Table of Contents
![]() |
যে জাতি নিজের ইতিহাস ভুলে যায়, সে নিজের ভবিষ্যৎও অন্যের হাতে তুলে দেয়—এই বাস্তবতার প্রতীকী ভিজুয়াল উপস্থাপন |
Previous Part.......
যে জাতি নিজের ইতিহাস ভুলে যায়, শেষ পর্যন্ত সে অন্যের ইতিহাস রক্ষা করে। কথাটা কঠিন, কিন্তু মিথ্যা নয়। কারণ ইতিহাস কখনো খালি থাকে না। এক জাতি নিজের অতীতের মালিকানা ছেড়ে দিলে সেই জায়গা অন্য বয়ান এসে দখল করে। অন্যের ভাষা, অন্যের নায়ক, অন্যের লজ্জা, অন্যের গৌরব, অন্যের ব্যাখ্যা—সব ধীরে ধীরে নিজের ঘরের দেয়ালে ঝুলতে থাকে। তখন মানুষ ভাবে সে নিজেই চিন্তা করছে। আসলে তার চিন্তার ভাষা অন্য কেউ সাজিয়ে দিয়েছে।
বাঙালি মুসলমানের ইতিহাসে এই বিপদ বহুদিনের। তাকে কখনো বলা হয়েছে, তার মুক্তি কেবল ভাষায়। কখনো বলা হয়েছে, তার মুক্তি কেবল ধর্মে। কখনো তাকে পাকিস্তানি রাষ্ট্রের অপরাধের দায়ে দাঁড় করানো হয়েছে। কখনো ভারতীয় বয়ানের চোখে নিজের ৪৭ নিয়ে লজ্জা শিখানো হয়েছে। কখনো তাকে বলা হয়েছে, ৭১-ই সব; তার আগে শুধু ভুল, অন্ধকার, সাম্প্রদায়িকতা। আবার কখনো ৪৭-এর নামে ৭১-এর রক্ত, ভাষা, অধিকার, পূর্ব বাংলার অভিজ্ঞতা মুছে দিতে চাওয়া হয়েছে।
বাঙালি মুসলমানের ইতিহাস এত সরল নয়। সে শুধু ভাষার জাতি নয়, শুধু ধর্মের সমাজও নয়। সে ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ-আনন্দ, ১৯০৬-এর মুসলিম লীগ, ১৯১৬-এর লখনৌ চুক্তি, পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী, ইকবালের জাতিসত্তার চিন্তা, ১৯৪০-এর লাহোর প্রস্তাব, ১৯৪৬-এর নির্বাচনী ম্যান্ডেট, ১৯৪৭-এর রাষ্ট্রিক মর্যাদা-দাবি, ১৯৫২-এর ভাষা, ১৯৬৬-এর স্বায়ত্ততা, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ—সব মিলিয়ে গঠিত এক জটিল জাতিগত সত্তা। এই ইতিহাস থেকে একটি রেখা তুলে আরেকটি রেখা মুছে দিলে মানুষ অর্ধেক হয়ে যায়। এই বই সেই অর্ধেক মানুষকে মানতে চায় না।
ইতিহাসের মালিকানা কার হাতে থাকে
ইতিহাসের মালিকানা শুধু বইয়ের তাকের বিষয় নয়। এটি রাষ্ট্রের বিষয়, পরিচয়ের বিষয়, ক্ষমতার বিষয়। কার ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকে যাবে, কার ইতিহাস ফুটনোটে থাকবে, কার নেতা জাতির নায়ক হবে, কার নেতা অস্বস্তিকর হবে, কোন সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম হবে, কোন সংগ্রাম সাম্প্রদায়িকতা হবে—এসব সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক।
বাঙালি মুসলমানের ইতিহাসের মালিকানা দীর্ঘদিন অন্যের হাতে ছিল। ঔপনিবেশিক শাসক তাকে সংখ্যার চোখে দেখেছে। হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদ তাকে অনেক সময় পিছিয়ে থাকা ধর্মীয় সমাজ হিসেবে দেখেছে। পাকিস্তানি রাষ্ট্র তাকে ভাষাহীন প্রাদেশিক জনতা বানাতে চেয়েছে। স্বাধীনতার পর শাহবাগী-ভারতীয় ফ্রেম তাকে ৭১-এর বাঙালি নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করেছে, কিন্তু ৪৭-এর মুসলিম রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে সন্দেহের ঘরে রেখেছে।
