Loading...

কুরআনপন্থী দল কোনটি? সত্য অনুসারী কারা?

কুরআনপন্থী দল কোনটি? সত্য অনুসারী কারা?
Advertisement
Advertisement — Place AdSense Code Here
Table of Contents

     

    কুরআনপন্থী দল কোনটি শিরোনামের ইসলামিক ব্লগ ইমেজ, যেখানে কুরআন, মসজিদের পটভূমি এবং সত্য অনুসারী কারা বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছে।
    পূর্বের অংশের পর থেকে আলোচনাটি অব্যাহত…

    কাদিয়ানী ও খারিজীদের প্রসঙ্গ

    এবার উনার প্রশ্নের অন্য আরেকটি দল, কাদিয়ানীদের আলোচনায় যাচ্ছি। দেখি এরা কোন কুরআন অনুসরণ করে কুরআনপন্থী দল হলো?

    কাদিয়ানী মতবাদের মূল গুরু হলো মিথ্যা নবুওয়তের দাবিদার "মির্জা গোলাম আহমদ"। সে ছিল "পূর্ব-পাঞ্জাব" প্রদেশের "গুরুদাসপুর" জেলার অন্তর্গত কাদিয়ান গ্রামের অধিবাসী। ওই গ্রামের দিকে সম্বন্ধ করে তাকে এবং তার অনুসারীদের "কাদিয়ানী" বলে পরিচয় দেওয়া হয়। তবে গিরগিটির ন্যায় তারা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নামে আপন রূপ পাল্টিয়েছে। যেমন, "আহমদিয়া মুসলিম জামাত, আহমদী জামাত, মির্জায়ী, কাদিয়ানী" ইত্যাদি নামে তারা পরিচিত লাভ করেছে।

    কাদিয়ানীদের উদ্ভবের পেছনে মূল কারণ হলো ইংরেজ। যখন ইংরেজরা দেখল, ভারত উপমহাদেশের মুসলমানরা জিহাদি প্রেরণায় উজ্জীবিত হয়ে তাদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, তখন তারা চিন্তা করল; এঁদের জিহাদি এ স্পৃহাকে কীভাবে দমন করা যায়। সেই চিন্তার ফসলস্বরূপ তারা "গোলাম আহমদ" কাদিয়ানীকে মিথ্যা নবী সাজিয়ে মাঠে ছেড়ে দেয়। তাকে বলে দেয়, "তুমি বলবে আমার কাছে ওহী এসেছে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হারাম"। এভাবে কূটচাল এঁটে ধূর্ত ইংরেজরা সরলমনা মুসলমানদের ঈমান বিধ্বংসী মিশন চালু করে। এতে তারা অনেকটা সফলও হয়ে যায়।

    এখানে আমাদের দেখার বিষয় হলো, কাদিয়ানীরা কোন কুরআনের অনুসারী? আমরা পূর্বে দেখে এসেছি দাদা, আল্লাহ তাআলা সূরা আহযাবের ৪০ নং আয়াতে বলে দিয়েছেন যে, "মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন সর্বশেষ নবী"। কাদিয়ানী যখন নবুওয়াতি দাবি করে বসলো, তখন সে কুরআনপন্থী থাকা তো দূরের কথা; সে আর মুমিনই থাকলো না। শুধু তাই নয়, কুরআনের মূলমন্ত্র এক আল্লাহকেও মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী মানেনি। সে নিজেকে খোদা বলেও দাবি করেছে।

    আওহাম দা, সবচেয়ে হাস্যকর কী জানেন! আরজ আলী সাহেব কাদিয়ানীদের কুরআনপন্থী অন্যতম একটি দল বলে গণ্য করেছেন। অথচ স্বয়ং কাদিয়ানীরাই ঘোষণা দিয়েছে যে, তারা কুরআনের অনুসারী নয়। কাদিয়ানীদের গুরু মির্জা গোলামের দাবি হলো, তার উপর ওহী নাযিল করা হয়েছে। যা কোরআনের পারাগুলোর ন্যায় ২০ পারার মতো হবে।

