Loading...

ধর্মে ধর্মে প্রভেদ: প্রতিহিংসার প্রতিধ্বনি নাকি সত্যের জয় ধ্বনি?

ধর্মে ধর্মে প্রভেদ: প্রতিহিংসার প্রতিধ্বনি নাকি সত্যের জয় ধ্বনি?
Advertisement
Advertisement — Place AdSense Code Here
Table of Contents
    ধর্মে ধর্মে প্রভেদ, সত্য-মিথ্যার লড়াই ও ইসলামের অবস্থান নিয়ে বাংলা ব্লগ কভার ইমেজ

    পূর্বের অংশের পর থেকে আলোচনাটি অব্যাহত…

    সত্য-মিথ্যার লড়াই, না হিংসা-বিদ্বেষের সংঘাত?

    কলিং বেল শুনে ইহতিজাজ বের হলো।
    আরে, আওহাম দা যে! কেমন আছেন?

    সালাম বিনিময় করে বললো, আসুন, ভিতরে আসুন!

    আওহাম আজ ইহতিজাজের হোস্টেলে সকলের জন্য মিষ্টি নিয়ে এসেছে।

    ইহতিজাজ বললো, দাদা! শুধু শুধু এগুলো আনতে গেলেন কেনো!?

    : না ভাই, তেমন কিছু না। আপনাদের জন্য সামান্য একটু হাদিয়া নিয়ে আসলাম আরকি। হাদিয়া দেওয়া এবং নেওয়া উভয়টিই তো আমাদের নবীজির সুন্নাত।

    : মাশাআল্লাহ, দাদা! খুব সুন্দর লজিক দেখালেন নবীজির সুন্নাত থেকে। তো আজ কী উদ্দেশ্যে আসা?

    : মুশির তাঁর গ্রামের বাড়িতে চলে গেছে আজ। তাই একটি প্রশ্ন নিয়ে একাকী আপনার কাছে ছুটে আসলাম।

    : ভালো ভালো। কোনো সমস্যা নেই। তো কী প্রশ্ন দাদা, বলেন?

    : আরজ আলী সাহেব লিখেছেন, “বর্তমান যুগে পৃথিবীর প্রায় সব ধর্মই আস্তিক। বিশেষত একেশ্বরবাদী। হিন্দুধর্মও মূলত একেশ্বরবাদী। তাহাই যদি হয় অর্থাৎ জগতের সকল লোক যদি একেশ্বরবাদী হয়, তবে তাদের মধ্যে একটি ভাতৃভাব থাকা উচিত। কিন্তু আছে কি? আছে যত রকম হিংসা ঘৃণা ও বিদ্বেষ। সম্প্রদায়বিশেষে ভুক্ত থাকিয়া মানুষ মানুষকে এত অধিক ঘৃণা করে যে, তদ্রূপ কোনো ইতর প্রাণীতেও কেউ করে না। হিন্দুদের নিকট গোময় গোবর পবিত্র, অথচ অহিন্দু মানুষ মাত্রই অপবিত্র। পক্ষান্তরে মুসলমানদের নিকট কবুতরের বিষ্ঠাও পাক, অথচ অমুসলমান মাত্রই নাপাক। পুকুরে সাপ, ব্যাঙ মরিয়া পচিলেও উহার জল নষ্ট হয় না, কিন্তু বিধর্মী মানুষ ছুঁইলেই উহা হয় অপবিত্র। কেহ কেহ একথাও বলেন যে, অমুসলমানী পার্বণ উপলক্ষে কলা, কচু, পাঠা বিক্রিও মহাপাপ। এমনকি মুসলমানের দোকান থাকিতে হিন্দুদের দোকানে কোনো কিছু ক্রয় করাও পাপ। এই কি মানুষের ধর্ম? না ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতা?”

    : বুঝলাম দাদা, আপনার প্রশ্ন। এখানে লক্ষ করে দেখুন, আরজ আলী সাহেব নিজেই বলেছেন, সকল ধর্মই আস্তিক এবং একেশ্বরবাদী। এমনকি হিন্দুরাও মূলত একেশ্বরবাদী। তাই তো?

    : জি।

    : আচ্ছা, এবার আপনি আমায় বলেন, সব ধর্ম কি এক ঈশ্বরে বিশ্বাস করে? নাকি কেউ কেউ একজন স্রষ্টার সাথে তিনজনকে শরিক করে, আর কেউ করে ৩৩ কোটি দেবতার পূজা-অর্চনা?