এই সব বয়ানের মধ্যে পার্থক্য আছে, কিন্তু একটি মিলও আছে। তারা বাঙালি মুসলমানকে নিজের পূর্ণ ইতিহাস নিজে পড়তে দেয় না।
৪৭ নিয়ে এই টানাটানির মূলে আছে ইতিহাসের মালিকানা। ৪৭ যদি শুধু পাকিস্তানের জন্ম হয়, তাহলে পাকিস্তানের অপরাধ দেখিয়ে ৪৭-কে বাতিল করা সহজ। ৪৭ যদি শুধু জিন্নাহর কৌশল হয়, তাহলে বাংলার মুসলিম জনমত অদৃশ্য হয়ে যায়। ৪৭ যদি শুধু সাম্প্রদায়িকতা হয়, তাহলে ব্রিটিশ ভারতের মুসলমানের নিরাপত্তা, প্রতিনিধিত্ব ও রাষ্ট্রিক মর্যাদার প্রশ্ন মুছে যায়। ৪৭ যদি শুধু বাংলার স্থানীয় প্রাদেশিক অভিজ্ঞতা হয়, তাহলে সর্বভারতীয় মুসলিম দরকষাকষি হারিয়ে যায়।
কিন্তু ৪৭ আসলে এসবের কোনো একটিমাত্র নয়। ৪৭ ছিল ব্রিটিশ ভারতের মুসলমানের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রে অবস্থান নির্ধারণের প্রশ্ন। Dar দেখান, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের নতুন কাঠামো এলে মুসলমানরা বুঝতে শুরু করে—গণতান্ত্রিক সংখ্যার রাজনীতিতে তারা স্থায়ী সংখ্যালঘু হয়ে যেতে পারে; পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী ছিল প্রথম দাবি, কিন্তু সময়ের সঙ্গে তারা দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধান খুঁজতে থাকে। (Farooq Ahmad Dar, “Jinnah and the Lahore Resolution,” p. 127)
এই ভয়কে শিশুসুলভ বলা যায় না। Neeti Nair দেখান, late 1930s-এ কংগ্রেসের পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী-বিরোধী অবস্থান মুসলমানদের কাছে বিশ্বাসভঙ্গের মতো মনে হয় এবং Hindu Raj (হিন্দু রাজ)-এর ভয় শক্তি পায়। (Neeti Nair, Changing Homelands, pp. 159–161) ইতিহাস এখানে আবেগ নয়; রাজনৈতিক কাঠামোর প্রশ্ন।
অতীত ভুলে যাওয়ার রাজনৈতিক মূল্য
যে জাতি নিজের ইতিহাস ভুলে যায়, তার শুধু অতীত হারায় না; ভবিষ্যৎও অন্যের হাতে চলে যায়। কারণ অতীত মানুষের কাছে কেবল গল্প নয়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানদণ্ড। কেউ যদি জানে না, কেন তার পূর্বপুরুষ ৪৭ চেয়েছিল, তবে সে আজকের ভারতীয় সংখ্যাগুরু জাতীয়তাবাদ বুঝবে কীভাবে? কেউ যদি জানে না, কেন পূর্ব বাংলার মুসলমান পাকিস্তানে গিয়েছিল, তবে সে কীভাবে বুঝবে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেও মুসলিম জাতিসত্তা বাতিল করা যায় না? কেউ যদি জানে না ১৯৪৬-এর নির্বাচনে বাংলার মুসলমান কী রাজনৈতিক ম্যান্ডেট দিয়েছিল, তবে সে আজ নিজের ভোট, রাষ্ট্র, কুরবানি, সীমান্ত, নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা—এসব প্রশ্ন কোথায় বসাবে?
অতীত ভুলে যাওয়ার রাজনৈতিক মূল্য ভয়ংকর। তখন মানুষ নিজের বন্ধু-শত্রু ভুল করে। কখনো পাকিস্তান রাষ্ট্রের অপরাধ ঢাকতে যায়। কখনো ভারতীয় বয়ানের কোলে গিয়ে বসে। কখনো বাংলা ভাষাকে মুসলিম ইতিহাসের বিরুদ্ধে দাঁড় করায়। কখনো ইসলামী পরিচয়ের নামে বাংলা মাটি-মানুষকে অবহেলা করে। দুটোই আত্মপ্রবঞ্চনা।
৪৭ ছিল এক প্রশ্নের উত্তর, “ব্রিটিশ ভারতের মুসলমান ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রে কোথায় দাঁড়াবে?”
