Table of Contents
![]() |
শাহবাগকে শুধু একটি আন্দোলন নয়, বরং ইতিহাস, পরিচয় ও রাজনৈতিক বৈধতার একটি বয়ান-ব্যবস্থা হিসেবে পাঠের চেষ্টা |
Previous Part.......
শাহবাগকে শুধু ঢাকার একটি মোড় হিসেবে পড়লে ভুল হবে। আবার ২০১৩ সালের একটি আন্দোলন হিসেবে ধরলেও তার পুরো বুদ্ধিবৃত্তিক অর্থ ধরা পড়ে না। এই বইয়ে শাহবাগ বলতে বোঝানো হচ্ছে বাংলাদেশের ভেতরে ভারতীয় বয়াননির্ভর এক সেক্যুলার-বাঙালি ইতিহাসচর্চার স্থানীয় মুখ। যে মুখ ৭১-কে মনে রাখতে বলে, কিন্তু ৪৭ নিয়ে অস্বস্তি তৈরি করে। যে মুখ মুক্তিযুদ্ধের ন্যায়ের ভাষা ব্যবহার করে, কিন্তু মুসলিম রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে সন্দেহের ঘরে রাখে। যে মুখ বাঙালি জাতীয়তাবাদকে একমাত্র গ্রহণযোগ্য পরিচয় বানায়, অথচ বাঙালি মুসলমানের মিল্লাত-চেতনা, ইসলামী ইতিহাসবোধ এবং ৪৭-এর রাষ্ট্রিক মর্যাদা-দাবিকে পেছনে ঠেলে দেয়।
শাহবাগ এই অর্থে শুধু রাজনীতি নয়। এটি একটি বয়ান-ব্যবস্থা। কে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ, কে প্রতিক্রিয়াশীল, কে মানবতাবাদী, কে সাম্প্রদায়িক, কে প্রগতিশীল, কে পাকিস্তানপন্থী—এসব শব্দের নৈতিক ক্ষমতা এই বয়ানের হাতে চলে যায়। এ কারণেই তাকে এখানে বুদ্ধিবৃত্তিক রাষ্ট্রধর্ম বলা হচ্ছে। রাষ্ট্রধর্মের মতোই এটি একটি নির্দিষ্ট বিশ্বাসকে উচ্চ মর্যাদা দেয়। তবে এখানে ধর্মের জায়গায় থাকে ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট পাঠ।
এই বুদ্ধিবৃত্তিক রাষ্ট্রধর্ম আইন করে না, কিন্তু বৈধতা দেয়। আদালত নয়, কিন্তু বিচার করে। সংবিধান নয়, কিন্তু নাগরিকতার নৈতিক পরীক্ষা নেয়। কেউ যদি বলে ৪৭ ছিল বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক মর্যাদার ইতিহাস, সঙ্গে সঙ্গে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়—তুমি কি মুক্তিযুদ্ধকে ছোট করছ? কেউ যদি বলে পাকিস্তান রাষ্ট্র অপরাধ করেছে, কিন্তু মুসলিম জাতিসত্তা অপরাধ নয়, তখন তাকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়। যেন ইতিহাসে দুই সত্য একসঙ্গে থাকতে পারে না।
এই জায়গায় শাহবাগের আসল চরিত্র প্রকাশিত হয়। সে মুক্তিযুদ্ধকে ভালোবাসার দাবি করে, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধকে একচেটিয়া ব্যাখ্যার সম্পত্তি বানাতে চায়। সে ইতিহাসকে সম্পূর্ণ করতে আসে না, বরং ইতিহাসের কেন্দ্র বদলে দিতে আসে।
শাহবাগের রাজনীতি তাই শুধু মিছিলের রাজনীতি নয়। এটি ভাষার রাজনীতি। ইতিহাসের রাজনীতি। গ্রহণযোগ্যতার রাজনীতি।
মুক্তিযুদ্ধের ন্যায় আর মুক্তিযুদ্ধের একচেটিয়া ব্যাখ্যা
মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসের কেন্দ্রীয় ঘটনা। পাকিস্তানি রাষ্ট্রের গণহত্যা, রাজনৈতিক অধিকারহরণ, সামরিক দমন, শরণার্থীস্রোত, গ্রাম পোড়ানো, ভাষা ও মর্যাদার ওপর আঘাত—এসবের বিরুদ্ধে ১৯৭১ ছিল ন্যায়ের যুদ্ধ। এই সত্যের সঙ্গে দরকষাকষির জায়গা নেই।
কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ন্যায় আর মুক্তিযুদ্ধের একচেটিয়া ব্যাখ্যা এক জিনিস নয়। শাহবাগী বয়ানের সমস্যা দ্বিতীয় জায়গায়। এখানে মুক্তিযুদ্ধ শুধু ইতিহাস নয়; একটি নৈতিক লাইসেন্স। যে নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা মানবে, সে গ্রহণযোগ্য। যে প্রশ্ন করবে, সে সন্দেহজনক। যে বলবে ৭১ পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, মুসলিম জাতিসত্তার বিরুদ্ধে আত্মহত্যা নয়—তার দিকে তাকানো হবে যেন সে মুক্তিযুদ্ধকে দুর্বল করছে।