    : আমরা তো ভাইয়া, জগতে ইসলাম ব্যতীত বাকি সব ধর্মেই এক ঈশ্বরের সাথে বহু ঈশ্বরকে শরিক করার প্রবণতা দেখতে পাই।

    : রাইট। যখন ওইসব ধর্মের অনুসারীরা এক ঈশ্বর মানলো না, তখন তারা কি আর সত্যপথে থাকলো? তাদের ধর্মের কথা কি মানলো?

    : না ভাই, তারা তো তাদের ধর্মের কথা মানলো না।

    : হুম। আরজ আলী সাহেবের কথামতো তারাও একেশ্বরবাদী হওয়া উচিত ছিলো। কারণ, তাদের ধর্ম অনুরূপ বলে। যখন তারা তাদের ধর্মের কথা মানলো না, তখন প্রতীয়মান হলো, তারা ধর্মের নামে মানুষকে ধোঁকা দিচ্ছে। এসব ধোঁকাবাজের সাথে ভাতৃভাব বজায় রাখা কি সম্ভব? তাদের বিরুদ্ধাচরণ করা কি অন্যায়?

    যদি অন্যায় না হয়, তাহলে ওইসব ধোঁকাবাজের যারা বিরুদ্ধাচরণ করে, আরজ আলী সাহেব তাদের দিকে আঙুল তোলার চেষ্টা করলেন কেনো?

    উপরন্তু ওইসব ধর্ম এক ঈশ্বরে বিশ্বাস না করে, তাদের ধর্মের মূলমন্ত্র অগ্রাহ্য করে মিথ্যা পথের পথিক হয়ে গেছে। সুতরাং এখানে চলছে সত্য-মিথ্যার লড়াই, যা আদিকাল থেকে চলে আসছে আর চিরকাল চলবে। কিন্তু তিনি সত্য-মিথ্যার লড়াইকে ঘৃণা-বিদ্বেষের লড়াইয়ে পর্যবসিত করে বাজারজাত করতে চাইলেন। সত্য-মিথ্যার লড়াইকে তিনি হিংসা, ঘৃণা এবং বিদ্বেষমূলক আখ্যা দেওয়ার এক দুর্দান্ত অপপ্রয়াস চালালেন।

    অথচ তিনি নিজে বলেছেন, “তার কলম ধরার উদ্দেশ্য ছিল সত্যের সন্ধান এবং কুসংস্কার তথা মিথ্যার অপনোদন।” তার মানে, তিনিও সত্য-মিথ্যার লড়াইয়ে ব্রতী ছিলেন। তাহলে তিনিও কি হিংসুটে ছিলেন? যেহেতু তার নিজের ভাষাতেই সত্য-মিথ্যার লড়াই আর হিংসাত্মক লড়াই এক।

    দেখুন, দাদা। এক স্রষ্টা মানার কথা সকল ধর্ম বলে। অর্থাৎ সকল ধর্মের মূলকথা হচ্ছে এক আল্লাহয় বিশ্বাসী হয়ে যাও। যা মূলত ইসলামের মর্মবাণী। কিন্তু তারা সেটা মানে না। না মেনে সত্যপথ ছেড়ে দিয়ে তারা মিথ্যা পথে পরিচালিত হয়। এখানে চলে সত্য-মিথ্যার লড়াই। সত্য-মিথ্যার লড়াইয়ে হিংসা-বিদ্বেষের কোনো সুযোগ নেই। হিংসা থাকে স্বার্থের লড়াইয়ে।

    আমরা ছোটকালে পড়ার সময় পরীক্ষায় অনেক প্রশ্ন আসতো, এখনো হয়তো আসে, “সঠিক উত্তরের পাশে টিক চিহ্ন দাও। বেঠিক উত্তরটিতে ক্রস চিহ্ন দাও।” সেখানে চলতো সত্য-মিথ্যার সংঘাত। কিন্তু সেখানে কি এটা বোঝা যায় যে, উভয় প্রশ্নের একটির অপরটির সাথে হিংসা-বিদ্বেষ রয়েছে? না, এমনটি কিন্তু আমাদের মনে হয় না।