৭১ ছিল আরেক প্রশ্নের উত্তর, “পাকিস্তান রাষ্ট্র যদি পূর্ব বাংলার মর্যাদা অস্বীকার করে, তবে পূর্ব বাংলার মানুষ কী করবে?” দুই প্রশ্ন আলাদা।
এই পার্থক্য না বুঝলে ৪৭ ও ৭১—দুটোই বিকৃত হয়। ৭১ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে; ৪৭-এর মুসলিম মর্যাদা-দাবির বিরুদ্ধে নয়। ৪৭ বাঙালি মুসলমানকে ভারতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রের ভিতর থেকে আলাদা রাষ্ট্রিক অবস্থানে এনেছিল; ৭১ সেই রাষ্ট্রিক অবস্থানের ভিতরে জন্ম নেওয়া পশ্চিম পাকিস্তানি অন্যায়ের বিচার করেছে। একটি দাবি ছিল। অন্যটি ছিল সেই দাবির নামে তৈরি রাষ্ট্রের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।
৪৭ অতীত নয়, চলমান বাস্তবতা
অনেকে ভাবে ৪৭ অতীত। মানচিত্র হয়ে গেছে, দেশভাগ হয়ে গেছে, পাকিস্তান হয়েছে, বাংলাদেশ হয়েছে—এখন আবার ৪৭ কেন? এই প্রশ্নই প্রমাণ করে ৪৭ ঠিকমতো বোঝা হয়নি। ৪৭ শুধু তারিখ নয়। ৪৭ একটি চলমান প্রশ্ন, মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ বা সংখ্যালঘু অবস্থায় নিজের রাজনৈতিক নিরাপত্তা কীভাবে ভাববে? ভাষা ও ধর্মের সম্পর্ক কী? রাষ্ট্র কি শুধু নাগরিকতার বিমূর্ত কাগজ, না সংখ্যাগরিষ্ঠ সংস্কৃতির চাপও বহন করে? মুসলিম জাতিসত্তা কি কেবল পাকিস্তান রাষ্ট্রে শেষ, না তার ইতিহাস পাকিস্তানের আগেও ছিল, পরেও আছে?
আজকের উপমহাদেশ এই প্রশ্নগুলো আবার খুলে দিয়েছে। ভারতীয় জাতীয়তাবাদ একসময় civic pluralism (নাগরিক বহুত্ববাদ)-এর ভাষা ব্যবহার করলেও এখন Hindu majoritarianism (হিন্দু সংখ্যাগুরুবাদ)-এর দিকে স্পষ্টভাবে ঝুঁকেছে। Brian Girvin দেখান, ভারতীয় রাষ্ট্র একসময় ভাষা ও জাতিগত দাবিকে ফেডারেল কাঠামোর মধ্যে সামলাতে চাইত, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে BJP-র সাফল্যের সঙ্গে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ হিন্দু জাতীয়তাবাদের সঙ্গে ক্রমশ মিশে majoritarian (সংখ্যাগুরুবাদী), assimilationist (আত্মসাৎকামী) ও exclusivist (বর্জনবাদী) চরিত্র নিয়েছে। (Brian Girvin, “From Civic Pluralism to Ethnoreligious Majoritarianism,” pp. 2–4, 23–24)
পশ্চিমবঙ্গের বাস্তবতাও বদলাচ্ছে। Subhasish Dey ও Soham Sahoo ২০১১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের ছয়টি নির্বাচনের assembly constituency (বিধানসভা আসন)-ভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, ২০১৬-এর পর ধর্মীয় জনসংখ্যা নির্বাচনী ফলের সঙ্গে অনেক শক্তভাবে যুক্ত হয়; মুসলিম-ঘন আসনে TMC-র সমর্থন বাড়ে, আর BJP বিপরীত দিকে শক্তি পায়। অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গেও ধর্মীয় মেরুকরণ রাজনৈতিক আচরণে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। (Subhasish Dey and Soham Sahoo, “Religious Polarisation, Economic Vulnerability, and Electoral Realignment,” pp. 1, 13–16)