    এগুলোকেই তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ হিসেবে মান্য করে। এবার আপনি বলেন দাদা, যারা নিজ থেকেই ঘোষণা দিলো যে, তারা কুরআনের অনুসারী নয়। তাদেরকে আরজ আলী সাহেব জোর করে কুরআনপন্থী একটি দল বানিয়ে দিতে চাইলেন কী উদ্দেশ্য? কোনো বিষয় সম্পর্কে যদি কেউ কিছু না জানে, তবে সে বিষয় সম্পর্কে চুপ থাকা কি ভালো নয়? কী বলেন দাদা? আওহামের হয়ে মুশির উত্তরটা দিয়ে দিলো।

    চলেন দাদা, এবার আমরা খারিজীদের সম্পর্কে কিছু জেনে নিই। খারিজীরা হলো রাসুল সা.-এর জামাতা ও চতুর্থ খলীফা হযরত আলী রাযি.-এর বিরুদ্ধাচরণকারী, ইসলাম থেকে ছিন্নমূল একটি ভ্রান্ত দল। এ দলের কয়েকজন গডফাদার রয়েছে। তন্মধ্যে আশআ'স ইবনে কায়েস আল-কিন্দি, মিস'আর ইবনে ফাদাক আত-তাইমী, যায়েদ ইবনে হুসাইন আত-তাঈ প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।

    আওহাম দা, এবার আমরা দেখব, খারিজীরা যা বলে তা কুরআন অনুযায়ী সঠিক কিনা। যদি হয়, তাহলে তারা অটোমেটিক কুরআনপন্থী সাব্যস্ত হয়ে যাবে। আর যদি না হয়, তবে.......?

    আমরা তাদের কিছু মৌলিক বিশ্বাস সম্পর্কে আলোচনা করি। পূর্বে দেখে এসেছি আমরা, মুতাজিলাদের বিশ্বাস হলো, কবিরা গুনাহগার ব্যক্তি মুমিনও নয় আবার কাফিরও নয়। অথচ কুরআন এমন বলেনি। আর এই খারিজীরা বলে, পাপী বলতেই কাফির। তারা বড় পাপ আর ছোট পাপের মধ্যে পার্থক্যও করে না। এমনকি তাদের মতের বিপরীত হলে সেটাকেও পাপ গণ্য করে এবং বিপরীত মত পোষণকারী মুসলিমকেও কাফির আখ্যা দিয়ে দেয়। যদি ওই বিপরীত মত কুরআন অনুযায়ী হয়, তবুও তারা কাফির আখ্যা দিতে কুণ্ঠাবোধ করে না।

    কী বুঝলেন, দাদা! খারিজীরা কুরআন মানে, নাকি নিজের সুবিধাবাদী মত প্রতিষ্ঠা করতে যেয়ে কুরআনও ছুড়ে ফেলে দিয়ে, যাকে ইচ্ছা তাকে কাফির আখ্যা দেয়? অথচ স্বয়ং আল্লাহ তাআলা সূরা নিসার ৯৪ নং আয়াতে বলে দিয়েছেন, "কেউ যদি তোমাদের সালাম দেয়, আর তোমরা ঐ ব্যক্তির প্রকৃত অবস্থা না জানো যে, সে কাফির নাকি মুসলিম, তবে তাকেও কাফির বলো না।"