    তাহলে বোঝা গেলো, সত্য-মিথ্যার লড়াইয়ে হিংসা-বিদ্বেষ থাকে না। সেখানে থাকে কেবল সত্যের জন্য সংগ্রাম। সত্য চেনার প্রচেষ্টা।

    এ সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানতে হলে, আরজ আলী মাতুব্বর রচনাসমগ্র দ্বিতীয় খণ্ডের জবাবে “বহু ধর্মের ছোড়াছুড়ি: মানবো কোনটি” শিরোনামের লেখাগুলো আগ্রহী পাঠক দেখে নিতে পারেন।

    অমুসলিম নাপাক—অভিযোগটি কতটা সত্য?

    আমরা দেখছি, আরজ আলী সাহেব বলেছেন, “মুসলিমরা অমুসলিম বলতেই নাপাক ভাবে”। অপবাদটি পুরোপুরি মিথ্যা। ইসলামের নবী মুসলিমদের এরূপ শিক্ষা দেননি। বরং তাদের পাশে রেখে সঠিক পথের দিশা দিতে বলেছেন।

    সিরাতের পাতায় এখনো আপনি দেখতে পাবেন জ্বলজ্বল করছে ওই অমুসলিম মেহমানের কথা, যে মেহমান হয়ে নবীজির ঘরে রাত্রিযাপন করেছিলো। অতিভোজনের ফলে রাতে সে মলমূত্র দিয়ে নবীজির পবিত্র বিছানা নষ্ট করে ফেলে। তদুপরি রহমতের নবী নিজ হাতে তা পরিষ্কার করেন। যদি কাফের বা অমুসলিম বলতেই ইসলামে নাপাক সাব্যস্ত হতো, তাহলে নবীজি অমুসলিম মেহমানকে তার ঘরে স্থান দিতেন না।

    আপনি জানেন দাদা! নবীজির জামাতা আবুল আস অমুসলিম ছিলেন। তিনি নবীজির মেয়ে হযরত যয়নব রাযি.-কে বিবাহ করেছিলেন। তখনো অমুসলিম পুরুষের সাথে মুসলিম রমণীর বিবাহ বৈধ ছিলো। আবুল আস অমুসলিম অবস্থায় নবীজির ঘরে আসা-যাওয়া করতেন।

    কিন্তু কই, নবীজি তো তাকে বাধা দেন নাই! অমুসলিম মাত্রই নাপাক বলে তাকে বের করেও দেননি। স্বয়ং নবী কারীম সা. তাঁর আপন অমুসলিম চাচা আবু তালিবের সাথে জীবনের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি সময় অতিবাহিত করেছেন।

    সুতরাং আরজ আলী সাহেবের আপত্তি, মুসলিমদের কাছে অমুসলিম বলতেই নাপাক, মিথ্যা। আপত্তিটি ভিত্তিহীন। ইসলামের শিক্ষা এরূপ নয়। বাংলাদেশে আমরা মুসলিম-অমুসলিম সবাই মিলে সুন্দরভাবে জীবন নির্বাহ করতে চাচ্ছি। কিন্তু ইসলামের উপর উনার এরূপ ভিত্তিহীন আপত্তি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণ হতে পারে। আমাদের সংহতি রক্ষায় বাধার সৃষ্টি করতে পারে। নিতান্তই গর্হিত কাজে পা বাড়িয়েছিলেন তিনি।

    উপরের আলোচনা থেকে এটাও পরিষ্কার হয়ে গেলো যে, অমুসলিমদের স্পর্শে পুকুরের পানি ইত্যাদি কোনো কিছুই নাপাক হয় না। উনি বললেন, “অমুসলিমরা পুকুরের পানি স্পর্শ করলেই মুসলিমরা নাপাক ভাবে।” এটা হয়তো উনার মনগড়া কথা। অথবা উনার গ্রামের ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ গ্রাম্য মুসলিমদের ধারণা। ইসলাম ধর্মে এর কোনো ভিত্তি নেই। ইসলাম তো অমুসলিমদের ঝুটাকেও পাক বলে। সুতরাং তাদের স্পর্শকে নাপাক বলতে যাবে কেনো?

