Table of Contents
![]() |
| লাহোর প্রস্তাব ছিল মুসলিম জাতিসত্তার রাষ্ট্রীয় ভাষা পাওয়ার এক ঐতিহাসিক মোড় |
লাহোর প্রস্তাবকে সাধারণত একটি সরল গল্পে বলা হয়। ১৯৪০ সালে মুসলিম লীগ পাকিস্তানের দাবি তুলল, ফজলুল হক প্রস্তাব পেশ করলেন, তারপর ১৯৪৭-এ পাকিস্তান হলো। গল্পটি জনপ্রিয়, কিন্তু ইতিহাস এত সরল নয়। লাহোর প্রস্তাব কোনো একক মানুষের মাথা থেকে বের হওয়া কাগজ নয়। এটি ছিল কয়েকটি ভিন্ন স্রোতের মিলন। কংগ্রেস-শাসিত প্রদেশের অভিজ্ঞতা, মুসলিম নিরাপত্তাহীনতা, ইকবালের মুসলিম স্বাতন্ত্র্যের ধারণা, জিন্নাহর সর্বভারতীয় দরকষাকষির কৌশল, সিকান্দার হায়াত খানের পাঞ্জাবি প্রাদেশিকতা, বাংলার মুসলিম জনভিত্তি, এবং মুসলিম লীগের ভেতরের কেন্দ্র-প্রদেশ টানাপোড়েন।
এই প্রস্তাবের শক্তি কাগজের ভাষায় যতটা, তার চেয়ে বেশি ছিল রাজনৈতিক মুহূর্তে। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পর কংগ্রেস মন্ত্রিসভার অভিজ্ঞতা মুসলিম লীগকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে। মুসলমানদের একটি বড় অংশ দেখতে পায়, ব্রিটিশ চলে গেলে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের ভাষা, শিক্ষা, প্রতীক, প্রশাসন ও সাংবিধানিক ক্ষমতা কংগ্রেসীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার হাতে গেলে মুসলিম রাজনৈতিক সত্তার অবস্থান কোথায় থাকবে।
Iqbal, Jinnah and Pakistan দেখায়, ১৯৩৮ সালের Sind Provincial Muslim League Conference-এও Hindus and Muslims-কে two nations (দুই জাতি) হিসেবে ধরে মুসলমানদের full independence (পূর্ণ স্বাধীনতা)-এর উপযোগী সাংবিধানিক ব্যবস্থা তৈরির কথা ওঠে। এই ধারাই ১৯৪০ সালের লাহোরে আরও পূর্ণ রাজনৈতিক রূপ পায়। (Iqbal, Jinnah and Pakistan, pp. 66–67)
লাহোর প্রস্তাব তাই sudden separatism (হঠাৎ বিচ্ছিন্নতাবাদ) নয়। এটি ছিল দীর্ঘ জমে ওঠা political anxiety (রাজনৈতিক উৎকণ্ঠা), constitutional uncertainty (সাংবিধানিক অনিশ্চয়তা), provincial bargaining (প্রাদেশিক দরকষাকষি), এবং Muslim nationhood (মুসলিম জাতিসত্তা)-এর ভাষা পাওয়ার এক মোড়।
প্রস্তাবের পটভূমি; কংগ্রেস মন্ত্রিসভা, মুসলিম নিরাপত্তা ও নতুন সংবিধানের প্রশ্ন
১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পর কংগ্রেস সাতটি প্রদেশে মন্ত্রিসভা গঠন করে। মুসলিম লীগের জন্য এই সময়টা ছিল রাজনৈতিক শিক্ষা। কংগ্রেস নিজেকে সমগ্র ভারতের জাতীয় প্রতিনিধি হিসেবে হাজির করছিল; কিন্তু মুসলমানদের অভিজ্ঞতা বলছিল, কংগ্রেস-নিয়ন্ত্রিত প্রাদেশিক শাসনে তাদের ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক পরিচয়, শিক্ষানীতি, ভাষাগত মর্যাদা, প্রশাসনিক নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন যথেষ্ট নিশ্চয়তা পাচ্ছে না।
এই “নিশ্চয়তা না পাওয়া” কথাটি বিমূর্ত অভিযোগ নয়। কয়েকটি নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা মুসলিম রাজনীতির ভিতরে ভয় তৈরি করেছিল।
প্রথমত, কংগ্রেস মন্ত্রিসভাগুলোর আচরণ মুসলিম লীগের চোখে সংখ্যাগুরু শাসনের আগাম নমুনা হয়ে দাঁড়ায়। Ayesha Jalal দেখান, ১৯৩৭–৩৯ সময়ে লীগের প্রচারণার বড় অংশ কংগ্রেস মন্ত্রিসভাগুলোর বিরুদ্ধে গড়ে ওঠে। Congress tricolour (কংগ্রেসের তেরঙ্গা), Bande Mataram গাওয়া, Central Provinces-এর Vidya Mandir scheme, Wardha education scheme—এসবকে লীগ মুসলিম সংস্কৃতির ওপর আঘাতের প্রমাণ হিসেবে ব্যাখ্যা করে। জিন্নাহর ভাষায় কংগ্রেস মুসলিম স্বার্থ প্রতিনিধিত্ব করতে অক্ষম, অথচ অন্য সব দলকে বিলুপ্ত করে নিজের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, p. 43)
দ্বিতীয়ত, শিক্ষানীতি মুসলমানদের কাছে নিরীহ প্রশাসনিক বিষয় ছিল না। Wardha Scheme বা Vidya Mandir Scheme নিয়ে লীগের আপত্তির পেছনে ছিল এই ভয়: ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মন, ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় চেতনা কোন ফ্রেমে গড়া হবে? শিক্ষা যদি কংগ্রেসীয় জাতীয়তার অধীনে যায়, মুসলমানের আলাদা ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক সত্তা অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। Farooq Ahmad Dar জিন্নাহর লাহোর ভাষণের আলোচনা দিতে গিয়ে দেখান, তিনি Nagpur-এর Vidya Mandir Scheme এবং সর্বভারতীয় Wardha Scheme-এর negative impact (নেতিবাচক প্রভাব) বিশেষভাবে উল্লেখ করেছিলেন। তাঁর মন্তব্য ছিল, তিনি কখনো ভাবেননি কংগ্রেস এত নিচে নামবে। (Farooq Ahmad Dar, “Jinnah and the Lahore Resolution,” pp. 135–136)
তৃতীয়ত, মুসলিম নিরাপত্তার প্রশ্ন শুধু সংস্কৃতি নয়; রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নও। কংগ্রেস যদি নিজেকে একমাত্র জাতীয় প্রতিনিধি বলে, তাহলে মুসলিম লীগের আলাদা প্রতিনিধি-দাবি কোথায় দাঁড়াবে? Jalal দেখান, কংগ্রেস মুসলমানদের নির্বাচিত প্রতিনিধি, সাধারণ মানুষ এবং প্রাদেশিক মুসলিম faction (গোষ্ঠী)—সব স্তরে যোগাযোগ বাড়িয়ে Muslim mass contact movement (মুসলিম গণসংযোগ আন্দোলন) চালাতে চাচ্ছিল। জিন্নাহর কাছে এটি মুসলিম রাজনীতিবিদদের গলায় ছুরি ধরার মতো ছিল। কারণ মুসলিম সমাজের আলাদা রাজনৈতিক কণ্ঠ কংগ্রেসের “সর্বভারতীয়” ছাতার নিচে গিলে যেতে পারত। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, p. 43)
চতুর্থত, কংগ্রেসের high command (কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব) নিজের প্রাদেশিক মন্ত্রিসভাগুলোর ওপর যে নিয়ন্ত্রণ দেখাচ্ছিল, তা মুসলিম লীগের চোখে ভবিষ্যৎ কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের বিপদের ইঙ্গিত দেয়। আজ প্রদেশে কংগ্রেস মন্ত্রিসভা নিজেদের দলের স্বার্থে কাজ করছে; কাল যদি কেন্দ্রও কংগ্রেসের হাতে যায়, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে? Jalal এই ভয়কে জিন্নাহর রাজনৈতিক হিসাবের কেন্দ্রে রেখেছেন: কংগ্রেসের iron control (কঠোর নিয়ন্ত্রণ) নিজের প্রদেশগুলোর ওপর ভবিষ্যৎ কেন্দ্রীয় আধিপত্যের ইঙ্গিত দিচ্ছিল। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, p. 43)
পঞ্চমত, Neeti Nair-এর বিশ্লেষণ দেখায়, কংগ্রেসের “সব ভারতের প্রতিনিধি” দাবি দুর্বল হয়ে পড়ে কারণ তারা Muslim minorities (মুসলিম সংখ্যালঘু) এবং Hindu minorities (হিন্দু সংখ্যালঘু)-এর ভয়কে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি, এবং Hindu Mahasabha (হিন্দু মহাসভা)-র ক্রমশ তীব্র হয়ে ওঠা রাজনীতির সঙ্গে নিজেদের পরিষ্কার দূরত্ব তৈরি করতে পারেনি। ১৯৩৭ নির্বাচনের পর মুসলিম লীগের ভোটভিত্তি দুর্বল ছিল—মাত্র ৪.৪ শতাংশ Muslim vote—তবু কংগ্রেসের নিজের প্রতিনিধিত্ব-দাবি দুর্বল হয় minority fears (সংখ্যালঘু ভয়) অবহেলার কারণে। (Neeti Nair, Changing Homelands, pp. 159–160)
ষষ্ঠত, কংগ্রেস পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী ও মুসলিম সংরক্ষণের প্রশ্নে আগের অবস্থান থেকে সরে আসে। Nair দেখান, ১৯১৬ সালের Lucknow Pact-এ কংগ্রেস মুসলিম আলাদা প্রতিনিধিত্ব মেনে নিয়েছিল; ১৯২৮ সালের Nehru Report-এর আলোচনাতেও communal councils ও সংরক্ষণের ভাষা ছিল; ১৯৩৫ সালের Prasad-Jinnah negotiations-ও minority representation নিয়ে ভাবছিল। কিন্তু late 1930s-এর Nehruvian Congress পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী ও সংরক্ষিত আসনকে Indian nation-এর অগ্রগতির বিরোধী communal compartment (সাম্প্রদায়িক খোপ) হিসেবে দেখাতে শুরু করে। এই unilateral repudiation (একতরফা প্রত্যাখ্যান) মুসলমানদের কাছে betrayal (বিশ্বাসভঙ্গ) মনে হয়। Nair-এর মতে, কংগ্রেস মন্ত্রিসভাগুলোতে coalition (জোট) না থাকার পরিবেশে এই অবস্থান “Islam in Danger” এবং “Hindu Raj” স্লোগানকে শক্তি দেয়। (Neeti Nair, Changing Homelands, pp. 160–161)