    দেখেন দাদা, যেখানে কেউ সালাম দিলে, আর ওই ব্যক্তি কাফের কি না, না জানলে কাফির আখ্যা দেওয়া যায় না। সেখানে কোনো ব্যক্তি কালিমার দাবিদার এবং এক আল্লাহয় বিশ্বাসী হওয়া সত্ত্বেও; কেবল সামান্য পাপ করার কারণে, কোন দলিলের ভিত্তিতে তাকে কাফের বলা যাবে? তবে হ্যাঁ, পাপ করাকে হালাল মনে করলে কাফের হয়ে যাবে। কারণ, তখন সে সরাসরি আল্লাহ যে কাজকে হারাম করেছেন বা পাপ বলে আখ্যা দিয়েছেন, সে সেটাকে অস্বীকার করে যেন আল্লাহকে অস্বীকার করে নিলো। কিন্তু পাপ করাকে হালাল মনে না করে এবং যে পাপের মধ্যে কুফর ও শিরক নেই, কেবল সে পাপ করার দ্বারা কেউ কাফির হয়ে যায় না। যদি পাপ করলেই মুমিন কাফির হয়ে যেতো, আল্লাহ তাআলা মাগফিরাতের এত আয়াত নাজিল করতেন না। কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় আল্লাহ তাআলা তাওবার শর্তে পাপীদের ক্ষমার ঘোষণা দিয়েছেন। সুতরাং যারা পাপ করলেই মুমিনকে কাফির বলে, তারা যেন কুরআনে অবতীর্ণ পাপীদের ক্ষমার ঘোষণা সম্বলিত আয়াতগুলোকে এভয়েড করে বসলো। অতএব এরূপ একটি জেদি এবং হঠকারী দল কুরআনপন্থী হবে কী করে? অথচ তারা কোরআনের বাণীই মানলো না!!

    অন্যত্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি কাফের নয় তাকে কাফির আখ্যায়িত করার দ্বারা, কাফির আখ্যা দানকারী নিজে কাফির হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

    তাহলে দেখা যাচ্ছে, খারিজীরা কাফির নয় এমন ব্যক্তিকে কাফির বলে নিজেরাই পথভ্রষ্ট। কুরআন-সুন্নাহর বাণী থেকে দূরে নিক্ষিপ্ত একটি ভ্রান্ত দল। আপনি কী বুঝলেন দাদা? এরা কুরআনপন্থী দল, নাকি কোরআন পরিপন্থী দল?

    অপরদিকে হযরত আলী রাযি.কেও তারা অভিসম্পাত করে। অথচ তিনি হলেন, নবী করিম সা.-এর জামাতা, চতুর্থ খলীফা ও জলিলুল কদর সাহাবী। সাহাবাদের সম্পর্কে কুরআনুল কারীমের বিভিন্ন জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেছেন, "আমি তাদের উপর সন্তুষ্ট এবং তাঁরাও আমার প্রতি কৃতজ্ঞ"। সূরা তওবা আয়াত 100, সূরা বায়্যিনাহ আয়াত 28

    আল্লাহ তাআলা কোরআনে এরূপ বলার পরও যখন তারা আলী রাযি.কে গালি দিলো, তখন কী বলবেন তারা কুরআন মেনেছে? না, তারা কুরআন মানেনি। বরং তারা হলো কুরআনের বিরুদ্ধাচরণকারী। যা আরজ আলী সাহেব তার ক্ষুদ্র মেধা এবং একদেশদর্শী জ্ঞান দিয়ে হয়তো বুঝে উঠতে সক্ষম হননি।

    এভাবে খারিজীদের মধ্যে কুরআন বিরোধী আরও অনেক সমস্যা রয়েছে। আপনি যদি তাদের সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জানতে চান তাহলে তাদের নিয়ে বাংলা ভাষায় অনেক কিতাব লেখা হয়েছে, সেগুলো অধ্যয়ন করতে পারেন।

    আহলুস সুন্নাত ও চার মাযহাব

    উনি কুরআনপন্থী বলে বিভিন্ন দলের নাম উল্লেখ করার পর, আমরা যখন প্রমাণ করে দিলাম সেগুলো মূলত কুরআনপন্থী দল নয়। তখন স্বভাবতই আপনার মনে প্রশ্ন জাগবে, "তাহলে কুরআনপন্থী দল কোনটি?"

