Loading...

৭১ বনাম ৪৭: রাষ্ট্র ভাঙলো, জাতিসত্তা না

৭১ বনাম ৪৭: রাষ্ট্র ভাঙলো, জাতিসত্তা না
Advertisement
Advertisement — Place AdSense Code Here
Table of Contents
    ৭১ বনাম ৪৭: সংঘাত নাকি ধারাবাহিকতা—পাকিস্তান রাষ্ট্র, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, মুসলিম জাতিসত্তা এবং বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক ইতিহাসকে কেন্দ্র করে একটি ঐতিহাসিক ইনফোগ্রাফিক।

    রাষ্ট্র ভাঙলো, জাতিসত্তা ভাঙলো না—১৯৪৭ থেকে ১৯৭১, বিচ্ছেদ নাকি একই মর্যাদা-সংগ্রামের দুই অধ্যায়?

    Previous Part.......

    ১৯৭১ পাকিস্তান রাষ্ট্রকে ভেঙেছে। এই সত্য অস্বীকার করলে বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে অন্যায় হয়। কিন্তু ১৯৭১ কি বাঙালি মুসলমানের মুসলিম জাতিসত্তাও ভেঙেছে? এখানে এসে ইতিহাসের আসল প্রশ্ন শুরু হয়।

    শাহবাগী বয়ান এই জায়গায় একটি চালাকি করে। পাকিস্তান রাষ্ট্রের অপরাধকে সে মুসলিম রাজনৈতিক ইতিহাসের ওপর চাপিয়ে দেয়। যেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ মানে ৪৭-এর মুসলিম রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। যেন পূর্ব বাংলার মানুষ ১৯৭১-এ শুধু একটি রাষ্ট্র ভাঙেনি, নিজের ৪৭-ও ভেঙে ফেলেছে। যেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ মানে জিন্নাহ, ইকবাল, মুসলিম লীগ, মুসলিম জাতিসত্তা, সর্বভারতীয় মুসলিম রাজনৈতিক সংগ্রাম—সবকিছুর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রায়। এই পাঠ সুবিধাজনক, কিন্তু সত্য নয়।

    ৭১ ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার বিদ্রোহ। সেই রাষ্ট্র ভাষাকে অপমান করেছে, অর্থনীতি শোষণ করেছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব বাংলাকে ক্ষমতার কেন্দ্রে জায়গা দেয়নি, সামরিক-আমলাতান্ত্রিক কাঠামো দিয়ে একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ভূখণ্ডকে উপনিবেশের মতো ব্যবহার করেছে। এই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ন্যায্য ছিল। কিন্তু রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ মানে নিজের গভীর পরিচয়ের বিরুদ্ধে আত্মহত্যা নয়।

    রাষ্ট্র বদলায়। শাসক বদলায়। মানচিত্র বদলায়। মানুষের গভীর জাতিগত ও সভ্যতাগত পরিচয় এত সহজে বদলায় না।

    বাঙালি মুসলমান ১৯৭১-এ পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামো প্রত্যাখ্যান করেছে। ইসলাম প্রত্যাখ্যান করেনি। সে উর্দুকেন্দ্রিক রাষ্ট্রভাষা-নীতি প্রত্যাখ্যান করেছে। মুসলিম রাজনৈতিক ইতিহাস প্রত্যাখ্যান করেনি। সে পাঞ্জাবি সামরিক-আমলাতান্ত্রিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়েছে। নিজের মিল্লাত-চেতনার বিরুদ্ধে নয়। সে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। ৪৭-এর মর্যাদা-আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে নয়।

    এই পার্থক্য না ধরলে ৭১-কে বোঝা যায় না। বরং ৭১-কে ব্যবহার করে ৪৭ মুছে ফেলার পথ খুলে যায়।

    পাকিস্তান রাষ্ট্র আর মুসলিম জাতিসত্তা এক জিনিস নয়

    পাকিস্তান একটি রাষ্ট্র। মুসলিম জাতিসত্তা একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক সত্তা। এই দুটিকে এক করে ফেললেই ভুল শুরু হয়।

    পাকিস্তান রাষ্ট্র জন্মের পর থেকেই বহু সংকটে ভরা ছিল। পূর্ব-পশ্চিমের ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, ভাষার দ্বন্দ্ব, অর্থনৈতিক বৈষম্য, কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রযন্ত্রের পশ্চিম পাকিস্তানি দখল, সামরিক-আমলাতান্ত্রিক আধিপত্য, পূর্ব বাংলার জনসংখ্যাগত সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে ক্ষমতায় রূপ নিতে না দেওয়া—এসব ছিল পাকিস্তানের রাষ্ট্রিক ব্যর্থতার ভিত। কিন্তু মুসলিম জাতিসত্তার প্রশ্ন পাকিস্তানের চেয়ে পুরোনো, বিস্তৃত ও গভীর।

