিক মর্যাদার প্রশ্ন থেকে। (Asif Iqbal, “Clashing Nationalisms and Corrupting Co-Existence,” pp. 79–82)

    Anupam Debashis Roy-এর বিশ্লেষণও একই দিকে ইঙ্গিত করে। তিনি দেখান, শাহবাগ শুরু হয়েছিল একটি নির্দিষ্ট বিচার-দাবি থেকে—কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তা issue-specific (নির্দিষ্ট দাবি)-এর বাইরে গিয়ে renewed secularist movement (নতুন সেক্যুলারিস্ট আন্দোলন)-এর প্রতিনিধিত্ব হিসেবে দেখা হতে থাকে। AL co-option (আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ প্রভাব), framing task (ফ্রেম তৈরির কাজ), BNP-Jamaat প্রতিক্রিয়া, এবং হেফাজতের পাল্টা সংগঠনের ভেতর দিয়ে আন্দোলনের ভাষা বদলে যায়। এই বদলটাই জরুরি। বিচার-দাবি যখন সেক্যুলার-বাঙালি পরিচয়ের মানদণ্ডে পরিণত হয়, তখন যে কোনো মুসলিম রাজনৈতিক ইতিহাস সহজে “প্রতিক্রিয়াশীল” বা “পাকিস্তানি ছায়া” হিসেবে পড়া যায়। (Anupam Debashis Roy, “Shahbag Stolen?”, pp. 4S–6S, 16S)

    এখানে শাহবাগী বয়ানের চালাকি হলো—সে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অপরাধকে বিচার করতে গিয়ে পাকিস্তান-পূর্ব মুসলিম রাজনৈতিক ইতিহাসের ওপরও সন্দেহ চাপায়। ১৯৭১-এর গণহত্যা, সামরিক শাসন, পশ্চিম পাকিস্তানি আধিপত্য—এসব সত্য। কিন্তু এগুলো ১৯০৬-এর মুসলিম লীগ, ১৯১৬-এর লখনৌ চুক্তি, পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী, ইকবালের মুসলিম জাতিসত্তা, লাহোর প্রস্তাব, ১৯৪৬ নির্বাচনে বাংলার মুসলমানের ম্যান্ডেট—এসবকে মিথ্যা করে না। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ১৯৭১-এ অপরাধ করেছে বলে ১৯৪০-এর লাহোর প্রস্তাব সাম্প্রদায়িক অপরাধ হয়ে যায় না। রাষ্ট্রের ব্যর্থতা আন্দোলনের উৎসকে বাতিল করে না।

    ফ্রেমের ভেতরের সমীকরণটা তাই পরিষ্কার। প্রথমে পাকিস্তান রাষ্ট্রকে মুসলিম রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার একমাত্র ফল হিসেবে দেখানো হয়। তারপর পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্যায়, বৈষম্য ও ১৯৭১-এর অপরাধ সামনে আনা হয়। শেষে সেই অপরাধের দায় ৪৭-এর মুসলিম রাজনৈতিক ইতিহাসের ওপর চাপানো হয়। এভাবেই ৪৭ নতুনভাবে লেখা হয়। তখন ৪৭ আর ব্রিটিশ ভারতের মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও রাষ্ট্রিক ভবিষ্যতের প্রশ্ন থাকে না। ৪৭ হয়ে যায় পাকিস্তানের অপরাধের পূর্বকথা। মুসলিম জাতিসত্তা হয়ে যায় ১৯৭১-এর বিপরীত। জিন্নাহ হয়ে যায় খলনায়ক। ইকবাল হয়ে যায় অস্বস্তিকর। মুসলিম লীগ হয়ে যায় সাম্প্রদায়িক ক্লাব। বাংলার মুসলমানের ১৯৪৬-এর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত তখন আর একটি জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক ম্যান্ডেট হিসেবে পড়া হয় না; তাকে এমন এক অস্বস্তিকর উত্তরাধিকার বানানো হয়, যেটিকে ভুলে যাওয়া যেন ভদ্রতার শর্ত। 