সপ্তমত, জিন্নাহ ১৯৪০ সালের লাহোর ভাষণে এই অভিজ্ঞতাকে সরাসরি রাজনৈতিক ভাষা দেন। তিনি বলেন, মুসলমানরা কংগ্রেস-শাসিত প্রদেশ এবং কিছু দেশীয় রাজ্যে ill-treatment and oppression (অবহেলা ও নিপীড়ন)-এর অভিজ্ঞতা পেয়েছে; British Governors ও Governor-General-কে দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়েও ফল মেলেনি। তাঁর ভাষায় মুসলমানরা “between the devil and the deep sea”—দুই দিকের বিপদের মাঝখানে—পড়ে গেছে। এই অভিজ্ঞতা মুসলমানদের “more apprehensive” (আরও আশঙ্কাগ্রস্ত) করেছে এবং তারা “can trust nobody” (কাউকে ভরসা করতে পারে না)—এই মনস্তত্ত্বে পৌঁছেছে। (Farooq Ahmad Dar, “Jinnah and the Lahore Resolution,” pp. 135–136)
অষ্টমত, লাহোর প্রস্তাব সমর্থনকারী বক্তারাও একই অভিজ্ঞতা ব্যবহার করেন। Choudhury Khaliquzzaman বলেন, কংগ্রেস মন্ত্রিসভার নীতির কারণেই মুসলমানরা বুঝেছে তাদের existence (অস্তিত্ব) বিপদের মুখে। Sardar Aurangzeb Khan সরাসরি বলেন, মুসলমানরা British democracy (ব্রিটিশ গণতন্ত্র) চায় না, কারণ সেটি শুধু counting of heads (মাথা গোনা)। তাঁর দাবি ছিল, মুসলমানরা separate nation (আলাদা জাতি); তাদের home (নিজস্ব রাজনৈতিক ঘর) দরকার। (Farooq Ahmad Dar, “Jinnah and the Lahore Resolution,” pp. 142–143)
তাই লাহোরে বক্তাদের ভাষণে কংগ্রেস শাসনের অভিজ্ঞতা বারবার ফিরে আসে। Dar দেখান, প্রস্তাব সমর্থনকারী বক্তারা কংগ্রেস মন্ত্রিসভার “two and a half years” বা আড়াই বছরের আচরণকে মুসলমানদের চোখ খুলে দেওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখেছিলেন। Ibrahim Ismail Chundrigar বলেছিলেন, কংগ্রেসের Constituent Assembly proposal (গণপরিষদ প্রস্তাব) মুসলমানদের permanent minority (স্থায়ী সংখ্যালঘু) বানিয়ে দেবে, যা মুসলিম লীগের কাছে অসহনীয়। (Farooq Ahmad Dar, “Jinnah and the Lahore Resolution,” pp. 144–145)
এই অভিযোগগুলোকে শুধু প্রচারণা বলে উড়িয়ে দিলে মুসলিম রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব বোঝা যায় না। কংগ্রেসের শাসন মুসলমানদের কাছে এমন এক ভবিষ্যতের preview (আগাম নমুনা) হয়ে দাঁড়ায়, যেখানে ব্রিটিশ চলে গেলে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র কংগ্রেসের হাতে যাবে, আর মুসলমানরা সংখ্যার গণতন্ত্রে স্থায়ীভাবে দুর্বল অবস্থায় থাকবে। লাহোর প্রস্তাব সেই ভয়কে রাষ্ট্রীয় ভাষায় রূপ দেয়।
১৯৩৫ সালের Government of India Act মুসলমানদের পূর্ণ নিরাপত্তা দিতে পারেনি। পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী থাকলেও কেন্দ্রীয় ক্ষমতা, সংবিধান-রচনা, প্রাদেশিক স্বায়ত্ততা ও সর্বভারতীয় প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে মুসলিম লীগ সন্তুষ্ট নয়। প্রস্তাবে তাই প্রথমেই বলা হয়, কোনো constitutional plan (সাংবিধানিক পরিকল্পনা) মুসলমানদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না, যদি তা মুসলমানদের approval and consent (অনুমোদন ও সম্মতি) ছাড়া তৈরি হয়। Iqbal, Jinnah and Pakistan লাহোর প্রস্তাবের মূল দাবির অংশ উদ্ধৃত করে দেখায়, Muslim India ১৯৩৫-এর কাঠামোর সংশোধন নয়; পুরো constitutional plan নতুনভাবে বিবেচনা করতে চাচ্ছিল। (Iqbal, Jinnah and Pakistan, p. 67)
এই ভাষা গুরুত্বপূর্ণ। মুসলমানরা আর শুধু কিছু আসন বা চাকরির ভাগ চাচ্ছিল না। তারা বলছিল, রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো তাদের সম্মতি ছাড়া তৈরি হতে পারে না। এটাই minority rights (সংখ্যালঘু অধিকার) থেকে Muslim nationhood (মুসলিম জাতিসত্তা)-এর দিকে যাত্রা।
আসল খসড়া কার; লেখকত্ব নয়, রাজনৈতিক গঠনের প্রশ্ন
লাহোর প্রস্তাবের সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নগুলোর একটি হলো, আসল খসড়া কার? কেউ বলেন সিকান্দার হায়াত খান, কেউ বলেন জাফরুল্লাহ খান, কেউ ফজলুল হকের নাম সামনে আনেন, আবার জনপ্রিয় স্মৃতিতে অনেক সময় পুরো প্রস্তাবটি জিন্নাহর কৌশল হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়। সোজা উত্তর নেই। সোজা উত্তর খোঁজাও ভুল পদ্ধতি।
Jalal পরিষ্কার করেন, Working Committee যে constitutional sub-committee (সাংবিধানিক উপকমিটি) গঠন করেছিল, তার deliberations (আলোচনার পূর্ণ রেকর্ড) নেই। তাই প্রস্তাবের ভিতরের সব উপাদান কোন টেবিলে, কোন শব্দে, কোন দরকষাকষিতে মিশেছে, তা সম্পূর্ণভাবে document (দলিল)-করা যায় না। কিন্তু কয়েকটি সূত্র স্পষ্ট। Muslim-majority provinces (মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ), বিশেষ করে Punjab thesis (পাঞ্জাব-থিসিস), প্রস্তাব তৈরিতে বড় প্রভাব ফেলেছিল। Sikandar Hayat Khan পরে অস্বীকার করেন যে, প্রস্তাব তাঁর draft (খসড়া)-এর ওপর দাঁড়িয়েছিল। তিনি দাবি করেন, এটি লীগের দৃষ্টিভঙ্গি, পাঞ্জাবের নয়। তবু Jalal লিখছেন, Punjab thesis ছিল প্রস্তাবের গঠনে শক্তিশালী, সম্ভবত সবচেয়ে শক্তিশালী প্রভাবগুলোর একটি। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, p. 55)
প্রশ্নটি তাই “কার খসড়া?” নয়; প্রশ্নটি “কোন রাজনৈতিক স্রোত কোন ভাষায় মিশেছে?” সিকান্দার পাঞ্জাবের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রাদেশিক স্বায়ত্ততা, দুর্বল কেন্দ্র, এবং মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের নিরাপত্তা ভাবছিলেন। জাফরুল্লাহ খান একটি constitutional scheme (সাংবিধানিক পরিকল্পনা) নিয়ে চিন্তা করেছিলেন, যেখানে বিভিন্ন বিকল্প ছিল। জিন্নাহ চাইছিলেন কেন্দ্রীয় দরকষাকষির জন্য সর্বভারতীয় মুসলিম দাবি। ফজলুল হক প্রস্তাব পেশ করে বাংলার মুসলমানদের রাজনৈতিক উপস্থিতিকে সর্বভারতীয় মুসলিম দাবির মঞ্চে দৃশ্যমান করলেন।
Dar দেখান, ১৯৩৯ সালে একটি committee গঠিত হয়, যার সভাপতি ছিলেন জিন্নাহ এবং convenor (আহ্বায়ক) লিয়াকত আলী খান। সদস্যদের মধ্যে সিকান্দার হায়াত খান, নবাব মুহাম্মদ ইসমাইল, স্যার আবদুল্লাহ হারুন, খাজা নাজিমুদ্দিন, আবদুল মতিন চৌধুরীসহ বিভিন্ন প্রাদেশিক প্রতিনিধি ছিলেন। এই কমিটি থেকেই বোঝা যায়, লাহোর প্রস্তাব ছিল সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় কৌশল এবং প্রাদেশিক মুসলিম নেতৃত্বের উদ্বেগ—দুইয়ের মিশ্রণ। (Farooq Ahmad Dar, “Jinnah and the Lahore Resolution,” p. 151, n. 15)
জাফরুল্লাহ খানের নাম নিয়ে বিতর্কও আছে। Wali Khan দাবি করেন, Zafrullah Khan-ই Pakistan Resolution-এর প্রকৃত লেখক। কিন্তু Dar এই দাবিকে সরলভাবে গ্রহণ করেন না। তিনি দেখান, জাফরুল্লাহর note ছিল বিস্তৃত; তাতে কয়েকটি scheme (পরিকল্পনা) ছিল, তার একটিকে Separation Scheme বলা হয়। জাফরুল্লাহ নিজেই সেই separation scheme-কে “impossible” ও “impracticable” বলেছিলেন এবং বিভিন্ন পক্ষকে পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার পথে যাওয়ার আহ্বান করেছিলেন। এই মনোভাব Lahore Resolution-এর ভাষায় সরাসরি প্রতিফলিত নয়। (Farooq Ahmad Dar, “Jinnah and the Lahore Resolution,” pp. 147–148)
অতএব “একজন লেখক” খোঁজার বদলে প্রস্তাবকে political document (রাজনৈতিক দলিল) হিসেবে পড়া দরকার। এটি একক ব্যক্তির রচনা নয়; এটি বহু স্বার্থ, ভয়, কৌশল ও ভবিষ্যৎ-কল্পনার সমঝোতা।
সিকান্দার হায়াত; পাঞ্জাব-থিসিস ও প্রাদেশিক স্বায়ত্ততার রাজনীতি
সিকান্দার হায়াত খানকে বাদ দিয়ে লাহোর প্রস্তাব বোঝা যায় না। পাঞ্জাব ছিল মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ, কিন্তু তার রাজনীতি সরল মুসলিম লীগ রাজনীতি নয়। Unionist Party (ইউনিয়নিস্ট পার্টি), জমিদার, মুসলমান, শিখ, হিন্দু, প্রাদেশিক স্বার্থ, কৃষি-অর্থনীতি, প্রশাসনিক ভারসাম্য—সব মিলিয়ে পাঞ্জাবকে চালাত। পাঞ্জাবি মুসলিম নেতৃত্বের চিন্তা ছিল সর্বভারতীয় মুসলিম কৌশলের সঙ্গে সবসময় এক নয়।
Jalal দেখান, ১৯৪০ সালের আগে Muslim-majority provinces (মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ)—বিশেষ করে Punjab ও Bengal-এর premiers (প্রাদেশিক প্রধানমন্ত্রী)—মূলত provincial autonomy (প্রাদেশিক স্বায়ত্ততা) রক্ষা ও বাড়ানোর ব্যাপারে বেশি সচেতন ছিলেন। Fazlul Huq জানুয়ারি ১৯৪০-এ Working Committee-তে একটি resolution পাঠিয়েছিলেন, যেখানে provincial autonomy পরীক্ষা করার জন্য Royal Commission চাওয়ার কথা ছিল। পাঞ্জাবের সিকান্দারও কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগের অধীনে প্রদেশকে পুরোপুরি সমর্পণ করতে চাননি। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, pp. 54–55)