    ব্রিটিশ ভারতের মুসলমানরা একদিন হঠাৎ রাষ্ট্র দাবি করেনি। প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন, ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে স্থায়ী সংখ্যালঘু হয়ে যাওয়ার ভয়, কংগ্রেসের একক জাতীয় দাবির বিরুদ্ধে আপত্তি, পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী, প্রাদেশিক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও সর্বভারতীয় মুসলিম সংখ্যালঘু নিরাপত্তা—এসব ধীরে ধীরে মুসলিম রাজনৈতিক কল্পনাকে তৈরি করেছে। Dar দেখান, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের নতুন কাঠামো এলে মুসলমানরা বুঝতে থাকে, সংখ্যার রাজনীতিতে তারা স্থায়ী সংখ্যালঘুতে পরিণত হতে পারে। প্রথমে তাদের দাবি ছিল separate electorates (পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী), পরে সেই নিরাপত্তা-প্রশ্ন আরও বড় রাজনৈতিক ভাষা নেয়। (Farooq Ahmad Dar, “Jinnah and the Lahore Resolution,” p. 127)

    Ayesha Jalal এই জটিলতাকে আরও গভীরে ধরেন। তাঁর মতে, জিন্নাহ কেবল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের নেতা হতে চাননি; তিনি নিজেকে সমগ্র ভারতীয় মুসলমানের spokesman (মুখপাত্র) হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছিলেন। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোর শক্তি ব্যবহার করে সর্বভারতীয় কেন্দ্রে মুসলিম স্বার্থের ন্যায্য অংশ নিশ্চিত করার চেষ্টা ছিল তাঁর রাজনীতির কেন্দ্রে। (The Sole Spokesman, pp. xv–xvi)

    অতএব ৪৭-এর মুসলিম রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা শুধু একটি রাষ্ট্র বানানোর আবেগ ছিল না। এটি ছিল রাষ্ট্রে মুসলমানের মর্যাদা, প্রতিনিধিত্ব, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ ক্ষমতার হিসাব। পাকিস্তান রাষ্ট্র সেই দাবিকে ধারণ করার একটি রূপ ছিল। কিন্তু সেই রূপ ব্যর্থ হলে দাবির ইতিহাস মিথ্যা হয়ে যায় না।

    একজন মানুষ আশ্রয়ের জন্য ঘর বানাল। ঘরটি ভেঙে পড়ল। তাই বলে আশ্রয়-চাওয়ার অধিকার মিথ্যা হয়ে যায় না।

    পাকিস্তান রাষ্ট্র ভেঙেছে, কারণ সে পূর্ব বাংলার মর্যাদা রাখতে পারেনি। কিন্তু পূর্ব বাংলার মুসলমান ৪৭-এ যে মর্যাদা চেয়েছিল, তা মিথ্যা ছিল না। সেই আকাঙ্খাকে পাশ কেটে যাওয়া কিংবা পাত্তা না দেওয়া, এখানের মানুষের পবিত্র অনুভূতির সাথে ছেলেখেলা তুল্য। সুস্পষ্ট জুলুম ইতিহাসের আয়নায়।

    পাকিস্তানের ভিতরেই বাংলাদেশের বীজ

    বাংলাদেশ শূন্যে জন্মায়নি। ১৯৭১ কোনো বিচ্ছিন্ন বিস্ফোরণ নয়। পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভিতরেই তার কারণ জমেছে। ৪৭ যে রাষ্ট্র তৈরি করল, সেই রাষ্ট্রের ভেতরেই পূর্ব বাংলার ভাষা, অর্থনীতি, ভোট, প্রতিনিধিত্ব, প্রশাসন ও সামরিক নিরাপত্তার প্রশ্ন ধীরে ধীরে এমন সংঘাতে পরিণত হলো, যার শেষ রূপ ৭১।

    এই ধারাবাহিকতা না দেখলে ৭১ কেবল আবেগ হয়ে যায়। আর ৪৭ কেবল ভুল হয়ে যায়। দুটোই ক্ষতিকর।

    পাকিস্তানের ভিতরের সংকট শুধু ভাষা দিয়ে শুরু ও শেষ হয়নি। ভাষা ছিল দৃশ্যমান প্রথম আঘাতগুলোর একটি, কিন্তু তার পেছনে ছিল ক্ষমতার কাঠামো। রাষ্ট্র একটি সাধারণ যোগাযোগভাষা চাইতে পারে—ভারতের ক্ষেত্রে হিন্দির প্রশ্ন যেমন উঠেছে, পাকিস্তানের ক্ষেত্রে উর্দুর প্রশ্নও তেমন উঠেছিল। এই দাবি নিজে নিজে অস্বাভাবিক নয়। সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়।

    সমস্যা ছিল, পূর্ব বাংলার ভাষাগত সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে রাষ্ট্রের মর্যাদার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পাকিস্তানি কেন্দ্র প্রস্তুত ছিল না। বাংলা ছিল পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ভাষা। তবু রাষ্ট্রের উচ্চকাঠামো, প্রশাসনিক কল্পনা, সামরিক-আমলাতান্ত্রিক মনস্তত্ত্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তানি ক্ষমতাবৃত্তে বাংলা যেন প্রাদেশিক ভাষা, আর উর্দু যেন রাষ্ট্রের একমাত্র সভ্য ভাষা—এমন মনোভাব তৈরি হয়েছিল। এই মনোভাব ভাষার চেয়েও বড়। এটি ক্ষমতার মনোভাব।