    : হ্যাঁ ভাইয়া। এখন তো এটাই অনুসন্ধান করতে হবে।

    : হুম, রাইট। তাহলে চলুন আমরা দেখে নিই, কুরআনের প্রকৃত অনুসারী কারা। আপনার তো অবশ্যই মনে আছে দাদা, আরজ আলী সাহেবের প্রশ্নের মধ্যে "সুন্নি" নামে একটি দলের উল্লেখ রয়েছে, যেটির আলোচনা আমরা রেখে এসেছি।

    : হ্যাঁ, মনে আছে।

    : এবার আমি আপনাকে ওই দল সম্পর্কে জানাবো। আল্লাহর হাবিব সা.কে আল্লাহর পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর উম্মতের মধ্যে বিভিন্ন দল বিভিন্ন নামে কুরআনের অনুসারী সেজে বের হয়ে ইসলামকে কলুষিত করতে চাইবে। তখন তিনি এমন একটি পন্থা বলে দিলেন, যার দ্বারা পরখ করে নেওয়া যাবে যে, কোনটি প্রকৃতার্থেই কুরআনপন্থী দল।

    রাসূল সা. বলেছেন, মুসা আ.-এর উম্মত বনী ইসরাঈল তথা ইহুদীরা ৭২ দলে বিভক্ত হয়েছিল। আর আমার উম্মত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে। তন্মধ্যে মাত্র একটি দল ছাড়া অন্যগুলো হবে জাহান্নামী। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, জান্নাতি সেই দলটির পরিচয় কী? রাসূল সা. বললেন, যারা আমার ও আমার সাহাবাদের পথ ও মতের অনুসারী হবে, তারাই সেই দল। তিরমিজি শরীফ হাদিস নং-2852

    দেখুন দাদা, আল্লাহর রাসূল কয় দলকে সফল তথা জান্নাতি বলেছেন? মাত্র একটি দলকে। তারমানে এরাই হলো, কুরআনপন্থী। এরাই হলো প্রকৃতপক্ষে কুরআনের অনুসারী। কিন্তু সেই দল কোনটি? যেই দল রাসূল সা. এবং সাহাবায়ে কেরামের আদর্শে আদর্শিত হবে। এ দলকেই "আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাত" বলা হয়। "আহলুস সুন্নাত" বলে নবীজীর সুন্নাতে আদর্শিত এবং "ওয়াল জামাত" বলে জামায়াতে সাহাবার আদর্শে আদর্শিত বুঝায়। আমাদের পরিভাষায় তাদেরকে সংক্ষেপে "সুন্নি" বলে থাকি। আবার ওই সুন্নিদেরকেই, বিদআত ও কুসংস্কারের প্রতিবাদ করেন বিধায়, কুসংস্কারপন্থী বেদআতিরা ভারত উপমহাদেশে "ওহাবী" বলেও ডাকে। এবার বুঝলেন তো "সুন্নি" কারা? আর কুরআনপন্থী দল কয়টি?

    : জি হ্যাঁ ভাইয়া, বুঝলাম। তবে একটি প্রশ্ন। যদি সুন্নিরাই সঠিক এবং এককভাবে কুরআনের প্রকৃত অনুসারী একটি মাত্র দল হয়ে থাকে, তাহলে তাদের মধ্যে হানাফী, শাফেয়ী ইত্যাদি চার মাযহাব কেন?

    : হুম, অবশ্যই। আমি আপনার সেই প্রশ্নের উত্তরেই যাচ্ছিলাম। ইতিপূর্বে আরজ আলী সাহেবের উত্থাপিত আপত্তির মধ্যে এটিও রয়েছে। তাহলে শুনুন দাদা, একমাত্র হক দল হওয়া সত্ত্বেও সুন্নিরা চার মাযহাব রূপ নিয়ে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত আছে কীভাবে?

    আমরা দেখে এসেছি দাদা, আরজ আলী সাহেব একটি প্রবণতা জাহির করেছেন যে, সত্য কয়েকটি হতে পারে না। সত্য হবে একটি। তার এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই মাযহাবের উপর প্রশ্ন উত্থাপিত হয়।

    : জি হ্যাঁ, ভাইয়া। ধর্ম সম্পর্কে উনি যে প্রশ্ন তুলেছেন, সেটা থেকে তো তা-ই মনে হয়।

    : কিন্তু দাদা, আপনি কি জানেন স্বয়ং "সত্য"ও একরূপ নিয়ে এক ও অভিন্ন নয়?

