Loading...

কেন ৪৭ আবার ফিরে আসছে? পুরোনো প্রশ্নের নতুন প্রত্যাবর্তন

কেন ৪৭ আবার ফিরে আসছে? পুরোনো প্রশ্নের নতুন প্রত্যাবর্তন
Advertisement
Advertisement — Place AdSense Code Here
Table of Contents
    ৪৭ আবার ফিরছে কেন - বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় ও ইতিহাসের প্রতীকী চিত্র
    ১৯৪৭, পরিচয়, নিরাপত্তা ও ইতিহাসকে ঘিরে বাঙালি মুসলমানের নতুন প্রশ্নের প্রতীকী উপস্থাপন

    Previous Part.......

    ইতিহাস কখনো পুরোপুরি মরে না। কিছু ইতিহাসকে চাপা দেওয়া যায়, লজ্জা বানানো যায়, পাঠ্যপুস্তকের প্রান্তে রাখা যায়, মঞ্চের স্লোগানে ঢেকে দেওয়া যায়। কিন্তু কোনো জাতির গভীর প্রশ্ন মাটির নিচে চাপা থাকলেও একসময় আবার উঠে আসে। ৪৭ এখন সেইভাবেই ফিরে আসছে।

    এটি কেবল জিন্নাহকে নতুন করে ধন্যবাদ দেওয়ার ঘটনা নয়। কুরবানির অধিকার, বাংলার মুসলমানের নিরাপত্তা, পশ্চিমবঙ্গের বদলে যাওয়া রাজনীতি, ভারতীয় সংখ্যাগুরু জাতীয়তাবাদের চাপ, বাংলাদেশে জুলাই-পরবর্তী নতুন প্রজন্মের আত্মপরিচয়ের অস্থিরতা—এসব মিলেই ৪৭ আবার আলোচনায় ফিরে এসেছে। কেউ তাকে ভালোবেসে ডাকে। কেউ অস্বস্তিতে তাকে ঠেলে দিতে চায়। কেউ বাংলা ভাষা দেখিয়ে তাকে থামাতে চায়। কেউ বলে, জিন্নাহ নয়, শেরে বাংলা; জিন্নাহ নয়, আবুল হাশিম; জিন্নাহ নয়, সোহরাওয়ার্দী। তর্কগুলো আলাদা, কিন্তু মূলে একই প্রশ্ন।

    বাঙালি মুসলমান কে?

    সে কি শুধু বাংলা ভাষার মানুষ? শুধু বাংলাদেশের নাগরিক? শুধু ৭১-এর সন্তান? শুধু পূর্ব বাংলার কৃষকসমাজের উত্তরাধিকারী? নাকি সে একই সঙ্গে ব্রিটিশ ভারতের মুসলিম রাজনৈতিক সংগ্রামের অংশ, ৪৭-এর উত্তরাধিকারী, ৭১-এর নির্মাতা, এবং আজকের নতুন উপমহাদেশীয় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়ানো এক মুসলিম জাতিগত সত্তা?

    ৪৭ ফিরছে কারণ এই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।

    শাহবাগী বয়ান ভেবেছিল ৭১ দিয়ে ৪৭ মুছে দেওয়া যাবে। পাকিস্তান রাষ্ট্রের অপরাধ দেখিয়ে মুসলিম রাজনৈতিক ইতিহাসকে সন্দেহে রাখা যাবে। কিন্তু ইতিহাস এত অনুগত নয়। ৭১ সত্য। পাকিস্তানের অপরাধ সত্য। কিন্তু ৪৭-ও সত্য। ৪৭ ছাড়া পূর্ব বাংলার মুসলমানের রাজনৈতিক মানচিত্র, আত্মমর্যাদার দাবি, ভারতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার শঙ্কা, এবং পরবর্তী বাংলাদেশের সম্ভাবনা বোঝা যায় না। তাই ৪৭ ফিরে আসছে, কারণ বাস্তবতা তাকে ফিরিয়ে আনছে।

    উপমহাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা

    একসময় “ভারতীয় গণতন্ত্র” দক্ষিণ এশিয়ার অনেকের কাছে একটি স্থিতিশীল উদাহরণ ছিল। বহু ধর্ম, বহু ভাষা, বহু জাতিসত্তা, কেন্দ্র-প্রদেশ সমঝোতা, সংবিধানিক কাঠামো—এসব দিয়ে ভারত নিজেকে বহুত্ববাদী রাষ্ট্র হিসেবে দেখাত। কিন্তু আজকের ভারত সেই পুরোনো চেহারায় নেই। সংখ্যাগুরু জাতীয়তাবাদ সেখানে রাষ্ট্রের ভাষা বদলে দিয়েছে।