এই একচেটিয়া ব্যাখ্যা ইতিহাসকে সংকুচিত করে। ৭১ থাকে, কিন্তু ৪৭ হারায়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অপরাধ থাকে, কিন্তু মুসলমান কেন পাকিস্তানের পথে গিয়েছিল সেই প্রশ্ন থাকে না। রাজাকার থাকে, কিন্তু ১৯০৫, ১৯০৬, ১৯১৬, ১৯৪০, ১৯৪৬-এর ধারাবাহিকতা থাকে না। ভাষা থাকে, কিন্তু মুসলিম রাজনৈতিক নিরাপত্তার ইতিহাস থাকে না। বাঙালি জাতীয়তাবাদ থাকে, কিন্তু বাঙালি মুসলমানের ইসলামী জাতিগত চেতনার দীর্ঘ পরম্পরা থাকে না।
Asif Iqbal শাহবাগ-হেফাজত উত্তেজনা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখান, শাহবাগকে অনেকে ১৯৭১-এর nationalist fervor (জাতীয়তাবাদী উত্তাপ)-এর পুনর্জাগরণ হিসেবে দেখেছিল। কিন্তু তিনি একই সঙ্গে লক্ষ্য করেন, আন্দোলনটি দ্রুত এমন জায়গায় পৌঁছে যায়, যেখানে সেটি সরকারপন্থী propaganda mouthpiece (প্রচারমুখ) হয়ে উঠেছে বলে সমালোচিত হয় এবং Bengali nationalism (বাঙালি জাতীয়তাবাদ)-কে religiocentric nationalism (ধর্মকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদ)-এর বিরুদ্ধে দাঁড় করায়। (Asif Iqbal, “Clashing Nationalisms and Corrupting Co-Existence,” pp. 79–80)
এই পর্যবেক্ষণ জরুরি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ন্যায্য দাবি হতে পারে। কিন্তু বিচার-দাবি যখন ইতিহাসের একমাত্র বৈধ ব্যাখ্যা দাবি করে, তখন তা ন্যায়ের ক্ষেত্র ছাড়িয়ে বয়ান-পাহারায় ঢুকে যায়। বিচার তখন বিচার থাকে না, হয়ে ওঠে জাতির নৈতিক শুদ্ধিকরণ। আর শুদ্ধিকরণের রাজনীতি সবসময় বিপজ্জনক। কারণ সেখানে ভিন্ন প্রশ্নের জায়গা থাকে না।
শাহবাগের “মুক্তিযুদ্ধ” তাই একটি বাছাই করা মুক্তিযুদ্ধ। সেখানে ৭১ আছে, কিন্তু ৪৭ নেই। সেখানে পাকিস্তানের অপরাধ আছে, কিন্তু ৪৭-এ মুসলমান কেন পাকিস্তান চেয়েছিল সেই প্রশ্ন নেই। সেখানে রাষ্ট্রীয় অন্যায়ের বিচার আছে, কিন্তু মুসলিম রাজনৈতিক মর্যাদা-দাবির ইতিহাস নেই। এভাবে মুক্তিযুদ্ধের ব্যাখ্যা যত একচেটিয়া হয়, ইতিহাস তত ছোট হয়।
বিচার-দাবি থেকে বয়ান-পাহারা
শাহবাগের শুরু ছিল নির্দিষ্ট দাবিতে। কাদের মোল্লার রায়ের পর মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে মানুষ জড়ো হলো। এই ক্ষোভের নৈতিক ভিত্তি ছিল। ১৯৭১-এর অপরাধের বিচার নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষত ছিল। কিন্তু আন্দোলনের শক্তি যত বাড়ল, তার ফ্রেমও বদলাতে শুরু করল।
Anupam Debashis Roy দেখান, শাহবাগ প্রথমে নির্দিষ্ট death sentence (মৃত্যুদণ্ড)-দাবি নিয়ে উঠলেও খুব দ্রুত তার framing (ফ্রেম) বদলে যায়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন, আপিল, মৃত্যুদণ্ডের দাবি, আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ প্রভাব, বিএনপি-জামায়াতের প্রতিক্রিয়া—এসবের ভিতর দিয়ে আন্দোলনটি issue-specific (নির্দিষ্ট দাবি)-এর বাইরে গিয়ে renewed secularist movement (নতুন সেক্যুলারিস্ট আন্দোলন)-এর প্রতিনিধিত্ব হিসেবে দেখা হতে থাকে। (Anupam Debashis Roy, “Shahbag Stolen?”, pp. 4S–5S)
এই পরিবর্তন খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে বিচার-দাবি থেকে জাতির নতুন নৈতিক মানদণ্ড তৈরি হতে থাকে। কে যুদ্ধাপরাধী, কে বিচার চায়—এই প্রশ্ন দ্রুত বদলে হয়ে যায়, কে মুক্তিযুদ্ধের সত্যিকারের পক্ষ? কে ধর্মান্ধ? কে আধুনিক? কে অন্ধকার? কে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ?