    তাই ভাষা-আন্দোলনকে শুধু “বাংলা বনাম উর্দু” বললে কম বলা হয়। আবার “ইসলাম বনাম বাংলা” বললে মিথ্যা বলা হয়। আসল প্রশ্ন ছিল—পাকিস্তান রাষ্ট্র কি তার সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্বাংশকে মর্যাদাসম্পন্ন অংশীদার মানবে, নাকি তাকে প্রাদেশিক অধস্তন ভূখণ্ড হিসেবে রাখবে? ভাষা সেই বড় প্রশ্নের প্রথম প্রকাশ। পরে একই প্রশ্ন অর্থনীতি, প্রশাসন, সামরিক কাঠামো, স্বায়ত্তশাসন, ভোটের ম্যান্ডেট এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের জায়গায় বিস্ফোরিত হয়েছে।

    সুতরাং ৭১-এর পথে ভাষা ছিল দরজা, পুরো বাড়ি নয়। দরজা খুললে ভিতরে দেখা যায়—ক্ষমতার অসমতা, পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠতার অবমূল্যায়ন, অর্থনৈতিক শোষণ, প্রশাসনিক বঞ্চনা, এবং পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামোর গভীর পশ্চিমকেন্দ্রিকতা। ভাষা ছিল লক্ষণ। রোগ ছিল ক্ষমতার অসমতা।

    এরপর আসে অর্থনৈতিক প্রশ্ন। পূর্ব বাংলার পাট, কৃষি, শ্রম, বন্দর, রাজস্ব, বৈদেশিক আয়—সব ব্যবহার করে রাষ্ট্রের কেন্দ্র পশ্চিম পাকিস্তানি আধিপত্যকে শক্ত করেছে। পূর্ব বাংলার মানুষের কাছে পাকিস্তান ক্রমে মুসলিম ভ্রাতৃত্বের রাষ্ট্র নয়, বৈষম্যের রাষ্ট্র হয়ে উঠল। এরপর প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন। সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব বাংলাকে ক্ষমতার কেন্দ্রে স্বাভাবিক জায়গা দেওয়া হলো না। ভোটে জিতেও ক্ষমতা পাবে কি না, সেই সন্দেহ জন্ম নিল।

    Iqbal, Jinnah, and Pakistan গ্রন্থে ১৯৭০ নির্বাচন ও তার পরবর্তী সঙ্কটের বর্ণনায় দেখা যায়, ঘূর্ণিঝড়ের পর Yahya Khan সরকার ত্রাণ ও পুনর্বাসনে ব্যর্থ হয়, আওয়ামী লীগ ছয় দফা স্বায়ত্ততার দাবিকে কেন্দ্র করে নির্বাচনে প্রায় সব পূর্ব পাকিস্তানি আসন জয় করে, কিন্তু জাতীয় পরিষদে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও শেখ মুজিবকে সরকার গঠনের অধিকার দেওয়া হলো না। Bhutto মুজিবের শর্তে রাজনৈতিক সমঝোতা মানতে রাজি ছিলেন না; Yahya জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত করেন; বাঙালিরা এই সিদ্ধান্তে পশ্চিম পাকিস্তানি ষড়যন্ত্র দেখেছিল। (Iqbal, Jinnah, and Pakistan, pp. 162–163)

    এই জায়গায় ৭১-এর যুক্তি পরিষ্কার। পূর্ব বাংলার মানুষ শুধু ভাষার জন্য নয়, ভোটের মর্যাদার জন্যও লড়েছে। যে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ নির্বাচনে জয়ী হলো, তাকে ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করা হলো। তারপর ২৫ মার্চ রাতে বন্দুক, ভাষণ, ধর্ম, সংবিধান, ভোট—সবকিছুকে সরিয়ে দিল। একই গ্রন্থে বলা হয়েছে, ২৫ মার্চ ১৯৭১-এ speeches, strikes and ballots (বক্তৃতা, ধর্মঘট ও ব্যালট)-এর জায়গায় guns and bayonets (বন্দুক ও বেয়নেট) এল; পূর্ব পাকিস্তান civil war (গৃহযুদ্ধ)-এ ঢুকে যায়; মুজিবকে traitor (রাষ্ট্রদ্রোহী) হিসেবে ধরে পশ্চিম পাকিস্তানে নেওয়া হয়; আওয়ামী লীগ নেতারা ভারতে গিয়ে Bangladesh নামে government-in-exile (প্রবাসী সরকার) গঠন করেন। (Iqbal, Jinnah, and Pakistan, p. 163)

    এই বর্ণনা ৭১-কে একটি রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার মধ্যে রাখে। ভাষা থেকে অর্থনীতি, অর্থনীতি থেকে স্বায়ত্ততা, স্বায়ত্ততা থেকে নির্বাচন, নির্বাচন থেকে ক্ষমতা-হরণ, ক্ষমতা-হরণ থেকে সেনা-অভিযান—এই পথ ধরেই বাংলাদেশ আসে।

    এখানে ইসলাম কোথায় গেল? কোথাও যায়নি। পূর্ব বাংলার মুসলমান ইসলাম ছেড়ে যুদ্ধ করেনি। সে রাষ্ট্রীয় অবিচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। যুদ্ধের ন্যায্যতা এসেছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো থেকে, মুসলিম পরিচয় মুছে ফেলা থেকে নয়।