    এটাই ইতিহাসের কেন্দ্র বদলানো।

    এই বয়ান যতই মুক্তিযুদ্ধের ভাষায় কথা বলুক, তার ভিতরে ভারতীয় বয়ানের সুবিধা কাজ করে। কারণ ভারতীয় রাষ্ট্রীয় ইতিহাসও ৪৭-কে প্রধানত মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার ফল হিসেবে পড়তে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। শাহবাগী ফ্রেম সেই পাঠকে বাংলাদেশি নৈতিক ভাষা দেয়। বলে, পাকিস্তান ছিল ভুল, তাই ৪৭-ও ভুল। পাকিস্তান রাষ্ট্র ব্যর্থ, তাই মুসলিম রাজনৈতিক জাতিসত্তাও ব্যর্থ। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অপরাধী, তাই মুসলিম রাষ্ট্রিক মর্যাদার দাবিও সন্দেহজনক।

    এই যুক্তি ইতিহাস নয়।

    এটি সম্পর্কের দায় চাপিয়ে বিচার। এক রাষ্ট্রের অপরাধ দিয়ে একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক জাতিসত্তার ইতিহাসকে দোষী বানানো। পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিচার অবশ্যই হবে। ১৯৭১-এর অপরাধের বিচারও হবে। কিন্তু ৪৭-এর মুসলিম রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে সেই অপরাধের আসামি বানানো যাবে না।

    ৪৭ ছিল এক প্রশ্নের উত্তর, ব্রিটিশ ভারতের মুসলমান ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রে কোথায় দাঁড়াবে?

    ৭১ ছিল আরেক প্রশ্নের উত্তর, পাকিস্তান রাষ্ট্র যদি পূর্ব বাংলার মর্যাদা অস্বীকার করে, তবে পূর্ব বাংলার মানুষ কী করবে?

    এই দুই প্রশ্নকে এক করে ফেললেই ইতিহাস বিকৃত হয়। ৭১ পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে; ৪৭-এর মুসলিম মর্যাদা-দাবির বিরুদ্ধে নয়। শাহবাগী বয়ান এই সূক্ষ্ম অথচ জরুরি রেখাটি মুছে দেয়। তাই তার কাছে পাকিস্তানের অপরাধ মুসলিম রাজনৈতিক ইতিহাসের অপরাধ হয়ে যায়, আর রাষ্ট্রের ব্যর্থতা জাতিসত্তার ব্যর্থতা হয়ে দাঁড়ায়।

    এ বিচার নয়। এটি ইতিহাসের জটিলতা এড়িয়ে দেওয়া এক অন্যায্য রায়। ৭১ পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে; ৪৭-এর মুসলিম রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে নয়। এই রেখাটি মুছে দিলেই রাষ্ট্রের অপরাধ জাতিসত্তার অপরাধ হয়ে যায়।

    বাংলার মুসলিম নেতৃত্বকে নতুনভাবে সাজানোর প্রবণতা

    ৪৭ নিয়ে নতুন বয়ানের আরেক কৌশল হলো বাংলার মুসলিম নেতৃত্বকে নতুনভাবে সাজানো। কখনো ফজলুল হককে ব্যবহার করে জিন্নাহকে মুছে দেওয়া হয়। কখনো সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশিমকে ব্যবহার করে মুসলিম লীগের সর্বভারতীয় প্রকৃতি আড়াল করা হয়। কখনো অখণ্ড বাংলার প্রশ্নকে এমনভাবে তোলা হয়, যেন বাংলার মুসলমানের আসল পথ ছিল শুধু প্রাদেশিক বাঙালি কল্পনা, আর পাকিস্তান ছিল বাইরের চাপ।

    এই পাঠ অসম্পূর্ণ।

    ফজলুল হক লাহোর প্রস্তাব পেশ করেছেন। তাঁর ভূমিকা অস্বীকারের প্রশ্ন নেই। কিন্তু প্রস্তাব পেশ করা আর ১৯৪০-এর দশকে বাংলার মুসলিম লীগের সংগঠনী শরীর গড়া এক জিনিস নয়। Jalal দেখান, বাংলার মুসলিম রাজনীতি ছিল Krishak Praja Party, কলকাতাকেন্দ্রিক মুসলিম অভিজাত, মুসলিম লীগ, পূর্ব বাংলার মুসলিম কৃষকসমাজ—সব মিলিয়ে জটিল। ফজলুল হক নিজের প্রাদেশিক নেতৃত্ব রক্ষা করতে চেয়েছিলেন, আর জিন্নাহ বাংলায় মুসলিম লীগকে শক্ত করতে চাইছিলেন। (Jalal, p. 24)