পাঞ্জাব-থিসিসের লক্ষ্য ছিল শক্তিশালী কেন্দ্র নয়; বরং এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে প্রদেশগুলো নিজস্ব স্বায়ত্ততা বজায় রাখবে। Jalal-এর ভাষ্যে Working Committee-এর brief-এ পূর্ব ও পশ্চিমের মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলোকে independent dominions (স্বাধীন dominion) হিসেবে ভাবা হয়েছিল; প্রতিটি অঞ্চলের constituent units (গঠক একক) autonomous units (স্বায়ত্ত একক) হবে। সিন্ধু ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের মুসলিম রাজনীতিকদের আশ্বস্ত করার জন্য এই ভাষা দরকার ছিল। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, p. 55)
সিকান্দারের চিন্তা জিন্নাহর central strategy (কেন্দ্রীয় কৌশল)-এর সঙ্গে সহজে মেলেনি। জিন্নাহ চাইছিলেন মুসলিম ভারতের একক political claim (রাজনৈতিক দাবি) তৈরি করতে। সিকান্দার চাইছিলেন পাঞ্জাবের প্রাদেশিক জটিলতা অক্ষুণ্ণ রাখতে। এই দ্বন্দ্ব লাহোর প্রস্তাবের ভাষায় ambiguity (অস্পষ্টতা) তৈরি করেছে। “Independent States” (স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ), constituent units autonomous and sovereign (গঠক একক স্বায়ত্ত ও সার্বভৌম)—এই ভাষা প্রদেশগুলোকে আশ্বস্ত করার ভাষা। একই সঙ্গে সেটি জিন্নাহর হাতে সর্বভারতীয় দরকষাকষির অস্ত্রও।
এই প্রস্তাব তাই সরল “এক রাষ্ট্র” নয়, আবার সরল “বহু রাষ্ট্র”ও নয়। এটি ছিল strategic ambiguity (কৌশলগত অস্পষ্টতা)। রাজনীতি অনেক সময় স্পষ্টতার চেয়ে অস্পষ্টতায় কাজ করে। জিন্নাহ জানতেন, খুব নির্দিষ্ট পরিকল্পনা দিলে পাঞ্জাব, বাংলা, সিন্ধু, সীমান্ত প্রদেশ, সংখ্যালঘু প্রদেশ—সব পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ বিস্ফোরিত হবে। অস্পষ্টতা তাঁকে সবার দাবিকে সাময়িকভাবে এক পতাকার নিচে রাখতে সাহায্য করেছিল।
ফজলুল হকের কণ্ঠের বাইরে বাংলার রাজনৈতিক শরীর
লাহোর প্রস্তাবের ইতিহাসে বাংলার নাম সাধারণত ফজলুল হকের মাধ্যমে স্মরণ করা হয়। এই স্মরণ অকারণ নয়। তিনি প্রস্তাব পেশ করেছিলেন; লাহোরের মঞ্চে তাঁর কণ্ঠের মাধ্যমে বাংলার মুসলমান সর্বভারতীয় মুসলিম রাজনীতির এক নির্ণায়ক মুহূর্তে দৃশ্যমান হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস যদি এই এক মুহূর্তেই আটকে যায়, তাহলে বাংলার ভূমিকা সংকুচিত হয়ে পড়ে। ফজলুল হক প্রস্তাবের পেশকারী; তিনি তার লেখক নন, একক নির্মাতাও নন। তাঁর ভূমিকা ছিল বাংলার প্রাদেশিক ও জনভিত্তিক শক্তিকে লাহোরের মঞ্চে উপস্থিত করা। কিন্তু ১৯৪০-এর দশকে বাংলার মুসলিম রাজনীতিকে সংগঠনের শরীর দেওয়া, জেলা পর্যায়ে নামানো, নির্বাচনী শক্তিতে রূপ দেওয়া, এবং সামাজিক ভাষা দেওয়ার কাজ স্থায়ীভাবে তাঁর হাতে থাকেনি।
বাংলার মুসলমানের রাজনৈতিক ইতিহাস বুঝতে হলে “ফজলুল হক প্রস্তাব পেশ করেছিলেন”—এই বাক্যের বাইরে যেতে হয়। বাংলার ভিতরে তখন কাজ করছিল কৃষক-প্রজা বাস্তবতা, পূর্ববঙ্গের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার আত্মবিশ্বাস, কলকাতাকেন্দ্রিক মুসলিম অভিজাত ও ব্যবসায়ী শক্তি, হিন্দু অভিজাত আধিপত্যের প্রশ্ন, জমি-শ্রেণি-সংস্কৃতির সংঘাত, এবং মুসলিম লীগকে mass politics (জনরাজনীতি)-এর স্তরে নামানোর সংগঠনী প্রয়োজন। এই বৃহত্তর পরিসর না ধরলে বাংলার মুসলিম political agency (রাজনৈতিক কার্যক্ষমতা) বোঝা যায় না। আর এই পরিসরেই সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমকে কেন্দ্রীয় জায়গায় আনতে হয়। তাঁদের ছাড়া বাংলার পাকিস্তান-রাজনীতি শুধু লাহোরের একটি প্রস্তাব-পেশের স্মৃতিতে আটকে থাকে; সংগঠন, সমাজ, নির্বাচন ও প্রাদেশিক কল্পনার পূর্ণ শরীর পায় না।
ফজলুল হক; পেশকারী, নির্মাতা নন
ফজলুল হক লাহোর প্রস্তাব পেশ করেছিলেন। তাঁর নামের সঙ্গে প্রস্তাবের সম্পর্ক তাই স্বাভাবিক। বাংলার মুসলমানদের কাছে এটি গৌরবের জায়গা। কিন্তু ইতিহাসের কাজ গৌরবকে মিথে পরিণত করা নয়; বাস্তব অবস্থান বুঝে নেওয়া।
ফজলুল হক তখন বাংলার Premier (প্রধানমন্ত্রী), কৃষক-প্রজা রাজনীতির মানুষ। প্রাদেশিক মুসলিম জনভিত্তির গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। তিনি জিন্নাহর মতো সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় সংগঠক নন। তাঁর রাজনীতি ছিল বাংলার জমিদারি, কৃষক, গ্রামীণ মুসলমান, কলকাতাকেন্দ্রিক মুসলিম elite (অভিজাত), এবং প্রাদেশিক ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। লাহোরে তাঁর প্রস্তাব পেশ করা বাংলার মুসলমানদের সর্বভারতীয় মুসলিম দাবির ভিতরে একটি দৃশ্যমান স্থান দেয়।
Jalal বাংলার মুসলিম রাজনীতির ভেতরের বিভাজন তুলে ধরেছেন। Eastern Bengal (পূর্ববঙ্গের) মুসলিম রাজনীতি, Calcutta-based Muslim elite (কলকাতাকেন্দ্রিক মুসলিম অভিজাত), Krishak Praja Party, United Muslim Party—সব মিলিয়ে ফজলুল হকের অবস্থান ছিল জটিল। ১৯৩৫–৩৬ সালে তিনি পূর্ববাংলার মুসলমানদের সমর্থনের ভিত্তিতে প্রাদেশিক ক্ষমতার জন্য লড়ছিলেন; কলকাতার পশ্চিমভিত্তিক মুসলিম নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর টানাপোড়েন ছিল। জিন্নাহ বাংলায় লীগের সংগঠন গড়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু ফজলুল হক নিজের পরিচয় ও নেতৃত্ব ছাড়তে প্রস্তুত ছিলেন না। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, p. 24)
ফজলুল হক তাই লাহোর প্রস্তাবের পেশকারী হলেও প্রস্তাবের একক স্থপতি নন। তিনি প্রস্তাবকে বাংলার বাস্তবতায় রাজনৈতিক শক্তি দেন। তাঁর হাত দিয়ে প্রস্তাব পেশ করানোও জিন্নাহর কৌশলের অংশ। এতে বাংলার মুসলমানদের প্রাদেশিক ও জনভিত্তিক দাবিকে সর্বভারতীয় মুসলিম দাবির সঙ্গে যুক্ত করা যায়। মুসলিম লীগ তখনও বাংলার ওপর পুরো নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। ফজলুল হকের উপস্থিতি প্রস্তাবকে শুধু elite bargaining (অভিজাত দরকষাকষি) থেকে বের করে বৃহত্তর মুসলিম প্রাদেশিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করে।
লাহোরের পর ফজলুল হকের সঙ্গে জিন্নাহর সম্পর্ক মসৃণ থাকেনি। Jalal দেখান, War effort (যুদ্ধ প্রচেষ্টা) নিয়ে লীগ high command (কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব) প্রাদেশিক premiers-দের ওপর নিয়ন্ত্রণ চাইলে ফজলুল হক বাধা দেন। তিনি বলেন, provincial government (প্রাদেশিক সরকার)-এর সদস্য হিসেবে যুদ্ধ প্রচেষ্টায় তাঁর দায়িত্ব আছে। লীগ সদস্যপদ ও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বের মধ্যে বেছে নিতে হলে তিনি শেষটিকেই অগ্রাধিকার দেবেন। পরে তিনি কেন্দ্রীয় লীগের নির্দেশ মানতে অস্বীকার করে ভেঙে যান। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, pp. 65–68)
এর সঙ্গে যুক্ত হয় Huq–Syama Prasad Mukherjee coalition (হক-শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী জোট)-এর প্রশ্ন। ১৯৪১ সালে ফজলুল হক মুসলিম লীগের সঙ্গে বিরোধের পর শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর Hindu Mahasabha (হিন্দু মহাসভা)-ঘনিষ্ঠ শক্তির সঙ্গে জোট সরকার গঠন করেন। এই জোটকে কেউ কেউ Hindu-Muslim cooperation (হিন্দু-মুসলিম সহযোগিতা)-এর চেষ্টা হিসেবে পড়েন, কিন্তু বাংলার মুসলিম লীগ রাজনীতির দৃষ্টিতে এটি ছিল গুরুতর rupture (ছেদ)। কারণ লাহোর প্রস্তাব পেশকারী নেতা নিজেই মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় দাবির বাইরে প্রাদেশিক ক্ষমতার জোটে চলে গেলেন। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, pp. 65–68)
এই ঘটনা লাহোর প্রস্তাবের ভেতরের একটি সত্য খুলে দেয়। প্রস্তাব পেশ হওয়ার মুহূর্তে মুসলিম ঐক্য যত দৃশ্যমান ছিল, ভিতরে প্রাদেশিক স্বার্থ, ব্যক্তিগত নেতৃত্ব, কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ, কৃষক-রাজনীতি ও elite politics (অভিজাত রাজনীতি)-এর দ্বন্দ্ব ততটাই বাস্তব। ফজলুল হক প্রস্তাবের মুখ, কিন্তু বাংলার পাকিস্তান দাবির দীর্ঘমেয়াদি সংগঠনী কেন্দ্র নন।
সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম; বাংলায় দাবির সংগঠনী শরীর