    ৭১ ছিল রাজনৈতিক বিচ্ছেদ, সভ্যতাগত আত্মবিসর্জন নয়

    শাহবাগী বয়ান ৭১-কে সভ্যতাগত বিচ্ছেদ বানাতে চায়। যেন ৭১ মানে মুসলিম রাজনৈতিক history (ইতিহাস)-এর শেষ, বাংলা-সাংস্কৃতিক identity (পরিচয়)-এর একমাত্র শুরু। এই পাঠে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকে মুসলিম জাতিসত্তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বানানো হয়। এর ফলে বাঙালি মুসলমান নিজের গভীর ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

    কিন্তু ৭১-এর যুদ্ধের ভিতরে এমন কোনো ঐতিহাসিক সত্য নেই, যা বলে পূর্ব বাংলার মুসলমান তার ইসলামি পরিচয় ত্যাগ করেছে। বরং সত্য হলো, পূর্ব বাংলার মুসলমান পাকিস্তানি রাষ্ট্রের ভণ্ডামি দেখেছে। ইসলামি ভ্রাতৃত্বের নামে জন্ম নেওয়া রাষ্ট্র কীভাবে অন্যায় করতে পারে, তা দেখেছে। মুসলিম শাসকশ্রেণি কীভাবে মুসলিম জনগণকে শোষণ করতে পারে, তা দেখেছে। এই অভিজ্ঞতা তার রাষ্ট্রবোধ বদলেছে। কিন্তু তার গভীর ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক সত্তা মুছে দেয়নি। রাষ্ট্রীয় পরিচয় বদলেছে। সভ্যতাগত পরিচয় বদলায়নি।

    এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। পাকিস্তান রাষ্ট্র নিজেকে মুসলিম পরিচয়ের ভাষায় বৈধতা দিত। পূর্ব বাংলার মানুষ দেখল, শুধু মুসলিম নামের রাষ্ট্র ন্যায় নিশ্চিত করে না। কিন্তু এখান থেকে যে সিদ্ধান্ত বের হয় তা হলো—ন্যায় ছাড়া মুসলিম রাষ্ট্র টেকে না। সিদ্ধান্তটি এই নয়—মুসলিম জাতিসত্তা মিথ্যা।

    বরং ৭১ পাকিস্তানকে ইসলামের নামে অন্যায়ের বিচার করেছে। রাষ্ট্রের নামে ধর্মকে ব্যবহার করার বিচার করেছে। কেন্দ্রের নামে প্রান্তকে শোষণ করার বিচার করেছে। সেনাবাহিনীর নামে জনগণের ওপর যুদ্ধ চাপানোর বিচার করেছে।

    এই বিচারকে মুসলিম পরিচয়-বিরোধী বানানো ভারতীয় বয়ানের সুবিধা। কারণ এতে বাংলাদেশ নিজের মুসলিম রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে দ্বিধায় পড়ে। সে ৭১ ধরে রাখে, কিন্তু ৪৭ লুকায়। সে ভাষা ধরে রাখে, কিন্তু মিল্লাতকে সন্দেহ করে। সে মুক্তিযুদ্ধ ধরে রাখে, কিন্তু সেই মানুষটির ইতিহাস ভুলে যায়, যে ১৯৪৭-এ মুসলিম মর্যাদার দাবিও তুলেছিল। এই বিচ্ছিন্নতা বিপজ্জনক।

    কারণ যে জাতি নিজের ইতিহাসকে দুই টুকরায় কেটে এক টুকরাকে পবিত্র আর আরেক টুকরাকে লজ্জা বানায়, সে নিজের আত্মপরিচয় স্থির রাখতে পারে না।

    পূর্ব বাংলার বাস্তবতা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব

    পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের ভিতরে কেবল ভাষাগত অঞ্চল ছিল না। এটি ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম ভূখণ্ড, কৃষকসমাজের দেশ, ব্রিটিশ ও হিন্দু অভিজাত আধিপত্যের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা বহনকারী সমাজ, এবং ৪৭-এর পর পাকিস্তান রাষ্ট্রের জনসংখ্যাগত শক্তির কেন্দ্র। কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল পশ্চিমে। এই দ্বন্দ্বই পাকিস্তানকে ভিতর থেকে ফাটিয়ে দেয়।

    Jalal পাকিস্তানের জন্মের বাস্তবতাকে খুব কঠোর ভাষায় ধরেছেন। তাঁর মতে, পশ্চিমবঙ্গ ও কলকাতা ছাড়া পূর্ব বাংলা এক ধরনের over-populated rural slum (অতিরিক্ত জনসংখ্যাভারী গ্রামীণ বস্তি)-তে নেমে যায়, যা বহিরাগত আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার মতো শক্তিশালী নয়, আবার মুসলিম রাষ্ট্রের ভেতর সমান অংশীদার হিসেবে উন্নত হওয়ার মতো কাঠামোও পায় না। (The Sole Spokesman, p. 3)

    এই পর্যবেক্ষণ কঠোর, কিন্তু পূর্ব বাংলার অবস্থান বোঝার জন্য দরকারি। ৪৭ পূর্ব বাংলাকে ভারতীয় ইউনিয়নের প্রদেশ হতে দেয়নি; এই দিকটি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে ৪৭ পূর্ব বাংলাকে পশ্চিম পাকিস্তানি কেন্দ্রের সঙ্গে অসম সম্পর্কে ঠেলে দিয়েছে। এই দুই সত্য একসঙ্গে ধরতে হয়।