    বিশেষ ধর্মীয় আচার, ক্রয়-বিক্রয় এবং ইসলামের অবস্থান

    তিনি আরো বলেছেন, “অমুসলিমদের অনুষ্ঠান উপলক্ষে কলা, কচু, পাঠা ইত্যাদি বিক্রিকে মহাপাপ বলে আখ্যায়িত করেছে ইসলাম। এমনকি মুসলিমদের দোকান থাকতে অমুসলিমদের দোকান থেকে কোনো কিছু ক্রয় করাকেও পাপ গণ্য করেছে ইসলাম।”

    এখানে দুটি দাবির মধ্যে দ্বিতীয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা। প্রথমটির ক্ষেত্রে কিছু কথা রয়েছে।

    ইসলাম সর্বাবস্থায় অমুসলিমদের তথা হিন্দুদের কাছে কলা, কচু, পাঠা ইত্যাদি বিক্রি থেকে নিরুৎসাহী করেনি। বিশেষ এক সময়ে করেছে। সেটা হলো, যখন তাদের পাড়ায় এগুলোকে দেবদেবীর নামে উৎসর্গ করার আমেজ চলে। সেই সময়ে নিরুৎসাহ করার পিছনে একটি যৌক্তিক কারণ রয়েছে।

    কারণটি বোঝার আগে দাদা, আমাকে আপনি একটি প্রশ্নের উত্তর দিন।

    মনে করুন, আপনার একখণ্ড জমি রয়েছে। আপনি এতে বিভিন্ন বস্তু চাষবাস করেছেন এবং অনেক গাছ-গাছড়াও লাগিয়েছেন। সেগুলো দেখাশোনার জন্য গুটিকয়েক লোক নিযুক্ত করেছেন। আর তাদেরকে নিষেধ করে দিয়েছেন, সেগুলো থেকে কোনো কিছু যেনো আপনার অনুমতি ব্যতীত কাউকে না দেয়। এখন আপনি কি তাদেরকে অন্যায় কিছু আদেশ করেছেন? বা মানুষকে দান-অনুদানের ক্ষেত্রে তাদেরকে নিরুৎসাহিত করেছেন?

    : অবশ্যই না, ভাই। সেগুলোর মালিক আমি। আমার অনুমতি ব্যতীত দেখভালকারী লোকদের এতে হস্তক্ষেপের কোনো সুযোগ নেই। এটা অনুচিত এবং অন্যায়। আমার মালিকানাধীন বস্তুতে এরূপ নিষিদ্ধতা আরোপ আমার জন্য কোনোভাবেই অনুচিত হতে পারে না।

    : যদি তারা আপনার মালিকানাধীন বস্তু কাউকে দিয়ে দিতে চায়, তাহলে সেখানে আপনার বাধা প্রদান করা বৈধ নয় কি?

    : অবশ্যই বৈধ।

    : হুম, রাইট দাদা। এবার লক্ষ করুন, আমরা ইতিপূর্বে দেখে এসেছি মহাবিশ্বের একজন সৃষ্টিকর্তা রয়েছেন। গাছপালা, বন-বাদাড়, পশু-প্রাণী, সকল কিছু তাঁরই সৃষ্টি। তার মানে, এসবের মালিক হচ্ছেন একমাত্র তিনি। শুধুমাত্র তাঁর অনুমতিতে এসবের মধ্যে আমরা হস্তক্ষেপ করতে পারি।

    এখন দেখার বিষয় হলো, বিশেষ যে সময়ে হিন্দু ভাইদের কাছে কচু, কলা, পাঠা বিক্রিতে ইসলাম নিরুৎসাহী করেছে, সেই সময় ওই বস্তুগুলো কি তাঁর অনুমোদিত খাতে ব্যয় করা হয়?

    অবশ্যই না, দাদা। সেই সময় একমাত্র স্রষ্টা আল্লাহর মালিকানাধীন এ সমস্ত বস্তুকে দেবদেবীর নামে উৎসর্গ করা হয়। এটা যেনো এমন, আপনার মালিকানাধীন বস্তুকে কেউ একজন জোরপূর্বক অন্যকে দিয়ে দিচ্ছে। সেটা যেভাবে অন্যায়, এটাও সেভাবে অন্যায়। তাই ইসলাম অমুসলিমদের এমন অন্যায় কাজে সহযোগিতা থেকে নিরুৎসাহিত করে। এই সময় এ ধরনের বস্তুরাজি তাদের নিকট বিক্রি করা থেকে নিষেধ করে।