বাংলার মুসলমানের রাজনৈতিক agency (কার্যক্ষমতা) বুঝতে হলে শুধু লাহোরের মঞ্চে ফজলুল হকের প্রস্তাব-পেশের মুহূর্তে আটকে থাকা যায় না। ফজলুল হকের ঐতিহাসিক মর্যাদা আছে, কিন্তু তিনি লাহোর প্রস্তাবের লেখক নন, এবং ১৯৪০-এর দশকে বাংলার পাকিস্তান-আন্দোলনের স্থায়ী সংগঠনী ধারকও নন। বাংলার মুসলিম রাজনীতিকে mass politics (জনরাজনীতি), district mobilisation (জেলা-স্তরের সংগঠন), electoral force (নির্বাচনী শক্তি), এবং social programme (সামাজিক কর্মসূচি)-এর শরীর দেয় Suhrawardy–Abul Hashim line (সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশিম রেখা)। তাই বাংলার ভূমিকা বুঝতে হলে ফজলুল হককে সম্মান দিয়ে, কিন্তু তাঁর প্রতীকী ভূমিকার বাইরে গিয়ে, সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমকে কেন্দ্রীয় জায়গায় আনতে হবে।
Jalal দেখান, ১৯৪৩–৪৫ সময়ে Bengal Muslim League-এর ভেতরে Nazimuddin faction (নাজিমুদ্দিন গোষ্ঠী) ও Suhrawardy faction (সোহরাওয়ার্দী গোষ্ঠী)-এর লড়াই তীব্র হয়। Pro-Nazimuddin business magnates (নাজিমুদ্দিনপন্থী ব্যবসায়ী মহল), যেমন Haji Adamji Daud ও Ispahani, আগের অবস্থান ধরে রাখতে পারেননি। Bengal থেকে AIML Council-এ যাওয়া শতাধিক প্রতিনিধির প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে সোহরাওয়ার্দীর প্রতি আনুগত্য রাখত। Suhrawardy ministry (মন্ত্রিসভা)-র তুলনায় League organisation (লীগ সংগঠন)-এর ওপর বেশি প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, p. 104)
এই সংঘর্ষের মধ্যেই Abul Hashim নিজের শক্তি হয়ে ওঠেন। Jalal স্পষ্ট লিখেছেন, Hashim দুই faction-এর বাইরে দাঁড়িয়ে “a power in his own right” (নিজস্ব শক্তি) হয়ে উঠছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল League-এ vitality and force (প্রাণ ও শক্তি) আনা। তিনি জেলা লীগগুলোকে অফিস, full-time workers (পূর্ণকালীন কর্মী), reading rooms (পাঠাগার), বই-পত্রিকা, এবং মানুষের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হতে বলেছিলেন। তাঁর কাছে লীগ শুধু electioneering campaign (নির্বাচনী প্রচারণা) বা tub-thumping propaganda (চিৎকারধর্মী প্রচার) দিয়ে চলতে পারে না; তাকে খাদ্যসংকটসহ মানুষের concrete problems (বাস্তব সমস্যা)-এ কাজ করতে হবে। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, pp. 104–105)
Hashim-এর draft manifesto (খসড়া ইশতেহার) ছিল আরও গুরুত্বপূর্ণ। সেটি Bengal League-এর লক্ষ্য জনগণের সামনে সংজ্ঞায়িত করার প্রথম প্রাদেশিক চেষ্টা। সেখানে Pakistan (পাকিস্তান)-কে Islamic state (ইসলামি রাষ্ট্র)-এর সঙ্গে কিছুটা অস্পষ্টভাবে মিলিয়ে দেখা হলেও, manifesto-র বড় অংশে ছিল equality (সমতা), fraternity (ভ্রাতৃত্ব), poor people’s rights (দরিদ্রের অধিকার), এবং vested interests (স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী)-এর বিরুদ্ধে ভাষা। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, p. 105)
১৯৪৫ সালের Parliamentary Board fight (পার্লামেন্টারি বোর্ডের লড়াই)-এও Suhrawardy–Hashim শক্তি পরিষ্কার। Nazimuddin আগের দিন পর্যন্ত কয়েকটি আসন ধরে ফেলেছিলেন বলে ভাবছিলেন, কিন্তু Suhrawardy ও Abul Hashim বাকি পাঁচটি আসন জিতে নেন। ফলে Suhrawardy Board-এ dominance (প্রাধান্য) পায় এবং নির্বাচনের পর League parliamentary party leadership (লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির নেতৃত্ব)-এর পথ নিশ্চিত হয়। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, p. 156)
এই ঘটনাগুলো দেখায়, বাংলার মুসলমান জিন্নাহর passive follower (নিষ্ক্রিয় অনুসারী) ছিল না। বাংলার ভিতরে নিজস্ব সংগঠন, faction (গোষ্ঠী), district mobilisation (জেলা সংগঠন), সামাজিক ভাষা, কৃষক-প্রজা বাস্তবতা এবং নেতৃত্বের টানাপোড়েন ছিল। জিন্নাহ সর্বভারতীয় দরকষাকষির মুখ, কিন্তু বাংলার মুসলিম রাজনীতির সংগঠনী শরীর গড়ে উঠছিল বাংলার ভিতরেই।
মুসলিম লীগের সংশোধনী ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া
লাহোর প্রস্তাব পেশ হওয়ার পর তা শুধু আবেগী ভাষণে শেষ হয়নি। Subjects Committee (বিষয় কমিটি) প্রস্তাব ও লীগের constitution (গঠনতন্ত্র)-সংক্রান্ত সংশোধনী বিবেচনা করে। Dar দেখান, মূল resolution-এর আলোচনা শেষ হওয়ার পর Liaquat Ali Khan মুসলিম লীগের constitution-এ কিছু amendment (সংশোধনী) পেশ করেন, যা Subjects Committee অনুমোদন করেছিল। সব amendment কোনো পরিবর্তন ছাড়াই গৃহীত হয়। (Farooq Ahmad Dar, “Jinnah and the Lahore Resolution,” p. 145)
এই প্রক্রিয়া প্রমাণ করে, লাহোর অধিবেশন শুধু প্রতীকী ঘোষণা নয়; এটি সংগঠনকে নতুন লক্ষ্যের সঙ্গে সাজানোর পদক্ষেপ। প্রস্তাব পাস হওয়ার পর জিন্নাহ ২৪ মার্চ ১৯৪০-কে Muslim India (মুসলিম ভারতের) ভবিষ্যৎ ইতিহাসের red letter day (স্মরণীয় দিন) বলে ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, লাহোর প্রস্তাব মুসলমানদের ultimate goal (চূড়ান্ত লক্ষ্য) clearest possible manner (সবচেয়ে পরিষ্কারভাবে) সংজ্ঞায়িত করেছে। তিনি প্রাদেশিক, জেলা ও প্রাথমিক লীগ সংগঠনগুলোকে জনসভা করার আহ্বান জানান, যাতে Muslim India-এর verdict (রায়) নিয়ে কারও মনে সন্দেহ না থাকে। (Farooq Ahmad Dar, “Jinnah and the Lahore Resolution,” p. 147)
এই আহ্বান গুরুত্বপূর্ণ। জিন্নাহ বুঝেছিলেন, কাগজে resolution পাস করলেই চলবে না; সেটিকে Muslim mass opinion (মুসলিম জনমত)-এর ভাষায় নামাতে হবে। April 19-কে Muslim self-determination and Muslim independence-day (মুসলিম আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মুসলিম স্বাধীনতা দিবস) হিসেবে পালন করার আহ্বানও এই mobilisation (সংগঠনী সক্রিয়তা)-এর অংশ। (Farooq Ahmad Dar, “Jinnah and the Lahore Resolution,” p. 147)
লাহোর প্রস্তাব তাই কাগজ থেকে জনমতে, elite negotiation (অভিজাত দরকষাকষি) থেকে popular slogan (জনস্লোগান)-এ রূপ নিতে শুরু করে। এই রূপান্তরের মধ্যেই history (ইতিহাস) ধীরে ধীরে myth (মিথ) হয়ে ওঠে।
“পাকিস্তান প্রস্তাব” কীভাবে কিংবদন্তি হলো
সবচেয়ে বড় মিথ হলো—লাহোর প্রস্তাব মানেই Pakistan Resolution. কিন্তু ১৯৪০ সালের অধিবেশনের বাস্তবতা আলাদা।
Dar স্পষ্ট লিখেছেন, resolution-এর text-এ “Pakistan” শব্দটি ছিল না। জিন্নাহ বা অন্য কোনো মুসলিম লীগ নেতার লাহোর অধিবেশনের বক্তৃতাতেও শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি। সে সময় “Pakistan” শব্দটি মূলত Chaudhary Rahmat Ali ও Cambridge circle-এর সঙ্গে যুক্ত ছিল, যারা ১৯৩৩ সালের Now or Never pamphlet-এ উত্তর-পশ্চিম ভারতীয় মুসলিম অঞ্চলকে কেন্দ্র করে Pakistan ধারণা দেয়; সেখানে Bengal-এর কথা ছিল না। Lahore Resolution-এর scope (পরিসর) ছিল অনেক বিস্তৃত। (Farooq Ahmad Dar, “Jinnah and the Lahore Resolution,” pp. 148–149)
শব্দটি জনপ্রিয় করে তোলে বিরোধী press (সংবাদমাধ্যম), বিশেষ করে Hindu newspapers যেমন Milap, Pratap, Bande Mataram. তারা resolution-কে “Pakistan Resolution” বলতে শুরু করে। Muslim League ও জিন্নাহ পরে শব্দটি গ্রহণ করেন। ২৫ ডিসেম্বর ১৯৪০ Delhi session-এ জিন্নাহ বলেন, তারা একটি শব্দ চাচ্ছিলেন; শব্দটি তাঁদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হলেও Lahore Resolution-এর synonym (সমার্থক নাম) হিসেবে ব্যবহার করা সুবিধাজনক হয়ে ওঠে। (Farooq Ahmad Dar, “Jinnah and the Lahore Resolution,” pp. 148–149)
এই ঘটনা রাজনৈতিক ভাষার জন্ম বুঝতে সাহায্য করে। কখনো কোনো আন্দোলন নিজের শব্দ নিজে বানায়; কখনো প্রতিপক্ষ শব্দ দেয়, আন্দোলন সেটিকে দখল করে নেয়। “Pakistan Resolution” সেই দ্বিতীয় ধরনের উদাহরণ। বিরোধীরা শব্দটি বিদ্রূপে ব্যবহার করেছিল; লীগ সেটিকে দাবির নাম বানিয়ে নেয়। পরে জনতার স্মৃতিতে Lahore Resolution আর Pakistan Resolution আলাদা থাকে না।