    Brian Girvin দেখান, ভারতীয় জাতীয়তাবাদ একসময় civic pluralism (নাগরিক বহুত্ববাদ)-এর সঙ্গে আপস করত; ভাষা ও জাতিগত দাবিকে ফেডারেল কাঠামোর মধ্যে সামলাতে চাইত। কিন্তু সাম্প্রতিক দশকগুলোতে সেই জায়গা বদলে গেছে। BJP-এর রাজনৈতিক সাফল্যের পর ভারতীয় জাতীয়তাবাদ Hindu nationalism (হিন্দু জাতীয়তাবাদ)-এর সঙ্গে ক্রমশ মিশেছে, এবং তা majoritarian (সংখ্যাগুরুবাদী), assimilationist (আত্মসাৎকামী) ও exclusivist (বর্জনবাদী) চরিত্র নিয়েছে। এই ধারা সংখ্যালঘু, ফেডারেল কাঠামো এবং ভিন্ন জাতিসত্তার দাবি—সবকিছুর ওপর চাপ তৈরি করে। (Brian Girvin, “From Civic Pluralism to Ethnoreligious Majoritarianism,” pp. 2–4)

    এই বাস্তবতা ৪৭-কে নতুন অর্থ দেয়। ১৯৪৭-এ মুসলমানরা যে শঙ্কা করেছিল—একটি সংখ্যাগুরু-নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রে তাদের রাজনৈতিক মর্যাদা কী হবে—আজকের ভারত সেই প্রশ্নকে আবার জীবিত করেছে। কেউ যদি আজও বলে ৪৭ ছিল শুধু সাম্প্রদায়িক বিভ্রম, তাকে এখন ভারতের দিকে তাকাতে হবে। যে রাষ্ট্রে নাগরিকত্ব, ইতিহাস, ধর্মীয় পরিচয়, গরু, মসজিদ, কাশ্মীর, সংখ্যালঘু অধিকার—সবকিছু সংখ্যাগুরু জাতীয়তাবাদের ভাষায় নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে, সেখানে ৪৭-এর মুসলিম নিরাপত্তা-প্রশ্নকে শিশুসুলভ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

    শুধু দিল্লির ভারত নয়, বাংলার পশ্চিম দিকও বদলাচ্ছে। একসময় পশ্চিমবঙ্গ নিজের “বাঙালি অসাম্প্রদায়িকতা” নিয়ে গর্ব করত। সেই গর্বের ভিতরেও হিন্দু অভিজাত সংস্কৃতির আধিপত্য ছিল, মুসলমানের প্রান্তিকতা ছিল, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে একধরনের প্রকাশ্য হিন্দুত্ব-প্রতিরোধী ভাষা ছিল। এখন সেই জমিও বদলাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী বাস্তবতায় ধর্মীয় জনসংখ্যা ক্রমশ দৃশ্যমান রাজনৈতিক রেখা হয়ে উঠছে। Dey and Sahoo ২০১১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ছয়টি নির্বাচনের assembly constituency (বিধানসভা আসন)-ভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, ২০১৬-এর পর থেকে মুসলিম জনসংখ্যার অংশ নির্বাচনী ফলের সঙ্গে অনেক শক্তভাবে যুক্ত হয়ে যায়; মুসলিম-ঘন আসনে TMC-র সমর্থন বাড়ে, আর BJP বিপরীতভাবে কম মুসলিম-ঘন আসনে শক্তি পায়। তাঁদের ভাষায় পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক realignment (পুনর্বিন্যাস) ধর্মীয় polarisation (মেরুকরণ)-এর শক্তিশালী উপস্থিতি দেখায়। (Subhasish Dey and Soham Sahoo, “Religious Polarisation, Economic Vulnerability, and Electoral Realignment,” pp. 1, 13–16)

    এই তথ্য শুধু পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী গণিত নয়। এর অর্থ, বাংলার পশ্চিম অংশেও “বাংলা” একা নিরাপত্তা দিচ্ছে না। ধর্মীয় পরিচয় রাজনৈতিক আচরণের গভীরে ঢুকে যাচ্ছে। তখন পূর্ব বাংলার মুসলমান যখন কুরবানির অধিকার, ধর্মীয় নিরাপত্তা, রাজনৈতিক মর্যাদা, এবং আলাদা রাষ্ট্রিক বাস্তবতার কথা বলে, তাকে শুধু আবেগী বলা যায় না। সে উপমহাদেশের নতুন সংকেত পড়ছে।

    জ্ঞানীদের জন্য ইশারা যথেষ্ট—এই কথাটি রাজনীতিতেও সত্য। কিন্তু ইশারা বুঝতে হলে অহংকার কম লাগে।