এই বাস্তবতায় ৪৭ আবার ফিরে আসবেই। কারণ গরু, কুরবানি, নাগরিকত্ব, সীমান্ত, মুসলিম নিরাপত্তা, হিন্দুত্ব, পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান, আসাম, কাশ্মীর—এসব প্রশ্ন কেবল খবরের কাগজের ঘটনা নয়। এগুলো রাষ্ট্র, জাতিসত্তা ও নিরাপত্তার প্রশ্ন। পূর্ব বাংলার মুসলমান যখন বলে ৪৭ না হলে সে আজ এই ভূখণ্ডে কুরবানি করতে পারত কি না, সেটা নিছক আবেগ নয়। সে সীমান্তের দুই পাশের বাস্তবতা তুলনা করছে। প্রশ্নটি বাস্তব। ৪৭ তাই মৃত অতীত নয়। এটি বর্তমানের ভেতর ফিরে আসা ইতিহাস।
নতুন প্রজন্মের সামনে আদর্শিক যুদ্ধ
নতুন প্রজন্মের সামনে যুদ্ধ শুধু দলের নয়। শুধু ভোটের নয়। আসল যুদ্ধ ইতিহাসের ভাষা নিয়ে। তারা কি ৭১ রাখবে, কিন্তু ৪৭ লুকাবে? তারা কি বাংলা ভাষা ভালোবাসবে, কিন্তু মুসলিম রাজনৈতিক ইতিহাসকে সন্দেহ করবে? তারা কি শেরে বাংলা, সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিমকে ফিরিয়ে আনবে, কিন্তু জিন্নাহকে মুছে দেবে? তারা কি ভারতীয় পুতুল হতে চাইবে না, কিন্তু ভারতীয় বয়ানের ভাষায় নিজের ইতিহাস পড়বে? তারা কি পাকিস্তানের দাস হবে না, কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্রের অপরাধ আর মুসলিম জাতিসত্তার ইতিহাসের পার্থক্য করতে পারবে? এই প্রশ্নগুলো থেকে পালানোর সুযোগ নেই।
জুলাই-পরবর্তী তরুণ রাজনৈতিক ভাষায় একটি আকর্ষণীয় সুর দেখা যাচ্ছে। বাঙালি মুসলমানের স্থানীয় ইতিহাস আছে। তার মাটি আছে। তার ভাষা বাংলা। সে তুরান নয়, ইরান নয়, আরবও নয়। সে গুজরাটি নয়, পাঠানও নয়। সে বাংলার মানুষ।
কিন্তু এই সত্যগুলো যদি এমনভাবে সাজানো হয় যে ৪৭-এর সর্বভারতীয় মুসলিম রাজনৈতিক ভিত্তি অস্বস্তিকর হয়ে পড়ে, তাহলে নতুন ভাষাও পুরোনো ভুলে পড়ে। জিন্নাহকে ধন্যবাদ দেওয়ার বিপরীতে বাংলা ভাষা দাঁড় করানো দুর্বল দ্বন্দ্ব। বাংলা ভাষা দিয়ে জিন্নাহকে বাতিল করা যায় না। আবার জিন্নাহ দিয়ে বাংলার মুসলিম নেতাদের ঢেকে দেওয়া যায় না।
Ayesha Jalal দেখান, বাংলার মুসলিম রাজনীতি ছিল জটিল; ফজলুল হক, কলকাতাকেন্দ্রিক মুসলিম অভিজাত, কৃষকপ্রজা রাজনীতি, মুসলিম লীগ—সব মিলিয়ে এক কঠিন প্রাদেশিক বাস্তবতা কাজ করছিল। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, p. 24) আবার ১৯৪৩–৪৫-এ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম Bengal Muslim League-কে সংগঠনী শক্তি দিতে চেয়েছেন; আবুল হাশিম জেলা লীগকে office (অফিস), full-time workers (পূর্ণকালীন কর্মী), reading rooms (পাঠাগার), বই-পত্রিকা এবং মানুষের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করতে চাইছিলেন। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, pp. 104–105)