এই রূপান্তর মিথ-নির্মাণের শুরু। প্রস্তাবের মূল শব্দ ছিল “Independent States” (স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ)। “Pakistan” শব্দ ছিল না। Two Nation Theory (দুই জাতি তত্ত্ব) প্রস্তাবের foundation (ভিত) হিসেবে কাজ করলেও text-এ তা স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যাত নয়। ১৯৪৬ সালের Muslim League Legislators’ Convention প্রস্তাবে এই ফাঁক পূরণ করা হয়। Iqbal, Jinnah and Pakistan দেখায়, ১৯৪৬ সালের resolution লাহোর প্রস্তাবকে revise (সংশোধিত) ও elaborate (বিস্তৃত) করে; সেখানে Hindus and Muslims দুই distinct major nations (দুই স্বতন্ত্র প্রধান জাতি) হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয় এবং “Independent States” বদলে Bengal-Assam ও North-Western zones নিয়ে sovereign independent State (একক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র) Pakistan-এর ভাষা আসে। (Iqbal, Jinnah and Pakistan, pp. 71–72)
অতএব ১৯৪০ থেকে ১৯৪৬ পর্যন্ত ধারণা বদলেছে। লাহোর প্রস্তাবকে পরে যে একক পাকিস্তান দাবির ভিত্তি হিসেবে পড়া হয়, তা রাজনৈতিকভাবে সত্য হলেও textually (পাঠগতভাবে) সরাসরি নয়। ইতিহাস ও মিথের ফারাক এখানেই।
প্রাদেশিক নেতৃত্ব বনাম কেন্দ্রীয় কৌশল
লাহোর প্রস্তাবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর হলো প্রাদেশিক নেতৃত্ব ও জিন্নাহর কেন্দ্রীয় কৌশলের দ্বন্দ্ব। জিন্নাহ Muslim India-র sole spokesman (একক মুখপাত্র) হতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু Punjab, Bengal, Sind, NWFP—সব মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশের নেতৃত্ব তাঁর নির্দেশে সহজে চলেনি।
Jalal কঠিন ভাষায় দেখান, লাহোর প্রস্তাব পাস হওয়ার পরও মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ কোনো বড় প্রদেশই পুরোপুরি জিন্নাহর লাইনে আসেনি। Punjab-এ Sikhs ও Hindus-এর প্রতিক্রিয়া সিকান্দারকে চাপের মুখে ফেলে; Unionist Party পাঞ্জাবি সমীকরণ বাঁচাতে Lahore Resolution থেকে দূরত্ব নিতে বাধ্য হয়। জিন্নাহ নিজেও পাঞ্জাবিদের বলেছিলেন, Lahore Resolution বাস্তবায়নে Punjab key position (চাবিকাঠির অবস্থান) ধরে আছে। কিন্তু resolution-এর ভাষা Punjab-এর অন্য দুই বড় সম্প্রদায়, বিশেষ করে Sikhs-এর কাছে অগ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, p. 66)
Bengal-এ ফজলুল হক কেন্দ্রীয় লীগের নিয়ন্ত্রণ মানতে চাননি। Sind ও Frontier-এ স্থানীয় দলাদলি, অভিজাত স্বার্থ ও প্রশাসনিক হিসাব চলছিল। Jalal এক জায়গায় লিখেছেন, জিন্নাহ যেন coachman (ঘোড়ার গাড়ির চালক) নন, যিনি মুসলিম প্রদেশগুলোকে চাবুক মেরে লাইনে আনছেন; বরং তিনি অনেক সময় sidelines (সাইডলাইনে) দাঁড়িয়ে এমন victory (জয়) দাবি করছিলেন, যা তাঁর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসেনি। প্রাদেশিক Muslim factions (মুসলিম গোষ্ঠী) League-কে কেন্দ্রীয় মুখপাত্র হিসেবে মেনে নিলেও নিজেদের local affairs (স্থানীয় বিষয়ে) প্রায় anarchic autonomy (অরাজক স্বায়ত্ততা) চাইত। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, p. 120)
এই বাস্তবতা লাহোর প্রস্তাবের ambiguity (অস্পষ্টতা) ব্যাখ্যা করে। জিন্নাহ cut-and-dried scheme (তৈরি-করা পূর্ণ পরিকল্পনা) দিলে প্রদেশগুলোর মতভেদ প্রকাশ্যে বিস্ফোরিত হতো। তিনি তাই demand-কে যথেষ্ট বড়, যথেষ্ট আবেগী, যথেষ্ট অস্পষ্ট রেখে দেন, যাতে সংখ্যালঘু প্রদেশের মুসলমান, পাঞ্জাবের ইউনিয়নিস্ট, বাংলার প্রাদেশিক নেতৃত্ব, সিন্ধুর নেতা—সবাই নিজের মতো করে এর ভিতরে আশ্রয় পায়।
এই অস্পষ্টতা দুর্বলতা, আবার শক্তিও। দুর্বলতা, কারণ ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের কাঠামো, নাগরিক অধিকার, কেন্দ্র-প্রদেশ সম্পর্ক, minority question (সংখ্যালঘু প্রশ্ন)—এসব স্পষ্ট করা হয়নি। শক্তি, কারণ এই অস্পষ্টতা Muslim political energy (মুসলিম রাজনৈতিক শক্তি)-কে এক দাবিতে সংগঠিত করে।
“পাকিস্তান” ধারণার বিবর্তন
লাহোর প্রস্তাবের পর “Pakistan” ধারণা নিজের জীবন পেতে শুরু করে। Rahmat Ali-এর pamphlet-এর Pakistan ছিল একটি limited geographic imagination (সীমিত ভূখণ্ডগত কল্পনা), যেখানে Bengal অনুপস্থিত। Muslim League-এর Lahore demand ছিল উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলীয় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের ভিত্তিতে broader constitutional claim (বৃহত্তর সাংবিধানিক দাবি)। জিন্নাহর হাতে “Pakistan” শব্দটি হয়ে ওঠে bargaining symbol (দরকষাকষির প্রতীক), mobilizing slogan (সংগঠনী স্লোগান), এবং Muslim self-determination (মুসলিম আত্মনিয়ন্ত্রণ)-এর ভাষা।
এই বিবর্তন Gandhi-Jinnah talks-এর সময় আরও স্পষ্ট হয়। Nair দেখান, ১৯৪৪ সালে জিন্নাহ গান্ধীকে বলেন, মুসলমানরা self-determination (আত্মনিয়ন্ত্রণ) দাবি করছে territorial unit (ভূখণ্ডগত একক) হিসেবে নয়, nation (জাতি) হিসেবে। তাঁর ভাষায়, মুসলমানরা inherent right as a Muslim nation (মুসলিম জাতি হিসেবে জন্মগত অধিকার) প্রয়োগ করতে চায়। এটি কোনো existing union (বিদ্যমান ইউনিয়ন) থেকে secession (বিচ্ছেদ) নয়, কারণ এমন কোনো sovereign Indian union তখন ছিল না; বরং দুই major nations (দুই প্রধান জাতি)—Hindus and Muslims—এর মধ্যে settlement (নিষ্পত্তি)। (Neeti Nair, Changing Homelands, p. 165)
এই যুক্তি লাহোর প্রস্তাবকে minority safeguards (সংখ্যালঘু সুরক্ষা) থেকে nation’s self-determination (জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণ)-এ উন্নীত করে। Gandhi প্রস্তাবকে অঞ্চলভিত্তিক plebiscite (গণভোট) ও পৃথকীকরণের প্রশ্নে নামাতে চাচ্ছিলেন। জিন্নাহ বলছিলেন, মুসলমানের আত্মনিয়ন্ত্রণ ভূখণ্ডের নয়; জাতিসত্তার। এই পার্থক্য মৌলিক।
Iqbal, Jinnah and Pakistan ১৯৪০ থেকে ১৯৪৬-এর রূপান্তরকে তিন ধাপে পড়ে: ১৯০৬–১৯২০ পর্যায়ে মুসলমানদের দাবি religious minority (ধর্মীয় সংখ্যালঘু) হিসেবে constitutional safeguards; ১৯২১–১৯৩৯ পর্যায়ে Muslim majorities (মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ)-গুলোর regional consolidation (আঞ্চলিক সংহতি); ১৯৪০–১৯৪৭ পর্যায়ে distinct nation (স্বতন্ত্র জাতিসত্তা) হিসেবে স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবি। (Iqbal, Jinnah and Pakistan, pp. 72–73)
এই কাঠামো অধ্যায়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। লাহোর প্রস্তাব ছিল সেই সেতু, যেখানে মুসলমান “সংখ্যালঘু” থেকে “প্রদেশীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ” হয়ে “জাতিসত্তা”র ভাষায় প্রবেশ করে।
অখণ্ড বাংলা; বাংলার মুসলিম রাজনীতির অসমাপ্ত কল্পনা
লাহোর প্রস্তাব মুসলিম ভারতের ভবিষ্যৎ নিয়ে সর্বভারতীয় রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করেছিল। কিন্তু ১৯৪৭-এর দিকে এগোতে এগোতে বাংলার প্রশ্ন শুধু পাকিস্তান বনাম ভারত-এর সরল অঙ্কে আটকে থাকেনি। বাংলা নিজেই তখন এক রাজনৈতিক সম্ভাবনা হয়ে উঠেছিল। এই সম্ভাবনার ভিতরে ছিল ভূগোল, অর্থনীতি, কলকাতা, পূর্ববঙ্গের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা, বাংলার নদীমাতৃক সামাজিক শরীর, হিন্দু-মুসলমান ক্ষমতা-বণ্টনের সংকট, এবং আসন্ন রাষ্ট্রবিভাজনের মুখে একটি প্রদেশের নিজের ভবিষ্যৎ নিজে ভাবার শেষ চেষ্টা।
এই প্রশ্নে ফজলুল হক কেন্দ্রীয় চরিত্র নন। লাহোরে তিনি প্রস্তাব পেশ করেছিলেন; সেই ভূমিকা ঐতিহাসিক। কিন্তু অখণ্ড বাংলা বা United Independent Bengal (স্বাধীন যুক্তবঙ্গ)-এর শেষ রাজনৈতিক কল্পনায় নেতৃত্বের কেন্দ্রে উঠে আসেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, শরৎ বসু, কিরণশঙ্কর রায় এবং বাংলার মুসলিম-হিন্দু নেতৃত্বের একটি অংশ। এখানে বাংলার রাজনীতি আর “প্রস্তাব কে পেশ করলেন” প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না। এখানে প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, বাংলা কি শুধু দুই রাষ্ট্রের মধ্যে কাটা একটি ভূখণ্ড হবে, নাকি নিজের জনসংখ্যা, অর্থনীতি, ভাষা, শহর, বন্দর, কৃষিজীবন ও রাজনৈতিক ভার নিয়ে আলাদা ভবিষ্যৎ দাবি করবে?