    : না তো ভাইয়া। একি বলছেন আপনি! স্বয়ং "সত্যের" রূপও বিভিন্ন নাকি?

    : হ্যাঁ। দার্শনিকরা এটা প্রমাণ করে দেখিয়েও দিয়েছেন।

    : তাই নাকি?

    : হুম। আসুন প্রথমে আপনাকে সত্যের বিভিন্ন রূপের সাথে পরিচয় করিয়ে দেই। দার্শনিকরা "সত্য"কে দু'ভাগে বিভক্ত করেছেন।

    এক. আকারগত সত্য।
    দুই. বস্তুগত সত্য।

    এই সত্যতা নিরূপণের মানদণ্ড নির্ধারণ করতে গিয়েও দার্শনিকরা চারটি মত পেশ করেছেন।

    এক. স্বতঃপ্রতীতিবাদ (The self-evidence theory).
    দুই. অনুরূপতাবাদ (The correspondence theory).
    তিন. সঙ্গতিবাদ (The coherence theory).
    চার. প্রয়োগবাদ (The pragmatic theory).

    আওহাম দা, এসবের দুরূহ-দার্শনিক বাকবিতণ্ডায় প্রবিষ্ট হওয়া আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি শুধু আপনাকে বুঝাতে চাচ্ছি যে, সত্যের মধ্যেও দুটি রূপ আসায় এবং তা নিরূপণের মানদণ্ড চার প্রকারে বিভক্ত হয়ে যাওয়ায়, আপনি কি বলবেন "সত্য"ই সত্য নয়?

    : না ভাইয়া। এরূপ বলা সম্ভব না। "সত্য" অবশ্যই আছে। নতুবা আমাদের অস্তিত্বই মিথ্যা হয়ে যাবে।

    : কিন্তু দাদা, স্বয়ং সত্যের দুটি রূপ থাকা সত্ত্বেও "সত্য" সত্য হয় কী করে? এর উত্তর আপনি দিবেন নাকি মুশির ভাই দিবেন?

    আওহামকে থামিয়ে দিয়ে মুশির বললো, উত্তরটি আমি দেওয়ার চেষ্টা করি। যেহেতু "দর্শন" নিয়ে আমার একটু-আধটু পড়াশোনা আছে।

    : আওহাম বললো, কোনো সমস্যা নেই। বলতে পারো তুমি।

    : মুশির বললো, আসল "সত্য" একটিই। কিন্তু আপনি সত্যের যে দু'টি রূপ দেখালেন, সেটি মূলত একই সত্যের দু'টি দিক মাত্র। যেভাবে এক টাকার অস্তিত্ব ধ্রুবসত্য। কিন্তু এই এক টাকার দুটি পৃষ্ঠ রয়েছে। তাই বলে এমন নয় যে, এক টাকার কোনো অস্তিত্বই নেই। আবার এমনও নয়, ওই এক টাকার দু'টি পৃষ্ঠ থাকায়, এক টাকার সত্যতা দু'টাকায় পরিণত হয়ে গেছে। ঠিক তেমনি ভাবে আপনি সত্যের যে দু'টি রূপ বলেছেন, সেগুলো মূলত একই সত্যের এপিঠ-ওপিঠ।

    : খুব সুন্দর করে বুঝালেন, মুশির ভাই। রিয়েলি, ইউ আর গ্রেট। বাকি থাকল সত্যের মানদণ্ড চার প্রকার। সে সম্পর্কে কী বলবেন? জিজ্ঞেস করলো ইহতিজাজ।

    : সেটাও এরকম যে, একই "সত্য" উদঘাটনের এবং বিশ্লেষণের চারটি পদ্ধতিমাত্র। যেভাবে একটি কাজ করার বিভিন্ন পদ্ধতি থাকতে পারে।

    : এক্সেলেন্ট, মুশির ভাই।

    আওহাম দা, আপনি তো জানেন, আরজ আলী সাহেব "স্বশিক্ষিত দার্শনিক" উপাধিপ্রাপ্ত একজন ব্যক্তি?