এই দলিল প্রমাণ করে, বাংলার মুসলমানের নিজস্ব রাজনৈতিক শরীর ছিল। কিন্তু সেই শরীর all-India Muslim League (সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ)-এর বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল না। জিন্নাহ ছিলেন সর্বভারতীয় সাংবিধানিক দরকষাকষির মুখ। বাংলার নেতারা ছিলেন বাংলার জনভিত্তি, সংগঠন ও প্রাদেশিক কল্পনার ভিত। একজনকে দিয়ে অন্যজনকে মুছে দিলে ইতিহাসের মাপ নষ্ট হয়। নতুন প্রজন্মের কাজ নায়ক বদলানো নয়। কাজ হলো স্তরগুলোকে ঠিক জায়গায় বসানো।
মুসলিম রাজনৈতিক চেতনার ভবিষ্যৎ সংকট
মুসলিম রাজনৈতিক চেতনার ভবিষ্যৎ এখন তিন বিপদের সামনে দাঁড়িয়ে।
প্রথম বিপদ—শাহবাগী-ভারতীয় বয়ান। এটি ৭১-কে একমাত্র উৎস বানিয়ে ৪৭-কে লজ্জা বানায়। পাকিস্তানের অপরাধ ব্যবহার করে মুসলিম রাজনৈতিক ইতিহাসকে সন্দেহ করে। এতে বাঙালি মুসলমান নিজের ৪৭ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়।
দ্বিতীয় বিপদ—পাকিস্তানি নস্টালজিয়া। এটি ৪৭-এর মর্যাদা-দাবিকে রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার, ভাষা, পূর্ব বাংলার অধিকার, ৭১-এর গণহত্যা—এসবের ওপর বসিয়ে দিতে চায়। এতে বাঙালি মুসলমান নিজের ৭১ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়।
তৃতীয় বিপদ—নতুন স্থানীয়তাবাদী সংকোচন। এটি বাংলা মাটি, ভাষা, স্থানীয় নেতা, বহুত্ব, বৈশাখ-কুরবানি-আজান—এসব সত্যকে সামনে আনে, কিন্তু কখনো কখনো সর্বভারতীয় মুসলিম রাজনৈতিক ধারাকে বাইরে ঠেলে দেয়। এতে বাঙালি মুসলমান নিজের আকাশ হারায়।
এই তিন বিপদ এড়াতে হলে মুসলিম রাজনৈতিক চেতনাকে পরিণত হতে হবে। শুধু স্লোগানে নয়, জ্ঞানে। শুধু আবেগে নয়, ইতিহাসে। শুধু পরিচয়ে নয়, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রদৃষ্টিতে।
পরিণত মুসলিম রাজনৈতিক চেতনা মানে হিন্দু-বিদ্বেষ নয়। ভারত-বিদ্বেষ নয়। পাকিস্তান-বন্দনাও নয়। এর অর্থ—নিজের ইতিহাসের মালিকানা, নিজের রাষ্ট্রের মর্যাদা, নিজের সংখ্যাগরিষ্ঠতার নৈতিক দায়, সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা, ন্যায়ভিত্তিক রাজনীতি, এবং উপমহাদেশীয় বাস্তবতা বোঝা।
বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র। এই সত্য লুকিয়ে কোনো সেক্যুলার স্বস্তি পাওয়া যাবে না। আবার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে অন্য ধর্মের মানুষের অধিকার কমানোও মুসলিম রাজনৈতিক চেতনা নয়। ইসলামের নামে অন্যায় করলে ৭১-এর পাঠ ভুলে যাওয়া হয়। আর ৭১-এর নামে ইসলামী ইতিহাসবোধ মুছে দিলে ৪৭-এর পাঠ ভুলে যাওয়া হয়। দুটোই অজ্ঞতা।
ইতিহাস ভুলে যাওয়ার শেষ মূল্য
ইতিহাস ভুলে গেলে জাতি শুধু অতীত হারায় না; বিচারক্ষমতাও হারায়। তখন সে বুঝতে পারে না কখন তাকে ব্যবহার করা হচ্ছে। কখন তার ৭১ দিয়ে ৪৭ মুছানো হচ্ছে। কখন তার ৪৭ দিয়ে ৭১ ঢাকা হচ্ছে। কখন তার বাংলা দিয়ে ইসলামকে ঠেকানো হচ্ছে। কখন তার ইসলাম দিয়ে বাংলাকে ছোট করা হচ্ছে। কখন তার স্থানীয় নেতাদের দিয়ে জিন্নাহকে মুছে দেওয়া হচ্ছে। কখন জিন্নাহর নামে স্থানীয় ইতিহাস ঢেকে দেওয়া হচ্ছে।