    সংখ্যাগুরু জাতীয়তাবাদের প্রত্যাবর্তন

    সংখ্যাগুরু জাতীয়তাবাদ নতুন কিছু নয়। ভারতবর্ষের ঔপনিবেশিক যুগেই তার বীজ ছিল। কংগ্রেস নিজেকে সর্বভারতীয় জাতীয় প্রতিনিধি বলত, কিন্তু মুসলমানরা প্রশ্ন করেছিল—এই “জাতীয়” কাদের জাতীয়? Neeti Nair দেখান, late 1930s-এ পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী প্রশ্নে কংগ্রেসের অবস্থান মুসলমানদের কাছে বিশ্বাসভঙ্গ মনে হয় এবং Hindu Raj (হিন্দু রাজ)-এর শঙ্কাকে শক্তি দেয়। (Neeti Nair, Changing Homelands, pp. 159–161)

    Farooq Ahmad Dar একই ধারাকে অন্য দিক থেকে ধরেন। ব্রিটিশ শাসন যখন গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের নতুন কাঠামো খুলে দেয়, মুসলমানরা বুঝতে পারে—সংখ্যার রাজনীতিতে তারা স্থায়ী সংখ্যালঘু হয়ে যাবে। প্রথমে তারা separate electorates (পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী) চায়, পরে সেই প্রশ্ন বৃহত্তর জাতিসত্তা ও রাষ্ট্রিক মর্যাদার দাবিতে পরিণত হয়। (Farooq Ahmad Dar, “Jinnah and the Lahore Resolution,” p. 127)

    আজকের উপমহাদেশে সেই প্রশ্ন অন্য রূপে ফিরে এসেছে। তখন মুসলমানরা ভয় করত কংগ্রেসীয় জাতীয়তার ভিতরে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতার আধিপত্য। আজ তারা দেখছে একটি প্রকাশ্য হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রদৃষ্টি ভারতীয় জাতীয়তাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে। পার্থক্য আছে, কিন্তু ধারাবাহিকতাও আছে। আগে শঙ্কা ছিল সম্ভাব্য। এখন তা রাষ্ট্রীয় ভাষা পেয়েছে।

    Girvin দেখান, BJP-এর রাজনৈতিক সাফল্য ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে এমন জায়গায় নিয়ে গেছে, যেখানে pluralistic possibilities (বহুত্ববাদী সম্ভাবনা) থেকে unitary nation-state model (একক জাতি-রাষ্ট্রের মডেল)-এর দিকে চাপ বাড়ছে। সংখ্যাগুরু জাতীয়তাবাদ সেখানে হিন্দু সাংস্কৃতিক কাঠামোকে রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় পরিচয় বানাতে চায়। (Brian Girvin, pp. 2–3)

    এই বাস্তবতা বাঙালি মুসলমানকে নতুন করে প্রশ্ন করতে বাধ্য করে। যদি ভারত এমন দিকে যায়, তবে ৪৭-এর প্রশ্ন কি পুরোনো থাকে? যদি পশ্চিমবঙ্গেও পরিচয়ের রাজনীতি ধর্মের রেখায় ঘনীভূত হয়, তবে পূর্ব বাংলার মুসলমান কি শুধু “ভাষা” বলে নিশ্চিন্ত থাকবে? যদি সীমান্তের ওপারে মুসলমান পরিচয় চাপের মধ্যে পড়ে, তবে সীমান্তের এপারের মুসলমান কি নিজের ৪৭ নিয়ে লজ্জিত থাকবে?

    ৪৭ এই কারণেই ফিরে আসে। কারণ নতুন বাস্তবতা পুরোনো প্রশ্নকে আবার জাগায়।

    জুলাই-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক ভাষা

    জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে একটি নতুন রাজনৈতিক ভাষা তৈরি হচ্ছে। এই ভাষা পুরোনো শাহবাগী ভাষা নয়। আবার সরল ৪৭-পন্থী মুসলিম রাজনৈতিক ভাষাও নয়। এটি মাঝামাঝি, অস্থির, সম্ভাবনাময়, আবার বিপজ্জনকও। এই ভাষায় কুরবানি আছে, আজান আছে, বাংলা আছে, বৈশাখ আছে, ভাটিয়ালি আছে, মন্দিরের ঘণ্টা আছে, গির্জার প্রার্থনা আছে। এখানে পাকিস্তানের দাস হতে না চাওয়ার ঘোষণা আছে, ভারতের পুতুল হতে না চাওয়ার কথাও আছে। এখানে নিজের মাটি, নিজের ভাষা, নিজের মানুষ, নিজের ইতিহাসের ওপর দাঁড়ানোর ডাক আছে।

    শুনতে সুন্দর। অনেকটাই সত্য। কিন্তু রাজনীতিতে শুধু সুন্দর কথা যথেষ্ট নয়। প্রশ্ন হলো, এই ভাষা ইতিহাসকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?