    পাকিস্তান রাষ্ট্র পূর্ব বাংলাকে প্রয়োজনীয় মর্যাদা দিলে ইতিহাস অন্যরকম হতে পারত। কিন্তু সে তা করেনি। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা ও ভোটকে সন্দেহ করেছে। অর্থনীতিকে শোষণ করেছে। সামরিক কাঠামো পশ্চিমে রেখেছে। রাষ্ট্রের কল্পনায় পূর্ব বাংলাকে অংশীদার নয়, অধীন অঞ্চল বানিয়েছে। এই অবস্থায় ৭১ ছিল অবশ্যম্ভাবী বিদ্রোহ।

    Iqbal, Jinnah, and Pakistan-এ ১৯৭১-কে “the beginning of the end of Pakistan as Jinnah had created it” বলা হয়েছে; বছরের শেষে Indian Army (ভারতীয় সেনা) যুদ্ধে প্রবেশ করে এবং পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়; এর ফলে পাকিস্তানি রাষ্ট্র formal dismemberment (আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদ)-এর মুখে পড়ে। (Iqbal, Jinnah, and Pakistan, pp. 163–164)

    এই “Jinnah had created it” বাক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রটি জিন্নাহর নামে জন্মেছে, কিন্তু জিন্নাহর নাম তাকে রক্ষা করতে পারেনি। কারণ রাষ্ট্র কেবল প্রতিষ্ঠাতার নামে টিকে না। ন্যায়, প্রতিনিধিত্ব, ক্ষমতার ভাগ, ভাষার মর্যাদা, অর্থনৈতিক সাম্য—এসব ছাড়া কোনো রাষ্ট্র টেকে না। পাকিস্তান এই পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে।

    ৭১ দিয়ে ৪৭ মুছে ফেলার ভুল

    ৭১ দিয়ে ৪৭ মুছে ফেলা ইতিহাসের সবচেয়ে ক্ষতিকর সরলীকরণগুলোর একটি। এতে পাকিস্তানের অপরাধ বিচার হয় না; বরং মুসলিম রাজনৈতিক ইতিহাসকে শাস্তি দেওয়া হয়।

    পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বাঙালি মুসলমানের বিদ্রোহ ন্যায্য। কিন্তু এই বিদ্রোহকে ৪৭-এর বিরুদ্ধে রায় বানালে প্রশ্ন ওঠে—তাহলে ৪৭-এর মানুষেরা কী চেয়েছিল? তারা কি কেবল সাম্প্রদায়িক বিভ্রমে গিয়েছিল? তাদের কোনো রাজনৈতিক ভয় ছিল না? কোনো সাংবিধানিক অনিরাপত্তা ছিল না? হিন্দু অভিজাত আধিপত্যের অভিজ্ঞতা ছিল না? কংগ্রেসের একক জাতীয় দাবির বিরুদ্ধে আপত্তি ছিল না? বাংলার মুসলিম কৃষকসমাজের নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ছিল না?

    এই প্রশ্নগুলো মুছে দিলে ইতিহাস সহজ হয়। কিন্তু সহজ ইতিহাস অনেক সময় মিথ্যা ইতিহাস।

    ৪৭ ছিল মুসলিম রাজনৈতিক মর্যাদার দাবি। ৭১ ছিল সেই দাবির নামে জন্ম নেওয়া রাষ্ট্রের অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। দুটো পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় না; বরং একে অন্যকে ব্যাখ্যা করে। ৪৭ না বুঝলে বোঝা যায় না কেন পূর্ব বাংলার মুসলমান পাকিস্তানে গিয়েছিল। ৭১ না বুঝলে বোঝা যায় না কেন সেই মুসলমান পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ বানাল।

    একটি ছিল আশ্রয়ের দাবি।

    অন্যটি ছিল ভাঙা আশ্রয়ের বিচার।

    এই ধারাবাহিকতা ভাঙলেই শাহবাগী বয়ানের সুবিধা। তখন ৪৭ হয়ে যায় লজ্জা, ৭১ হয়ে যায় একমাত্র জন্ম। কিন্তু জাতির জন্ম এমন একরৈখিক নয়। বাঙালি মুসলমানের ইতিহাসে ৪৭ ও ৭১ দুই অধ্যায়। একটিতে সে মুসলিম মর্যাদা চেয়েছে; অন্যটিতে রাষ্ট্রীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে সেই মর্যাদা রক্ষা করতে উঠেছে।

    ভারতীয় বয়ানের সুবিধা কোথায়

    ভারতীয় বয়ান ৭১-কে ব্যবহার করে ৪৭-এর মুসলিম রাজনৈতিক ইতিহাসকে সন্দেহজনক করতে চায়। এতে ভারতের জন্য একটি বুদ্ধিবৃত্তিক সুবিধা তৈরি হয়। বাংলাদেশ যদি নিজের ৪৭ নিয়ে লজ্জিত হয়, তাহলে সে নিজের মুসলিম রাজনৈতিক জন্মসূত্র নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত থাকবে। সে ভারতীয়/কলকাতাকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক বাঙালিত্বের অনুমোদন চাইবে। সে ৭১ মনে রাখবে, কিন্তু ৪৭ লুকাবে। সে পাকিস্তানকে ঘৃণা করতে গিয়ে মুসলিম রাজনৈতিক ইতিহাসকেও সন্দেহ করবে।