    : জী হ্যাঁ।

    : কিন্তু এটা কি জানেন স্বয়ং "দর্শন"ও এক এবং অভিন্ন নয়? কারণ দার্শনিকদের দর্শনের পদ্ধতিগুলো প্রথমত দু'ভাগে বিভক্ত।

    এক. বুদ্ধিনির্ভর দর্শন।
    দুই. বুদ্ধিবিযুক্ত দর্শন।

    এই প্রথমটি আবার চার প্রকার। আমি সেসবের আলোচনায় অবতীর্ণ হতে চাচ্ছি না। আমি শুধু বুঝাতে চাচ্ছি, দর্শন দু'ভাগে বিভক্ত হওয়ায় কি প্রমাণিত হয়ে গেলো "দর্শন" মিথ্যা? "দর্শন" বলতে কিছুই নেই? অবশ্যই না।

    তাহলে আমরা কী বুঝলাম? একটি বস্তু বা বিষয় মৌলিকভাবে "সত্য" হয়েও তার বিভিন্ন শাখা থাকতে পারে। যা তার থেকেই উদগত। সে তার এসব শাখা-প্রশাখা নিয়েই "সত্য" হিসেবে একটিমাত্র রূপ লাভ করে থাকে। তার মধ্যে বিভিন্ন শাখা হওয়ায়, “সত্য কোনটি” এরূপ সন্দেহে পতিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বরং সবটিই সঠিক এবং সবক'টি মিলে সত্যের রূপ একটি। আর সেটার নাম হলো "সত্য"।

    ঠিক এভাবে আওহাম দা, কুরআনপন্থী দলের রূপ হলো একটি। তথা "আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাত"। কিন্তু তার শাখা হলো চারটি বা চার মাযহাব। যেভাবে "সত্য" বিভিন্ন হয়েও, দর্শন বিভিন্ন প্রকারের বিভক্ত থাকা সত্ত্বেও এবং সত্য নিরূপণে দার্শনিকদের মানদণ্ড বিভিন্ন বিভাগে বিভক্ত হওয়ার পরও, সবগুলো এক বিন্দুতে মিলিত হয়ে আপন "সত্যরূপ" হিসেবে একটি মাত্র রূপ প্রকাশ করে; সেভাবে সুন্নিরা চার মাযহাবে বিভক্ত হয়েও একই সত্যের চাঁদোয়ার নিচে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে। আর সেটা হল "আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাত"।

    সহজে বুঝার স্বার্থে আরও একটি উদাহরণ দেই, দাদা। আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে কয়টি?

    : একটি।

    : কিন্তু এই যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর সেক্টর ছিল কয়টি?

    : ১১ টি।

    : তাই বলে কি তারা বিভিন্ন যুদ্ধের যোদ্ধা, নাকি সবাই একই যুদ্ধের যোদ্ধা?

    : সবাই একই যুদ্ধের যোদ্ধা।

    : কেন কেন, বিভিন্ন দলে বিভক্ত হওয়া সত্ত্বেও সবাই এক হলো কী করে?