এইভাবে একটি আইনগত-নৈতিক দাবির ওপর দাঁড়িয়ে ইতিহাসের বৃহত্তর ফ্রেম বানানো হয়। সেখানেই সমস্যা। কারণ তখন ৭১-এর বিচার চাইলে ৪৭ নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না—এমন এক অদৃশ্য শর্ত তৈরি হয়। মুক্তিযুদ্ধের নামে মুসলিম রাজনৈতিক ইতিহাসের ওপর নীরব নিষেধাজ্ঞা বসে যায়।
Roy আরও দেখান, শাহবাগের ভেতরে framing limitation (ফ্রেমিং সীমাবদ্ধতা), internal division (অভ্যন্তরীণ বিভাজন), AL co-option (আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ প্রভাব), এবং হেফাজতের counter-mobilisation (পাল্টা-সংগঠন) আন্দোলনের গতিপথকে বদলে দেয়। (Anupam Debashis Roy, “Shahbag Stolen?”, pp. 5S–6S, 16S)
অর্থাৎ শাহবাগকে শুধু নির্মল নাগরিক উত্তাপ হিসেবে পড়া যায় না। এর ভিতরে ক্ষমতা ঢুকেছে, দলীয় রাজনীতি ঢুকেছে, সাংস্কৃতিক ফ্রেম ঢুকেছে, পাল্টা ধর্মীয় সংগঠনও জন্ম নিয়েছে। বিচার-দাবির নৈতিক উত্তাপ ধীরে ধীরে ইতিহাসের পাঠ বদলানোর প্রকল্পে পরিণত হয়েছে।
মিডিয়া, সাংস্কৃতিক মঞ্চ ও বয়ান-পাহারা
শাহবাগের শক্তি শুধু জনসমাবেশে ছিল না। তার শক্তি ছিল আবহ তৈরিতে। টেলিভিশন, পত্রিকা, সামাজিক মাধ্যম, পোস্টার, গান, মোমবাতি, স্লোগান, কবিতা, শহুরে তরুণ প্রজন্মের মুখ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা—সব মিলিয়ে একটি বিশেষ নৈতিক দৃশ্য নির্মাণ করা হয়েছিল। যেন জাতি আবার জন্ম নিচ্ছে। যেন ৭১ আবার ফিরে এসেছে। যেন যে এই আবহের ভেতরে নেই, সে জাতির বাইরে।
এই সাংস্কৃতিক মঞ্চই শাহবাগকে শক্তি দেয়। বিচার-দাবি রাজনৈতিক হতে পারে; কিন্তু গান, স্লোগান, ছবি, মোমবাতি, শহুরে নৈতিক উত্তাপ—এসব তাকে প্রায় ধর্মীয় আবহ দেয়। এখানে যুক্তি নয়, উপস্থিতি বড় হয়ে ওঠে। কে সেখানে ছিল, কে ছিল না—এটাই পরিচয়ের পরীক্ষা হয়ে যায়।
Asif Iqbal “তুই রাজাকার” গান ও শাহবাগ-সংলগ্ন সাংস্কৃতিক উপাদান নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দেখান, এগুলো অতীতকে cleanse (শুদ্ধ/পরিষ্কার) করার নৈতিক আবেগ তৈরি করে। তাঁর তুলনায় এটি ঔপনিবেশিক জাতীয়তাবাদের সেই ধরনের moral narrative (নৈতিক বয়ান)-এর সঙ্গে মিলে যায়, যেখানে জাতির ট্র্যাজেডি কাটাতে “অপর” নির্মাণ করা হয়। (Asif Iqbal, “Clashing Nationalisms and Corrupting Co-Existence,” pp. 81–82)
এখানে “রাজাকার” শুধু বিচারযোগ্য অপরাধীর নাম থাকে না; তা এক ধরনের চূড়ান্ত নৈতিক গালি হয়ে ওঠে। এরপর যে কোনো অস্বস্তিকর প্রশ্নকেও সেই শব্দের ছায়ায় ঠেলে দেওয়া যায়। ৪৭ নিয়ে প্রশ্ন? মুসলিম রাজনৈতিক ইতিহাসের কথা? ইকবাল-জিন্নাহর প্রসঙ্গ? পাকিস্তান রাষ্ট্র আর মুসলিম জাতিসত্তার পার্থক্য? সবকিছু সন্দেহের ঘরে চলে যায়।
মিডিয়া এই আবহকে ছড়িয়ে দেয়। সংবাদ তখন শুধু ঘটনা জানায় না; চরিত্র বানায়। একদিকে তরুণ প্রজন্ম, আলো, গান, মুক্তিযুদ্ধ। অন্যদিকে অন্ধকার, ধর্মান্ধতা, প্রতিক্রিয়া। বাস্তব সমাজের জটিলতা এই দুই রঙে ধরা যায় না। তবু এই দুই রঙই জনপ্রিয় বয়ান হয়ে ওঠে। এটা ইতিহাস নয়। এটা নাট্যরূপ দেওয়া ইতিহাস।
এনজিও, নাগরিক সমাজ ও নতুন এলিট
শাহবাগকে শুধু দলীয় রাজনীতি দিয়ে বোঝা যায় না। এর পেছনে আছে শহুরে নতুন এলিট শ্রেণি, NGO (এনজিও)-ভাষায় গড়া নাগরিক সমাজ, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন-শব্দভাণ্ডার, মানবাধিকার-নির্ভর নৈতিকতা, মিডিয়া-সমর্থিত গ্রহণযোগ্যতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের সেক্যুলার ভাষা এবং সাংস্কৃতিক মঞ্চের প্রভাব। এগুলো মিলেই একটি নতুন ইতিহাস-নিয়ন্ত্রণকারী শ্রেণি তৈরি করে।