    এই জায়গায় “শাহবাগ” হলো সেই ভারতীয় বয়ানের স্থানীয় মুখ। এটি কোনো মোড়ের নাম নয়, শুধু এক দিনের আন্দোলনের নামও নয়। এটি এমন এক ইতিহাস-পাঠ, যা বাংলাদেশের মুসলমানকে বলে—তুমি ৭১ মনে রাখো, কিন্তু ৪৭ ভুলে যাও। তুমি বাংলা ভাষা মনে রাখো, কিন্তু মুসলিম রাজনৈতিক মর্যাদার ইতিহাস ভুলে যাও। তুমি পাকিস্তানি রাষ্ট্রের অপরাধ মনে রাখো, কিন্তু কেন তোমার পূর্বপুরুষ পাকিস্তানের পথ বেছে নিয়েছিল তা জিজ্ঞেস কোরো না।

    এই বয়ানের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানে পাকিস্তানকে পবিত্র করা নয়। বরং পাকিস্তানের অপরাধকে তার জায়গায় রাখা। পাকিস্তান অপরাধ করেছে। কিন্তু মুসলিম জাতিসত্তার ইতিহাস অপরাধ নয়। পাকিস্তান পূর্ব বাংলাকে শোষণ করেছে। কিন্তু ৪৭-এর মুসলিম মর্যাদা-দাবি শোষণ ছিল না। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী গণহত্যা করেছে। কিন্তু ভারতীয় মুসলিম রাজনৈতিক ইতিহাসের দীর্ঘ সংগ্রাম গণহত্যার দায় বহন করবে কেন?

    এই প্রশ্ন করতেই হবে।

    কারণ কোনো জাতিকে পরাজিত করার একটি পদ্ধতি হলো তাকে নিজের ইতিহাস নিয়ে লজ্জিত করা। শাহবাগী-ভারতীয় ফ্রেম এই কাজ করে। সে বাঙালি মুসলমানকে নিজের ৪৭ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়। বিচ্ছিন্ন মানুষ সহজে অন্যের ইতিহাসে আশ্রয় নেয়।

    ৪৭ ছাড়া ৭১ সম্ভব হতো না

    ৪৭ ছাড়া ৭১ হতো না—এই বাক্যটি শুধু আবেগ নয়; কাঠামোগত সত্য। ১৯৪৭ পূর্ব বাংলাকে ভারতীয় ইউনিয়নের একটি প্রদেশ না রেখে পাকিস্তান রাষ্ট্রের পূর্বাংশে দাঁড় করিয়েছিল। এই রাষ্ট্রিক অবস্থানই পরে স্বাধীনতার পথ তৈরি করে।

    পূর্ব বাংলা যদি ১৯৪৭-এ ভারতের অংশ হয়ে থাকত, তার ভাষা থাকত, মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকত, পূর্ববঙ্গীয় সমাজ থাকত। কিন্তু স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার কাঠামোগত পথ প্রায় বন্ধ থাকত। তখন স্বাধীনতার দাবি হতো Indian Union (ভারতীয় ইউনিয়ন)-এর বিরুদ্ধে secession (বিচ্ছিন্নতা)-এর দাবি। ভারতীয় রাষ্ট্র এ ধরনের বিচ্ছিন্নতাকে সহজে মেনে নিত—এমন ভাবার কোনো ঐতিহাসিক কারণ নেই। হায়দরাবাদ, জুনাগড়, সিকিম, কাশ্মীর—যে উদাহরণই নেওয়া হোক, ভারতীয় রাষ্ট্র তার ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার প্রশ্নে কঠোর। পূর্ব বাংলা ভারতের ভিতরে থাকলে তাকে আলাদা রাষ্ট্র হতে দেওয়া হতো—এ কথা ইতিহাসের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলে না।

    ৪৭ পূর্ব বাংলাকে এক paradoxical space (বিরোধাভাসী স্থান)-এ রাখে। সে পাকিস্তানে গেল মুসলিম মর্যাদার আশা নিয়ে। কিন্তু পাকিস্তান তাকে বঞ্চিত করল। এই বঞ্চনার ভিতরেই পূর্ব বাংলা আলাদা রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে ঘনীভূত হলো। East Pakistan (পূর্ব পাকিস্তান) নামটি শুধু প্রশাসনিক নাম ছিল না; সেটি এক বাস্তব রাজনৈতিক শরীর হয়ে উঠল। ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসনের দাবি, ছয় দফা, ১৯৭০ নির্বাচনের সংখ্যাগরিষ্ঠ ম্যান্ডেট, ২৫ মার্চের সেনা-অভিযান—সব এই শরীরের ভিতরেই ঘটেছে।

    ভারতের ভিতরে পূর্ব বাংলা থাকলে সে হতো একটি প্রদেশ। পাকিস্তানের ভিতরে সে হলো একটি রাষ্ট্রের অর্ধেকের বেশি জনসংখ্যাবাহী পূর্বাংশ, যার ওপর পশ্চিমাংশ আধিপত্য করছে। এই পার্থক্য বিরাট। ৭১-এর ন্যায্যতা শুধু ভাষা থেকে আসেনি; এসেছে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ম্যান্ডেট, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বৈষম্য, পূর্ব-পশ্চিম ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, কেন্দ্রের বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক ভূখণ্ডের অধিকার থেকে।