    আল্লাহ তা'আলা বলেন, “নিশ্চয়ই তিনি তোমাদের উপর হারাম করেছেন মৃত জীব, রক্ত, শুকরের মাংস এবং সেসব জীবজন্তু যা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে উৎসর্গ করা হয়।” সূরা বাকারা -আয়াত 173

    এবার আপনি বলুন, দাদা! যদি আপনার মালিকানাধীন জমিতে চাষ করা বস্তুরাজি আপনার অনুমতি ব্যতীত দান করা অবৈধ হয় এবং তা দান করা থেকে আপনার নিষেধ আরোপ অযৌক্তিক না হয়, তাহলে একমাত্র আল্লাহর মালিকানাধীন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বস্তুরাজিকে তাঁর অনুমতি ব্যতীত যখন অন্যকে, অন্যের নামে বলি দিয়ে, দিয়ে দেওয়া হচ্ছে, এমতাবস্থায় তিনি যদি সেটা কাউকে এরূপ দেওয়াতে সহযোগিতা করা থেকে বারণ করার লক্ষ্যে ওই সময়টাতে তাদের কাছে এ ধরনের বস্তু বিক্রি করা নিষিদ্ধ করে দেন, তবে সেটা কি অন্যায়?

    তাঁর নিজস্ব মালিকানাধীন বস্তু কীভাবে, কোথায় খরচ করা হবে, সেটা বলে দেওয়া তাঁর জন্য কি অবৈধ? তাঁর নিজস্ব বস্তু অন্যকে তাঁর অনুমতি ব্যতীত দিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা প্রদান কি বেআইনি?

    আশা করি, আপনি বিষয়টা বুঝতে পেরেছেন। এ কারণেই কেবল ওই সময়ে, যখন অমুসলিম ভাইদের মধ্যে এরূপ গর্হিত কাজের মৌসুম চলে, তখন যে সমস্ত বস্তু তারা দেবদেবীর নামে উৎসর্গ করে থাকেন, সেগুলো তাদের নিকট বিক্রি করা থেকে ইসলাম নিরুৎসাহিত করে। এছাড়া অন্য সময় বিক্রি করতে কোনো সমস্যা নেই। সামনের আলোচনায় আমরা দেখতে পাবো, স্বাভাবিক সময়ে অমুসলিমদের সাথে ক্রয়-বিক্রয় নবী করীম সা. থেকেও প্রমাণিত রয়েছে।

    যে হাদিস থেকে ফুকাহায়ে কেরাম ওই সময়ে অমুসলিম ভাইদের কাছে এসব বস্তু বিক্রয় নিষিদ্ধ হওয়ার হুকুম বের করেছেন, সেই হাদিসের মধ্যে আল্লাহর রাসূল খুবই সুন্দরভাবে বলে দিয়েছেন যে, তাদের সাথে তখন কেনো এরূপ আচরণ প্রদর্শন করে ইসলাম।

    হাদীসটি হলো, “হযরত আবু উমামা রাযি. থেকে বর্ণিত। নবী কারীম সা. বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা আমাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমত এবং হেদায়াতস্বরূপ প্রেরণ করেছেন। আমাকে আদেশ দিয়েছেন বাদ্যযন্ত্র, বংশী-বীণা, প্রতিমা-পূজা, ক্রুশ এবং জাহিলি যুগের পাপাচারকে মিটিয়ে দিতে।” মুসনাদে আবু দাউদ তায়ালিসি -হাদীস নং 1230/  মুজামুল কাবির লিত-তাবরানী -হাদীস নং 7803

    এ হাদীস দ্বারা আল্লাহর রাসূল বুঝিয়ে দিয়েছেন, তিনি এসেছেন সব ধরনের অন্যায়-অবিচার, গর্হিত কাজ এবং জাহিলি যুগের পাপাচার পৃথিবীর বুক থেকে ধুয়ে-মুছে সাফ করে দিতে। এখন স্রষ্টার সৃষ্ট বস্তুকে অন্যের নামে উৎসর্গ করে দেওয়া অবশ্যই অন্যায়-অবিচার। এ ধরনের কাজ তিনি কী করে সমর্থন দিতে পারেন?