    জুলাই-পরবর্তী তরুণ নেতৃত্বের কিছু বক্তব্যে দেখা যায়, “জিন্নাহকে ধন্যবাদ” বলার বিপরীতে বাংলা ভাষা, পূর্ব বাংলার নিজস্ব সংগ্রাম, বৈষম্যহীন বাংলা, বহুধর্মী সহাবস্থান, নজরুল, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, মওলানা আকরম খাঁ, শেরে বাংলা, সোহরাওয়ার্দী—এসবকে সামনে আনা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, মুসলিম বাঙালি তুরান-ইরান-আরবের স্বপ্নে হারাবে না, গুজরাটি বা পাঠান হবে না, নিজের মাটি ও ভাষায় দাঁড়াবে। এই কথাগুলোতে আত্মমর্যাদার সুর আছে। ভারতীয় পুতুল না হওয়ার ঘোষণা আছে। পাকিস্তানি নিরাপত্তা-নির্ভরতার বিরুদ্ধেও সতর্কতা আছে।

    এই ভাষার শক্তি এখানেই। কিন্তু তার দুর্বলতাও এখানেই। কারণ সে অনেক সময় স্থানীয় আত্মমর্যাদা রক্ষা করতে গিয়ে সর্বভারতীয় মুসলিম রাজনৈতিক ইতিহাসকে বাইরে ঠেলে দেয়। বাংলা ভাষা সত্য, কিন্তু বাংলা ভাষা দিয়ে ৪৭ শেষ হয়ে যায় না। পূর্ব বাংলার নিজস্ব সংগ্রাম সত্য, কিন্তু সেই সংগ্রাম all-India Muslim politics (সর্বভারতীয় মুসলিম রাজনীতি)-এর সঙ্গে যুক্ত ছিল। শেরে বাংলা সত্য, সোহরাওয়ার্দী সত্য, আবুল হাশিম সত্য। কিন্তু তাঁদের দাঁড় করাতে জিন্নাহকে মুছে দিতে হবে—এমন ইতিহাস দুর্বল ইতিহাস।

    বাংলার মুসলমানের মাটি আছে। কিন্তু তার আকাশও আছে। এই আকাশে লাহোর আছে, দিল্লির দরকষাকষি আছে, সংখ্যালঘু প্রদেশের মুসলমানের ত্যাগ আছে, ইকবালের চিন্তা আছে, জিন্নাহর সাংবিধানিক লড়াই আছে, বাংলার ১৯৪৬ নির্বাচন আছে। শুধু মাটির কথা বললে আকাশ হারায়। শুধু আকাশের কথা বললে মাটি হারায়। বাঙালি মুসলমানকে এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়াতে হবে।

    জিন্নাহ বনাম বাংলা—একটি ভুল দ্বন্দ্ব

    আজকের তর্কে একটি বিপজ্জনক দ্বন্দ্ব তৈরি হচ্ছে: জিন্নাহ নাকি বাংলা? যেন জিন্নাহকে মানলে বাংলা হারায়, আর বাংলা মানলে জিন্নাহ অপ্রয়োজনীয়। এই দ্বন্দ্ব ভুল।

    জিন্নাহ বাংলা ভাষার কবি নন, পূর্ব বাংলার কৃষকসমাজের সংগঠকও নন। তিনি বাংলার মাটি থেকে ওঠা নেতা নন। কিন্তু ৪৭-এর সর্বভারতীয় মুসলিম দরকষাকষিতে তিনি অপরিহার্য মুখ। এই সত্য অস্বীকার করলে ৪৭ বোঝা যায় না। আবার জিন্নাহকে সামনে আনতে গিয়ে শেরে বাংলা, সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, মওলানা আকরম খাঁ, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ—এদের ভুলে গেলে বাংলার মুসলিম রাজনীতির শরীর বোঝা যায় না।

    Dar দেখান, লাহোর প্রস্তাবের পর জিন্নাহ শুধু নামকরণ বা বক্তৃতায় থাকেননি; তিনি প্রাদেশিক, জেলা ও প্রাথমিক লীগ সংগঠনগুলোকে জনসভা করতে বলেন, যাতে Muslim India-এর verdict (রায়) স্পষ্ট হয়। (Farooq Ahmad Dar, “Jinnah and the Lahore Resolution,” p. 147) অর্থাৎ তিনি দাবিকে সংগঠনে নামাতে চেয়েছেন। আবার Jalal দেখান, বাংলায় আবুল হাশিমরা লীগকে মানুষের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করতে চাইছিলেন। (Jalal, pp. 104–105)