    পরে ফজলুল হক ও মুসলিম লীগ high command-এর টানাপোড়েন, War effort নিয়ে মতভেদ, এবং Huq–Syama Prasad Mukherjee coalition দেখায়, লাহোরের প্রতীকী ভূমিকা তাঁর রাজনৈতিক পথের পূর্ণ ব্যাখ্যা নয়। (Jalal, pp. 65–68)

    এই জায়গায় সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম আসেন। Jalal দেখান, ১৯৪৩–৪৫ সময়ে Bengal Muslim League-এর ভিতরে নাজিমুদ্দিনপন্থী শক্তি ও সোহরাওয়ার্দী-হাশিম শক্তির সংঘাত তীব্র হয়। কলকাতাকেন্দ্রিক ব্যবসায়ী অভিজাত প্রভাব কমে, সোহরাওয়ার্দী সংগঠনে জমি পেতে থাকেন; Bengal থেকে All-India Muslim League Council-এ যাওয়া প্রতিনিধিদের বড় অংশ তাঁর প্রতি আনুগত্য দেখায়। (Jalal, p. 104)

    আর আবুল হাশিমকে Jalal শুধু সহকারী নেতা হিসেবে দেখান না; তিনি “a power in his own right”। তাঁর draft manifesto, Bengal League-এর লক্ষ্য জনগণের সামনে সংজ্ঞায়িত করার প্রথম প্রাদেশিক চেষ্টা। সেখানে পাকিস্তানকে Islamic state (ইসলামি রাষ্ট্র)-এর সঙ্গে কিছুটা অস্পষ্টভাবে মিলিয়ে দেখা হলেও equality (সমতা), fraternity (ভ্রাতৃত্ব), poor people’s rights (দরিদ্রের অধিকার), এবং vested interests (স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী)-এর বিরুদ্ধে ভাষা ছিল। Hashim জেলা লীগগুলোকে office (অফিস), full-time workers (পূর্ণকালীন কর্মী), reading rooms (পাঠাগার), বই-পত্রিকা এবং মানুষের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করতে চাইছিলেন। (Jalal, pp. 104–105)

    এগুলো প্রমাণ করে, বাংলার মুসলমান জিন্নাহর passive follower (নিষ্ক্রিয় অনুসারী) ছিল না। আবার তারা সর্বভারতীয় মুসলিম রাজনীতির বাইরে বিচ্ছিন্ন দ্বীপও ছিল না। বাংলার ভিতরে সংগঠন, প্রাদেশিক কল্পনা, কৃষকসমাজ, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা, হিন্দু অভিজাতের ভয়, অখণ্ড বাংলার পরীক্ষা—সব ছিল। এই ইতিহাসকে শুধু “বাঙালি জাতীয়তাবাদ”-এর প্যাকেজে ঢোকালে তার মুসলিম রাজনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে যায়।

    ৭১ দিয়ে ৪৭ মুছে ফেলার ভুল

    ১৯৭১ বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গভীর মুক্তির মুহূর্ত। পাকিস্তানি রাষ্ট্রের বৈষম্য, অর্থনৈতিক শোষণ, রাজনৈতিক অধিকারহরণ, সামরিক দমন, গণহত্যা—এসবের বিরুদ্ধে ৭১ ছিল ন্যায্য বিদ্রোহ। এই সত্যকে দুর্বল করার কোনো সুযোগ নেই।

    কিন্তু ৭১-এর সত্য দিয়ে ৪৭ মুছে ফেলা যায় না। ১৯৭১ পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বাঙালি মুসলমানের বিদ্রোহ। কিন্তু ১৯৪৭ ছিল ব্রিটিশ ভারতের মুসলমানদের রাজনৈতিক মর্যাদার দাবি। একটির ব্যর্থ রাষ্ট্রিক ফল দিয়ে অন্যটির ঐতিহাসিক উৎস বাতিল করা যায় না।

    পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের পরপরই রাষ্ট্রভাষা প্রশ্ন ওঠে। ১৯৪৮ থেকে ভাষা আন্দোলন শুরু হয়ে ১৯৫২-তে শহীদের রক্তে তা চূড়ান্ত রূপ নেয়, এবং পরবর্তীতে ১৯৫৬ সালে বাংলা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি পায়। অর্থাৎ পূর্ব বাংলার মুসলমান পাকিস্তানের ভিতরেই প্রথম বড় রাষ্ট্রিক সংঘাতে ঢুকল ভাষা নিয়ে।

    ১৯৬৬ সালে ছয় দফা ছিল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্য দূর এবং পূর্ব বাংলায় পশ্চিম পাকিস্তানি internal colonial rule (অভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশিক শাসন)-এর অবসানের দাবি। War of Liberation বলছে, ১৯৭১-এর সশস্ত্র সংগ্রাম পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তানের সম্পর্ক ক্রমশ অবনতির এক দীর্ঘ ধারাবাহিকতার ফল। এগুলো প্রমাণ করে—৭১ হঠাৎ আসেনি। পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভিতরেই তার কারণ জমেছে।

    সুতরাং ৭১ দিয়ে ৪৭ মুছলে ইতিহাস ভেঙে যায়। আর ৪৭ দিয়ে ৭১ ঢাকলে ন্যায়বিচার মরে যায়। বাঙালি মুসলমানের ইতিহাস এই দুই সত্যকে একসঙ্গে ধরতে বাধ্য।

    ৪৭ ছিল এক আকাঙ্ক্ষা।

    ৭১ ছিল সেই আকাঙ্ক্ষার বিশ্বাসঘাতক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।

    ৪৭ ছাড়া ৭১ কেন সম্ভব ছিল না?

    ৪৭ ছাড়া ৭১-ও হতো না—এই কথা সরলভাবে বললে তার গভীরতা নষ্ট হয়। ৪৭ শুধু পাকিস্তান রাষ্ট্র তৈরি করেনি; পূর্ব বাংলার মুসলমানকে ভারতীয় ইউনিয়নের একটি প্রদেশ না রেখে একটি আলাদা রাষ্ট্রের পূর্বাংশে দাঁড় করিয়েছিল। এই অবস্থানই পরবর্তী ইতিহাসের কাঠামো বদলে দেয়।

    পূর্ব বাংলা যদি ১৯৪৭-এ ভারতের অংশ হয়ে থাকত, তাহলে তার ভবিষ্যৎ স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবি অন্য চরিত্র নিত। তখন তা হতো Indian Union (ভারতীয় ইউনিয়ন)-এর বিরুদ্ধে secession (বিচ্ছিন্নতা)-এর দাবি। স্বাধীনতার পথ তখন ভাষা, সংস্কৃতি বা সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রশ্নে সহজে খুলত না। কারণ ভারতীয় রাষ্ট্র শুরু থেকেই নিজের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা রক্ষায় কঠোর। হায়দরাবাদের পরিণতি এই বাস্তবতার একটি বড় উদাহরণ। নিজাম স্বাধীন থাকতে চেয়েছিলেন। ১৯৪৮ সালে ভারতীয় সেনা হায়দরাবাদে হস্তক্ষেপ করে নিজামের বাহিনীকে পরাজিত করে এবং হায়দরাবাদ ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়। সিকিমের পরিণতিও দেখায়, ভারতীয় ভূরাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে ছোট বা প্রান্তিক রাজনৈতিক সত্তার স্বাধীন অবস্থান টেকে না। শেষ পর্যন্ত তা ভারতীয় রাষ্ট্রের ভিতরেই শোষিত হয়।

    এই তুলনা Bangladesh (বাংলাদেশ)-কে হায়দরাবাদ বা সিকিমের সঙ্গে এক করে না। ইতিহাস এক নয়। কিন্তু শিক্ষাটি স্পষ্ট। পূর্ব বাংলা যদি ভারতীয় রাষ্ট্রের ভিতরে থাকত, তার ভাষা-প্রশ্ন থাকত, মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকত, পূর্ববঙ্গীয় বঞ্চনা থাকতে পারত; কিন্তু আলাদা রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার কাঠামোগত সুযোগ বন্ধ হয়ে যেত। ভারতীয় ইউনিয়নের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার যুদ্ধ কল্পনা করা যায়, কিন্তু তার বাস্তব সম্ভাবনা ছিল অত্যন্ত ক্ষীণ।