    তাই তাঁর আনিত ধর্ম ইসলামের আলোকে উলামায়ে কেরাম ফতোয়া দেন যে, কেবল ওই সময়টাতে অমুসলিম ভাইদের কাছে সেসব বস্তু বিক্রয় করা যাবে না, যেগুলো তারা দেবদেবীর নামে উৎসর্গ করেন। কারণ, সেটা অন্যের মালিকানাধীন বস্তুকে আরেকজনকে জোরপূর্বক দিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করার নামান্তর।

    আপনার জমিতে চাষ করা আপনার মালিকানাধীন বস্তুকে, আপনার অনুমতি ব্যতীত কাউকে দিয়ে দিতে নিষেধ করা এবং সে ক্ষেত্রে বাধা প্রদান করা যেভাবে যৌক্তিক, ঠিক সেভাবে আল্লাহর মালিকানাধীন এসব বস্তু বিশেষ এক সময়ে গুটিকয়েক লোকের কাছে বিক্রি করা থেকে নিষেধ করা অবশ্যই যৌক্তিক। যথার্থ। তবে নিষিদ্ধতা সর্বাবস্থায় নয়, কেবল ওই সময়ের সাথে সম্পৃক্ত।

    কিন্তু আরজ আলী সাহেবের এই কথা, “মুসলিমদের দোকান থাকতে অমুসলিমদের দোকান থেকে কোনো কিছু ক্রয় করাকেও ইসলাম পাপ গণ্য করে”—এটা ডাহা মিথ্যা কথা। ইসলামের মধ্যে এরূপ কিছুই নেই।

    আমাদের এই বিয়ানীবাজারেও ‘যামিনী’ নামে একটি হিন্দু হোস্টেল রয়েছে। মুসলিমদেরও অনেকগুলো আছে। অথচ অনেক সময় দেখা যায়, মুসলিমদের রেস্টুরেন্ট থাকা সত্ত্বেও বড় বড় অনেক আলিম-উলামা হিন্দু দোকান ‘যামিনী’ থেকে মিষ্টি-দধি ইত্যাদি কিনছেন। যদি ইসলামে এটা পাপ হতো, তবে অন্তত উলামায়ে কেরাম সেখানে কিছু কিনতে যেতেন না।

    তাছাড়া ইসলামে এটা পাপ হবে কী করে? স্বয়ং নবী কারীম সা. অমুসলিমদের সাথে ক্রয়-বিক্রয় করেছেন। হাদীস শরীফে এসেছে, “আব্দুর রহমান ইবনে আবুবকর রাযি. বর্ণনা করেন যে, একদা আমি নবী কারীম সা.-এর সাথে ছিলাম। সে সময় এলোমেলো লম্বা চুলবিশিষ্ট এক মুশরিক ব্যক্তি তার বকরি হাঁকিয়ে উপস্থিত হলো। নবীজি তাকে বললেন, এটা কি বিক্রির জন্য, না হেবা (দান) হিসেবে? সে বললো, বিক্রির জন্য। তখন তিনি তার নিকট হতে একটি বকরি কিনে নিলেন।” সহীহ বুখারী - হাদিস নং 2216

    অন্য হাদীসে রয়েছে, “আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত। নবী করীম সা. জনৈক ইহুদির কাছ থেকে নির্দিষ্ট মেয়াদে খাদ্যশস্য খরিদ করেন এবং নিজের বর্ম তার কাছে বন্ধক হিসেবে রাখেন।” সহীহ বুখারী -হাদীস নং 2509

    আচ্ছা দাদা, তখন কি কোনো মুসলিমের কাছে বকরি বা খাদ্যশস্য ছিলো না? অবশ্যই ছিলো। যদি মুসলিমের কাছে থাকতে অমুসলিম থেকে কেনা ইসলামে পাপ সাব্যস্ত হতো, তাহলে নবীজি কি এরূপ লেনদেন করতেন?

    ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ আরজ আলী সাহেব সম্পূর্ণ একটি মিথ্যা অপবাদ ইসলামের উপর ছুড়ে দিলেন। যার দায়ভার একান্ত তার নিজের। ইসলাম এ থেকে আপাদমস্তক মুক্ত।

    House of Wisdom

    House of Wisdom

    House of Wisdom — Inspired by the legacy of Baghdad’s Bayt al-Hikmah, where ideas meet knowledge, culture, philosophy, and civilization through thoughtful exploration.

    Post a Comment