    : কারণ, তাদের অভীষ্ট লক্ষ্য এবং ফর্মুলা এক ছিল, তাই।

    : একজ্যাক্টলি, চার মাযহাবের বিষয়টিও অনুরূপ। তাদের অভীষ্ট লক্ষ্য এবং ফর্মুলা হলো এক ও অভিন্ন। আর তা হলো নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বলে দেওয়া পন্থায় এক আল্লাহর গোলামী করা। সবাই একই সত্যের অনুরাগী-অনুগামী। বিধায়, মাযহাব চতুষ্টয়ের মধ্যে আমরা কোনো ধরনের হিংসা-বিদ্বেষ দেখতে পাই না। আমার এই দাবির সত্যতা বুঝাতে আপনাকে একটি ঘটনা শুনাই। "মালিকী মাযহাবের" ইমাম হলেন, ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ। তিনি তাঁর কিতাব "মুয়াত্তা মালিক"-এর মধ্যে নবী করীম সা.-এর হাদিসের বিশাল ভাণ্ডার জমা করেন। ইমাম মালিক রাহি. ছিলেন মদিনার বাসিন্দা। যখন "খলিফা মনসুর" হজে আসলেন, তখন তিনি ইমাম মালিক রাহি.কে অফার করলেন, "আপনার কিতাবটি কপি করে আমার প্রত্যেকটি প্রদেশে পাঠিয়ে দিয়ে ফরমান জারি করে দেই যে, আপনার এই কিতাবে জমাকৃত হাদিস অনুযায়ী যেন সকল মানুষ চলে। এই কিতাবের বাইরে কোনো আমল করা যাবে না। এছাড়া অন্যগুলো যেন ছেড়ে দেওয়া হয়।"

    জানেন দাদা, খলিফা মনসুর ছিলেন তখন অর্ধজাহানের শাসক! তাবৎ মুসলিম বিশ্বের খলিফা! তাঁর আদেশের সাথে সাথে ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ-এর কিতাব প্রত্যেক মুসলিমের ঘরে ঘরে চলে যেতো। সবাই সে কিতাব মেনে নিতে বাধ্য হতো। কিন্তু জানেন ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ এমন সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে কী বলেছিলেন?

    : কী বলেছিলেন, ভাইয়া?

    : ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ বলেছিলেন, "হে আমীরুল মুমিনীন, আপনি এমন করবেন না। কারণ, নবীজীর সকল হাদীস কারো একার পক্ষে জানা সম্ভব না। হতে পারে অন্যান্য এলাকাতে আমার অজানা অনেক হাদিস পৌঁছে গেছে। যার মধ্যে বিভিন্ন রেওয়ায়েত রয়েছে। সুতরাং তাঁরা যেসব হাদিস পেয়েছে এবং পূর্বসূরীদের কাছ থেকে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান গ্রহণ করেছে, তাদেরকে সেটার উপর ছেড়ে দিন। কোনো কোনো বর্ণনায় ঘটনাটিকে "খলিফা হারুনুর রশিদের" দিকে সম্বন্ধ করা হয়েছে যে, তিনি ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহকে এরূপ বলেছিলেন, "আপনার কিতাবটি আমি খানায়ে কাবায় টাঙিয়ে দিয়ে ঘোষণা করে দেই যে, আজ থেকে এ কিতাবে বর্ণিত হাদীস ছাড়া অন্য কোনো হাদিস মানা যাবে না।" ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ তখন উপরোল্লিখিত কথাগুলো বলেছিলেন।

    ঘটনা দু'টি হতে পারে। আবার একটিও হতে পারে। দু'টি হলেও অসম্ভবের কিছু নেই। কারণ, ইমাম মালিক রাহি. খলিফা হারুন এবং মামুন উভয় জনের জামানা পেয়েছেন। সুতরাং এ সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না যে, দুজন হয়তো তাঁকে সে অফারটি দু'বার দিয়েছিলেন।

    লক্ষ্য করুন দাদা, মাযহাবগুলোর মধ্যে কী পরিমাণ সৌহার্দ্যতা! একে অন্যের প্রতি কত সহিষ্ণু! কারণ, সবাই জানে তারা একই ঘরের, আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাতের, চারটি কামরার ন্যায়। মূলত সবাই এক। সবাই সুন্নি। সুন্নিরা চার মাযহাবে বিভক্ত হয়েও, একটি সত্যের অনুসারী হতে কোনো সমস্যা নেই। এটা সম্ভব। বুঝতে পারলেন তো, দাদা?

    : জি হ্যাঁ, ভাই। অনেক অনেক শুকরিয়া!!

    House of Wisdom

    House of Wisdom

    House of Wisdom — Inspired by the legacy of Baghdad’s Bayt al-Hikmah, where ideas meet knowledge, culture, philosophy, and civilization through thoughtful exploration.

    Post a Comment