এ থেকেই বাংলার মুসলিম রাজনীতির গভীরতা বোঝা যায়। বাংলার মুসলমান সর্বভারতীয় মুসলিম রাজনীতির নীরব শ্রোতা ছিল না। তার নিজের সংগঠন ছিল, নিজের কৃষকভিত্তি ছিল, নিজের শহুরে সংঘাত ছিল, নিজের হিন্দু অভিজাত-প্রশ্ন ছিল, নিজের কলকাতা-প্রশ্ন ছিল, নিজের প্রাদেশিক আত্মবিশ্বাস ছিল। সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম এই আত্মবিশ্বাসের সবচেয়ে শক্তিশালী মুসলিম মুখ। তাঁরা বাংলাকে শুধু পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় অংশ হিসেবে দেখেননি; তাঁরা এমন এক ভবিষ্যৎও ভেবেছিলেন, যেখানে বাংলা নিজের রাজনৈতিক শরীর নিয়ে দাঁড়াতে পারে।
১৯৪০-এর দশকে Bengal Muslim League (বাংলা মুসলিম লীগ)-এর ভিতরে বড় রূপান্তর ঘটে। নাজিমুদ্দিনপন্থী অভিজাত গোষ্ঠী, কলকাতাকেন্দ্রিক মুসলিম ব্যবসায়ী স্বার্থ, প্রাদেশিক ক্ষমতার হিসাব, জেলা-সংগঠনের দুর্বলতা—এসবের ভিতর দিয়ে সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম বাংলার মুসলিম রাজনীতিকে নতুন দিকে ঠেলে দেন। Jalal দেখান, ১৯৪৩–৪৫ সময়ে Nazimuddin faction (নাজিমুদ্দিন গোষ্ঠী) ও Suhrawardy faction (সোহরাওয়ার্দী গোষ্ঠী)-এর সংঘর্ষের মধ্যে সোহরাওয়ার্দী League organisation (লীগ সংগঠন)-এর ওপর শক্ত প্রভাব তৈরি করেন। Calcutta-র pro-Nazimuddin business magnates (নাজিমুদ্দিনপন্থী ব্যবসায়ী মহল), যেমন Haji Adamji Daud ও Ispahani, আগের জায়গা ধরে রাখতে পারেননি; Bengal থেকে AIML Council-এ যাওয়া শতাধিক প্রতিনিধি কোনো না কোনোভাবে সোহরাওয়ার্দীর প্রতি আনুগত্য দেখাত। Jalal-এর ভাষ্যে, সোহরাওয়ার্দীর ministry (মন্ত্রিসভা)-র তুলনায় League organisation (লীগ সংগঠন)-এর ওপর প্রভাব বেশি ছিল। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, p. 104)
আবুল হাশিম এই রূপান্তরের আরেকটি গভীর স্তর। তিনি শুধু factional politician (গোষ্ঠীগত রাজনীতিবিদ) ছিলেন না। Jalal তাঁকে “a power in his own right” বা নিজস্ব শক্তি হিসেবে দেখিয়েছেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল League-এর ভিতরে vitality and force (প্রাণ ও শক্তি) আনা। তিনি জেলা লীগগুলোকে অফিস, full-time workers (পূর্ণকালীন কর্মী), reading rooms (পাঠাগার), বই-পত্রিকা, এবং মানুষের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করতে চাইছিলেন। তাঁর কাছে লীগ শুধু electioneering campaign (নির্বাচনী প্রচারণা) বা tub-thumping propaganda (চিৎকারধর্মী প্রচার)-এর সংগঠন হতে পারে না; তাকে খাদ্যসংকট, দরিদ্র মানুষের সমস্যা, সামাজিক বঞ্চনা এবং গ্রাম-মফস্বলের বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হতে হবে। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, pp. 104–105)
এই জায়গায় আবুল হাশিমের গুরুত্ব ফজলুল হকের চেয়েও আলাদা। ফজলুল হক বাংলার মুসলমানের কৃষক-প্রজা বাস্তবতার এক ঐতিহাসিক মুখ, কিন্তু লাহোর-পরবর্তী বাংলার মুসলিম লীগের সংগঠনী পুনর্গঠনের কেন্দ্রীয় মানুষ তিনি নন। আবুল হাশিম জেলা, সংগঠন, কর্মী, জনজীবন, সামাজিক প্রশ্ন এবং রাজনৈতিক ভাষাকে একসঙ্গে ধরতে চেয়েছিলেন। তাঁর draft manifesto (খসড়া ইশতেহার)-এ Pakistan (পাকিস্তান)-এর ভাষা ছিল, কিন্তু তার সঙ্গে ছিল equality (সমতা), fraternity (ভ্রাতৃত্ব), poor people’s rights (দরিদ্র মানুষের অধিকার), এবং vested interests (স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী)-এর বিরুদ্ধে ভাষা। অর্থাৎ বাংলার পাকিস্তান-রাজনীতি তাঁর হাতে কেবল ভূখণ্ডের দাবি ছিল না; তা সামাজিক প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত হচ্ছিল। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, p. 105)
১৯৪৫ সালের Parliamentary Board fight (পার্লামেন্টারি বোর্ডের লড়াই)-এ এই শক্তির প্রকাশ আরও পরিষ্কার। নাজিমুদ্দিন আগের দিন পর্যন্ত কয়েকটি আসন নিশ্চিত ধরে ফেলেছিলেন; কিন্তু সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম বাকি পাঁচটি আসন জিতে নেন। ফলে সোহরাওয়ার্দী Board-এ dominance (প্রাধান্য) পান এবং নির্বাচনের পর League parliamentary party leadership (লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির নেতৃত্ব)-এর পথ খুলে যায়। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, p. 156)
এই পটভূমি ছাড়া অখণ্ড বাংলা প্রশ্নকে বোঝা যায় না। এটি কোনো শেষ মুহূর্তের আবেগী নাটক নয়। এর পেছনে ছিল একটি প্রাদেশিক মুসলিম রাজনৈতিক সমাজ, যে ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে নিজের শক্তি দেখিয়েছে, জেলা-সংগঠনের ভাষা পেয়েছে, এবং কলকাতা-পূর্ববঙ্গ-প্রদেশ-রাষ্ট্র—এই চার স্তরের মধ্যে নিজের ভবিষ্যৎ খুঁজছিল। সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের যুক্তবঙ্গ-ভাবনা সেই আত্মবিশ্বাস থেকেই জন্ম নেয়।
অখণ্ড বাংলার প্রশ্নে মূল সমস্যা শুধু ভারত-পাকিস্তান বিভাজন নয়। সমস্যা ছিল, বাংলার ভিতরে ক্ষমতা কার হাতে থাকবে? কলকাতার অবস্থান কী হবে? পূর্ববঙ্গের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা কীভাবে রাষ্ট্রীয় রূপ পাবে? হিন্দু অভিজাত সমাজ কি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলায় ক্ষমতা ভাগাভাগি মেনে নেবে? মুসলিম লীগের ভিতরে যারা পুরো প্রদেশে মুসলিম আধিপত্য চাইছিল, তারা কি power-sharing (ক্ষমতা ভাগাভাগি)-এর বাস্তব রাজনীতিতে প্রস্তুত ছিল? বাংলার হিন্দু নেতৃত্বের কোন অংশ অখণ্ডতার পক্ষে, কোন অংশ ভাগের পক্ষে? কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কি বাংলার স্বাধীন অবস্থান মেনে নেবে?
এই প্রশ্নগুলোর কোনো সহজ উত্তর ছিল না। বাংলার মুসলিম রাজনীতি শক্তিশালী হচ্ছিল, কিন্তু একক ছিল না। মুসলিম লীগের ভিতরে এক অংশ Pakistan (পাকিস্তান)-এর নামে পুরো প্রদেশে unfettered Muslim dominance (অবাধ মুসলিম আধিপত্য) চাইছিল; আরেক অংশ power-sharing (ক্ষমতা ভাগাভাগি)-এর অনিশ্চয়তার চেয়ে province partition (প্রদেশ ভাগ)-কে নিরাপদ মনে করছিল। Jalal দেখান, সোহরাওয়ার্দী যখন Bengal unity (বাংলার ঐক্য) রক্ষা করার সম্ভাবনা দেখছিলেন, তখন Bengal League-এর ভিতরেই গভীর দ্বিধা ছিল। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, p. 266)
সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম ও শরৎ বসুর মধ্যে আলোচনা এগোলেও বাংলার ভিতরের ঐক্য ভঙ্গুর ছিল। Bengal League-এর sub-committee (উপকমিটি) নিজেই বিভক্ত হয়ে পড়ে। ছয় সদস্যের মধ্যে চারজন independent Bengal (স্বাধীন বাংলা)-র বিরোধী ছিলেন, যদিও প্রকাশ্যে তাঁরা বাংলার partition (ভাগ)-এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিতেন। এই দ্বৈততা সোহরাওয়ার্দীর দরকষাকষিকে দুর্বল করে। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, p. 266)
অন্যদিকে হিন্দু অভিজাত রাজনীতির বড় অংশ বাংলার ভাগের দিকে এগোচ্ছিল। জয়া চ্যাটার্জীর আলোচনায় বাংলার দেশভাগকে শুধু মুসলিম লীগের দাবির ফল হিসেবে না পড়ে Hindu communalism (হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা), Bengal Congress (বঙ্গীয় কংগ্রেস), Hindu Mahasabha (হিন্দু মহাসভা), land-class-caste politics (জমি-শ্রেণি-বর্ণ রাজনীতি), এবং হিন্দু অভিজাত স্বার্থের ভিতর দিয়ে পড়ার পথ খুলে যায়। বাংলার ভাগে মুসলিম লীগের ভূমিকা ছিল, কিন্তু দায় একমুখী ছিল না। হিন্দু অভিজাত সমাজের একটি বড় অংশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অখণ্ড বাংলার ভবিষ্যৎকে নিরাপদ মনে করেনি। (জয়া চ্যাটার্জী, বাংলা ভাগ হল, পৃ. ১–৩, ২৩–৩৬, ৩৭–১২২)
United Independent Bengal Movement (স্বাধীন যুক্তবঙ্গ আন্দোলন)-এর আলোচনায় দেখা যায়, সোহরাওয়ার্দী ও শরৎ বসুর উদ্যোগে কিছু হিন্দু ও মুসলিম নেতা যুক্তবঙ্গের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন; তাঁদের মধ্যে কিরণশঙ্কর রায়, আবুল হাশিম, ফজলুর রহমান, মোহাম্মদ আলী চৌধুরী প্রমুখ ছিলেন। কিন্তু কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার বড় অংশ বাংলা ভাগের দিকে চলে যায়। (Banglapedia, “United Independent Bengal Movement”)
এখানে সোহরাওয়ার্দীর অবস্থান ছিল কঠিন। তিনি জানতেন, বাংলা ভাগ হলে পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশ হলেও কলকাতা হারাবে, শিল্প-অর্থনীতি ছিন্ন হবে, বন্দর-শহর-গ্রাম সম্পর্ক ভেঙে যাবে। আবার অখণ্ড বাংলা রাখতে হলে হিন্দু নেতৃত্বের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে ক্ষমতা-বণ্টনের নিশ্চয়তা দিতে হবে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার আত্মবিশ্বাস ও হিন্দু অভিজাতের ভয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে অখণ্ড বাংলা এক কঠিন দরকষাকষির নাম হয়ে উঠেছিল।