এখানে সরল স্লোগান চলবে না। NGO মানেই খারাপ—এ কথা বলা শিশুসুলভ। বাংলাদেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য, নারী-উন্নয়ন, দুর্যোগ ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে NGO ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু NGO-ভাষা নিরীহ নয়। এই ভাষা সমাজকে নির্দিষ্টভাবে দেখে। উন্নয়ন, সচেতনতা, অধিকার, জেন্ডার, সুশাসন, সহনশীলতা, সেক্যুলার মূল্যবোধ। শব্দগুলো সবই প্রয়োজনীয় হতে পারে। কিন্তু এগুলো যখন স্থানীয় ধর্মীয়-ঐতিহাসিক চেতনার ওপর বিচারকের আসনে বসে, তখন সমস্যা।
Sarah C. White দেখিয়েছেন, বাংলাদেশে NGO ও civil society (নাগরিক সমাজ) নিয়ে প্রচলিত আলোচনায় একসময় state-vs-NGO opposition (রাষ্ট্র বনাম এনজিও বিরোধ)-এর বদলে complementarity and common interest (পরিপূরকতা ও সাধারণ স্বার্থ)-এর ভাষা আসে। NGO-দের comparative advantage (তুলনামূলক সুবিধা) অর্থনৈতিক সেবা থেকে civil society (নাগরিক সমাজ) ও popular participation (জনঅংশগ্রহণ)-এর রাজনৈতিক ভাষায় বিস্তৃত হয়। কিন্তু White সতর্ক করেন, এই নতুন agenda (এজেন্ডা) ১৯৬০-এর political modernization (রাজনৈতিক আধুনিকীকরণ)-এর পুরোনো উদ্বেগের প্রতিধ্বনি বহন করে এবং NGO-আলোচনার technocratic terms (প্রযুক্তিবাদী ভাষা) তার রাজনৈতিক অর্থ আড়াল করে। (Sarah C. White, “NGOs, Civil Society, and the State in Bangladesh,” p. 309)
এই বিশ্লেষণ শাহবাগের পটভূমি বুঝতে কাজে লাগে। কারণ শাহবাগ নিজেকে শুধু দলীয় মুখ হিসেবে হাজির করেনি। সে এসেছে “নাগরিক সমাজ”, “তরুণ প্রজন্ম”, “মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ”, “অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ”, “মানবতা”—এসব শব্দের ভিতর দিয়ে। এই শব্দগুলোকে প্রশ্ন করলেই যেন প্রশ্নকারী মানবতাবিরোধী হয়ে পড়ে। এখানেই ভাষার ক্ষমতা।
David Lewis বাংলাদেশের civil society (নাগরিক সমাজ)-এর ইতিহাসে ভাষা আন্দোলন, জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী, trade unions (ট্রেড ইউনিয়ন), cultural organisations (সাংস্কৃতিক সংগঠন)-কে development NGOs (উন্নয়ন-এনজিও)-এর বাইরে বৃহত্তর পরিসরে রেখেছেন। একই সঙ্গে তিনি দেখান, এদের অনেক অংশ পরে narrow organised political interests (সংকীর্ণ সংগঠিত রাজনৈতিক স্বার্থ)-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। (David Lewis, Bangladesh: Politics, Economy and Civil Society, p. 25)
এই কথাটি খুব দরকারি। নাগরিক সমাজ সবসময় নিরপেক্ষ নয়। সাংস্কৃতিক সংগঠন সবসময় জনগণের সরল কণ্ঠ নয়। মিডিয়ায় জায়গা পাওয়া মানেই জাতির সত্য নয়। অনেক সময় এগুলো রাষ্ট্রক্ষমতা, দলীয় স্বার্থ, বিদেশি উন্নয়ন-ভাষা, শহুরে নৈতিকতা এবং সাংস্কৃতিক আধিপত্যের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। শাহবাগ সেই জটিল মিশ্রণের একটি বড় উদাহরণ।
এই নতুন এলিটের হাতে বন্দুক নেই, কিন্তু ভাষা আছে। পুলিশ নেই, কিন্তু সামাজিক বিচার আছে। আদালত নেই, কিন্তু গ্রহণযোগ্যতার সার্টিফিকেট আছে। তারা ঠিক করে কোন মুসলমান “সহনীয়”, কোন মুসলমান “সমস্যা”; কোন ইতিহাস “প্রগতিশীল”, কোন ইতিহাস “সাম্প্রদায়িক”; কোন পরিচয় “বাংলাদেশি”, কোন পরিচয় “পাকিস্তানি ছায়া”। এই ক্ষমতা নরম, কিন্তু গভীর।
কোন ইসলাম গ্রহণযোগ্য?