    ৪৭ সেই অর্থে পূর্ব বাংলাকে একটি paradoxical space (বিরোধাভাসী স্থান)-এ রাখে। সে পাকিস্তানের ভিতরে যায় মুসলিম রাজনৈতিক মর্যাদার আশা নিয়ে। তারপর সেই পাকিস্তানই তার ভাষা অস্বীকার করে, অর্থনীতি শোষণ করে, সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে ক্ষমতায় রূপ নিতে দেয় না, সামরিক কর্তৃত্ব চাপায়। কিন্তু সেই রাষ্ট্রিক অবস্থানই পূর্ব বাংলাকে একটি আলাদা রাজনৈতিক শরীর দেয়—East Pakistan (পূর্ব পাকিস্তান)। এই শরীরের ভিতরেই ভাষা আন্দোলন হয়, প্রাদেশিক অধিকার জন্ম নেয়, ছয় দফা ওঠে, ১৯৭০ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ম্যান্ডেট আসে, আর ১৯৭১-এ স্বাধীনতার দাবি রাষ্ট্রিক যুক্তি পায়।

    ভারতের ভিতরে পূর্ব বাংলা থাকলে সে হতো এক প্রদেশ। পাকিস্তানের ভিতরে সে হলো এক wing (অংশ), এক সংখ্যাগরিষ্ঠ ভূখণ্ড, এক রাজনৈতিক একক, যার বিরুদ্ধে কেন্দ্র বৈষম্য করছে। এই পার্থক্য ছোট নয়। ৭১-এর শক্তি শুধু ভাষা বা সংস্কৃতিতে নয়; তার পেছনে ছিল পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রিক সত্তা, জনসংখ্যাগত সংখ্যাগরিষ্ঠতা, নির্বাচনী ম্যান্ডেট, অর্থনৈতিক বৈষম্যের দলিল, এবং কেন্দ্রের বিরুদ্ধে প্রদেশের নয়—এক অংশের বিরুদ্ধে আরেক অংশের রাজনৈতিক ন্যায্যতা।

    এই কারণেই ৪৭ ছাড়া ৭১ বোঝা যায় না।

    ৪৭ পাকিস্তান তৈরি করেছিল। পাকিস্তান পূর্ব বাংলাকে প্রতারণা করেছিল। সেই প্রতারণার ভিতর থেকেই ৭১ জন্ম নিয়েছে। তাই ৭১, ৪৭-এর সরল অস্বীকার নয়; ৪৭-এর অসম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতির বিচার। যে মর্যাদার আশায় পূর্ব বাংলার মুসলমান ৪৭-এ পাকিস্তানের অংশ হয়েছিল, সেই মর্যাদা পাকিস্তান দিতে ব্যর্থ হয়। ৭১ সেই ব্যর্থতার বিরুদ্ধে শেষ ঘোষণা।

    এই ধারাবাহিকতা না বুঝলে কেউ ৪৭ বুঝবে না, ৭১-ও বুঝবে না। ৪৭-কে মুছে দিলে ৭১ শূন্যে ঝুলে যায়। ৭১-কে ঢাকতে ৪৭ ব্যবহার করলে অন্যায়কে পবিত্র করা হয়।

    সঠিক পথ হলো দুটোকে একসঙ্গে ধরা।

    ৪৭ ছিল মর্যাদার দাবি।

    ৭১ ছিল সেই মর্যাদা রক্ষার রক্তাক্ত বিদ্রোহ।

    এই দুই অধ্যায়ের যোগসূত্র ছিঁড়ে দিলে ইতিহাস আর ইতিহাস থাকে না; হয়ে ওঠে এক জাতির আত্মপরিচয়ের ওপর চালানো নীরব ছুরি। 


    House of Wisdom

    House of Wisdom

    House of Wisdom — Inspired by the legacy of Baghdad’s Bayt al-Hikmah, where ideas meet knowledge, culture, philosophy, and civilization through thoughtful exploration.

    Post a Comment