    এই যুক্তি কঠিন, কিন্তু এড়ানো যায় না।

    ৪৭ পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানে নিয়েছিল। পাকিস্তান পূর্ব বাংলার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। সেই বিশ্বাসঘাতকতার বিচার ৭১। তাই ৭১ হলো ৪৭-এর সরল অস্বীকার নয়; ৪৭-এর অসম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতির রক্তাক্ত হিসাব।

    ইসলামি পরিচয় কি শেষ হয়ে গিয়েছিল?

    যদি ৭১ মুসলিম জাতিসত্তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হতো, তাহলে স্বাধীন বাংলাদেশে মুসলিম জনমনের ধারাবাহিকতা দেখা যেত না। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বাংলাদেশের মানুষ ভাষায় বাঙালি, রাষ্ট্রে বাংলাদেশি, সমাজে গভীরভাবে মুসলমান। তার আচার, পরিবার, নাম, মৃত্যু, বিবাহ, ঈদ, মসজিদ, মাদরাসা, ওয়াজ, কোরআনখানি, দোয়া, জানাজা, হালাল-হারাম বোধ, সামাজিক ন্যায়-অন্যায়ের ভাষা—সবই ইসলামি চেতনার সঙ্গে যুক্ত।

    রাষ্ট্রীয় সংবিধানের শব্দ বদলাতে পারে। দলীয় স্লোগান বদলাতে পারে। কিন্তু জনমনের ধর্মীয় কাঠামো এত দ্রুত বদলায় না। ৭১-এর মুক্তিযোদ্ধার ঘরেও নামাজ ছিল। শহীদের মায়ের মুখেও দোয়া ছিল। যুদ্ধের পর গ্রামের সমাজেও মসজিদ ছিল, ঈদ ছিল, জানাজা ছিল, কবর ছিল। স্বাধীনতার পতাকা ইসলামকে মুছে দেয়নি। বরং পাকিস্তানি রাষ্ট্রের নামে ইসলাম ব্যবহারের ভণ্ডামি থেকে মানুষকে আলাদা করেছে।

    এই পার্থক্য খুব জরুরি। পাকিস্তান Islam (ইসলাম)-এর নাম ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় বৈধতা চাইত। বাংলাদেশ সেই রাষ্ট্রীয় ভণ্ডামি ভেঙেছে। কিন্তু ভণ্ডামি ভাঙা আর ইসলাম ভাঙা এক জিনিস নয়। বাঙালি মুসলমান পাকিস্তানি রাষ্ট্রধর্মী আধিপত্য প্রত্যাখ্যান করেছে; নিজের ইসলামি জীবনবোধ নয়।

    এখানে ভারতীয় বয়ান আবার ভুল করায়। সে ধরে নেয়, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানে ইসলামি পরিচয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। এই ধারণা বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খায় না। বাংলাদেশের মুসলিম জনমন পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙেছে, কিন্তু নিজের বিশ্বাস, সামাজিক স্মৃতি, ধর্মীয় অভ্যাস, মিল্লাতের দীর্ঘ ইতিহাস—এসব ফেলে দেয়নি।

    এ কারণেই ৭১-পরবর্তী বাংলাদেশকে বোঝার জন্য শুধু সেক্যুলার-বাঙালি ভাষা যথেষ্ট নয়। আবার শুধু মুসলিম রাষ্ট্র-ভাষাও যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে এক জটিল সংমিশ্রণে: ভাষা আছে, ইসলাম আছে, মুক্তিযুদ্ধ আছে, ৪৭ আছে, ৭১ আছে, পূর্ববঙ্গীয় কৃষকসমাজ আছে, দক্ষিণ এশীয় মুসলিম ইতিহাস আছে। একটিকে দিয়ে আরেকটিকে হত্যা করলে বাংলাদেশকে বোঝা যায় না।

    বিচ্ছেদ নাকি ধারাবাহিকতা?

    ৭১ ৪৭-এর সঙ্গে সংঘাতে আছে—এই কথায় অর্ধেক সত্য আছে। ৭১ পাকিস্তান রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে আছে। ৭১ পশ্চিম পাকিস্তানি আধিপত্যের সঙ্গে সংঘাতে আছে। ৭১ ভাষা-অপমানের সঙ্গে সংঘাতে আছে। ৭১ সামরিক শাসন ও গণহত্যার সঙ্গে সংঘাতে আছে।

    কিন্তু ৭১ ৪৭-এর মুসলিম মর্যাদা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সংঘাতে নেই। বরং এক অর্থে তারই ধারাবাহিকতা। ৪৭-এ পূর্ব বাংলার মুসলমান বলেছিল, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতীয় রাষ্ট্রে সে নিরাপদ নয়; তাকে নিজের রাজনৈতিক মর্যাদা দরকার। ৭১-এ সে বলল, মুসলিম নামের পাকিস্তান রাষ্ট্রও যদি তার মর্যাদা না দেয়, তবে তাকেও সে মানবে না।