শাহবাগকে সরলভাবে “ধর্মবিরোধী” বললে ভুল হবে। বিষয়টি তার চেয়ে জটিল। শাহবাগের সবাই নাস্তিক ছিল না। শাহবাগ ধর্মীয় আবেগের ব্যবহারও করেছে। Asif Iqbal দেখান, murdered blogger Rajib-এর namaz-e-janaza (জানাজা) সমর্থনের মাধ্যমে Shahbag নিজেই religious sentiment (ধর্মীয় আবেগ) ব্যবহার করেছিল; পরে বিরোধী পক্ষ এটাকে ধর্মীয়ভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। (Asif Iqbal, “Clashing Nationalisms and Corrupting Co-Existence,” p. 80)
এতে বোঝা যায়, সংঘাত শুধু ধর্ম বনাম অধর্ম নয়। সংঘাত হলো কোন ইসলাম গ্রহণযোগ্য, আর কোন ইসলাম অস্বস্তিকর। ব্যক্তিগত ইসলাম চলবে। জানাজা চলবে। ঈদ চলবে। শহীদের জন্য দোয়া চলবে। কিন্তু ইসলাম যদি রাজনৈতিক ইতিহাস, রাষ্ট্রিক মর্যাদা, মুসলিম জাতিসত্তা, ৪৭, ইকবাল, জিন্নাহ, লাহোর প্রস্তাব, মুসলিম লীগের দাবির সঙ্গে যুক্ত হয়—তখনই সমস্যা।
শাহবাগী ফ্রেম মুসলমানের ধর্মীয় আবেগকে private morality (ব্যক্তিগত নৈতিকতা) হিসেবে সহ্য করতে পারে। কিন্তু ইসলামী রাজনৈতিক চেতনা তাকে ভয় দেখায়। কারণ এই চেতনা বলবে, বাংলাদেশ শুধু ৭১-এর সেক্যুলার বাঙালি প্রকল্প নয়; এর গভীরে ৪৭-এর মুসলিম রাজনৈতিক মর্যাদার দাবিও আছে। পাকিস্তান রাষ্ট্র ভেঙেছে, কিন্তু মুসলিম জাতিসত্তা ভাঙেনি। বাংলা ভাষা আমাদের, কিন্তু মিল্লাত-চেতনা অচেনা নয়।
এই দাবি উঠলেই শাহবাগী বয়ানের ভেতরের উদ্বেগ প্রকাশ পায়।
তখন Islamism (ইসলামবাদ), extremism (চরমপন্থা), communalism (সাম্প্রদায়িকতা), anti-liberation (মুক্তিযুদ্ধবিরোধিতা)—এসব শব্দ একসঙ্গে ছুড়ে দেওয়া হয়। সব ইসলামী রাজনৈতিক প্রশ্নকে একই ঘরে রাখা হয়। কেউ ৪৭-এর মর্যাদা-দাবি নিয়ে কথা বললে, কেউ ভারতীয় বয়ানের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুললে, কেউ মুসলিম জাতিসত্তার ধারাবাহিকতার কথা বললে—তাকে একই সন্দেহের জালে ফেলা হয়। এটা শাহবাগীদের জ্ঞান-গবেষণা নয়। এটা বয়ান পাহারা।
ইতিহাসের বাছাই করা (সিলেক্টিভ) পাঠ
শাহবাগী ইতিহাসচর্চার মূল পদ্ধতি হলো selective reading (বাছাই করা পাঠ)। তারা সব ইতিহাস অস্বীকার করে না। বরং কিছু ইতিহাস এত জোরে বলে যে অন্য ইতিহাস আর শোনা যায় না।
কিন্তু তারা ১৯০৫ বলে না, বা বললেও অস্বস্তিতে বলে। ১৯০৬ বলে না। মুসলিম লীগের জন্ম বলে না। পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী বলে না। লখনৌ চুক্তি বলে না। ইকবাল বলে না। লাহোর প্রস্তাবের জটিল ভাষা বলে না। ১৯৪৬ নির্বাচনে বাংলার মুসলমানের রাজনৈতিক ম্যান্ডেট বলে না। সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশিমের সংগঠনী শ্রম বলে না। সংখ্যালঘু প্রদেশের মুসলমানের আত্মত্যাগ বলে না।
এই বাছাইয়ের ফলে ইতিহাসের মেরুদণ্ড বদলে যায়।
Farooq Ahmad Dar দেখান, মুসলমানদের রাজনৈতিক নিরাপত্তা-প্রশ্ন পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী থেকে ধীরে ধীরে জাতিসত্তার বৃহত্তর দাবিতে যায়। (Farooq Ahmad Dar, “Jinnah and the Lahore Resolution,” p. 127) Ayesha Jalal দেখান, জিন্নাহ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলকে ব্যবহার করে সর্বভারতীয় মুসলমানদের দরকষাকষির শক্তি গড়তে চাইছিলেন। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, pp. xv–xvi) Neeti Nair দেখান, late 1930s-এ কংগ্রেসের পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী-বিরোধী অবস্থান মুসলমানদের কাছে বিশ্বাসভঙ্গ মনে হয় এবং Hindu Raj (হিন্দু রাজ)-এর ভয় বাড়ায়। (Neeti Nair, Changing Homelands, pp. 159–161)