এই দরকষাকষিতে জিন্নাহর ভূমিকা সীমিত, কিন্তু একেবারে অপ্রাসঙ্গিক নয়। তিনি অখণ্ড বাংলার কল্পনার নির্মাতা নন। এই কল্পনা বাংলার ভিতর থেকে উঠেছে—সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, শরৎ বসুদের রাজনৈতিক উদ্যোগ থেকে। কিন্তু তিনি তখন All-India Muslim League (সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ)-এর মুখ। তাঁর প্রকাশ্য বিরোধিতা থাকলে সোহরাওয়ার্দীর উদ্যোগ মুসলিম লীগের ভিতরেই দাঁড়াতে পারত না। Jalal দেখান, Jinnah-এর blessing (সমর্থন) নিয়ে Suhrawardy মনে করেছিলেন, Bengal unity (বাংলার ঐক্য) রক্ষা করার এখনো সুযোগ আছে। এই সমর্থন উদ্যোগটির জন্ম দেয়নি, কিন্তু সেটিকে মুসলিম লীগের সর্বভারতীয় দরকষাকষির ভিতরে সাময়িক ওজন দিয়েছিল। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, p. 266)
এখানে জিন্নাহ creator (নির্মাতা) নন, কিন্তু tactical enabler (কৌশলগত সুযোগদাতা)। তিনি বাংলার নিজস্ব কল্পনা তৈরি করেননি, কিন্তু দরজা সঙ্গে সঙ্গে বন্ধও করেননি। তাঁর ভূমিকা প্রেক্ষাপটটির কেন্দ্রে নয়; আবার উপেক্ষার জলাধারেও নিক্ষেপের মতো নয়। কারণ, সেই ঐতিহাসিক মূহুর্তে দরকষাকষির দরজা খোলা রাখায় ভূমিকায় তিনি কোনো কার্পণ্য করেননি। বন্ধ করে দেননি পথটি। এই গুরুত্ব এবং ভূমিকা অবমূল্যায়ন করার সুযোগ নেই। আবার একক কৃতিত্ব দেবারও অবকাশ নেই। কারণ, তাঁকে চূড়ান্ত ভাবা হলে বাংলার agency (কার্যক্ষমতা) মুছে যায়; একে একেবারে মুছে দিলে সর্বভারতীয় মুসলিম রাজনীতির কাঠামো বোঝা যায় না।
জিন্নাহর calculated silence (হিসেবি নীরবতা) এখানে বোঝা দরকার। বাংলার ভিতরেই যখন পূর্ণ ঐক্য নেই, Bengal League-এর উপকমিটি বিভক্ত, হিন্দু অভিজাত সমাজের বড় অংশ ভাগের দিকে, কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা অখণ্ডতার বিরুদ্ধে, তখন জিন্নাহর জোরালো প্রকাশ্য অবস্থানও অখণ্ড বাংলাকে বাঁচাত কি না, তা নিশ্চিত নয়। বরং প্রকাশ্য ও অতিরিক্ত সমর্থন মুসলিম লীগের অন্য প্রাদেশিক অঙ্ক, বিশেষত পাঞ্জাব ও সংখ্যালঘু প্রদেশের হিসাবকে জটিল করতে পারত। তাই তাঁর নীরবতা শুধু অবহেলা নয়; তা কৌশল, চাপ ও সীমাবদ্ধতার মিশ্রণ।
এই জায়গায় দুই ধরনের ভুল একসঙ্গে ধরা পড়ে। একদিকে জিন্নাহ-কেন্দ্রিক স্মৃতি বাংলার মুসলিম নেতৃত্বকে আড়াল করে দেয়; ফলে অখণ্ড বাংলা প্রশ্ন প্রান্তে চলে যায়। অন্যদিকে জিন্নাহ-বিরোধী প্রাদেশিক ক্ষোভ বাংলার ব্যর্থতার দায় প্রায় পুরোপুরি বাইরের নেতৃত্বের ওপর চাপায়। দুটো পাঠই অসম্পূর্ণ। বাংলার মুসলমান জিন্নাহর ছায়া ছিল না; আবার সর্বভারতীয় মুসলিম রাজনীতির বাইরে আলাদা দ্বীপও ছিল না। সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম বাংলার নিজস্ব রাজনৈতিক কল্পনার মুখ। জিন্নাহ সেই কল্পনার জন্মদাতা নন, কিন্তু সর্বভারতীয় দরকষাকষির দরজায় তাঁর অবস্থানও অপ্রাসঙ্গিক ছিল না।
১৯৪৬ সালের আগের একটি ঘটনাও এই প্রেক্ষাপটকে ঘন করে। সোহরাওয়ার্দী Bengal Congress-এর সঙ্গে coalition (জোট) আলোচনায় এগিয়েছিলেন। যদি Bengal-এ League-Congress ministry তৈরি হতো, তাহলে বাংলা হয়তো প্রাদেশিক স্বায়ত্ততার একটি আলাদা ভিত্তি পেত। কিন্তু Congress High Command Bengal Congress-কে League-এর সঙ্গে চুক্তি করতে দেয়নি। আলোচনার ভাঙন বাংলার ভবিষ্যতের জন্য অশুভ ছিল; বাংলার আরেকটি সুযোগ আর আসেনি। (Ayesha Jalal, The Sole Spokesman, p. 162)
এই ১৯৪৬ সালের coalition attempt (জোট প্রচেষ্টা) এবং ১৯৪৭ সালের United Bengal attempt (যুক্তবঙ্গ প্রচেষ্টা) একসঙ্গে পড়লে দেখা যায়, বাংলার নিজস্ব political imagination (রাজনৈতিক কল্পনা) একদিনে জন্মায়নি। সোহরাওয়ার্দী বারবার চেষ্টা করেছেন Bengal-এর প্রাদেশিক বাস্তবতা, Muslim League-এর শক্তি, হিন্দু নেতৃত্বের সঙ্গে দরকষাকষি, এবং সর্বভারতীয় কেন্দ্রীয় রাজনীতির চাপের মধ্যে একটি পথ খুঁজতে। কিন্তু তাঁর পথ দুই কেন্দ্রের চাপের মধ্যে আটকে গেছে—একদিকে সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের কৌশল, অন্যদিকে কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় কৌশল। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল বাংলার ভিতরের হিন্দু-মুসলমান অবিশ্বাস।
অখণ্ড বাংলা তাই বাংলার মুসলিম ইতিহাসে এক দ্বিমুখী আয়না। একদিকে এটি দেখায়, বাংলার মুসলমান নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বাধীনভাবে ভাবতে পারত। সে শুধু পশ্চিমের নির্দেশে চলা রাজনৈতিক জনতা ছিল না। অন্যদিকে এটি দেখায়, সেই কল্পনা পূর্ণ সামাজিক ঐক্য, স্থির কৌশল ও বিশ্বাসযোগ্য ক্ষমতা-বণ্টনের কাঠামো তৈরি করতে পারেনি। সোহরাওয়ার্দীর প্রশাসনিক বুদ্ধি ছিল, হাশিমের সংগঠনী শক্তি ছিল, Sarat Bose-এর সঙ্গে দরকষাকষির চেষ্টা ছিল, কিন্তু অবিশ্বাসের দেয়াল বেশি উঁচু ছিল।
অখণ্ড বাংলা সফল হয়নি। কিন্তু ব্যর্থ কল্পনাও ইতিহাসে মূল্যহীন নয়। কারণ ব্যর্থতার ভিতরেই বোঝা যায়, বাংলার মুসলমানের রাজনৈতিক মন শুধু কেন্দ্রের নির্দেশে চলেনি। তার ভিতরে ছিল অঞ্চল, ভাষা, জমি, নদী, কলকাতা, কৃষকসমাজ, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার আত্মবিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র নিয়ে স্বাধীন চিন্তার আকাঙ্ক্ষা।
সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমকে বাংলার মুসলিম রাজনীতির স্বতন্ত্র agency (কার্যক্ষমতা)-এর প্রতিনিধি হিসেবে পড়তে হবে। তাঁদের ভূমিকা জিন্নাহর বিকল্প নেতৃত্ব তৈরি করা নয়, আবার জিন্নাহর কেন্দ্রীয় কৌশলের প্রাদেশিক প্রতিধ্বনি হয়েও থাকা নয়। জিন্নাহর অবস্থান ছিল all-India constitutional bargaining (সর্বভারতীয় সাংবিধানিক দরকষাকষি)-এর স্তরে। তিনি মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় দাবিকে ব্রিটিশ, কংগ্রেস ও প্রাদেশিক শক্তিগুলোর সামনে রাজনৈতিক ভাষা দিতেন। অন্যদিকে সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম কাজ করছিলেন Bengal provincial mobilisation (বাংলার প্রাদেশিক সংগঠন), district organisation (জেলা-স্তরের সংগঠন), electoral consolidation (নির্বাচনী সংহতি), mass politics (জনরাজনীতি), এবং United Bengal imagination (অখণ্ড বাংলা-কল্পনা)-এর স্তরে। অর্থাৎ জিন্নাহ ছিলেন কেন্দ্রীয় দরকষাকষির মুখ; সোহরাওয়ার্দী ও হাশিম ছিলেন বাংলার মুসলিম রাজনীতির organisational and provincial engine (সংগঠনী ও প্রাদেশিক চালিকাশক্তি)। এই দুই স্তরকে এক করে ফেললে যেমন জিন্নাহর ভূমিকা অতিরঞ্জিত হয়, তেমনি আলাদা করে ফেললে বাংলার মুসলিম রাজনীতির সর্বভারতীয় সংযোগ অদৃশ্য হয়ে যায়।
এই ভারসাম্য না ধরলে ইতিহাস দুইভাবে নষ্ট হয়। একদিকে জিন্নাহ-ভক্তি বাংলাকে মুছে দেয়; অন্যদিকে জিন্নাহ-বিরোধী প্রাদেশিক ক্ষোভ সর্বভারতীয় মুসলিম প্রশ্নকে মুছে দেয়। অখণ্ড বাংলা প্রশ্ন এই দুই ভুলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। এটি বলে, বাংলার মুসলমান পাকিস্তান আন্দোলনের footnote (পাদটীকা) নয়। আবার সে সর্বভারতীয় মুসলিম রাজনীতির বাইরে বিচ্ছিন্ন দ্বীপও নয়।
লাহোর প্রস্তাব Muslim nationhood (মুসলিম জাতিসত্তা)-এর রাষ্ট্রীয় ভাষা দিয়েছিল। অখণ্ড বাংলা প্রশ্ন দেখাল, সেই ভাষার ভিতরেও বাংলার নিজস্ব ব্যাকরণ ছিল। সেই ব্যাকরণ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রে পরিণত হয়নি। কিন্তু তার অস্তিত্ব অস্বীকার করলে বাঙালি মুসলমানের ৪৭ বোঝা যাবে না।
প্রতিক্রিয়া; কংগ্রেস, গান্ধী, হিন্দু মহাসভা ও শিখ রাজনীতি
লাহোর প্রস্তাব পাস হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কংগ্রেস ও হিন্দু রাজনীতির ভেতরে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। কংগ্রেস প্রস্তাবকে anti-national (জাতিবিরোধী) হিসেবে দেখেছিল। Ramgarh session-এ কংগ্রেস independence, democracy, national unity (স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, জাতীয় ঐক্য)-এর ভিত্তিতে সংবিধান দাবি করে এবং India-র nationhood (জাতিসত্তা) ভাগ করার প্রচেষ্টার নিন্দা করে। গান্ধী এটিকে baffling situation (বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি) বলে দেখেন; তাঁর কাছে partition ছিল sin (পাপ) এবং call to war (যুদ্ধের ডাক)। (Farooq Ahmad Dar, “Jinnah and the Lahore Resolution,” p. 147)