    এখানে দ্বন্দ্ব নয়, স্তর আছে।

    জিন্নাহ ছিলেন constitutional bargaining (সাংবিধানিক দরকষাকষি)-এর মানুষ।
    সোহরাওয়ার্দী ছিলেন organiser-administrator (সংগঠক-প্রশাসক)।
    আবুল হাশিম ছিলেন organisational-intellectual force (সংগঠনী-বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি)।
    শেরে বাংলা ছিলেন জনভিত্তিক প্রাদেশিক শক্তির প্রতীক।

    এই চারজনকে একে অন্যের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো শিশুসুলভ। ইতিহাসের কাজ নায়ক বদলানো নয়; মাপ ঠিক রাখা।

    সমস্যা জিন্নাহকে ধন্যবাদ দেওয়া নয়। সমস্যা হলো, জিন্নাহকে ধন্যবাদ দিতে গিয়ে বাংলার মুসলিম নেতাদের ভুলে যাওয়া। আবার তার উল্টোটাও সমস্যা—বাংলার নেতাদের ফিরিয়ে আনতে গিয়ে জিন্নাহকে মুছে দেওয়া।

    পূর্ব পাকিস্তান আন্দোলন কথাটির সম্ভাবনা ও বিপদ

    “পূর্ব পাকিস্তান আন্দোলন” কথাটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পাকিস্তান আন্দোলনের ভিতরে পূর্ব বাংলার নিজস্ব কণ্ঠ ছিল। বাংলার মুসলমান শুধু উত্তর ভারতের অভিজাত মুসলিম রাজনীতির অনুসারী ছিল না। তার নিজের জমি, ভাষা, কৃষকসমাজ, হিন্দু জমিদারি ও ভদ্রলোক আধিপত্যের অভিজ্ঞতা, কলকাতাকেন্দ্রিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে ক্ষোভ, পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠতার বাস্তবতা—এসব ছিল। এই জায়গা পুনরুদ্ধার করা দরকার।

    কিন্তু “পূর্ব পাকিস্তান আন্দোলন” যদি পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার ভাষা হয়ে যায়, তাহলে তা বিপজ্জনক। কারণ পূর্ব বাংলার মুসলিম রাজনীতি নিজের স্থানীয় শক্তি নিয়ে দাঁড়ালেও সর্বভারতীয় মুসলিম রাজনৈতিক দরকষাকষির ভেতরেই অর্থ পেয়েছে। লাহোর প্রস্তাব, মুসলিম লীগের সর্বভারতীয় কাঠামো, সংখ্যালঘু প্রদেশের মুসলমানদের ত্যাগ, জিন্নাহর কেন্দ্রীয় দরকষাকষি—এসব বাদ দিলে পূর্ব পাকিস্তান আন্দোলন আঞ্চলিক আবেগে নেমে যায়।

    অখণ্ড বাংলার প্রশ্নেও একই কথা। ১৯৪৭-এ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, শরৎ বসু প্রমুখের মধ্যে অখণ্ড বাংলার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। Jalal দেখান, জিন্নাহর blessing (সমর্থন) নিয়ে সোহরাওয়ার্দী Bengal unity (বাংলার ঐক্য)-এর সুযোগ দেখেছিলেন, কিন্তু Bengal League নিজেই বিভক্ত ছিল এবং সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছিল। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, p. 266)

    এই দলিল প্রমাণ করে, জিন্নাহ অখণ্ড বাংলা প্রশ্নে একেবারে অনুপস্থিত ছিলেন না; আবার তিনি তার জন্মদাতাও নন। ধারণাটি বাংলার ভিতর থেকে এসেছে, কিন্তু সর্বভারতীয় মুসলিম রাজনীতির সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল। এই সূক্ষ্মতা না ধরলে কেউ জিন্নাহ-বন্দনায় পড়ে, কেউ জিন্নাহ-বিরোধী স্থানীয়তাবাদে পড়ে। দুটোই অসম্পূর্ণ।

    কুরবানি, বৈশাখ ও আজানের সমন্বয়

    জুলাই-পরবর্তী নতুন ভাষার একটি সুন্দর দিক আছে। সেখানে বলা হচ্ছে, এমন বাংলা চাই যেখানে কুরবানির ঈদ হবে, বৈশাখী আনন্দ হবে, ভাটিয়ালি গান বাজবে, মসজিদে আজান ধ্বনিত হবে, মন্দিরে ঘণ্টা বাজবে, গির্জায় প্রার্থনা হবে। এই ভাষা আকর্ষণীয়। কারণ বাংলাদেশের বাস্তবতাও বহুস্তরীয়। এখানে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ, কিন্তু হিন্দু আছে, বৌদ্ধ আছে, খ্রিস্টান আছে; আছে লোকসংস্কৃতি, ভাষা, নদী, গান, মেলা, ঈদ, মসজিদ, মন্দির—সব মিলিয়ে এক জটিল সমাজ।