এই দলিলগুলো ছাড়া ৪৭ বোঝা যায় না। কিন্তু শাহবাগী ফ্রেম এগুলোকে কেন্দ্রে আনে না। কারণ এগুলো কেন্দ্রে এলে ৪৭ আর সাম্প্রদায়িক ভুল থাকে না; তা হয়ে ওঠে মুসলিম রাজনৈতিক নিরাপত্তা, মর্যাদা ও প্রতিনিধিত্বের ইতিহাস।
এই ইতিহাসকে বাদ দিলে মুক্তিযুদ্ধের ব্যাখ্যাও অসম্পূর্ণ হয়। কারণ ৭১ যে মানুষের বিদ্রোহ, সেই মানুষের ৪৭-ও আছে। সে শুধু বাংলা ভাষার মানুষ নয়, মুসলিম রাজনৈতিক ইতিহাসেরও উত্তরাধিকারী।
শাহবাগী বয়ানের দরকার ৪৭-কে সহজ রাখা। সহজ মানে, ভুল, সাম্প্রদায়িক, পাকিস্তানি, লজ্জাজনক। কিন্তু ইতিহাস তো এত্তো সহজ নয়।
গ্রহণযোগ্য ইতিহাস তৈরির প্রক্রিয়া
গ্রহণযোগ্য ইতিহাস হঠাৎ তৈরি হয় না। ধীরে ধীরে তৈরি হয়।
প্রথমে কিছু শব্দ পবিত্র করা হয়। মুক্তিযুদ্ধ, প্রগতি, অসাম্প্রদায়িকতা, বাঙালিত্ব, মানবতা, গণজাগরণ। এই শব্দগুলো নিজে খারাপ নয়। বরং প্রয়োজনীয়। কিন্তু এগুলোর মালিকানা যখন একটি গোষ্ঠী নিয়ে নেয়, তখন শব্দগুলো আর মুক্ত থাকে না। অস্ত্র হয়ে যায়।
তারপর কিছু শব্দ সন্দেহজনক করা হয়। মুসলিম জাতিসত্তা, মিল্লাত, ৪৭, জিন্নাহ, ইকবাল, মুসলিম লীগ, ইসলামী রাজনীতি, পাকিস্তান আন্দোলন। এগুলো উচ্চারণ করলেই ব্যাখ্যা দিতে হয়। যেন শব্দগুলো আদালতে দাঁড়ানো আসামি।
এরপর মিডিয়া সেই বিভাজনকে ছড়িয়ে দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ভাষা দেয়। NGO ও এজেন্সি-ধর্মী নাগরিক সমাজ তাকে নৈতিকতা দেয়। সাংস্কৃতিক মঞ্চ তাকে আবেগ দেয়। রাষ্ট্র কখনো তাকে আইনি শক্তি দেয়। এভাবেই একটি বয়ান ধীরে ধীরে “স্বাভাবিক” হয়ে ওঠে।
এই স্বাভাবিকতাই ভয়ংকর। কারণ মানুষ তখন ভাবে, সে নিজে চিন্তা করছে। আসলে তাকে চিন্তার ভাষা দেওয়া হয়েছে।
Shahbag এই প্রক্রিয়ার একটি বড় উদাহরণ। Roy দেখান, আন্দোলনটি প্রথমে death sentence (মৃত্যুদণ্ড)-এর নির্দিষ্ট দাবিতে থাকলেও দ্রুত সেক্যুলারিস্ট রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব হিসেবে দেখা যেতে থাকে। পরে AL co-option, framing limitation, internal division, Hefazat counter-mobilisation—সব মিলিয়ে এর প্রাথমিক শক্তি ক্ষয় হয়। (Anupam Debashis Roy, “Shahbag Stolen?”, pp. 4S–6S, 16S)
এই ক্ষয়ও অর্থবহ। যে বয়ান সমাজের বাস্তব জটিলতা ধারণ করতে পারে না, তা নৈতিক উত্তাপে শুরু করে, রাজনৈতিক দখলে যায়, তারপর সমাজকে আরও দুই ভাগে ভাগ করে যায়। শাহবাগ সেই কাজ করেছে। যুদ্ধাপরাধ বিচারের দাবিকে সে জাতির পূর্ণ ইতিহাসের বদলে একটি একক সাংস্কৃতিক বয়ানের মালিকানায় নিতে চেয়েছিল।
ধর্ম, জাতিসত্তা ও সাংস্কৃতিক প্রভাব
বাংলাদেশের মুসলমানকে বুঝতে হলে তিনটি স্তর একসঙ্গে ধরতে হয়, ধর্ম, ভাষা, রাষ্ট্র। এর সঙ্গে আছে জমি, শ্রেণি, অর্থনীতি, শিক্ষা, কৃষকসমাজ, ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতা। এই বহুতল মানুষকে এক লাইনে নামানো যায় না।