এই প্রতিক্রিয়ায় শুধু নৈতিক আপত্তি নয়, রাজনৈতিক অস্বস্তিও ছিল। লাহোর প্রস্তাব কংগ্রেসের “one nation” (এক জাতি)-দাবিকে চ্যালেঞ্জ করে। যদি মুসলমানরা জাতিসত্তা হয়, তাহলে কংগ্রেস একক জাতীয়তার প্রতিনিধি নয়। যদি মুসলমানের সম্মতি ছাড়া সংবিধান গ্রহণযোগ্য না হয়, তাহলে সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতীয়তার নামে রাষ্ট্র নির্মাণ অসম্পূর্ণ। এই কারণেই প্রস্তাব কংগ্রেসের জন্য শুধু বিভাজনের দাবি নয়; তার প্রতিনিধিত্ব-দাবির বিরুদ্ধে আঘাত।
Hindu Mahasabha ও Akali Dal-এর প্রতিক্রিয়া আরও তীব্র। Dar দেখান, Hindu Mahasabha anti-Pakistan Conference আয়োজন করে এবং Viceroy-কে Lahore Resolution নিন্দা করার জন্য চাপ দেয়। Master Tara Singh প্রস্তাবকে extreme communal considerations (চরম সাম্প্রদায়িক বিবেচনা)-ভিত্তিক বলে আক্রমণ করেন এবং বলেন, এর লক্ষ্য minority-দের ওপর Muslim domination (মুসলিম আধিপত্য)। (Farooq Ahmad Dar, “Jinnah and the Lahore Resolution,” p. 147)
এই প্রতিক্রিয়াগুলো দেখায়, লাহোর প্রস্তাব কেবল মুসলিম রাজনীতির দলিল নয়; এটি ভারতীয় জাতীয়তার অভ্যন্তরীণ সংকট প্রকাশ করে। হিন্দু, শিখ, কংগ্রেস, মুসলিম লীগ—সব পক্ষই ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রে নিজের অবস্থান নিয়ে হিসাব করছিল। মুসলমানের দাবি communal (সাম্প্রদায়িক); হিন্দু ও শিখ উদ্বেগ national (জাতীয়) বা minority security (সংখ্যালঘু নিরাপত্তা)—এভাবে ভাষা বদলে যায়। এই ভাষা-পরিবর্তনই ইতিহাসচর্চার বড় বিষয়।
ইতিহাস কীভাবে বিকৃত হয়
লাহোর প্রস্তাব নিয়ে কয়েক ধরনের বিকৃতি তৈরি হয়েছে।
প্রথম বিকৃতি Pakistani nationalist myth (পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদী মিথ)। এতে লাহোর প্রস্তাবকে প্রায় নির্ভুল, পূর্বনির্ধারিত, একক পাকিস্তান রাষ্ট্রের সরাসরি blueprint (নকশা) হিসেবে দেখানো হয়। ফজলুল হক প্রস্তাব পেশ করলেন, জিন্নাহ নেতৃত্ব দিলেন, মুসলিম জাতি পাকিস্তানের দিকে এগিয়ে গেল—এই গল্প শক্তিশালী, কিন্তু প্রস্তাবের অস্পষ্টতা, সংশোধন, প্রাদেশিক টানাপোড়েন, সিকান্দার-ফজলুল হক-হাশিম-সোহরাওয়ার্দীর মতো চরিত্রের জটিলতা, এবং বাংলার নিজস্ব রাজনৈতিক agency (কার্যক্ষমতা) সরিয়ে দেয়।
দ্বিতীয় বিকৃতি Indian nationalist/secular myth (ভারতীয় জাতীয়তাবাদী/সেক্যুলার মিথ)। এতে লাহোর প্রস্তাবকে সাম্প্রদায়িক বিচ্ছেদের অযৌক্তিক সূচনা হিসেবে দেখানো হয়। মুসলিম নিরাপত্তা, কংগ্রেস মন্ত্রিসভার অভিজ্ঞতা, সাংবিধানিক সংকট, প্রাদেশিক মুসলিম উদ্বেগ, সংখ্যাগুরু গণতন্ত্রের ভয়—এসব গৌণ হয়ে যায়। জিন্নাহ villain (খলনায়ক), মুসলিম লীগ communal party (সাম্প্রদায়িক দল), পাকিস্তান British conspiracy (ব্রিটিশ ষড়যন্ত্র)—এই সরল ফ্রেমে ঘটনা বন্দি হয়।
তৃতীয় বিকৃতি Bengali anti-Jinnah provincialism (জিন্নাহ-বিরোধী বাঙালি প্রাদেশিকতা)। এই পাঠে জিন্নাহকে পশ্চিমের বহিরাগত প্রতীক বানিয়ে বাংলার নিজের মুসলিম নেতৃত্বকে তাঁর বিপরীতে দাঁড় করানো হয়। এই ফ্রেমের ভিতরে একটি দরকারি প্রশ্ন আছে: বাঙালি মুসলমানের নিজের ফজলুল হক, সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, আবুল মনসুরদের স্মৃতি কোথায়? কিন্তু প্রশ্ন দরকারি হলেই উত্তর সরল হতে পারে না। জিন্নাহকে মুছে দিলে সর্বভারতীয় মুসলিম রাজনীতি বোঝা যায় না। আবার জিন্নাহকে একা রাখলে বাঙালি মুসলমানের নিজস্ব রাজনৈতিক শ্রম, সংগঠন ও কল্পনা বোঝা যায় না।
সঠিক পাঠ এই দুই সরলতার মাঝখানে। লাহোর প্রস্তাব ছিল Muslim nationhood (মুসলিম জাতিসত্তা)-এর রাষ্ট্রীয় ভাষা, কিন্তু তার ভিতরে ছিল প্রাদেশিক হিসাব, কেন্দ্রীয় কৌশল, বাংলার জনভিত্তি, পাঞ্জাবের স্বায়ত্ততার উদ্বেগ, সংখ্যালঘু প্রদেশের নিরাপত্তা-ভয় এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের অস্পষ্টতা। এই দলিলকে শুধু জিন্নাহর কাগজ বলা ভুল। শুধু ফজলুল হকের কীর্তি বলা ভুল। শুধু পাকিস্তানি মিথ বলা ভুল। শুধু সাম্প্রদায়িক ষড়যন্ত্র বলা আরও ভুল।
১৯৪০; মুসলিম জাতিসত্তার রাষ্ট্রীয় ভাষা
লাহোর প্রস্তাবের গুরুত্ব তার নামের মধ্যে নয়, তার রাজনৈতিক কাজের মধ্যে। এটি কোনো পূর্ণ রাষ্ট্রনকশা নয়, আবার নিছক আবেগী ঘোষণা নয়। এর শক্তি ছিল, মুসলমানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারকে প্রথমবার সর্বভারতীয় রাজনৈতিক ভাষায় দাঁড় করানো।
এই দলিলের পেছনে একাধিক স্রোত কাজ করেছে। পাঞ্জাবি প্রাদেশিক স্বায়ত্ততার হিসাব, বাংলার মুসলিম জনভিত্তির বাস্তবতা, সংখ্যালঘু প্রদেশের মুসলমানদের নিরাপত্তা-ভয়, জিন্নাহর কেন্দ্রীয় দরকষাকষি, কংগ্রেস মন্ত্রিসভার অভিজ্ঞতা, ইকবালীয় আত্মপরিচয়ের দীর্ঘ ছায়া, এবং পরবর্তী সময়ে বাংলায় সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশিমের সংগঠনী রেখা—সবকিছু মিলে প্রস্তাবটিকে শুধু একটি দলীয় resolution (প্রস্তাব) রাখেনি; তা Muslim nationhood (মুসলিম জাতিসত্তা)-এর রাষ্ট্রীয় দাবির ভাষায় পরিণত করেছে।
ফজলুল হক প্রস্তাব পেশ করেছিলেন, তাই বাংলার মুসলমানের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু তাঁকে প্রস্তাবের লেখক বা একক নির্মাতা বানালে ইতিহাস সংকুচিত হয়। সিকান্দার হায়াত খানের চিন্তা প্রস্তাবের ভাষায় প্রাদেশিক স্বায়ত্ততার ছাপ রেখেছে, কিন্তু সেটিও চূড়ান্ত ব্যাখ্যা নয়। জাফরুল্লাহ খানের note নিয়ে বিতর্ক আছে, কিন্তু তাকে প্রস্তাবের মূল উৎস বলা দুর্বল ইতিহাস। Working Committee-র সংশোধন, জিন্নাহর কৌশল, প্রাদেশিক নেতৃত্বের হিসাব, এবং পরবর্তী রাজনৈতিক ব্যবহারের মধ্য দিয়েই Lahore Resolution তার ঐতিহাসিক অর্থ পায়।
প্রস্তাবের সবচেয়ে বড় কাজ ছিল মুসলমানকে minority (সংখ্যালঘু) থেকে nation (জাতিসত্তা)-এর ভাষায় নিয়ে যাওয়া। এর আগে মুসলমানদের প্রশ্ন অনেক সময় সুরক্ষা, আসন, প্রতিনিধিত্ব, চাকরি, পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী কিংবা constitutional safeguards (সাংবিধানিক সুরক্ষা)-এর ভিতরে সীমাবদ্ধ ছিল। লাহোর প্রস্তাব সেই ভাষাকে অতিক্রম করে বলল, মুসলমানদের ভবিষ্যৎ তাদের সম্মতি ছাড়া নির্ধারিত হতে পারে না।
এই দাবিই কংগ্রেসীয় একক জাতীয়তার ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছিল। যদি ভারত এক জাতি হয়, তাহলে মুসলমানের আলাদা রাজনৈতিক সম্মতির প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু যদি মুসলমান একটি historical-political nation (ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক জাতিসত্তা) হয়, তাহলে তার ভবিষ্যৎ কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের গণতান্ত্রিক সদিচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। লাহোর প্রস্তাব এই দ্বিতীয় অবস্থানকে রাজনৈতিক দলিলে স্থাপন করে।
এই কারণে প্রস্তাবটি একই সঙ্গে শক্তিশালী এবং অসম্পূর্ণ। শক্তিশালী, কারণ এটি মুসলিম রাজনৈতিক আত্মপরিচয়কে রাষ্ট্রীয় ভাষা দিয়েছে। অসম্পূর্ণ, কারণ ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের পূর্ণ কাঠামো, কেন্দ্র-প্রদেশ সম্পর্ক, সংখ্যালঘুদের অবস্থান, পূর্ব-পশ্চিম সংযোগ, অর্থনৈতিক বিন্যাস এবং ইসলামি নৈতিক রাষ্ট্রচিন্তার স্পষ্ট রূপরেখা দেয়নি। এই অসম্পূর্ণতাই পরে পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভিতরে ফিরে আসবে, বিশেষত পূর্ববাংলা, প্রাদেশিক অধিকার, কেন্দ্রীয় ক্ষমতা এবং জাতিসত্তার প্রশ্নে।
লাহোর প্রস্তাব তাই একদিনের ঘোষণা নয়; এটি দীর্ঘ মুসলিম রাজনৈতিক জাগরণের একটি মোড়। আলীগড় শিক্ষা দিয়েছিল ক্ষমতার ভাষা শেখার প্রয়োজন। মুসলিম লীগ দিয়েছিল সংগঠনের রূপ। ইকবাল দিয়েছিলেন আত্মপরিচয়ের দার্শনিক ভাষা। জিন্নাহ সেই ভাষাকে দরকষাকষির টেবিলে বসালেন। বাংলার মুসলিম জনভিত্তি তাকে পূর্বাঞ্চলীয় বাস্তবতা দিল। Suhrawardy–Abul Hashim line (সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশিম রেখা) তাকে সংগঠনী ও নির্বাচনী শরীর দিল।
এটাই প্রস্তাবের আসল উত্তরাধিকার।
লাহোর প্রস্তাবকে কেবল রাষ্ট্রীয় কিংবদন্তি বানালে তার অস্পষ্টতা, সংশোধন, দ্বন্দ্ব ও প্রাদেশিক টানাপোড়েন হারিয়ে যায়। আবার তাকে শুধু সাম্প্রদায়িক ষড়যন্ত্র বললে মুসলমানদের ঐতিহাসিক ভয়, রাজনৈতিক যুক্তি ও জাতিসত্তার দাবি মুছে যায়। দলিলটি এই দুই সরলতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। এর ভাষা অসম্পূর্ণ, কিন্তু তার রাজনৈতিক দাবি স্পষ্ট।
১৯৪০ শুধু একটি প্রস্তাবের বছর নয়।
এটি ছিল মুসলিম জাতিসত্তার রাষ্ট্রীয় ভাষা পাওয়ার বছর।
আর সেই ভাষাই ১৯৪৭-এর দিকে পথ খুলে দেয়, কিন্তু ১৯৪৭ একে শেষ করে না। কারণ রাষ্ট্র জন্ম নিলেও জাতিসত্তার পূর্ণ নির্মাণ এখনও বাকি।

Post a Comment