    এই সমন্বয়ের ভাষা দরকার। কিন্তু এই ভাষার ভিতরে যদি মুসলিম রাজনৈতিক চেতনাকে নরম করে দেওয়া হয়, তাহলে তা আবার নতুন সমস্যা তৈরি করবে। কুরবানি থাকবে, কিন্তু ৪৭ থাকবে না—এ কেমন সমন্বয়? আজান থাকবে, কিন্তু মুসলিম জাতিসত্তার রাষ্ট্রিক ইতিহাস থাকবে না—এ কেমন বহুত্ব? মসজিদ থাকবে, কিন্তু জিন্নাহ-ইকবাল সন্দেহজনক থাকবে—এ কেমন আত্মপরিচয়?

    ব্যক্তিগত ধর্মের জায়গা দিয়ে রাজনৈতিক মুসলিম চেতনাকে মুছে দেওয়া পুরোনো সেক্যুলার কৌশল। নতুন প্রজন্ম যদি একই পথ নেয়, শুধু ভাষা বদলে, তাহলে ফল আলাদা হবে না।

    বাংলাদেশে বৈশাখ থাকবে। থাকা উচিত। ভাটিয়ালি থাকবে। থাকা উচিত। হিন্দুর নিরাপত্তা থাকবে। অবশ্যই থাকতে হবে। কিন্তু এসবের কোনোটি ৪৭-কে বাতিল করার হাতিয়ার হতে পারে না। বরং ৪৭-ই পূর্ব বাংলার মুসলমানকে এমন এক রাষ্ট্রিক ভূখণ্ড দিয়েছে যেখানে আজ সে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও অন্যদের নিরাপত্তার নৈতিক দায়িত্ব নিতে পারে। এই দায়িত্বের উৎস দুর্বলতা নয়, শক্তি।

    বাংলার হিন্দুদের পাশে দাঁড়ানো মুসলিম বাঙালির নৈতিক দায়িত্ব—এই কথা সত্য। কিন্তু সেই দায়িত্বের ভিত্তি নিজের মুসলিম রাজনৈতিক ইতিহাস অস্বীকার করে নয়। বরং নিজের ক্ষমতা, সংখ্যাগরিষ্ঠতা, ইসলামি ন্যায়বোধ এবং রাষ্ট্রিক আত্মমর্যাদার জায়গা থেকে। যে নিজের ইতিহাস নিয়ে লজ্জিত, সে অন্যকে ন্যায় দেবে কীভাবে?

    পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ ও সীমান্তের দুই পাশ

    আজ সীমান্তের দুই পাশে পরিচয়ের সংকট ঘন হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান নিজের জায়গা নিয়ে উদ্বিগ্ন। পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুও নতুন সংখ্যাগুরু জাতীয়তাবাদ, অনুপ্রবেশ-বয়ান, নাগরিকত্ব প্রশ্ন, সীমান্ত-আতঙ্ক, বাংলা বনাম হিন্দি-হিন্দুত্বের চাপ—এসবের মধ্যে নিজের পরিচয় নতুন করে ভাবছে। বাংলাদেশও নিজের ইতিহাস নিয়ে টানাটানিতে আছে। এই পরিস্থিতিতে ৪৭ আবার ফিরবেই।

    কারণ ৪৭ শুধু অতীত নয়; এটি সীমান্তের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা। কেন এপারে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ স্বাধীন রাষ্ট্র হলো, ওপারে মুসলমান সংখ্যালঘু হয়ে রইল? কেন এপারের মুসলমান গরু কুরবানি করতে পারে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার মধ্যে, আর ওপারে তা অনেক জায়গায় রাজনৈতিক উত্তেজনার বিষয়? কেন বাংলাদেশের মুসলমান ভারতীয় সংখ্যাগুরু রাজনীতির দিকে তাকিয়ে নিজের রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা আবার অনুভব করে? এই প্রশ্নগুলো শুধু আবেগ নয়। এগুলো রাষ্ট্রবিজ্ঞান। ৪৭ এরকম অনেক প্রশ্নের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে।

    যারা বলে ৪৭ ভুল, তারা কি পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানকে দেখছে? আসামের মুসলমানকে দেখছে? নাগরিকত্বের প্রশ্ন দেখছে? গরু-রাজনীতি দেখছে? হিন্দুত্ববাদী ইতিহাসচর্চার বিস্তার দেখছে? যদি দেখে, তবে ৪৭-কে এত সহজে লজ্জা বানায় কীভাবে?