শাহবাগী বয়ান তাকে এক লাইনে নামায়। তুমি বাঙালি, তাই তোমার মুক্তি ভাষা-সংস্কৃতিতে। ইসলাম থাকুক ব্যক্তিগত বিশ্বাসে, কিন্তু ইতিহাসের কেন্দ্রে আসবে না। মুসলিম রাজনৈতিক চেতনা থাকলে সেটা পাকিস্তানপন্থা। ৪৭ বললে সন্দেহ। জিন্নাহ বললে লজ্জা। ইকবাল বললে অস্বস্তি।
এই ছাঁকনি দিয়ে মানুষকে পড়লে বাংলাদেশের জনমন বোঝা যায় না। বাংলাদেশের মানুষ ভাষায় বাঙালি, কিন্তু ধর্মে গভীরভাবে মুসলমান। রাষ্ট্রে বাংলাদেশি, কিন্তু ইতিহাসে পূর্ববঙ্গীয় মুসলিম অভিজ্ঞতার উত্তরাধিকারী। সে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অপরাধ জানে, কিন্তু ভারতীয় সাংস্কৃতিক অভিভাবকত্বও মানে না। সে মুক্তিযুদ্ধের গৌরব রাখে, কিন্তু তার ঘরে ঈদও থাকে, কবরও থাকে, দোয়া থাকে, মাদরাসা থাকে, ওয়াজ থাকে, আলেম থাকে, পীরের দরবার থাকে, মসজিদ থাকে।
এই বাস্তবতাকে না বুঝে যে বয়ান তৈরি হয়, তা শহুরে এলিটের কাগজে সুন্দর দেখায়। জনমনে পুরোপুরি বসে না।
Asif Iqbal Shahbag/Hefazat সংঘাতকে শুধু ধর্ম বনাম সেক্যুলারিজম হিসেবে না দেখে competing nationalisms (প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয়তাবাদ)-এর সংঘাত হিসেবে দেখেছেন। তাঁর লেখায় দেখা যায়, Shahbag Bengali nationalism (বাঙালি জাতীয়তাবাদ) রক্ষা করছে, আর তার বিরোধী শিবির religion as yardstick for national identity (জাতীয় পরিচয়ের মানদণ্ড হিসেবে ধর্ম)-এর জায়গা থেকে প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে। (Asif Iqbal, “Clashing Nationalisms and Corrupting Co-Existence,” pp. 80–82)
এই পাঠের সঙ্গে পুরোপুরি একমত হওয়া জরুরি নয়। কিন্তু এতে একটি সত্য ধরা পড়ে, বাংলাদেশে সংঘাত কেবল দলীয় নয়। এটি পরিচয়ের সংঘাত। জাতির আত্মবোধ নিয়ে টানাটানি।
মুসলিম রাজনৈতিক চেতনাকে পেছনে ঠেলে দেওয়ার প্রবণতা
শাহবাগী প্রকল্পের শেষ লক্ষ্য হলো মুসলিম রাজনৈতিক চেতনাকে পেছনে ঠেলে দেওয়া। তাকে সরাসরি নিষিদ্ধ না করে, তাকে অগ্রহণযোগ্য করে তোলা। তাকে এমনভাবে হাজির করা, যেন তা মানেই পাকিস্তানপন্থা, যুদ্ধাপরাধী রাজনীতি, সাম্প্রদায়িকতা, নারী-বিরোধিতা, সংখ্যালঘু-বিদ্বেষ, প্রগতিবিরোধিতা। এভাবে এক বিশাল ঐতিহাসিক ধারাকে কয়েকটি ভয়ের শব্দে আটকে দেওয়া হয়।
কিন্তু মুসলিম রাজনৈতিক চেতনা মানেই কোনো দলের পক্ষে থাকা নয়। এটি একটি ইতিহাসবোধ। ব্রিটিশ ভারতের মুসলমান কেন আলাদা প্রতিনিধিত্ব চেয়েছিল, কেন কংগ্রেসের একক জাতীয় দাবিতে শঙ্কিত হয়েছিল, কেন লাহোর প্রস্তাব উঠেছিল, কেন বাংলার মুসলমান ১৯৪৬-এ মুসলিম লীগকে ম্যান্ডেট দিয়েছিল, কেন পাকিস্তান রাষ্ট্রের ব্যর্থতার পরও বাংলাদেশ মুসলিম জনমনের দেশ রয়ে গেল—এসব প্রশ্নের ভিতরে এই চেতনা কাজ করে।
একে পেছনে ঠেলে দিলে বাঙালি মুসলমান নিজের অতীত হারায়। শুধু ৭১ রেখে ৪৭ বাদ দিলে তার ইতিহাস একচোখা হয়। শুধু ভাষা রেখে মিল্লাত বাদ দিলে তার আত্মপরিচয় অর্ধেক হয়। শুধু মুক্তিযুদ্ধ রেখে মুসলিম রাজনৈতিক মর্যাদার ইতিহাস বাদ দিলে তার রাষ্ট্রবোধ দুর্বল হয়।