এই বিভ্রান্ত জাতি অন্যের ইতিহাস রক্ষা করে। ভারতীয় বয়ান চাইলে সে ভারতীয় ইতিহাসের লজ্জা-গৌরব নিজের ঘরে টাঙায়। পাকিস্তানি নস্টালজিয়া চাইলে সে নিজের ৭১ ভুলতে বসে। শহুরে নতুন এলিট চাইলে সে নিজের মাটি মনে রাখে, কিন্তু সর্বভারতীয় মুসলিম ধারাবাহিকতা ভুলে যায়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই সে অন্যের ফ্রেমে নিজের মুখ দেখে। এভাবে আত্মপরিচয় তৈরি হয় না। আত্মপরিচয় তৈরি হয় পূর্ণ ইতিহাসের ওপর দাঁড়িয়ে।
পূর্ণ ইতিহাস বলবে—৪৭ দরকার ছিল, কারণ মুসলমানের রাষ্ট্রিক মর্যাদার প্রশ্ন বাস্তব ছিল।
পূর্ণ ইতিহাস বলবে—পাকিস্তান ব্যর্থ হয়েছিল, কারণ ন্যায় ছাড়া মুসলিম রাষ্ট্রও অন্যায়ের রাষ্ট্র হয়ে যায়।
পূর্ণ ইতিহাস বলবে—৭১ ন্যায্য ছিল, কারণ পূর্ব বাংলার মর্যাদা, ভাষা, ভোট ও জীবন রক্ষার আর পথ ছিল না।
পূর্ণ ইতিহাস বলবে—বাংলা ভাষা আমাদের, কিন্তু বাংলা ভাষা মুসলিম জাতিসত্তার বিপরীতে নয়।
পূর্ণ ইতিহাস বলবে—জিন্নাহ দরকারি, কিন্তু জিন্নাহ একা নন। শেরে বাংলা, সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিমও দরকারি।
পূর্ণ ইতিহাস বলবে—ভারতকে বুঝতে হবে, কিন্তু ভারতীয় বয়ানে আত্মসমর্পণ করা যাবে না।
পূর্ণ ইতিহাস বলবে—পাকিস্তানের অপরাধ বিচার করতে হবে, কিন্তু মুসলিম রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে আসামি বানানো যাবে না।
এই পূর্ণ ইতিহাস ছাড়া বাঙালি মুসলমান নিজের ভবিষ্যৎ বানাতে পারবে না।
শেষ কথা
৪৭ অতীত নয়। ৪৭ চলমান বাস্তবতা।
৭১ও অতীত নয়। ৭১ চলমান দায়িত্ব।
৪৭ আমাদের শেখায়, সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রের ভেতরে সংখ্যালঘু নিরাপত্তার প্রশ্ন অবহেলা করলে রাষ্ট্র ভেঙে যায়। ৭১ শেখায়, মুসলিম নামের রাষ্ট্রও যদি ন্যায় না দেয়, তবে তাকে প্রত্যাখ্যান করা যায়। এই দুই শিক্ষা একসঙ্গে ধরতে না পারলে আমরা বারবার অন্যের বয়ানে আটকে যাব।
বাঙালি মুসলমানকে এখন নিজের ইতিহাস নিজের চোখে পড়তে হবে। ভারতীয় চোখে নয়। পাকিস্তানি নস্টালজিয়ার চোখে নয়। শাহবাগী বাছাই করা চোখে নয়। শুধু স্থানীয় মাটির সংকীর্ণ চোখেও নয়।
নিজের চোখ মানে পূর্ণ চোখ। এই চোখে ৪৭ থাকবে। ৭১ থাকবে। বাংলা থাকবে। ইসলাম থাকবে। কুরবানি থাকবে। ভাষা থাকবে। শেরে বাংলা থাকবে। জিন্নাহ থাকবে। সোহরাওয়ার্দী থাকবে। আবুল হাশিম থাকবে। কৃষকসমাজ থাকবে। শহুরে মধ্যবিত্ত থাকবে। পশ্চিমবঙ্গের পরিবর্তন থাকবে। ভারতের সংখ্যাগুরু জাতীয়তাবাদের চাপ থাকবে। বাংলাদেশের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার নৈতিক দায় থাকবে।
কারণ যে জাতি নিজের ইতিহাস ভুলে যায়, সে শেষ পর্যন্ত অন্যের ইতিহাস রক্ষা করে। আর যে জাতি নিজের ইতিহাস ফিরিয়ে আনে, সে শুধু অতীত উদ্ধার করে না; ভবিষ্যতের ওপরও নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে।

Post a Comment