    আবার যারা শুধু জিন্নাহর নাম নিয়ে উচ্ছ্বাস করে, তাদেরও প্রশ্ন আছে। তারা কি বাংলার মুসলিম নেতাদের জায়গা দিচ্ছে? শেরে বাংলা, সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, আকরম খাঁ, শহীদুল্লাহ—তাদের পুনরুদ্ধার করছে? নাকি ৪৭-কে এক ব্যক্তির প্রতীকে ছোট করে ফেলছে?

    দুই পাশেই ভুল আছে। এ কারণেই আসল কাজ কোনো এক পক্ষের স্লোগান দেওয়া নয়। কাজ হলো মাপ ঠিক করা।

    মুসলিম জাতীয়তাবাদের ভবিষ্যৎ

    মুসলিম জাতীয়তাবাদের ভবিষ্যৎ পাকিস্তান-বন্দনা নয়। আবার ভারতীয়-বাঙালি বয়ানে আত্মসমর্পণও নয়। ভবিষ্যৎ দাঁড়াবে তিনটি স্তম্ভে, নিজের মাটি, নিজের মুসলিম রাজনৈতিক ইতিহাস, এবং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রদৃষ্টি।

    নিজের মাটি মানে আমার এই জমিন, এই মাটি, এর ভাষা, এই বাংলার সমাজ, নদী, কৃষক, শহর, শ্রম, কুরবানি, ঈদ, ভাটিয়ালি, বৈশাখ, মসজিদ, মন্দির—সব। মুসলিম রাজনৈতিক ইতিহাস মানে এই জমিনের জন্য অন্তত ১৯০৬, লখনৌ, ইকবাল, লাহোর, জিন্নাহ, বাংলার মুসলিম লীগ, ১৯৪৬ নির্বাচন, ৪৭—সব ধারাবাহিকতা বোঝা। আরও বিস্তৃত পরিসরে বললে, ভাটি বাংলার মুসলিম থেকে বিশ্ব-মুসলিম ইতিহাসের সাথে নিজের সংযোগ গড়া এবং জেগে উঠা। যে জাগরণের ডাক ফররুখ ও ইকবাল মহাকাল থেকে এসে ডেকে যাচ্ছেন। ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রদৃষ্টি মানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান হিসেবে অন্য ধর্মের মানুষের নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা। এটাই পরিণত মুসলিম রাজনৈতিক চেতনা।

    এটি হিন্দু-বিদ্বেষ নয়। ভারত-বিদ্বেষও নয়। পাকিস্তান-নস্টালজিয়াও নয়। এটি নিজের ইতিহাসের মালিকানা। নিজের নিরাপত্তা বোঝা। নিজের দায় বোঝা। নিজের রাষ্ট্রকে ন্যায়ভিত্তিক করা।

    জুলাই-পরবর্তী নতুন প্রজন্ম যদি এই পথ নেয়, তবে তারা সত্যিই নতুন রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করতে পারবে। কিন্তু যদি তারা বাংলা ভাষার নামে সর্বভারতীয় মুসলিম ইতিহাস কেটে ফেলে, যদি স্থানীয় নেতাদের নামে জিন্নাহ-ইকবালকে মুছে দেয়, যদি বৈশাখ-ভাটিয়ালির ভাষায় মুসলিম রাষ্ট্রিক মর্যাদাকে নরম করে দেয়, তবে তারা পুরোনো শাহবাগী ফ্রেমের আরেক সংস্করণ হয়ে যাবে। শুধু শব্দ বদলাবে, কেন্দ্র বদলাবে না।

    বাংলার মুসলমান তুরান হবে না, ইরান হবে না, আরবও হবে না। সত্য। সে গুজরাটি হবে না, পাঠানও হবে না। সত্য। কিন্তু সে শুধু মাটির মানুষও নয়। সে একটি বৃহৎ মুসলিম রাজনৈতিক ইতিহাসের সন্তান। তার ভাষা বাংলা, কিন্তু তার ইতিহাসের মানচিত্র শুধু বাংলা নয়। সে পূর্ব বাংলার মানুষ, আবার উপমহাদেশের মুসলমানও। সে ৭১-এর সন্তান, আবার ৪৭-এরও উত্তরাধিকারী। এই পূর্ণতা না বুঝলে তার ভবিষ্যৎও অর্ধেক হবে।

    কেন ৪৭ আবার ফিরছে?