    এখানে ধারাবাহিকতা পরিষ্কার।

    মর্যাদার দাবি ৪৭-এ ছিল। মর্যাদার দাবি ৭১-এও ছিল। শুধু প্রতিপক্ষ বদলেছে। প্রথমে প্রতিপক্ষ ছিল ঔপনিবেশিক কাঠামো, কংগ্রেসীয় একজাতি দাবি, হিন্দু অভিজাত আধিপত্যের ভয়। পরে প্রতিপক্ষ হলো পশ্চিম পাকিস্তানি রাষ্ট্র, সামরিক শাসন, অর্থনৈতিক শোষণ, ভাষা-অপমান, গণহত্যা।

    মানুষ একই। মর্যাদার দাবি একই। ইতিহাসের মঞ্চ বদলেছে।

    এই কারণেই ৭১-কে ৪৭-এর বিরুদ্ধে দাঁড় করানো ভুল। ৭১ ৪৭-কে বাতিল করে না; ৪৭-এর অসম্পূর্ণতাকে বিচার করে। পাকিস্তান রাষ্ট্র ৪৭-এর আকাঙ্ক্ষাকে বিকৃত করেছিল। ৭১ সেই বিকৃতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।

    এখানে বাঙালি মুসলমানের ইতিহাসের গভীর সৌন্দর্য আছে। সে হিন্দু আধিপত্যের ভয়ে মুসলিম মর্যাদা চেয়েছে, আবার মুসলিম রাষ্ট্রের অন্যায়ের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাও চেয়েছে। এর মানে সে দ্বিচারী নয়। এর মানে সে মর্যাদাকে কেন্দ্র করে ইতিহাসে চলেছে। যে মর্যাদা হিন্দু অভিজাত রাষ্ট্রে হারাবে, তাকে সে মানেনি। যে মর্যাদা মুসলিম নামের রাষ্ট্রেও হারাবে, তাকেও মানেনি।

    এই ইতিহাস দুর্বল নয়। এটি পরিণত ইতিহাস।

    নতুন রাজনৈতিক প্রকল্পের বিরুদ্ধে ইতিহাসের পূর্ণতা

    শাহবাগী-ভারতীয় বয়ান ৭১-কে ব্যবহার করে বাঙালি মুসলমানকে তার ৪৭ থেকে আলাদা করতে চায়। এই আলাদা করা রাজনৈতিক। কারণ ৪৭ মনে থাকলে বাঙালি মুসলমান জানে, তার ইতিহাস শুধু সাংস্কৃতিক বাঙালিত্ব নয়; তার ইতিহাসে মুসলিম রাজনৈতিক মর্যাদার দাবিও আছে। সে জানে, তার পূর্বপুরুষ শুধু ভাষার জন্য নয়, রাষ্ট্রিক নিরাপত্তার জন্যও লড়েছে। সে জানে, পাকিস্তান ভুল করেছে, কিন্তু পাকিস্তান-প্রশ্ন কেন উঠেছিল তা ভুলে গেলে নিজের ইতিহাসই অন্ধকারে পড়ে।

    এই পূর্ণতা ভারতীয় বয়ানের জন্য অস্বস্তিকর। কারণ পূর্ণ ইতিহাস জানে এমন বাংলাদেশ ভারতীয় সাংস্কৃতিক অভিভাবকত্ব সহজে মেনে নেয় না। সে ৭১-কে রাখে, কিন্তু ৪৭-ও রাখে। সে বাংলা ভাষাকে রাখে, কিন্তু মুসলিম জাতিসত্তাকেও রাখে। সে পাকিস্তানের অপরাধ বিচার করে, কিন্তু মুসলিম রাজনৈতিক ইতিহাসকে অপরাধ বানায় না। সে ভারতকে মুক্তিযুদ্ধের মিত্র হিসেবে দেখে, কিন্তু নিজের ইতিহাসের মালিকানা ভারতীয় বয়ানের হাতে তুলে দেয় না।

    ৭১ পাকিস্তান রাষ্ট্র ভেঙেছে। কিন্তু বাঙালি মুসলমানের মুসলিম জাতিসত্তা ভাঙেনি। ৭১ রাষ্ট্র বদলেছে, গভীর পরিচয় মুছে দেয়নি। ৭১, ৪৭-এর বিরুদ্ধে আত্মহত্যা নয়; ৪৭-এর অসম্পূর্ণ মর্যাদা-দাবির নতুন রূপ।

    যে ইতিহাস ৪৭ ও ৭১-কে একসঙ্গে ধরতে পারে না, সে বাঙালি মুসলমানকে বুঝতে পারে না। ৪৭ তাকে ভারতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভয় থেকে বের করে এনেছিল। ৭১ তাকে পাকিস্তানি রাষ্ট্র-অন্যায় থেকে মুক্ত করেছে।

    দুটোই তার ইতিহাস। একটিকে লজ্জা আর অন্যটিকে পবিত্র বানালে মানুষ অর্ধেক হয়ে যায়। বাঙালি মুসলমান অর্ধেক মানুষ নয়।

    House of Wisdom

    House of Wisdom

    House of Wisdom — Inspired by the legacy of Baghdad’s Bayt al-Hikmah, where ideas meet knowledge, culture, philosophy, and civilization through thoughtful exploration.

    Post a Comment