শাহবাগী বয়ান এই অর্ধেক মানুষ চায়। কিন্তু বাংলাদেশ অর্ধেক মানুষের দেশ নয়।
ভারতীয় বয়ানের স্থানীয় মুখ
শাহবাগকে ভারতীয় বয়ানের স্থানীয় মুখ বলা মানে এই নয় যে, সবাই বাইরে থেকে নির্দেশ পেয়ে চলে। বয়ান এভাবে কাজ করে না। অনেক সময় মানুষ নিজেই এমন ভাষায় চিন্তা করে, যার উৎস সে দেখে না। এমনভাবে তা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেওয়া হয়, তার অজান্তেই সে ওরকম ভাবতে থাকে। কথা বলতে থাকে। কলকাতাকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক বাঙালিত্ব, ভারতীয় রাষ্ট্রীয় ইতিহাসচর্চা, পাকিস্তান-বিরোধিতার একরৈখিক পাঠ, ইসলামী রাজনৈতিক চেতনার প্রতি সন্দেহ, মুক্তিযুদ্ধের একচেটিয়া নৈতিক ভাষা—এসব মিলে বাংলাদেশে একটি স্থানীয় মুখ তৈরি করে। এই মুখই শাহবাগ।
এই মুখ বাংলাদেশের ভেতরেই জন্মেছে। ভাষা বাংলা, মানুষ বাংলাদেশি, আবেগ মুক্তিযুদ্ধমুখী। কিন্তু তার ইতিহাসপাঠ ভারতীয় বয়ানের সঙ্গে মিলে যায়। ভারত ৪৭-কে মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার ফল হিসেবে পড়তে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। শাহবাগী ফ্রেমও তাই করে। ভারতীয় বাঙালি সাংস্কৃতিক ফ্রেম মুসলমানি রাজনৈতিক সত্তাকে সন্দেহ করে। শাহবাগী ফ্রেমও সেই সন্দেহ স্থানীয় ভাষায় চালায়।
বিরোধিতা ভারতের মানুষ বা ভারতীয় সংস্কৃতির বিরুদ্ধে নয়। বিরোধিতা হলো ইতিহাসের মালিকানা নিয়ে। বাংলাদেশ নিজের ইতিহাস নিজে পড়বে, না অন্যের ফ্রেম ধার করবে? ৭১ কি বাংলাদেশকে নিজের ৪৭ ভুলিয়ে দেবে, না ৪৭ ও ৭১ একসঙ্গে বুঝতে শেখাবে? মুসলমানি ইতিহাসবোধ কি লজ্জা, না রাষ্ট্রিক আত্মপরিচয়ের প্রয়োজনীয় স্তর?
শাহবাগ এই প্রশ্নগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে অস্বস্তি বোধ করে। কারণ পূর্ণ ইতিহাস তার জন্য সুবিধাজনক নয়। পূর্ণ ইতিহাসে ৭১ আছে, আবার ৪৭ আছে। মুক্তিযুদ্ধ আছে, আবার মুসলিম জাতিসত্তাও আছে। ভাষা আছে, আবার মিল্লাতও আছে। পাকিস্তানের অপরাধ আছে, আবার মুসলিম রাজনৈতিক মর্যাদার দাবিও আছে। এই পূর্ণ মানুষকে ছোট না করলে ভারতীয় বয়ান কাজ করতে পারে না।
শাহবাগ আমাদের সামনে একটি বড় শিক্ষা রেখে গেছে। শুধু ন্যায় দাবির ভাষা যথেষ্ট নয়; সেই ভাষা কার হাতে যাচ্ছে, কোন ইতিহাসকে সামনে আনছে, কোন ইতিহাসকে পেছনে ঠেলছে, কোন জাতিসত্তাকে বৈধ করছে, কোন জাতিসত্তাকে সন্দেহজনক করছে—এসবও দেখতে হবে।
যুদ্ধাপরাধের বিচার দরকার ছিল। কিন্তু বিচারকে যদি ৪৭ মুছার ছুরি বানানো হয়, তা ইতিহাসের ন্যায় নয়। মুক্তিযুদ্ধের গৌরব দরকার। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের নামে যদি মুসলিম রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে লজ্জা বানানো হয়, তা আত্মপরিচয়ের ওপর আঘাত। বাঙালি জাতীয়তাবাদ দরকার। কিন্তু বাঙালি জাতীয়তাবাদ যদি ভারতীয় বয়ানের স্থানীয় সংস্করণ হয়ে মুসলিম জাতিসত্তাকে পেছনে ঠেলে দেয়, তা বাংলাদেশের পূর্ণ ইতিহাস নয়। শাহবাগ তাই কেবল একটি ঘটনা নয়। এটি একটি পরীক্ষা।
বাংলাদেশ কি নিজের ইতিহাসকে পূর্ণভাবে পড়বে, নাকি প্রচলিত ও গ্রহণযোগ্যতা উৎপাদিত বয়ানের ভয়ে নিজের অর্ধেক ইতিহাস লুকাবে?
এই প্রশ্ন এখনো শেষ হয়নি।

Post a Comment