    ৪৭ ফিরছে কারণ ভারত বদলেছে।
    ৪৭ ফিরছে কারণ পশ্চিমবঙ্গ বদলাচ্ছে।
    ৪৭ ফিরছে কারণ বাংলাদেশে শাহবাগী বয়ান ৪৭-কে চাপা দিতে চেয়েছে।
    ৪৭ ফিরছে কারণ জুলাই-পরবর্তী নতুন প্রজন্ম নিজের ভাষা ও মাটির কথা বলতে গিয়ে আবার ৪৭-এর দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে।
    ৪৭ ফিরছে কারণ কুরবানি, নাগরিকত্ব, সীমান্ত, হিন্দুত্ব, মুসলিম নিরাপত্তা, বাংলা ভাষা, রাষ্ট্রিক মর্যাদা—সব প্রশ্ন নতুন করে জেগেছে।

    কিন্তু ৪৭ ফিরছে মানে পুরোনো পাকিস্তান ফিরে আসছে না। ইতিহাস ফিরে আসে প্রশ্ন হয়ে, রাষ্ট্র হয়ে নয়। ৪৭ আজ ফিরছে বাঙালি মুসলমানকে জিজ্ঞেস করতে—তুমি কি নিজের ইতিহাস পুরো পড়বে? তুমি কি ৭১ ধরে রাখবে, কিন্তু ৪৭ লুকাবে? তুমি কি বাংলা ভাষা ভালোবাসবে, কিন্তু মুসলিম জাতিসত্তাকে সন্দেহ করবে? তুমি কি শেরে বাংলা-সোহরাওয়ার্দী-হাশিমকে ফিরিয়ে আনবে, কিন্তু জিন্নাহকে মুছে দেবে? নাকি সবাইকে তাদের জায়গায় বসিয়ে পূর্ণ ইতিহাস পড়বে?

    এরকম অনেক প্রশ্নের উত্তরেই ভবিষ্যৎ।

    ৪৭-কে ফিরিয়ে আনা মানে কারও বন্দনা নয়। ৪৭-কে ফিরিয়ে আনা মানে বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ের হারানো অধ্যায়কে তার জায়গায় বসানো। জিন্নাহকে ধন্যবাদ দেওয়া যায়, কিন্তু জিন্নাহকে একক করা যাবে না। শেরে বাংলাকে ফিরিয়ে আনতে হবে, কিন্তু জিন্নাহকে মুছে নয়। সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমকে পড়তে হবে, কিন্তু সর্বভারতীয় মুসলিম রাজনীতির ধারাবাহিকতা কেটে নয়। বাংলা ভাষাকে ভালোবাসতে হবে, কিন্তু ভাষাকে মুসলিম ইতিহাসের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে নয়।

    এই বইয়ের মূল কথা এখানেই।

    বাঙালি মুসলমানের ইতিহাস একরৈখিক নয়। সে শুধু ভাষার জাতি নয়, শুধু ধর্মের সমাজও নয়। সে ভাষা, মিল্লাত, মাটি, রাষ্ট্র, কুরবানি, ভোট, কৃষকসমাজ, শহুরে মধ্যবিত্ত, উপমহাদেশীয় মুসলিম রাজনীতি, ৪৭, ৭১—সব মিলিয়ে গঠিত এক জটিল জাতিগত সত্তা।

    যে তাকে শুধু ৭১ দিয়ে পড়বে, সে অর্ধেক পড়বে।
    যে তাকে শুধু ৪৭ দিয়ে পড়বে, সেও অর্ধেক পড়বে।
    যে তাকে ভারতীয় বয়ানের চোখে পড়বে, সে তাকে সন্দেহ করবে।
    যে তাকে পাকিস্তানি নস্টালজিয়ার চোখে পড়বে, সে তাকে বন্দি করবে।

    তাকে তার নিজের চোখে পড়তে হবে।

    ৪৭ আবার ফিরে আসছে, কারণ বাঙালি মুসলমান এখনো নিজের পূর্ণ পরিচয়ের হিসাব শেষ করেনি।

    এই হিসাব শেষ করতে হলে তাকে নিজের মাটি ধরে রাখতে হবে, নিজের ভাষা ভালোবাসতে হবে, নিজের মুসলিম রাজনৈতিক ইতিহাস ফিরিয়ে আনতে হবে, আর নিজের রাষ্ট্রকে ন্যায়ভিত্তিক করতে হবে। অর্ধেক ইতিহাস দিয়ে কোনো জাতি পূর্ণ ভবিষ্যৎ বানাতে পারে না।

    House of Wisdom

    House of Wisdom

    House of Wisdom — Inspired by the legacy of Baghdad’s Bayt al-Hikmah, where ideas meet knowledge, culture, philosophy, and civilization through thoughtful exploration.

    Post a Comment